22/07/2026
বর্ষা ঋতুর অন্তর্গত শ্রাবণ মাস হলো আমাদের কাছে অন্যতম পবিত্র মাস। একদিকে যেমন প্রকৃতি সবুজে সেজে ওঠে, সতেজ হয়ে ওঠে গাছপালা ও নদী-নালা; তেমনি অপর দিকে "বোল বম্" বা " হর হর মহাদেব" ধ্বনিতে মুখরিত হয় চারপাশ; আবার শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি যোগে ঘরে-আশ্রমে শুরু হয় মাতৃ সম্মেলন। শ্রাবণ মাস শ্রীশ্রীবড়মার পবিত্র জন্মমাস। সেই উপলক্ষে মূলতঃ দীক্ষিত মায়েরা সারা মাস জুড়ে আয়োজন করেন এই অনুষ্ঠানের। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে মাতৃ সম্মেলনের সাথে আষাঢ় মাসের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে, কিংবা মাতৃ সম্মেলনের সূচনা লগ্নের কথা, গৌরবময় অতীতের কথা অনেকেরই অজানা। গর্বে বুক ভরে ওঠা, শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যাওয়া, বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে যাওয়ার মতন কিছু বিবরণ আপন লেখনীতে ফুটিয়ে তুলেছেন পূজনীয় শ্রী বৌধায়ন চক্রবর্তী দাদা। আপনাদের কাছে সেটা তুলে ধরা হলো। পড়ুন, জানুন, সংগ্রহ করে রাখুন ও অন্যকেও এসবের সুযোগ করে দিন । জয়গুরু ।
************
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জীবন এবং দর্শন থেকে উদ্ভুত সৎসঙ্গ আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হ'ল মাতৃ সম্মেলন। মাতৃ সম্মেলন কথাটির অর্থ হ'ল মায়েদের মিলন মেলা। মিলন মেলা মানে কিন্তু অন্যান্য অনেক সামাজিক ও ধর্মীয় মেলার মত সমাবেশ বা জমায়েত নয়। শ্রীশ্রীঠাকুরের সমগ্র জীবনদর্শনের মূল কথাই হল "বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠা”। "কর, হও, পাও"-- এই হল তাঁর মন্ত্র। একজন কুমারী মেয়ে বা বধূ তার নানাবিধ ভূমিকা পালন করে কীভাবে এককথায় সার্থক নারী হয়ে উঠতে পারবে সেই বিষয়ক ধ্যান-ধারণা ও শিক্ষা দেওয়ার-নেওয়ার সমাবেশ হল মাতৃ সম্মেলন। মাতৃ সম্মেলন শ্রীশ্রীঠাকুরের প্রবর্তিত প্রকৃত নারী শিক্ষা সঞ্চারণার জন্যই নিবেদিত। তাছাড়াও এই সংসারের নানান ঘাটে জোয়ার ভাটার অমোঘ বিধানে মানুষের মনের কোণে পলি জমে ওঠে স্বাভাবিকভাবে, জমতে জমতে গভীরতাও কমে। মায়েদের ক্ষেত্রে ক্লান্ত অবসন্ন মনকে ঊর্জীতেজা ও ইষ্টপ্রাণ করে রাখাটাও মাতৃ সম্মেলনের অন্যতম উপযোগিতা। মনে পড়ে যাচ্ছে " গল্প হলেও সত্যি" সিনেমার কথা। একজন সৎ ও আদর্শনিষ্ঠ " কাজের লোকের" প্রভাবে কীভাবে এক এলোমেলো পরিবার একগাট্টা হয়ে উঠল! প্রত্যেকে কেমন আপন বৈশিষ্ট্যে বিকশিত হয়ে উঠল! সিনেমাই তো, তবুও কেমন নিজের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত মনে হয় না ? অমন একটা মানুষের অভাব বোধ হয় না ? আসলে এই