07/04/2026
শিশুর হাম হলে বুঝবেন কীভাবে
অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ শাহরিয়ার
প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৫
একটি শিশুর হাসি যেমন একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি, তেমনি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের কারণে সেই হাসি ম্লান হয়ে যাওয়া আমাদের সবার জন্যই বেদনাদায়ক। বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশুদের মধ্যে হাম রোগের পুনরুত্থান আমাদের সামনে এমনই এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরছে; যেখানে সামান্য অসচেতনতা বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
কতটা ভয়ংকর এই ‘হাম’?
হাম পৃথিবীর অন্যতম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ।
একজন আক্রান্ত শিশু থেকে গড়ে ১২-১৮ জন
অ-টিকাপ্রাপ্ত শিশু সংক্রমিত হতে পারে। বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস খুব দ্রুত পরিবার ও সমাজে বিস্তার লাভ করে। প্রথমেই জেনে নিন, শিশুর হাম হলে বুঝবেন কীভাবে।
লক্ষণ: প্রথমেই চিনে নিন
l উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া
l চোখ লাল হয়ে যাওয়া
l মুখের ভেতরে সাদা দাগ (Koplik spots)
l মুখ থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া লাল ফুসকুড়ি
জটিলতা: অবহেলার সুযোগ নেই
হাম কখনোই ‘হালকা’ রোগ নয়; বিশেষ করে কিছু শিশুর জন্য এটি জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।প্রথমেই জেনে নিন শিশুর হাম হলে বুঝবেন কিভাবে
সম্ভাব্য জটিলতা
l নিউমোনিয়া l ডায়রিয়া ও ডিহাইড্রেশন
l কানের সংক্রমণ l এনসেফালাইটিস
l দীর্ঘমেয়াদে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়া
জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশু: তারা কি বেশি ঝুঁকিতে?
একজন পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে আমার অভিজ্ঞতায়–জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুরা হামের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকে, বিশেষ করে–
l যাদের হার্টের সমস্যা এখনও সম্পূর্ণ সংশোধন (corrected) হয়নি
l যাদের হার্ট ফেইলিউর বা ফুসফুসে অতিরিক্ত রক্তপ্রবাহ রয়েছে
l অপুষ্ট বা বারবার অসুস্থ হয়ে পড়া শিশু
কেন তারা বেশি ঝুঁকিতে?
l হামের সময় নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা আগে থেকেই দুর্বল হার্ট ও ফুসফুসের জন্য বিপজ্জনক
l জ্বর ও সংক্রমণের কারণে হার্টের ওপর চাপ বাড়ে
l অক্সিজেনের চাহিদা বাড়ে, যা সায়ানোটিক হার্ট ডিজিজে সমস্যা বাড়াতে পারে
l হাইড্রেশন ও ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা হার্টের অবস্থা খারাপ করতে পারে
অর্থাৎ একটি ‘সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণ’ এই শিশুদের জন্য দ্রুত জটিল অবস্থায় রূপ নিতে পারে।
এসব শিশুর জন্য বিশেষ সতর্কতা
টিকাদানে কোনো বিলম্ব নয়
l নির্ধারিত সময়েই MR টিকা অবশ্যই দিতে হবে
l প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে আগাম সুরক্ষা পরিকল্পনা করা যেতে পারে
সংক্রমণ এড়িয়ে চলা
l ভিড় বা অসুস্থ মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন
l পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে শিশুকে আলাদা রাখুন
দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ
l জ্বর, কাশি বা ফুসকুড়ি দেখা দিলেই দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান
l ‘দেখি নিজে নিজে ভালো হয় কিনা’–এই অপেক্ষা বিপজ্জনক হতে পারে
পুষ্টি ও ফলোআপ নিশ্চিত করা
l অপুষ্টি থাকলে ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে
l নিয়মিত কার্ডিওলজি ফলোআপ বজায় রাখা জরুরি
প্রতিরোধ: টিকাই একমাত্র ঢাল
বাংলাদেশ সরকারের Expanded Programme on Immunization (EPI) অনুযায়ী–
l ৯ মাসে MR টিকার প্রথম ডোজ
l ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ
দুটি ডোজ সম্পূর্ণ হলে প্রায় ৯৭% পর্যন্ত সুরক্ষা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে হাম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে–
l জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি (EPI)
l দেশব্যাপী MR ক্যাম্পেইন
l কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে বিনামূল্যে টিকা
l মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ
এই সমন্বিত উদ্যোগই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
সরকারি হাসপাতালে কী চিকিৎসা পাওয়া যায়?
হামের নির্দিষ্ট ওষুধ না থাকলেও কার্যকর সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া হয়–
l ভিটামিন A l জ্বর নিয়ন্ত্রণ (প্যারাসিটামল)
l ORS বা স্যালাইন l পুষ্টি সহায়তা
l নিউমোনিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক l অক্সিজেন সাপোর্ট l জটিল ক্ষেত্রে ভর্তি চিকিৎসা
প্রতিদিন আমরা এমন শিশু দেখি, যাদের কেবল একটি টিকা না নেওয়ার কারণে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট পেতে হচ্ছে।
বিশেষ করে জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে–অবহেলা কখনও কখনও জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করে।
শেষ কথা: একটি টিকা, একটি জীবন
হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ; কিন্তু আমাদের অসচেতনতা একে প্রাণঘাতী করে তুলছে। বিশেষ করে যেসব শিশু আগে থেকেই অসুস্থ; যেমন জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত–তাদের সুরক্ষা আমাদের আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে।v
[পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি বিভাগ, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল]
জেনে নিন কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
হাম একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা অনেক ক্ষেত্রে ভয়ংকর জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। হাম-পরবর্তী জটিলতা হিসেবে প্রায়ই নিউমোনিয়া ও গুরুতর ডায়রিয়া দেখা যায়, যা শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। এছাড়া আক্রান্ত শিশুর শরীরে ভিটামিন এ-এর মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ফলে চোখ শুষ্ক হয়ে যেতে পারে এবং চোখের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে যায়। এই অবস্থার কারণে রাতকানা থেকে শুরু করে স্থায়ী অন্ধত্ব পর্যন্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। হামে আক্রান্ত অনেক শিশুর ক্ষেত্রে কান পাকা, মুখে ঘা, তীব্র অপুষ্টি এবং মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে এসব জটিলতার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে–
lশ্বাসকষ্ট lখিঁচুনি lশিশুর অস্বাভাবিক নিস্তেজতা lখেতে না পারাlতীব্র ডায়রিয়া
বা ডিহাইড্রেশন
সূত্র : দৈনিক সমকাল
04/04/2026
04/04/2026
21/02/2026
21/02/2026
21/02/2026
05/02/2026
31/12/2025
04/12/2025
26/11/2025