16/08/2025
*যুব সমাজের মোবাইল ব্যবহারে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা*
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে মোবাইল ফোন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যুব সমাজের কাছে এটি একদিকে যেমন জ্ঞানের ভাণ্ডার, কর্মসংস্থানের হাতিয়ার ও বিনোদনের উৎস, অন্যদিকে তেমনি সামাজিক বিচ্ছিন্নতার বড় কারণ। আজকের তরুণ-তরুণীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলের পর্দায় ডুবে থেকে ভার্চুয়াল জগতে সময় কাটাচ্ছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব বা অনলাইন গেমে আসক্ত হয়ে তারা ধীরে ধীরে বাস্তব সমাজ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। যেখানে একসময় পরিবারে বসে খাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে খেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা সামাজিক আড্ডা ছিল স্বাভাবিক অভ্যাস, সেখানে এখন দেখা যাচ্ছে মোবাইল ফোনে ব্যস্ততা। বাবা-মা কিংবা পরিবারের সাথে আলাপচারিতা কমে গিয়ে মোবাইলের চ্যাট ও ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব বেড়ে যাচ্ছে। বাস্তব বন্ধুত্ব যেখানে আবেগ, বিশ্বাস ও আন্তরিকতার উপর দাঁড়িয়ে, সেখানে আজকের বন্ধুত্ব অনেক সময় নির্ভর করছে কেবল লাইক, কমেন্ট বা রিঅ্যাকশনের উপর। এর ফলে যুব সমাজের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা ও বন্ধুত্বের আন্তরিকতা কমে যাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে মানসিক দূরত্ব।
অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের কারণে যুব সমাজ নানা মানসিক সমস্যায় ভুগছে। একাকিত্ব, হতাশা, উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের অভাব ও হীনমন্যতা তাদের মধ্যে বাড়ছে। বাস্তব জীবনের ব্যর্থতা বা চাপ থেকে মুক্তি পেতে তারা ভার্চুয়াল দুনিয়ায় আশ্রয় নিচ্ছে, অথচ সেখানে তারা কোনো স্থায়ী সমাধান পাচ্ছে না। পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত সমস্যাও বাড়ছে—চোখের ক্ষতি, মাথাব্যথা, অনিদ্রা, স্থূলতা এবং মানসিক ক্লান্তি এদের মধ্যে সাধারণ হয়ে উঠছে। পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে, কারণ প্রয়োজনীয় সময়ে পড়ার পরিবর্তে অনেকেই মোবাইল গেম বা ভিডিওতে ডুবে থাকছে। ফলে শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। একসময় তরুণরা সামাজিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকত। এতে তারা দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস গড়ে তুলত এবং সমাজের সাথে একাত্ম হতো। কিন্তু আজকের যুব সমাজের অনেকেই এসব থেকে সরে গিয়ে কেবল মোবাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। এর ফলে সমাজে তাদের অবদান কমছে এবং সমষ্টিগত চেতনা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এমনকি পরিবার থেকেও দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, বাবা-মায়ের সাথে আলাপচারিতা কমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদ্বেগজনক।
তবে সমাধানও আছে। মোবাইলকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু এর ব্যবহারকে সীমিত করা যায়। প্রতিদিন মোবাইল ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে রাখা, অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ বাদ দেওয়া, পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সরাসরি সময় কাটানো, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা—এসব অভ্যাস সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কমাতে সাহায্য করবে। যুব সমাজ যদি মোবাইলকে কেবল শিক্ষা, তথ্য সংগ্রহ ও উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করে, তবে এটি সমাজ উন্নয়নের বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, মোবাইল ফোন যুব সমাজকে একদিকে আধুনিক প্রযুক্তির সুযোগ দিচ্ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ব্যবহারে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করছে। এখন প্রয়োজন সচেতনতা। যুব সমাজকে বুঝতে হবে যে মোবাইল হলো জীবনের অংশ, কিন্তু পুরো জীবন নয়। বাস্তব সম্পর্ক, পারিবারিক মূল্যবোধ ও সামাজিক বন্ধনকে অক্ষুণ্ণ রেখে মোবাইল ব্যবহার করতে পারলেই কেবল তারা সুস্থ, সফল ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত নাগরিক হতে পারবে।