20/08/2026
#জাতীয়_বিজ্ঞানমনস্ক_দিবস
জাতীয় বিজ্ঞানমনস্কতা দিবস প্রতি বছর ২০শে আগস্ট সারা দেশ জুড়ে পালিত হয়ে থাকে । সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করে দৈনন্দিন জীবনে যুক্তিবাদী বৈজ্ঞানিক এবং প্রশ্ন করার মানসিকতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে দিনটি উদযাপিত হয় । ২০১৩ সালের ২০শে আগস্ট উগ্ৰ ধর্মান্ধ অতিদক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদীদের গুলিতে নিহত যুক্তিবাদী ও চিকিৎসক নরেন্দ্র অচ্যুত দাভোলকরের (১লা নভেম্বর, ১৯৪৫ - ২০শে আগস্ট, ২০১৩) স্মরণে এই দিনটি পালিত হয় ।
নরেন্দ্র অচ্যুত দাভোলকার বিশিষ্ট ভারতীয় চিকিৎসক, সমাজসেবী, যুক্তিবাদী, কুসংস্কার বিরোধী আন্দোলনের নেতা, লেখক এবং মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন । সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করে মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক হিসাবে গড়ে তুলতে যে আন্দোলনের সূচনা করছিলেন তাতে বেশ কিছু অতিদক্ষিণপন্থী উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের বিরোধ ছিল । ফলস্বরূপ, তিনি ২০শে আগস্ট, ২০১৩ তারিখে দুই আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান । পরের বছর ২০১৪ সালে সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে মরণোত্তর পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত করেন ।
নরেন্দ্র অচ্যুত দাভোলকারের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১লা নভেম্বর । বাবার নাম অচ্যুত দাভোলকার আর মায়ের নাম ছিল তারাবাঈ । তাঁর পড়াশোনা শুরু হয় মহারাষ্ট্রের সাতারার নিউ ইংলিশ স্কুলে । মাধ্যমিক পাশের পর সাঙ্গলির উইলিংডন কলেজ হয়ে ডাক্তারি পড়ার জন্য মরাজ-এর সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই এমবিবিএস পাশ করেন । তিনি শিবাজী ইউনিভার্সিটি কাবাডি দলের অধিনায়ক ছিলেন এবং ভারতের কাবাডি দলের হয়ে তিনি বাংলাদেশ সফরে যান । কাবাডিতে সাফল্যের জন্য তিনি মহারাষ্ট্র সরকারের 'শিব ছত্রপতি যুবরাজ' সম্মানে ভূষিত হন । তিনি বারো বৎসর সক্রিয়ভাবে চিকিৎসক হিসাবে পরিষেবা দেন ।
১৯৮০ সালে নিজেকে সমাজকর্মী হিসাবে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেন দাভোলকার । বাবা আদভের "এক গাঁও এক পানোঠা" (One village - One well) -এর আদর্শে ন্যায়-বিচারের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন এবং ধীরে ধীরে দাভোলকার কুসংস্কার বিরোধী আন্দোলনের প্রধান মুখ ওঠেন এবং "অখিল ভারতীয় অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি"-র সাথে যুক্ত হন । পরে ১৯৮৯ সালে তিনি 'মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি' প্রতিষ্ঠা করেন । বহু ভণ্ড সাধু ধর্ম ও মোক্ষলাভের নামে দিনের পর দিন ভাঁওতাবাজি ও বুজরুকির মাধ্যমে দুর্বলচিত্ত, অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন অসংখ্য মানুষকে প্রতারিত করে থাকে । এইসব ভণ্ড সাধু-সন্তের অবৈজ্ঞানিক তান্ত্রিক চিকিৎসাতেও প্রবঞ্চিত হতেন বহু মানুষ । এদের প্রতিহত করতে, সমাজে অন্ধবিশ্বাসের প্রকোপ আটকাতে এবং কুসংস্কার নির্মূল করে বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তুলতে কাজ শুরু করে তাঁর এই সংগঠন । পঁচিশ বছরে মহারাষ্ট্র জুড়ে ২২৫ টি এইরকম কেন্দ্র চালু করেছিলেন তিনি । যে সব চমৎকারী কাণ্ডকারখানা নানা সাধু-সন্তরা দেখিয়ে থাকেন, সেসবের পেছনে লুকিয়ে থাকা বৈজ্ঞানিক ভিত্তিগুলো তিনি ফাঁস করে দিতেন । প্রায় তিন দশক ধরে এইসব ভণ্ড সাধুবাবাদের মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন তিনি । সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের জীবনে স্বার্থ, সুরক্ষা মর্যাদা ও উন্নত জীবনচর্চায় শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সাতারায় 'পরিবর্তন' নামে এক সামাজিক কর্ম কেন্দ্রও গড়ে তোলেন দাভোলকর । ১৯৯০ সাল থেকে শুরু করে ২০১০ সালে দাভোলকার দলিত সম্প্রদায়ের প্রতি সাম্যের অধিকার, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ, ভারতের ধর্মীয় ব্যবস্থা ও ধর্মীয় দাঙ্গা প্রতিহত করা ইত্যাদির ব্যাপারে অতি সক্রিয় ছিলেন । তিনি মারাঠাওয়াড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে "ড. বি আর আম্বেদকর মারাঠাওয়াড়া বিশ্ববিদ্যালয়" করার পক্ষে নামান্তর আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন । বিখ্যাত মারাঠা পাক্ষিক "সাধনা" পত্রিকার সম্পাদনাও করেছেন তিনি ।
