05/09/2020
শ্রদ্ধা জানাই ...
***********************************************
ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন (৫ই সেপ্টেম্বর,১৮৮৮ – ১৭ই এপ্রিল,১৯৭৫) স্বাধীন ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি (১৯৫২-১৯৬২) এবং দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি(১৯৬২-১৯৬৭) ছিলেন।
একজন আদর্শ শিক্ষক ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ তামিলনাডুর তিরুতান্নিতে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
একাধারে রাজনীতিবিদ, দার্শনিক ও অধ্যাপক এই শান্ত মানুষটি ছাত্রজীবনে অতি মেধাবী ছিলেন। জীবনে কোন পরীক্ষায় দ্বিতীয় হননি। বিভিন্ন বৃত্তির মাধ্যমে তার ছাত্র জীবন এগিয়ে চলে। ১৯০৫ সালে তিনি মাদ্রাজ খ্রিস্টান কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তার বিষয়টি ছিল ‘বেদান্ত দর্শনের বিমূর্ত পূর্বকল্পনা’(The Ethics of the Vedanta and its Metaphysical Presuppositions)।
বিশ্বের দরবারে তিনি অতি জনপ্রিয় দার্শনিক অধ্যাপক হিসাবেও পরিচিত ছিলেন। ১৯৩১ সালে তাঁকে British knighthood-এ সম্মানিত করা হয়। ১৯৫৪ সালে ভারতরত্ন উপাধি পান।
প্রথম জীবনে তিনি মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা করেন (১৯১৮)। এসময় তিনি বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য পত্রিকায় লিখতেন। সে সময়েই তিনি লেখেন তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘The Philosophy of Rabindranath Tagore’। দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘The Reign of Religion in Contemporary Philosophy’প্রকাশিত হয় ১৯২০সালে। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যাপনা করেন। দেশ–বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বারবার অধ্যাপনার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তার গুণমুগ্ধ ছাত্র ও বন্ধুরা তাঁর জন্মদিন পালন করতে চাইলে তিনি বলেন ‘জন্মদিনের পরিবর্তে ৫ই সেপ্টেম্বর যদি শিক্ষক দিবস উদ্যাপিত হয় তবে আমি বিশেষরূপে অনুগ্রহ লাভ করবো।’
শিক্ষক আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিক্ষক ছাড়া যোগ্য সমাজ ও উজ্জ্বল জীবন কল্পনাতীত। প্রতি বছর ৫ই সেপটেম্বর আমরা শিক্ষক দিবস পালন করি এবং আজকের দিনেই ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি একজন শিক্ষক ছিলেন। ১৯৬২ সালে ছাত্রদের অনুরোধে তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন প্রথম শিক্ষক দিবস অনুষ্ঠান পালন করার অনুপ্রেরণা দেন। তিনি ছিলেন একজন বিদ্বান ব্যক্তি ও উপদেষ্টা। ভারতবর্ষের সকল বিদ্যার্থী তাকে সম্মান জানানোর জন্য আজকের দিনে শিক্ষক দিবস পালন করে থাকে।
(সৌজন্যে : উইকিপিডিয়া)
---------------------------------------------------------------
ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ এবং তাঁর সম্পর্কে কিছু কথা :
১৯৬২-এ প্রথম বার ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের জন্মদিন শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়েছিল। তিনি একাধারে ছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি , সোভিয়েত ইউনিয়নে ভারতের দূত এবং সর্বোপরি তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক এবং দার্শনিক।
রাধাকৃষ্ণণ সম্পর্কে দশটা তথ্য, যা আমাদের জানা দরকার।
১) বর্তমান তামিলনাড়ু এবং তৎকালীন মাদ্রাজ প্রদেশের তিরুতান্নিতে এক গরিব ব্রাহ্মণ পরিবারে ১৮৮৮ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন রাধাকৃষ্ণণ। ছেলে পূজারি হোক, এমনটাই চাইতেন তাঁর বাবা। বাবা কখনোই চাননি ছেলে ইংরেজি পড়ুক। কিন্তু রাধাকৃষ্ণণের জেদে পরাজিত হন তাঁর বাবা। তিরুপতির একটি স্কুলে তাঁকে ভর্তি করা হয়।
মেধাবী ছাত্র হওয়ার ফলে, স্কুল জীবনে অসংখ্য স্কলারশিপ পেয়েছেন রাধাকৃষ্ণণ। প্রথমে ভেলোরের ভুরহি কলেজে ভর্তি হলেও, পরে মাদ্রাজ ক্রিশ্চান কলেজে ভর্তি হন তিনি। তাঁর বিষয় ছিল দর্শন। কিন্তু দর্শন তাঁর প্রথম পছন্দের বিষয় ছিল না। বই কেনার টাকা ছিল না রাধাকৃষ্ণণের। কিন্তু সেই সময়েই একই কলেজ থেকে দর্শন নিয়ে স্নাতক হন তাঁর এক দাদা। দাদার বইয়ের জন্যই দর্শনকেই বেছে নেন তিনি।
বয়স যখন ২০, বেদান্ত দর্শন ওপর তাঁর গবেষণা প্রকাশিত হয়।
