03/09/2025
রাঢ়বঙ্গ, জঙ্গলমহল বা ছোটনাগপুরের জঙ্গলে পাওয়া “অষ্টমী ছাতু (মাশরুম) বা কাড়ান ছাতু বা দুর্গা ছাতু বা পরব ছাতু”র রহস্য উন্মোচন।
এই মাশরুমটির বটানিক্যাল নাম হল Termitomyces heimii, ১৯৭৯ সালে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞানের অধ্যাপক কুরুপ্পাস্বামী নটরাজন ছত্রাকটির বৈজ্ঞানিক বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন, ফরাসি মাইকোলজিস্ট রজার হেইমকে সম্মান জানাতে বটানিক্যাল নাম রাখা হয় Termitomyces heimii (টার্মিটোমাইসেস হেইমি)।
Termitomyces heimii এক প্রজাতির মিথোজীবি ছত্রাক যা উইপোকাদের সঙ্গে জৈবিক সহাবস্থানে (symbiosis) জীবনচক্র সম্পন্ন করে, জীববিজ্ঞানে সিম্বায়োটিক সম্পর্কের অর্থ হল যেখানে দুটি জীব প্রজাতি ঘনিষ্ট সম্পর্কে জীবনচক্র সম্পন্ন করে, এবং উভয় প্রজাতিরই উপকার হয়। এই প্রজাতিটি অ্যাগারিকেলস (Agaricales) বর্গের এবং লিওফিল্যাসি পরিবারের, এই ছত্রাক সাধারণত ভারত, বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে জন্মায়, রাঢ়বঙ্গের বিভিন্ন জঙ্গলে এটি পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে সাধারণত আষাঢ়ের শেষ থেকে শুরু করে আশ্বিনের শেষ পর্যন্ত জন্মায়। যেহেতু এই মাশরুম উইপোকার সহাবস্থান ছাড়া জন্মায়না, তাই নবীন পলিমাটি অঞ্চলে, যেখানে মাটির নিচে উইপোকা বাসা তৈরি করতে পারেনা, সেখানে জন্মায়না।
টার্মিটোমাইসেস গণের অন্যান্য প্রজাতিগুলি আফ্রিকা, এশিয়া এবং মধ্য আমেরিকার গ্রীষ্মমন্ডলীয় এবং উপ-ক্রান্তীয় অঞ্চল জুড়ে জন্মায়, যদিও আণবিক গবেষণা আফ্রিকা এবং এশিয়ায় টার্মিটোমাইসেসগুলির পৃথক উৎপত্তি দর্শায়।
ছত্রাকের ফলদেহ গুলি খুবই সুস্বাদু, গ্রীষ্মমন্ডলীয় এবং উপ-ক্রান্তীয় অঞ্চল জুড়ে এটি "উইপোকা মাশরুম, বন মাশরুম, জংলি মাশরুম" নামে পরিচিত।
অন্যান্য টার্মিটোমাইসেস প্রজাতিগুলির মত রাঢ়বঙ্গের প্রজাতিটিও উইপোকার বাসায় বাস করে। এটি বন-জঙ্গলের পাশাপাশি বাগান এবং চারণভূমিতেও জন্মাতে যায়, যেখানে ওডোন্টোটার্মস প্রজাতির উইপোকা দেখা যায়। কয়েকটি প্রজাতির উইপোকা আক্ষরিক অর্থেই এই মাশরুমের ”চাষ” করে, তাদের নিজেদের খাবার জন্য।
প্রথমে উইপোকারা গাছের মৃত পাতা, কাঠ, ছাল সংগ্রহ করে নিজেদের বাসায় নিয়ে আসে, তারপর কর্মী উইপোকারা সেগুলো চিবিয়ে একটি তা অর্ধপাচিত মন্ডে রূপান্তরিত করে, যেটি ছত্রাকটির বেড়ে ওঠার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, যাকে বলে ফাঙ্গাস কম্ব বা ফাঙ্গাস গার্ডেন। উইপোকাদের অন্ত্রে আগে থেকেই টার্মাইটোমাইসেস ছত্রাকের স্পোর (ছত্রাকের বীজ) থাকে, তারা কাঠ-পাতার তৈরি মন্ডের ওপর মলত্যাগ করার মাধ্যমে ছত্রাকের স্পোর রোপণ করে, ছত্রাকের স্পোর অঙ্কুরিত হয় এবং বৃদ্ধি পায় এবং এক সময়ে তা ছোট ছোট গাঁট তৈরি করে, এই গাঁটগুলি খুব পুষ্টিকর, যা উইপোকারা খায়, এই কাজ তারা চক্রকারে করে যায়। উইপোকার বাসা মাটির নিচে ২-৩ মিটার গভীর থাকতে পারে, টার্মাইটোমাইসেস প্রজাতির ছত্রাক শুধু উইপোকাদের সহায়তায়ই বাঁচতে পারে, তাই দুর্লভ।