বিবাহ করেছিলেন শৈল দেবীকে । তাঁদের এক পুত্র হামিদ ও এক কন্যা মুক্তা । ছেলের নাম মারঠি মুসলমান সমাজকর্মী ও সংস্কারক হামিদ দলবাই-এর নাম অনুসারে রাখেন । তিনি নাস্তিক ছিলেন বলেই তাদের বিবাহ পঞ্জিকা অনুসারে ও প্রথাগত রীতি মেনে করাননি ।
২০১০ খ্রিস্টাব্দে দাভোলকারের 'মহারাষ্ট্র অন্ধ শ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি' কুসংস্কারবিরোধী ও ব্ল্যাকম্যাজিক বিলের খসড়া তৈরি করে । কিন্তু কিছু উগ্ৰ হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দল এটির বিরোধিতা করতে থাকে । কারণ হিসাবে বলা হয় এটি হিন্দু সংস্কৃতি রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের পরিপন্থী হবে । কিন্তু দাভোলকার এক সাংবাদিক সম্মেলনে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন - এই বিলে ঈশ্বর ও ধর্মীয় বিষয়ে কিছুই নেই, বিলটি সংবিধানে প্রদত্ত পূজা-অর্চনার মৌলিক স্বাধিকারের বিরুদ্ধে নয়, এটি সমাজে প্রবঞ্চনা প্রতিহত ও শোষণ হতে নিষ্কৃতির জন্যই ।
কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের অচলায়তন ভেঙে ফেলা সহজ কাজ ছিল না । স্বভাবতই দাভোলকার বিরাগভাজন হয়েছেন বহু ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের ও তথাকথিত সমাজপতিদের । ২০১৩ সালের ২০শে আগস্ট মহারাষ্ট্রের পুনেতে যখন তিনি প্রাতঃভ্রমণে বের হন তখন সকাল ৭ টা ২০ মিনিটে অজ্ঞাতপরিচয় দু'জন উগ্ৰ ধর্মান্ধ অতিদক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী আততায়ী তার উপর পরপর চার রাউন্ড গুলি চালায় । ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় ।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ঠিক একইভাবেই ২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রের অধ্যাপক ও গবেষক গোবিন্দ পানসারে, কন্নড় ভাষার শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এম এম কালবুর্গি, এবং ২০১৭ সালে কর্নাটকের বিশিষ্ট সাংবাদিক গৌরি লঙ্কেশের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটে যায় উগ্ৰ ধর্মান্ধ অতিদক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদীদের হাতেই ।
দাভোলকরের হত্যাকাণ্ডের চার দিনের মধ্যেই অর্ডিন্যান্স পাশ হয়ে যায় । এর পর ‘জাত পঞ্চায়েত’-এর ক্ষমতা কেড়ে নিতে অন্য একটি জরুরি বিল পাশ করাতে সক্ষম হয় তাঁর সংগঠন । নরেন্দ্র দাভোলকার সমাজসেবী হিসাবে যে অবদান রেখেছেন তারই স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার ২০১৪ সালে তাঁকে মরণোত্তর পদ্মশ্রী পুরস্কার প্রদান করে ।
২০১৮ সালে সর্বভারতীয় জনবিজ্ঞান নেটওয়ার্ক সাংবিধানিক কর্তব্যকে সমুন্নত রেখে জনবিজ্ঞান আন্দোলনের প্রথম শহীদের প্রয়াণ দিবসটির স্মরণে 'ন্যাশনাল সায়েন্টিফিক টেম্পার ডে' (National Scientific Temper Day) তথা 'জাতীয় বিজ্ঞানমনস্কতা দিবস' পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । সর্বভারতীয় গণবিজ্ঞান নেটওয়ার্ক মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতির সহযোগিতায় ২০১৮ সালের ২০শে আগস্ট প্রথমবার জাতীয় বিজ্ঞানমনস্কতা দিবস উদযাপন শুরু করে । ক্রমে সারা দেশের সমস্ত বিজ্ঞান সংগঠন সামিল হয় । বিজ্ঞান-ভিত্তিক যুক্তিবাদী চিন্তার প্রচার, কুসংস্কারের ক্রমবর্ধমান প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই এবং বিজ্ঞান-বিরোধী ধারণার প্রসারের বিরোধিতা করার উদ্দেশ্য নিয়েই এই বার্ষিক উদযাপন ।
দেশের বিভিন্ন বিজ্ঞান সংগঠন, যেমন পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চসহ দেশের বিভিন্ন বিজ্ঞান সংগঠন র্যালি, পথসভা ও প্রচারের মাধ্যমে এই দিনটি পালন করে থাকে । তাই সারা দেশে বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ আন্দোলনে ২০শে আগস্ট তারিখটি এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে ।