13/01/2022
★ জ্বলন্ত সূর্য ★
বিয়ের রাত, মাস্টারদা এসেছেন বিয়ে করতে। বিয়ের মন্ত্র পড়া হবে, এমন সময় হঠাৎ পাশ থেকে একজন মাস্টারদার হাতে গুঁজে দিল একটা চিরকুট। চিরকুট পড়ে খুবই চিন্তিত ও গম্ভীর হয়ে গেলেন মাস্টারদা। গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ এসেছে কলকাতার দলের উচ্চমহল থেকে। ফুলশয্যার রাতে নির্জন কক্ষে সহধর্মিণী পুস্পকে বললেন "তোমার কাছে আমার অপরাধের সীমা নেই। তুমি আমার অগ্নি সাক্ষী করা স্ত্রী। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তুমিই আমার স্ত্রী থাকবে। দলের গুরুত্বপূর্ণ কাজে আমার ডাক এসেছে। আজই তোমার কাছ থেকে আমাকে বিদায় নিতে হবে।"
অশ্রুসিক্ত নয়নে মাস্টারদাকে বিদায় দিয়েছিলেন নব বিবাহিতা স্ত্রী পুস্প। শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন মাস্টারদার চিঠি পাবে কিনা। কথা রেখেছিলেন মাস্টারদা। চিঠি আসতো পুস্পর কাছে, খুব গোপনে। সে চিঠি শুরু হতো "স্নেহের পুস্প" দিয়ে আর শেষ হতো "তোমারই সূর্য" দিয়ে।
আর দেখা হয়নি স্বামী স্ত্রীর? হয়েছিল, পুস্প যখন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত, মৃত্যু পথযাত্রী, সূর্য তখন জেলে। প্যারোলে কয়েক ঘণ্টার জন্য ছাড়া পেয়ে স্নেহের পুস্পকে দেখতে এসেছিলেন মাস্টারদা। কিন্তু তার আগেই জীবনদীপ নিভে গেছে পুস্পর।
২রা ফেব্রুয়ারী ১৯৩৩ ....
পলাতক সূর্য সেনকে গৈরালা গ্রামে নিয়ে এসেছেন বিপ্লবী ব্রজেন সেন। মাষ্টারদার সাথে রয়েছেন তার একান্ত অনুগত শান্তি, কল্পনা দত্ত, সুশীল ও মণি দত্ত। তাঁরা ছিলেন গ্রামের বিশ্বাস বাড়িতে,পরম যত্নে তাঁদের আগলে রেখেছিলেন সে বাড়ির বড়বধূ ক্ষিরোদপ্রভা ।
বেশ ছিলেন কিন্ত বিপদ এলো অন্য দিক দিয়ে। প্রতিবেশী নেত্র সেনের সন্দেহ হলো কারা আছে বিশ্বাস বাড়িতে? কিসের এত ফিসফাস গুঞ্জন? খবর লাগাতে বললেন নিজের গিন্নিকে ।
গ্রাম্য বধূটি সরল মনে এসে বললো ও বাড়িতে সূর্য সেন লুকিয়ে আছে গো! অমন লোককে খাওয়ালেও যে পূণ্যি লাভ!
শুনে লাফ দিয়ে উঠলো নেত্র। খবর দিলেই যে কড়কড়ে দশ হাজার টাকা! বউকে আশ্বস্ত করে ব্যাগ হাতে তখনই বেরিয়ে পড়লো, সোজা উঠলো গিয়ে থানায়।
সেদিন রাতে ঘুম ভাঙতে চমকে উঠলো ব্রজেন, জানলা দিয়ে লণ্ঠন দেখিয়ে কি করছে নেত্র সেন? এক মিনিটও লাগলো না বুঝতে, ছুট লাগালেন বিশ্বাস বাড়ির দিকে। দেরী হয়ে গেছে ততক্ষনে, ক্যাপ্টেন ওয়ামসলের নেতৃত্বে গোটা বাড়ি ঘিরে ফেলেছে গোর্খা সেনার দল। রকেট বোমার আলোতে সবকিছু দিনের মতো স্পষ্ট।
পরদিন সমস্ত সংবাদপত্রের হেডলাইন..... গৈরালা নামক গ্রামে সূর্য সেন গ্রেফতার। এনাকে ধরবার জন্য সরকার দশহাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করিয়াছিলেন। (অমৃতবাজার পত্রিকা ১৭.২.১৯৩৩)
তিনদিন পর.........
সন্ধেবেলায় জলখাবার খেতে বসেছে নেত্র সেন, পাশে স্ত্রী। দরজায় শব্দ হতে উঠে গিয়ে খুলে দিলেন। পাড়ারই চেনা ছেলে দেখা করতে এসেছে স্বামীর সঙ্গে। সবে উনি ভাবছেন সেখান থেকে সরে যাবেন কিনা, আচমকা পাড়ার সেই ছেলের হাতের ভোজালির কোপে স্বামীর মুণ্ডু ছিটকে পড়লো!
থরথর করে কাঁপছেন গ্রাম্য বধূ। ঘাতক যাওয়ার আগে বলে গেলেন, মাস্টারদার সঙ্গে বেইমানি করার উপযুক্ত শাস্তি।
বৃটিশ পুলিশ কতবার কতভাবে জেরা করেছে সাধারণ আটপৌরে ঐ বধূটিকে। একবার তিনি বলুন স্বামীর ঘাতকের নাম। মুখ খোলেননি নেত্র সেনের বিধবা স্ত্রী। শুধু বলেছিলেন চোখের সামনে স্বামীকে লুটিয়ে পড়তে দেখে তিনি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত।
কিন্তু যে মানসিক যন্ত্রণায় তিনি সবথেকে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন তা হল এই জেনে যে তার স্বামী নেত্র সেন একজন বিশ্বাসঘাতক, যিনি পুলিশের পুরস্কারের লোভে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন মাস্টারদার মতো ব্যক্তির সঙ্গে। তাই তাকে হত্যা করে ঠিকই করেছেন মাস্টার দার সহযোগী ঐ তরুণ। মেরে ফেললেও তিনি ওই বিপ্লবীর নাম ফাঁস করবেন না।
হয়রানির বেশি আর কিছু নেত্র সেনের স্ত্রীকে করেনি ব্রিটিশ পুলিশ। কারণ, ততদিনে তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়ে গেছে। কারাগারে নির্মম অত্যাচার করা হচ্ছে মাস্টারদার উপরে।
নেত্র সেনের এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল ঐ বাড়িরই ছোট ছেলে কিরন সেন। মাষ্টারদা মরার আগে জেনে গেছিলেন দেশদ্রোহীকে চরম দন্ড দিতে তাঁর মন্ত্রশিষ্যরা এতটুকু দয়া দেখায়নি। মুক্তির মন্দিরের সোপান তলে এরকম কত কিরণ নিঃশব্দে দিয়েছে বলিদান ...আমরা মনে রাখিনি।
বাঙালির সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সেনাপতি মাস্টারদার ফাঁসির দড়িতে আত্মবলিদানের দিন ১২ই জানুয়ারী। পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি তাঁকে। আর প্রণাম জানাই সেই গ্রাম্য বধুকে শত প্রলোভনেও যিনি উচ্চারণ করেননি তার বিশ্বাসঘাতক স্বামীর হত্যাকারীর নাম।
তোমাকে ভুলে গেলে যে নিজেকেই ভুলে যাওয়া হবে। তোমার বিপ্লব আজও উদিয়মান সূর্যের আলোর মতো। যতোদিন এই পৃথিবীতে সূর্য উঠবে, ততোদিন তুমিও থাকবে মাস্টারদা, সমগ্ৰ ভারতবাসীর অন্তরের অন্তঃস্থলে।
তথ্যঃ সংগৃহীত