Termitomyces ছত্রাকের স্পোর সংগ্রহ করে কৃত্রিমভাবে সাবস্ট্রেটে লাগালেও তা অনেক সময় অঙ্কুরিত হয় না, কারণ, ছত্রাকটির স্পোর উইপোকাদের পাকস্থলীর এনজাইমেরর মাধ্যমে সক্রিয় হয়, কিছু সংস্থা উইপোকাদের অনুকরণে কৃত্রিম সাবস্ট্রেট ও পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছেন, আংশিক সাফল্যও পাওয়া গেছে।
আমরা যেটি ছাতু বা মাশরুম বলে খাই, সেটা আসলে ছত্রাকের “ফলদেহ বা ফ্রুটিংবডি (fruiting body)”, এটা ছত্রাকের সেই অংশ যা প্রজননের জন্য “স্পোর” উৎপাদন করে, এটা মাটি বা পচা জৈব পদার্থের উপরে দৃশ্যমান হয় এবং টুপি, কাণ্ড এবং ফুলকার মত গঠন থাকতে পারে, ফলদেহ আসলে মাইসেলিয়ামের একটি জটিল নেটওয়ার্কের সমষ্টি, যার ৮০-৯০% জল, এরসঙ্গে বিভিন্ন কার্বোহাইড্রেট (যেমন সেলুলোজ, গ্লাইকোজেন, এবং কাইটিন বা চিটিন), প্রোটিন (টার্মাইটোমাইসেসে উচ্চ প্রোটিন থাকে), সামান্য পরিমাণে ফ্যাট বা লিপিড থাকে। এছাড়া বিভিন্ন মিনারেল, ভিটামিন ও অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে। কিছু ছত্রাকে বিশেষ রাসায়নিক (যেমন পলিস্যাকারাইড, টারপেনয়েড) থাকে, যা স্বাদ বা ঔষধি গুণ যোগায়।
অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে ফ্রুটবডি মাটির তলায় থাকা সুতোর মত মূল গঠন মাইসেলিয়াম (mycelium) থেকে বৃদ্ধি পায় এবং উপরে উঠে আসে, ফ্রুটবডি গঠনের জন্য উচ্চ আর্দ্রতা (৮০-৯০%) প্রয়োজন এবং ২৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আদর্শ, রাঢ়বঙ্গে এই পরিবেশ বর্ষাকালে তৈরি হয়, ফলে।
রাঢ়বঙ্গে এই ছত্রাকটির উদগমের সঙ্গে বিভিন্ন “মিথ” জড়িয়ে আছে, যেমন অষ্টমী তিথি ধরে গজায়, যেমন জন্মাষ্টমী, রাধাষ্টমী, জিতাষ্টমী বা দুর্গাষ্টমীতেই ওঠে! বাস্তবে ছত্রাক তিথি মেনে ওঠেনা, যেখানে মানুষের মত চেতনাসম্পন্ন জীব নিজের ইচ্ছামত দিনে সন্তান জন্ম দিতে পারেনা, তাহলে ছত্রাক কিভাবে তিথি জানবে!! আসলে ছত্রাকের ফলদেহ ওঠা খুবই আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, মাটির জৈব পদার্থের উপস্তিতির ওপর নির্ভর করে। স্থানীয় জলবায়ুর কারণে এই ছত্রাকের ফলদেহ পুরো বর্ষাকাল জুড়ে ধাপে ধাপে এবং বিভিন্ন উইঢিবিতে বা বাসায় একসাথে ওঠে, এরজন্য মাটির নিচে মাইসেলিয়ামের নেটওয়ার্ক দায়ী, সংগ্রকারী মানুষজন প্রাচীন অভ্যাস অনুযায়ী অষ্টমী তিথির আশেপাশে সংগ্রহ করতে জঙ্গলে যায়, ফলে মানুষের মনে ছত্রাক আর অষ্টমীর মধ্যে একধরনের কাল্পনিক যোগ তৈরি হয়েছে, চান্দ্রমাসকে ৩০টি ভাগে ভাগ করা হয়, এই ৩০টি ভাগের প্রত্যেকটিকে বলা হয় তিথি। যদিও আমি দেখেছি মাশরুমগুলি ৩-৪ মাস জুড়ে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই পাওয়া যায়।
রেফারেন্স: Termitomyces heimii - উইকিপিডিয়া,
Termitomyces heimii Associated with Fungus-Growing Termite - Springer
South Indian Agaricales V: Termitomyces heimii -Natarajan K, JSTOR 3759201
Termitomyces of Southeast Asia - D. N Pegler, M. Vanhaecke