11/09/2026
গল্পের নাম:- শ্রদ্ধার এক চিলতে আলো 🪔
শহরের নামকরা ব্যবসায়ী আকাশ। বড় বড় ডিগ্রি তার ঝুলিতে, সমাজে তার অগাধ প্রতিপত্তি। কিন্তু এত কিছুর পরেও আকাশে একটা তীব্র অহংকার কাজ করত। সে মনে করত, মানুষের সফলতার পেছনে কেবল তার নিজের মেধা আর পরিশ্রমই শেষ কথা।
একদিন আকাশ তার দামি গাড়ি নিয়ে গ্রামের বাড়ির দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎ মাঝরাস্তায় একটা ছোট বাজারের কাছে তার গাড়িটি নষ্ট হয়ে যায়। ড্রাইভার গাড়ি ঠিক করতে ব্যস্ত, আর আকাশ বিরক্ত হয়ে গাড়ির বাইরে এসে দাঁড়াল। ঠিক তখনই তার চোখ গেল রাস্তার পাশে একটা ভাঙাচোরা, পুরনো ঘরের দিকে। জীর্ণ একটা সাইনবোর্ডে লেখা—"প্রাথমিক পাঠশালা"।
ভেতর থেকে একটা খসখসে, চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে আসছিল। আকাশ কৌতূহলবশত দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল, ভেতরে এক বৃদ্ধ শিক্ষক ছেঁড়া চট বিছানো মেঝেতে বসে কয়েকজন বাচ্চাকে পড়াচ্ছেন। লোকটার গায়ের জামাটা মলিন, চশমাটার একপাশের ফ্রেম সুতো দিয়ে বাঁধা। খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতেই আকাশের বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। এ তো আর কেউ নন, তার ছোটবেলার অংকের শিক্ষক—হরেন স্যার!
ছোটবেলায় হরেন স্যার ভীষণ কড়া ছিলেন। সামান্য ভুল করলেই বেত মারতেন, কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখতেন। আকাশের মনে আছে, একবার অংক ভুল করায় স্যার তাকে পুরো ক্লাসের সামনে খুব বকেছিলেন। সেই থেকে আকাশের মনে হরেন স্যারের প্রতি একটা ক্ষোভ আর তাচ্ছিল্য তৈরি হয়েছিল। আকাশ মনে মনে ভাবল, "এত বছর পার হয়ে গেল, লোকটা এই ভাঙা ঘরেই পড়ে রইল। আর আজ আমি কোথায় পৌঁছে গেছি! কী লাভ হলো অমন মারধর আর পণ্ডিতি দেখিয়ে?"
আকাশের ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে ঘরের ভেতরে পা রাখল।
আকাশকে দেখে হরেন স্যার পড়া থামালেন। চোখের চশমাটা ঠিক করে বৃদ্ধ মানুষটি চেনার চেষ্টা করলেন। তারপরই তার ফোকলা দাঁতের মুখটা এক অদ্ভুত আনন্দে ভরে উঠল। তিনি আনন্দে প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, "আরে আকাশ না! তুই এত বড় হয়ে গেছিস বাবা?"
আকাশ পকেটে হাত দিয়ে কিছুটা তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, "হ্যাঁ স্যার। ব্যবসার কাজে এদিকে এসেছিলাম, গাড়িটা নষ্ট হলো তাই ভাবলাম একটু দেখা করে যাই। তা স্যার, আপনার অবস্থা তো দেখছি আগের মতোই রয়ে গেল। এখনো এই ভাঙা ঘরেই পড়ে আছেন?"
আকাশের কথার ভেতরের খোঁচাটা হরেন স্যার বুঝতে পারলেন না। তিনি উল্টে গর্বিত গলায় পাশের বাচ্চাদের বললেন, "দেখ দেখ রে তোরা, এই আকাশ কিন্তু আমার ছাত্র ছিল। আজ ও শহরের মস্ত বড় মানুষ। আমার শেখানো অংক দিয়েই ও আজ কোটি কোটি টাকার হিসাব রাখে।" বৃদ্ধ শিক্ষকের চোখে তখন আনন্দের জল।
ঠিক সেই মুহূর্তে হরেন স্যারেরই বয়সী আরেকজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলেন। তিনি ওই গ্রামেরই একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। আকাশকে সেখানে দেখে তিনি অবাক হয়ে হরেন স্যারকে বললেন, "হরেন বাবু, আপনি এখনো এই ছেলেকে চাটুকারিতা করছেন? আপনি জানেন না, ও গত মাসে আমাদের এলাকার ওই এতিমখানার জমিটা জবরদখল করার চেষ্টা করেছে? ওর নামে কত জালিয়াতির মামলা চলছে শহরে! ও টাকার গরমে মানুষকে মানুষ মনে করে না।"
কথাটা শুনে হরেন স্যারের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। আকাশের অহংকারী মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে ভাবল, এবার বুঝি স্যার তাকে সবার সামনে অপমান করবেন, ছোটবেলার মতো তীব্র তিরস্কার করবেন।
কিন্তু হরেন স্যার তা করলেন না। তিনি ওই ভদ্রলোকের হাত ধরে শান্ত গলায় বললেন, "ও যা করেছে, তা হয়তো ওর চারপাশের পরিবেশ আর লোভের কারণে করেছে। কিন্তু ও আজ যখন এই ভাঙা পাঠশালায় পা রেখেছে, তখন ও কোনো অপরাধী বা বড় ব্যবসায়ী নয়। ও কেবলই আমার ছাত্র। শিক্ষক হিসেবে আমি হয়তো ওকে ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাটা পুরোপুরি গেঁথে দিতে পারিনি, সে ব্যর্থতা আমার। কিন্তু আমার ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আমার ছাত্রকে কেউ অপমান করবে, এটা আমি সইব না। ও যেমনি হোক, ও আমার ছাত্র। আর আমি যেমনি হই না কেন, আমি ওর শিক্ষক।"
হরেন স্যারের এই কথা কটি যেন আকাশের কানে এসে চাবুকের মতো পড়ল। যে স্যারকে সে মনে মনে তাচ্ছিল্য করছিল, যাকে সে ব্যর্থ ভাবছিল, সেই মানুষটিই আজ তার সম্মান বাঁচাতে নিজের কাঁধে ব্যর্থতার দায় তুলে নিলেন! আকাশের চোখের সামনে থেকে অহংকারের পর্দাটা ছিঁড়ে পড়ে গেল। সে বুঝতে পারল, শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় বা বড় ডিগ্রিতে থাকে না, শিক্ষা থাকে শিক্ষকের এমন বিশাল হৃদয়ের আদর্শে।
আকাশের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে সমস্ত অহংকার ভুলে হরেন স্যারের মলিন পায়ের কাছে নতজানু হয়ে বসে পড়ল এবং স্যারের পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। ভাঙা চশমার আড়াল থেকে হরেন স্যারের চোখ দুটো আবার ভিজে উঠল, তবে এবার তা পরম তৃপ্তির।
আকাশ সেদিন মনে মনে অনুভব করল—"শিক্ষক যেমনি হোক, যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, তিনি আমার শিক্ষক। তাঁর দেওয়া শিক্ষার আলোই আমার ভেতরের অন্ধকার দূর করার একমাত্র চাবিকাঠি।"