সব-পেয়েছির-যুগেও মানুষের বুনিয়াদি চাহিদা কিন্তু বদলায়নি। সে এমন সমাবেশ খোঁজেই যেখানে সে সুবিন্যস্ত হয়ে বিকশিত হয়ে উঠতে পারে, শান্তি-স্বস্তির অধিকারী হয়ে উঠতে পারে। মাতৃ সম্মেলনের উদ্দেশ্যও তাইই। এই প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুরের সাথে জনৈকা মায়ের আলাপচারিতার কথা উল্লেখ করা হলো --- "একটি মা কথাপ্রসঙ্গে বললেন---আমার খুব ইচ্ছা করে নিজেদের মধ্যে পরস্পর মেলামেশা, যাতায়াত, আদান-প্রদান খুব থাকে।
শ্রীশ্রীঠাকুর প্রীত হয়ে বললেন---সেই তো ভাল। তাতে শক্তি বাড়ে, ঐক্য হয়, বৈশিষ্ট্য ঠিক থাকে, আত্মীয়তা গজায়। প্রত্যেকে মনে ভাবে যে আমার কেউ আছে। মনের বল বেড়ে যায়। সুখী হওয়ার পথ হলো অপরকে সুখী করা। ঐ নেশা নিয়ে নিরন্তর লেগে পড়ে থাকতে হয়। সহযোগিতা খুব ভাল। দেওয়া--নেওয়া। আমি তোমার জন্য করি, কিন্তু একবাটি কাঁঠালের তরকারি রেঁধেও আমাকে দেওয়ার কথা তোমার মনে পড়ে না, তার মানে আমি এতখানি দুরে আছি তোমার মনের থেকে। ওতে দানা বাঁধে না।... আগে কত বড় বড় পরিবার ছিল। একশ দেড়শ লোকের একান্নবর্তী বিরাট পরিবার ছিল। পরিবারের কর্তাকে কেন্দ্র করে সবাই কেমন সংহত হয়ে থাকত--সকলেই যেন সকলের জন্য--কেমন একটা একগাট্টা ভাব--অন্তহীন প্রাণঢালা দরদ ও মমতা। পরস্পরের সুখশান্তি এবং সংসারের উন্নতির জন্য সকলেই প্রাণের আবেগে করত আর পরিবারের কর্তা যার যথাপ্রয়োজন যোগান দিতেন, যাতে প্রত্যেকেই তার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ফুটে উঠতে পারে, সার্থক হতে পারে। একেই বলে Indian Communism (ভারতীয় সাম্যবাদ)।" (আঃ প্রঃ ১৫/২২.২.১৯৪৯)
কী অপূর্ব বাস্তব কথা ! আর শ্রীশ্রীঠাকুরই হলেন এর আদর্শ উদাহরণ। তাঁকে কেন্দ্র করে, তাঁর মনোজ্ঞ চলনে চলে তদানীন্তন গড়ে ওঠা তাঁর বিরাট একান্নবর্তী পরিবার "সৎসঙ্গ"- এর পরিচয় তো এমনই ছিল। সেইসব সোনাঝরা দিনগুলোর বর্ণনা শুনলে বা পড়লেও মন এক অনাবিল আনন্দে ভরে ওঠে। এমন নয় যে তখন অভাব অনটন ছিল না বা দুঃখ কষ্ট ছিল না বা রোগ শোক ছিল না; কিন্তু সেসব ছাপিয়েও তাদের ছিল এক প্রেমঘন দরদী অভিভাবক---যাঁর পোষণদীপ্ত, প্রেরণাপুষ্ট, ব্যথা-উপশমী আচরণ-বাক্য-কর্ম সবার উদ্দেশ্যেই থাকত। নানান প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একানুরক্তি, তীব্রতা ও ক্রমাগতি সম্পন্ন চলনে চলে সৌন্দর্য্য ও সার্থকতায় ভরিয়ে তুলতে পেরেছিল নিজের জীবনকে।