২) ১৯০৮ সালে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেন রাধাকৃষ্ণণ। এর পড়ে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজ দিয়ে তাঁর অধ্যাপনা জীবন শুরু করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, মহীশুর বিশ্ববিদ্যালয়েও তাঁর অধ্যাপনার স্বাদ পায়। অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের ভূমিকাও পালন করেছেন তিনি।
৩) ছাত্রছাত্রীদের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয় ছিলেন রাধাকৃষ্ণণ। মহীশুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার উদ্দেশে যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায় নিচ্ছেন অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণন, তখন তাঁর পড়ুয়ারা, ফুলসজ্জিত গাড়ির ব্যবস্থা করে, তাঁকে হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল।
৪) বয়স যখন ১৬, দূর সম্পর্কের আত্মীয় শিবাকামুকে বিয়ে করেন তিনি। ১৯৫৬ সালে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়।
৫) ১৯৫২ সালে উপরাষ্ট্রপতি হন রাধাকৃষ্ণণ। কিন্তু তার আগে, অর্থাৎ ১৯৪৬ সালে ইউনেস্কোর দূত হয়েছিলেন তিনি। এর পর সোভিয়েত ইউনিয়নে ভারতের দূতও ছিলেন তিনি।
১৯৬২ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি হন রাধাকৃষ্ণণ। নোবেলজয়ী ব্রিটিশ দার্শনিক, বারট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন, “ডঃ রাধাকৃষ্ণন ভারতের রাষ্ট্রপতি হওয়া মানে দর্শন বিষয়টার কাছে একটা আলাদা সম্মানের। আমিও নিজের দার্শনিক, তাই আমিও গর্বিত।”
৬) রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর পড়ুয়াদের দাবি ছিল তাঁর জন্মদিনটা যেন বিশেষ ভাবে উদযাপন করা হয়। রাধাকৃষ্ণণ বলেছিলেন, “জন্মদিন উদযাপন না করে সেই দিনটা যদি শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করা হয়, তা হলে আমি কৃতজ্ঞ থাকবে।” সেই থেকে ৫ই সেপ্টেম্বর ভারতের শিক্ষক দিবস।
৭) ১৯৫৭ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদের কার্যকাল শেষ হওয়ার পর, রাধাকৃষ্ণণকেই রাষ্ট্রপতি করতে চেয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। কিন্তু মৌলানা আজাদের তীব্র বিরোধিতায় সেটা হয়নি। ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ আরও পাঁচ বছর থাকেন। ১৯৬২ সালে নেহরুর সক্রিয়তায় রাষ্ট্রপতি হন রাধাকৃষ্ণণ।
৮) তাঁর রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালে দুটো যুদ্ধে যেতে হয় ভারতকে। প্রথম ছিল ১৯৬২ সালের চীন যুদ্ধ। রাষ্ট্রপতির আসনে বসার কয়েক মাসের মধ্যেই সেই যুদ্ধ। এর তিন বছর পরে ছিল পাকিস্তান যুদ্ধ।
১৯৬৫ সালের ২৫শে জুন, জাতির উদ্দেশে ভাষণের সময়ে, রাধাকৃষ্ণণ বলেন, “পাকিস্তান ভারতকে হয় খুব দুর্বল ভেবেছে, নয়তো খুব ভীত ভেবেছে। ভারত সাধারণত অস্ত্র হাতে তোলে না, কিন্তু আমাদের মনে হয়েছে পাকিস্তানকে একটা শিক্ষা দেওয়া দরকার। পাকিস্তান যেটা ভেবেছিল, তার বিপরীতটাই হল।”
১৯৬৪ সালে নেহরুর মৃত্যু হয়, এর ঠিক দু’বছর পরেই তাশখন্দে আকস্মিক মৃত্যু হয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর।
৯) তাঁর জীবনীতে, বাবার ব্যাপারে রাধাকৃষ্ণণের ছেলে সর্বপল্লী গোপাল বলেছেন, “কখনও কোনো নিম্নমানের কাজ করেননি তিনি। কখনও কোনো নিম্নমানের চিন্তাও এসেছিল বলে মনে হয় না।”
১০) ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকায় প্রকাশিত একটি লেখায় প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী কে নটবর সিংহ জানান যে সরকারের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে ১৯৬৭-তে দ্বিতীয় বার রাষ্ট্রপতি হওয়ার সুযোগ তিনি হারান।
এই মহান পুরুষের কিছু বিখ্যাত উক্তি :-
১) সত্যিকারের শিক্ষক তাঁরাই, যাঁরা আমাদের ভাবতে সাহায্য করেন
২) ৫ সেপ্টেম্বর, আমার জন্মদিন পালন না করে শিক্ষক দিবস উদযাপন করলেই আমি বেশি খুশি হব।
৩) পাপে নিমগ্ন যে জন, তাঁরও একটা ভবিষ্যৎ আছে। মহানতম ব্যক্তিরও একটা অতীত আছে। কেউ-ই ভালো-খারাপের অতীত নয়।
৪) ঈশ্বর আমাদের প্রত্যেকের ভিতর দিয়েই অনুভব করেন, দুঃখ ভোগ করেন। তাঁর গুণসমূহ, জ্ঞান, সৌন্দর্য এবং ভালোবাসা আমাদের প্রত্যেকের ভিতর দিয়েই প্রকাশিত হয়।
৫) বই হল এমন এক মাধ্যম যার সাহায্যে আমরা বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সেতু নির্মাণ করতে পারি।
৬) আমরা যে মানবজীবন পেয়েছি তা হল আদর্শ মানবজীবন গড়ে তোলার উপকরণ।
(সংগৃহীত )