09/10/2022
বাল্মীকি জয়ন্তী
আজ বাল্মীকি জয়ন্তী। পুরাণ এবং ইতিহাস বিশারদদের মতে আজকের দিনে আবির্ভাব ঘটেছিল আদি কবি বাল্মীকির। যাঁর বিরচিত রামায়ণ ভারতীয় সংস্কৃত সাহিত্য ভাণ্ডারের একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এবং যেটি আদি মহাকাব্য রূপে ভূ-ভারতের সর্বত্র প্রসিদ্ধ। রামায়ণের চব্বিশ হাজার শ্লোক, সাতটি কাণ্ড, সেই কাণ্ডে বর্ণিত উপাখ্যান প্রায় সকলেরই কম বেশি জানা থাকলেও বহুকাল থেকে আদি কবির জীবন নিয়ে সংশয়ের অবকাশ রয়েছে। আমাদের ভারতীয় শাস্ত্রের রীতি অনুসরণ করলে এই সৃষ্টির সময় কালকে সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি, চারটি যুগে ভাগ করা হয়। ত্রেতা যুগে অবতীর্ণ বিষ্ণুর রামাবতারের কাহিনী অনুসারে রচিত হয়েছিল রামায়ণ। সেই জন্য রামায়ণের রচয়িতা মহর্ষি বাল্মীকিকেও ত্রেতা যুগেরই একজন হিসাবে মেনে নিতে আমাদের কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু বিভিন্ন পুরাণে বর্ণিত বাল্মীকির বিভিন্ন উপখ্যান আমাদের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি করে, আদতে বাল্মীকি কোনো ব্যক্তি নাকি কোনো পদ।
বাল্মীকি রামায়ণ ও আধ্যাত্ম রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে বাল্মীকি মুনি নিজেকে প্রচেতার দশম সন্তান এবং ভৃগু গোত্রোৎপন্ন বলে অভিহিত করেছেন। স্কন্দ পুরাণের অবন্তি ক্ষেত্র মাহাত্ম্যে সুমতি ও কৌশিকী নামক তাঁর মা বাবার নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই পুরাণেরই প্রভাস ক্ষেত্র মাহাত্ম্যে বাল্মীকির বাবার নাম শমীমুখ। আবার বৈশাখমাহাত্ম্যে আমরা বল্মীক নামাখ্যাত কৃণুঋষির পুত্র হিসাবে বাল্মীকি মুনি কে দেখতে পাই। এ ছাড়াও ভাগবতে, মৎস পুরাণে, দেবী ভাগবতে, বিষ্ণুপুরাণে বাল্মীকিকে ভৃগু বংশজাত বলে অভিহিত করা হয়েছে।
বাংলার কৃত্তিবাসী রামায়ণ একটি আধুনিক সংকলন। এই রামায়ণ কোনো মূল রামায়ণ উপজীব্য করেই রচিত হওয়াটা স্বাভাবিক। কৃত্তিবাসী রামায়ণে আমরা বাল্মীকি মুনির যে দস্যু রূপ দেখতে পাই সে ঘটনা নিতান্ত নিরাধার নয়। কারণ স্কন্দপুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ এবং অধ্যাত্ম রামায়ণ এই তিন জায়গাতেই তাঁর দস্যুবৃত্তির যথাযথ প্রমাণ পাওয়া গেলেও কৃত্তিবাসী রামায়ণে কবির কল্পনায় অনেক ঘটনা নতুন ভাবে রূপ নিয়েছে। যেমন অধ্যাত্ম রামায়ণ, ভবিষ্যপুরাণ এবং স্কন্দপুরাণের বৈশাখমাহাত্ম্য এসব জায়গায় আমরা দেখতে পাই দস্যু বাল্মীকি সপ্তর্ষিদের কৃপায় রামনাম জপ করে দস্যুবৃত্তি থেকে মুক্তি লাভ করেন। কিন্তু কৃত্তিবাসী রামায়ণে রামনামের উল্লেখ থাকলেও সপ্তর্ষিদের জায়গায় ব্রহ্মা এবং নারদের উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও সংশয় রয়েছে কৃত্তিবাসী রামায়ণের পিতৃপরিচয় এবং বাল্মীকি মুনির পূর্ব জীবনের নাম নিয়েও। কারণ কৃত্তিবাসী রামায়ণে কবি লিখেছেন-
"চ্যাবন মুনির পুত্র দস্যু রত্নাকর দস্যু বৃত্তি করে সে বনের ভিতর।"
এখন যদি বাল্মীকি রামায়ণ ও অধ্যাত্ম রামায়ণ ছাড়াও পুরাণের যেসব অংশে বাল্মীকি মুনিকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে সে সব জায়গা খুঁজে দেখি তাহলে দেখতে পাব সেখানে কোথাও বাল্মীকি মুনিকে চ্যাবন মুনির পুত্র বা রত্নাকর বলা হয়নি। যেমন স্কন্দপুরাণের অবন্তীক্ষেত্র মাহাত্ম্যে বাল্মীকির পূর্বনাম অগ্নিশর্মা, প্রভাস ক্ষেত্র মাহাত্ম্যে বৈশাখ, নাগরখণ্ডে লোহজঙ্ঘ এবং ভবিষ্যপুরাণে মৃগব্যাধ।
এখানেই শেষ নয় বিষ্ণুপুরাণ, কুর্মপুরাণ, দেবীভাগবৎ, এমনকি বায়ুপুরাণে ২৮ জন ব্যাসের যে নামের উল্লেখ পাওয়া যায় তার মধ্যে বাল্মীকি মুনি অন্যতম।
সকল পৌরাণিক গ্রন্থে বাল্মীকির পূর্বনাম, পিতৃপরিচয় এবং তাঁদের দ্বারা রামায়ণ রচিত হওয়ার যে উল্লেখ রয়েছে তার উপর ভিত্তি করে এই নির্ণয়ে আসতে পারি রামায়ণের রচয়িতা বল্মীকি যেমন একজন নয় তেমন মহাকাব্য রাময়ণও একটি নয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জনের দ্বারা রচিত হয়েছে রামায়ণ। এবং যিনিই এই মহাকাব্য রচনা করেছেন তাঁকেই বলা হয়েছে বাল্মীকি।
বর্তমানে আমরা যে রামায়ণটি পাই সেটি ভৃগুগোত্রোত্পন্ন প্রচেতার পুত্র প্রাচেতস্ বাল্মীকির রচিত রামায়ণ। অগ্নিপুরাণে, পদ্মপুরাণে বর্ণিত রামায়ণ প্রসঙ্গে বাল্মীকি মুনির প্রসঙ্গ উঠে এসেছে বারবার । বাল্মীকি মুনির প্রভাব এতই সূদুর প্রসারী এবং তাঁর কাব্যের মহিমা এতটাই সুমহান যে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস থেকে কালিদাস ভবভূতি এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁদের রচনার মাধ্যমে বাল্মীকি মুনিকে স্মরণ করেছেন বার বার ।