28/05/2026
বিনায়ক দামোদর সাভারকর ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রাচীন, সাহসী ও দূরদর্শী বিপ্লবী — এমন এক ব্যক্তি, যিনি বহু নেতার আগে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের ডাক দিয়েছিলেন। যখন অনেকে ব্রিটিশদের কাছ থেকে সামান্য সংস্কার বা সুযোগের আশায় ছিলেন, তখন সাভারকর নির্ভয়ে পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলছিলেন এবং যুবসমাজকে বিপ্লবী জাতীয়তাবাদের পথে উদ্বুদ্ধ করছিলেন।
তিনি ‘অভিনব ভারত’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং লন্ডনের ইন্ডিয়া হাউসকে ব্রিটিশবিরোধী কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। তাঁর লেখা “দ্য ইন্ডিয়ান ওয়ার অফ ইন্ডিপেনডেন্স ১৮৫৭” বইটি প্রথমবার ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে শুধুমাত্র “সিপাহী বিদ্রোহ” নয়, বরং ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরে। এই বই অসংখ্য তরুণ বিপ্লবীর মনে দেশপ্রেম ও সংগ্রামের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
ব্রিটিশরা তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকে এতটাই ভয় পেয়েছিল যে তাঁকে আন্দামানের সেলুলার জেলের ভয়ংকর কারাবাসে পাঠানো হয়। ১৯১০ সালে তার জেল হয় ও ১৯১১ সালে তাকে দুটি যাবজ্জীবন কারাদন্ডে সাজা দেওয়া হয় ৫০বছরের জন্যে।সেই জেল ছিল নরকসম — ২৪ঘন্টা শেকলে হাত পা বাঁধা, অমানবিক শ্রম, নির্যাতন, একাকীত্ব ও অশেষ শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের কেন্দ্র। বহু মানুষ সেখানে ভেঙে পড়েছিলেন মারা গেছিলেন। কিন্তু সাভারকর বেঁচে থাকেন, লড়াই চালিয়ে যান তাঁর চিন্তা, লেখনী ও আদর্শের মাধ্যমে।
তাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগ তোলা হয়, তা হলো তথাকথিত “মার্সি পিটিশন”। কিন্তু সমালোচকরা প্রায়শই সেই সময়ের বাস্তবতা ও নিষ্ঠুর পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করেন। আন্দামানের অমানবিক নির্যাতনের মধ্যে এই আবেদন ছিল কৌশলগত পদক্ষেপ — আত্মসমর্পণ নয়। ইতিহাসে বহু বিপ্লবী কঠিন পরিস্থিতিতে কৌশল নিয়েছেন, কারণ বেঁচে থাকলে তবেই ভবিষ্যতের সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। সাভারকর বুঝেছিলেন যে জাতীয় জাগরণের জন্য তাঁর বেঁচে থাকা জরুরি। মৃত বিপ্লবী অনুপ্রেরণা দিতে পারেন, কিন্তু জীবিত বিপ্লবী সমাজ ও জাতিকে সংগঠিত করতে পারেন।
কারামুক্তির পরেও তিনি সমাজ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে সরব হন, মন্দিরে সকল হিন্দুর প্রবেশাধিকার সমর্থন করেন, আন্তঃজাত ভোজনের পক্ষে কথা বলেন এবং হিন্দু সমাজের ঐক্য ও আধুনিকীকরণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। সেই সময়ে এই ধরনের অবস্থান ছিল অত্যন্ত সাহসী ও প্রগতিশীল।
সাভারকর শুধুমাত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তক। তিনি বিশ্বাস করতেন যে শক্তিশালী জাতি গড়তে হলে শুধু আবেগ নয়, প্রয়োজন বিজ্ঞানমনস্কতা, সামরিক সক্ষমতা, সামাজিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস। আজকের বিশ্বের বাস্তবতায় তাঁর এই চিন্তাধারা আরও প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়।
তিনি বারবার বলেছিলেন যে দুর্বল জাতির স্বাধীনতা টেকে না। তাই তিনি যুবসমাজকে শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। আজ যখন বিশ্বজুড়ে জাতীয় নিরাপত্তা, আত্মনির্ভরতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন সাভারকরের বক্তব্য নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
সাভারকর কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের বিরোধী ছিলেন। তিনি যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানচেতনা ও আধুনিক শিক্ষাকে সমর্থন করতেন। তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখতেন যেখানে জাতপাতের বিভেদ ভেঙে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠবে।
তিনি ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি নির্ভয়ে হিন্দু সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের কথা বলেছিলেন। বহু মানুষের কাছে তিনি ‘হিন্দুত্ব’-এর প্রধান তাত্ত্বিক — যা শুধুমাত্র ধর্ম নয়, বরং ভারতের প্রাচীন সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এক জাতীয় দর্শন।
আজও অনেকেই রাজনৈতিক কারণে বা স্বাধীনতার পর বহুদিন ক্ষমতায় থাকার কারনে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাঁর অবদানকে খাটো করার চেষ্টা করেন এমনকি পাঠ্য পুস্তকেও বিকৃতি ঘটনো হয়।নেতাজীর সাথে তার কিছু মতাদর্শের অমিল থাকলেও যেই নোংরা রটনা করা হয় দুজনকে ঘিরে সেটাও কোনো প্রমাণ নেই ,ওঁনাদের ১৯৪০সালে দেখা হয় তখন সাভারকারের বয়স ৫৭ ও নেতাজীর ৪৩ ছিলো তাই এইরুপ ঘটনা যার কোনো প্রমাণ নেই সেটাকে কি কারনে প্রচার করা হয় সেটা বুঝতে কোনো অসুবিধে হয় না।
সত্য হলো, সাভারকরের ত্যাগ, বিপ্লবী সাহস, সাহিত্যকর্ম ও জাতীয়তাবাদী চিন্তা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এমনকি ভগৎ সিং তাকে "বীর সাভারকর" বলেই বিপ্লবী মহলে সম্মোধন করতেন ,তাঁর মতাদর্শের সঙ্গে একমত হওয়া বা না হওয়া আলাদা বিষয়, কিন্তু তাঁকে স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে অস্বীকার করা ইতিহাসের প্রতি অবিচার।
ভারতের স্বাধীনতা কোনো এক ব্যক্তির হাত ধরে আসেনি। গান্ধী গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, নেতাজি সশস্ত্র সংগ্রামের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, ভগত সিং বিপ্লবী চেতনাকে উজ্জীবিত করেছেন — আর সাভারকর সেই প্রথম দিকের মানুষদের একজন, যিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন।
আজকের যুবসমাজের কাছে সাভারকর শুধুমাত্র ইতিহাসের চরিত্র নন; তিনি আত্মসম্মান, শৃঙ্খলা, সাহস, আত্মনির্ভরতা ও জাতীয় চেতনার এক প্রতীক। আন্দামানের অন্ধকার কারাগারেও যাঁর মনোবল ভাঙেনি, তাঁকে ইতিহাস কখনও উপেক্ষা করতে পারে না।
অসংখ্য ভারতীয়ের কাছে তাই ‘বীর সাভারকর’ শুধুমাত্র একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন, বরং এক নির্ভীক দেশপ্রেমিক, যিনি নিজের যৌবন, স্বাধীনতা ও জীবন দেশের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন।
আজ ওঁনার পবিত্র জন্মতিথি ,সমগ্র ভারতবাসীর পক্ষ থেকে নতজানু হয়ে তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাই। #