শ্রীশ্রীঠাকুরের জ্যেষ্ঠা কন্যা পূজনীয়া সাধনা দেবীর তত্বাবধানে প্রথম মাতৃ সম্মেলন শুরু হয়। তিনি সদদীক্ষা লাভের পর তাঁর পিতাকে কেবল জন্মদাতা হিসেবেই নয়, আপন ইষ্টদেব, আচার্য্য, বিশ্বপিতা রূপেও চিনতে পেরেছিলেন। আশ্রমের কন্যা, বধূ ও মায়েদের নিয়ে তিনি তাঁর ইষ্টপূজার অঙ্গ হিসেবে শুরু করেছিলেন মাতৃ সম্মেলন। মাতা শ্রীশ্রীমনোমোহিনী দেবী ও শ্রীশ্রীবড়মা --- এনাদেরও পূর্ণ সমর্থন দিয়ে শুরু হয় এই মহতী উদ্যোগ। আমরা নাম দেখে অনেকসময় ভূল করি যে এই অনুষ্ঠানটি বুঝি শ্রীশ্রীবড়মার অনুষ্ঠান বা তাঁকে কেন্দ্র করে আয়োজিত অনুষ্ঠান। তা কিন্তু নয়, স্বয়ং শ্রীশ্রীবড়মারও তা পছন্দের নয়। শ্রীশ্রীঠাকুরই হলেন সৎসঙ্গের প্রাণপুরুষ, তাঁকে কেন্দ্র করেই যা কিছু সব। মাতৃ সম্মেলনও তাই,--- শ্রীশ্রীঠাকুরকে কেন্দ্র করে মায়েদের, মেয়েদের তাদের মতন করে মেতে থাকা এবং তাতে শ্রীশ্রীবড়মার অবদানও অনস্বীকার্য। পূজনীয়া সাধনা দেবীর পরিচালনায় প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ইষ্টপূজা, প্রার্থনা, নামধ্যান অনুষ্ঠিত হতো। ক্রমে ক্রমে আশ্রমের মেয়েরা একে একে দৈবগুণসম্পন্না হয়ে উঠেছিল। তিনি নিজে নাটক রচনা করতেন, নিজে পরিচালনা করতেন । সৃষ্টি করেছিলেন এক অভিনব সমাবেশ যেখানে পুরুষের প্রবেশাধিকার ছিল না, এমনকি দর্শক হিসেবেও নয়। মেয়েরাই নাটক লিখত, মেয়েরাই অভিনয় করত, মেয়েরাই দেখত। "সংঘমিত্রা" তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য নাটক। যদিও আজ তার ঠাঁই হয়েছে ইতিহাসের পাতায়। শ্রীশ্রীঠাকুর একদিন কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন--- "সাধনার লেখার ধাঁচ আমার লেখার মতো।" এর চেয়ে আনন্দের ও গর্বের প্রশস্তিপত্র আর কী হতে পারে ! তাঁর বিরচিত "ইষ্ট সম্বর্ধনা" পাঠ করলে সত্যিই শ্রীশ্রীঠাকুরের লেখা বলেই মনে হয়। মায়েদের ইষ্টপূজার মন্ত্রস্বরূপ এই লেখাটিতে আবেগমিশ্রিত দিব্য অনুভূতি তথা কৃতজ্ঞতা-কৃতার্থতা ও দায়বদ্ধতার অনুরাগনিবদ্ধ সমর্পণী সুর রয়েছে ছত্রে ছত্রে। শ্রীশ্রীঠাকুর বিরচিত, আমাদের নিত্য করণীয় "প্রার্থনা"(দয়াল আমার প্রভু আমার) ও "অগ্নিহোত্র" তিনি যেন রচনার বহু আগেই উপলব্ধি করেছিলেন সাধনযোগে এবং তারই আহুতি স্বরূপ রচনা করেছিলেন "ইষ্ট সম্বর্ধনা"। কতই না স্বস্তি-তৃপ্তির কারণ হয়েছিলেন তিনি তাঁর প্রিয়পরমের! এছাড়াও গরিব-দুঃখী সৎসঙ্গী ও গ্রামবাসীদের জন্য তিনি গড়ে তুলেছিলেন একটি তহবিল, পুরনো কাপড় এবং যেমন যা জোটে তেমন পয়সা সংগ্রহ করে করে। এই দায়িত্ব তিনি বহন করেছিলেন নিজেই ---নিঃশব্দে, প্রচারবিহীনভাবে। অনেকেই জানেন না যে শ্রীশ্রীঠাকুরের "নারীর নীতি" গ্রন্থে প্রথমেই যে বাণীখানি সংকলিত হয়েছে---"মেয়ে আমার, তোমার সেবা, তোমার চলা, তোমার চিন্তা, তোমার বলা...."