18/07/2026
১৯৪০-এর দশকের গোড়ার দিক। দার্জিলিংয়ের সান্দাকফু এবং ফারি জং এলাকা তখন বরফে ঢাকা এক দুর্গম জনপদ, যেখানে সাধারণ পর্যটকরা যাওয়ার সাহস পেত না। কিন্তু সেই হাড়হিম করা উচ্চতাতেই দিনের পর দিন তাঁবু খাটিয়ে বসে থাকতেন এক বাঙালি তরুণী। তাঁর সঙ্গী ছিল কিছু অদ্ভুতদর্শন যন্ত্রপাতি এবং ইলফোর্ড হাফ-টোন ফটোগ্রাফিক প্লেট। তরুণীর নাম বিভা চৌধুরী, আর তাঁর লক্ষ্য ছিল মহাকাশ থেকে ভেসে আসা এক অদৃশ্য রহস্যের সমাধান করা। তিনি এবং তাঁর মেন্টর দেবেন্দ্রমোহন বসু তখন খুঁজছিলেন 'কসমিক রে' বা মহাজাগতিক রশ্মির উৎস। তাঁরা লক্ষ্য করলেন, ফটোগ্রাফিক প্লেটে এমন কিছু কণার দাগ পড়েছে, যা পরিচিত ইলেকট্রন বা প্রোটনের মতো নয়। সেই দাগগুলো ছিল বাঁকানো, ভারী এবং রহস্যময়। তাঁরা এই নতুন কণার নাম দিলেন 'মেসোট্রন', যা আজকের দিনে 'মেসন' নামে পরিচিত। এই আবিষ্কার ছিল পদার্থবিজ্ঞানের জগতে এক যুগান্তকারী ঘটনা, যা ভারতের মাটি থেকেই প্রথম হতে পারত।
কিন্তু ঠিক সেই সময়েই ইতিহাসের চাকা উল্টোদিকে ঘুরল। শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। বিভা চৌধুরীর গবেষণার জন্য প্রয়োজন ছিল আরও উন্নত মানের 'ফুল-টোন সেনসিটিভ প্লেট', যা একমাত্র ইংল্যান্ড থেকেই আসত। যুদ্ধের কারণে ব্রিটিশ সরকার ভারতে সবরকম বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম পাঠানো বন্ধ করে দিল। বিভা চৌধুরীর গবেষণা মাঝপথে থমকে গেল, তাঁর হাতের মুঠোয় থাকা সাফল্য বালির মতো ঝরে পড়ল। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগাল পশ্চিমী বিশ্ব। যুদ্ধের শেষে, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী সেসিল ফ্র্যাঙ্ক পাওয়েল ঠিক একই পদ্ধতি ব্যবহার করে, সেই উন্নত প্লেটগুলোর সাহায্যে কণাটিকে পুনরায় 'আবিষ্কার' করলেন। ১৯৫০ সালে পাওয়েল পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেলেন। তিনি তাঁর নোবেল বক্তৃতায় স্বীকার করেছিলেন যে ডি.এম. বসু এবং বিভা চৌধুরীর কাজই তাঁকে পথ দেখিয়েছে, কিন্তু নোবেলের সোনার মেডেল বা ইতিহাসের পাতায় নাম—কোনোটাই বিভার কপালে জুটল না। এটি ছিল এক নীরব চুরি, যা আজও ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক দগদগে ঘা হয়ে আছে।
নোবেল না পেলেও বিভা চৌধুরী দমে যাওয়ার পাত্রী ছিলেন না। ১৯৪৫ সালে তিনি পাড়ি দিলেন ম্যানচেস্টারে, নোবেলজয়ী প্যাট্রিক ব্ল্যাকেটের ল্যাবে। সেখানেও তিনি নিজের জাত চিনিয়েছিলেন। ম্যানচেস্টারের স্থানীয় পত্রিকা 'দ্য ম্যানচেস্টার হেরাল্ড' তাঁকে নিয়ে বিশাল ফিচার করেছিল, শিরোনাম ছিল—"Meet India's New Woman Scientist: She has an eye for cosmic rays"। একজন ভারতীয় নারী, শাড়ি পরে বিদেশের ল্যাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, এটা সেই সময়ে ছিল এক অভাবনীয় দৃশ্য। কিন্তু বিদেশে তিনি যতটা সম্মান পেয়েছিলেন, দেশে ফিরে তার ছিটেফোঁটাও পাননি। ১৯৪৯ সালে হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা নিজে তাঁকে ডেকে নিয়েছিলেন টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (TIFR)-এ। তিনি ছিলেন সেখানকার প্রথম মহিলা গবেষক। কিন্তু সেখানেও তিনি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেননি, হয়তো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার শিকার হয়েই তাঁকে সেই জায়গা ছাড়তে হয়েছিল।