--- এটি তাঁরই এই সুযোগ্যা কন্যাকে লেখা একটি চিঠির অংশবিশেষ। এই বাণীর অন্যতম সেরা দৃষ্টান্ত ছিলেন পূজনীয়া সাধনা দেবী। ২৩শে আষাঢ় তাঁর জন্মদিন। মাত্র ২৪ বছর ছিল তাঁর লৌকিক জীবন। অমর হয়ে আছেন ও থাকবেন তিনি শ্রীশ্রীঠাকুরের অতুলনীয়া ভক্ত হিসেবে, একনিষ্ঠ সাধিকা হিসেবে, পরমপিতার তৃপ্তি স্বস্তি ও গর্বের কারণরূপিনী সন্তান হিসেবে। মাতৃ সম্মেলনে "ইষ্ট সম্বর্ধনা" পাঠ করা ছাড়াও, অন্যান্য পূজনীয়া মাতৃবর্গের জীবনবন্দনার সাথে সাথে পূজনীয়া সাধনা দেবীর ইষ্টময় জীবন ও কর্ম নিয়েও কিছু আলোচনা করা উচিত। আলোচনা করা উচিত তৎকালীন সমাজের প্রচলিত প্রথা ও অভ্যস্ত মানসিকতায় আবদ্ধ নারীজীবনে যে সার্থক শিক্ষার সঞ্চার করেছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর, তা নিয়ে। আশ্রমের মেয়েদের, মায়েদের, গৃহবধূদের সর্বতোভাবে শিক্ষিত, দক্ষ ও যোগ্য করে তোলার জন্য তিনি যে কত কিছুর আয়োজন করেছিলেন এবং ঘর-সংসার থেকে শুরু করে সমাজের বৃহত্তর প্রাঙ্গণ পর্য্যন্ত তাদের বৈশিষ্ট্যানুগ কর্মধারা যেন সহজেই শ্রদ্ধা-সম্ভ্রমমন্ডিত হয়ে থাকে---তাঁর এমন বৈপ্লবিক চিন্তাধারার কথাও আলোচনা করা উচিত, যাতে গৌরবময় সেই অধ্যায়গুলো মানুষ জানতে পারে। এসব আলোচনা সকলেরই, বিশেষতঃ অনেক নবীনাদের প্রেরণাস্রোত হয়ে থাকবে নিঃসন্দেহে।
মাতৃ সম্মেলন মানে কেবলমাত্র সঙ্গীতানুষ্ঠান নয়, আপন ঘর সংসার দায়িত্ব ফেলে ছুটে যাওয়ার নির্দেশ নয়, অপ্রাসঙ্গিক আলোচনার ক্ষেত্র নয়, আপন ঐতিহ্য-কূলাচার ভূলে যাওয়া নয়, আর মাতৃ সম্মেলন কেবল এক মাসেরও নয়। শুধু মাতৃ সম্মেলন কেন---ইষ্টকেন্দ্রিক কোনো অনুষ্ঠানই এমন এমন নয়, হওয়া উচিত নয়। মায়েদের দ্বারা ও মায়েদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত পবিত্র এই সমাবেশের সাথে জড়িয়ে আছে মাতা শ্রীশ্রী মনোমোহিনী দেবী, শ্রীশ্রীবড়মা, পূজনীয়া সাধনা দেবী ও আরও অনেক প্রণম্য মাতৃবর্গের নাম। প্রাণপুরুষ হিসেবে রয়েছেন শ্রীশ্রীঠাকুর। ধরেই নি যেন, এখনও প্রতিটি মাতৃ সম্মেলনে এনাদের দিব্য উপস্থিতি ঘটে। তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করা ও তৃপ্তি স্বস্তি বিধান করাই আমাদের উন্নতির সোপান।
বন্দে আর্য্যপিতৃন্ 🙏 বন্দে মাতৃবর্গান্ 🙏 বন্দেহং কৃষ্টি দৈবতান্ 🙏
🙏বন্দে পুরুষোত্তমম্ 🙏
~~তথ্যসূত্র~~
* দয়াল আমার প্রভু আমার -- অনুশ্রুতি ৩ (প্রার্থনা)
* অগ্নিহোত্র -- ধৃতি বিধায়না ১ম, ১৫ নং বাণী
* শ্রীঅনুকূল চরিতামৃত -- শ্রী ব্রজগোপাল দত্তরায়
* শ্রীমৎ আচার্য্য সতীশচন্দ্র গোস্বামী ও সৎসঙ্গ আন্দোলন -- শ্রী সচ্চিদানন্দ গোস্বামী
* সৎসঙ্গের মাতৃ-সম্মেলন -- শ্রী বাসুদেব গোস্বামী
* স্মৃতিকথা -- শ্রীমতী কমলা বিশ্বাস
এছাড়াও আমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি social media-র সেইসব profile/page-এর প্রতি, যাদের তথ্যনিষ্ঠ পরিবেশনা সম্বৃদ্ধ করেছে আমাদের ।