পরবর্তীকালে তিনি যোগ দেন ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি (PRL)-এ। সেখানে তিনি কোলার গোল্ড ফিল্ডস বা কেজিএফ-এর গভীর সোনার খনিতে নেমে নিউট্রিনো কণা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। মাটির ৭০০০ ফুট গভীরে, যেখানে দমবন্ধ করা পরিবেশ, সেখানেও তিনি দিনের পর দিন কাটিয়েছেন বিজ্ঞানের নেশায়। তিনি চেয়েছিলেন মাউন্ট আবুতে একটি বিশাল ল্যাবরেটরি তৈরি করতে, যা নিয়ে বিক্রম সারাভাইয়ের সাথে তাঁর কথাও হয়েছিল। কিন্তু সারাভাইয়ের অকালমৃত্যু সেই স্বপ্নকেও ভেঙে চুরমার করে দেয়। বারবার বাধার মুখে পড়েও তিনি ছিলেন অবিচল। তিনি বিয়ে করেননি, সংসার পাতেননি, বিজ্ঞানের বেদীমূলে নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। অথচ জীবদ্দশায় তিনি কোনো জাতীয় পুরস্কার পাননি, কোনো সায়েন্স একাডেমির ফেলো হননি। এমনকি ২০০৮ সালে প্রকাশিত ভারতীয় নারী বিজ্ঞানীদের নিয়ে লেখা বই 'লীলাবতী'স ডটারস'-এও তাঁর নাম জায়গা পায়নি।
১৯৯১ সালে কলকাতার সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের ল্যাবে কাজ করতে করতেই তিনি নীরবে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তাঁর মৃত্যুতে কোনো শোকসভা হয়নি, কোনো মিডিয়া তোলপাড় করেনি। তিনি ছিলেন এক নিঃসঙ্গ নক্ষত্র, যিনি নিজের আলোয় জ্বলে নিজেই নিভে গেছেন। মৃত্যুর বহু পরে, ২০১৮ সালে তাঁর জীবনী প্রকাশিত হওয়ার পর এবং ২০১৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন একটি নক্ষত্রের নাম 'বিভা' এবং তার গ্রহের নাম 'সান্তামাসা' রাখার পর বিশ্ব নতুন করে চিনল তাঁকে। আজ আকাশের দিকে তাকালে হয়তো সেই তারাটি মিটমিট করে জ্বলে, যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মেধার কদর করতে না জানলে আমরা কেবল নক্ষত্র হারাই না, হারাই আমাদের গর্বের ইতিহাসকেও। দার্জিলিংয়ের কুয়াশা থেকে কোলারের অন্ধকার খনি—সর্বত্রই মিশে আছে বিভা চৌধুরীর দীর্ঘশ্বাস, যিনি হতে পারতেন ভারতের মেরি কুরি, কিন্তু হয়ে রইলেন এক বিস্মৃত ইতিহাস।
SOURCES
১. Wikipedia : "Bibha Chowdhuri"
২. Anandabazar : "Bibha Chowdhuri: অল্পের জন্য হাতছাড়া নোবেল! এই বাঙালি মহিলা বিজ্ঞানীর নামে রয়েছে নক্ষত্রও"
৩. The Telegraph : "The woman who could have won a Nobel"
৪. Prohor : "নোবেল পুরস্কার হয়তো পাননি বিভা। সব কিছু ঠিক ঠাক থাকলেও তিনি কি নোবেল পেতেন?"
৫. STEM Women : "Bibha Chowdhuri: A Woman of Firsts with No Recognition"
পেজটি ভালো লাগলে লাইক ও ফলো করে আমাদের উৎসাহ জোগাবেন, আর বন্ধুদের মেনশন/শেয়ার করে অন্যদের দেখার সুযোগ করে দেবেন।
বিধিকরণ সতর্কতা: ©Bangla Tweet — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত এই লেখার কোনো অংশ অনুমতি ছাড়া কপি বা পুনঃপ্রকাশ করা নিষিদ্ধ। ব্যবহার করতে চাইলে পেজের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে—অন্যথায় তা কপিরাইট লঙ্ঘন হিসেবে ধরা হবে।