02/10/2018
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম জনক তিনি৷ তাঁর অহিংস সত্যাগ্রহের পথকে সম্মান জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন ‘মহাত্মা’ শব্দটি৷ সেই তখন থেকেই আপামর বিশ্বের কাছে গান্ধী পরিচিত হন মহাত্মা গান্ধী নামে৷ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তাঁকে সম্বোধন করতেন 'জাতির জনক' বলে I অহিংস আন্দোলন নামক প্রতিরোধের নতুন পন্থা তিনি বিশ্বাবাসীকে উপহার দেন। মৃত্যুর পূর্বে চরম আঘাত সহনপূর্বক তিনি তাঁর আক্রমণকারীকে ক্ষমা করে দেন, এবং তাকে স্বাস্তি না দেওয়ার আবেদন জানিয়েছিলেন। অবতার যীশুখ্রীষ্টের পর সম্ভবত এমন কথা বিশ্বে কেউ কখনও বলেনি।
আজ ২ অক্টোবর, জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর শুভ ১৩৯তম জন্মদিন । তিনি শুধু ভারতকে স্বাধীনতা দানের চেষ্টা করেননি বিশ্বকে সন্ত্রাসমুক্ত করারও । তিনি এমন একজন ব্যক্তি যার আত্মজীবনী আজও বিশ্বব্যাপী বেস্টসেলার । আজ তাঁর পবিত্র জন্মদিনে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী উল্লেখ করা হচ্ছে ।
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ১৮৬৯ সালে পোরবন্দরের হিন্দু মোধ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন পোরবন্দরের দেওয়ান (প্রধান মন্ত্রী)। মা পুতলিবা করমচাঁদের চতুর্থ স্ত্রী ছিলেন। পুতলিবা প্রনামী বৈষ্ণব গোষ্ঠীর ছিলেন। করমচাঁদের প্রথম দুই স্ত্রীর প্রত্যেকেই একটি করে কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন। অজানা কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছিল (এরকম শোনা যায় যে সন্তান জন্ম দেবার সময়ে তারা মারা যান)। ধার্মিক মায়ের সাথে এবং গুজরাটের জৈন প্রভাবিত পরিবেশে থেকে গান্ধী ছোটবেলা থেকেই জীবের প্রতি অহিংসা, নিরামিষ ভোজন, আত্মশুদ্ধির জন্য উপবাসে থাকা, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সহিষ্ণুতা ইত্যাদি বিষয় শিখতে শুরু করেন। তিনি জন্মেছিলেন হিন্দু বৈশ্য গোত্রে যা ছিল ব্যবসায়ী গোত্র। গান্ধী ভারতে এবং বিশ্ব জুড়ে মহাত্মা (মহান আত্মা) এবং বাপু (বাবা) নামে পরিচিত। ভারত সরকারীভাবে তাঁর সম্মানার্থে তাকে ভারতের জাতির জনক হিসেবে ঘোষণা করেছে ।
১৮৮৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মহাত্মা গান্ধী তার বাবা মায়ের পছন্দে কস্তুরবা মাখাঞ্জীকে বিয়ে করেন। তাদের চার পুত্র সন্তান জন্মায় যাদের নাম হরিলাল গান্ধী, মনিলাল গান্ধী, রামদাস গান্ধী এবং দেবদাস গান্ধী। গান্ধী ছিলেন সাধারণ নিরামিষভোজী। ১৮ বছর বয়সে ১৮৮৮ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে যান। রাজকীয় রাজধানী লন্ডনে তার জীবন যাপন ছিল ভারতে থাকতে তার মায়ের কাছে করা শপথ প্রভাবিত। জৈন সন্ন্যাসি বেচার্জীর সামনে তিনি তার মায়ের কাছে শপথ করেছিলেন যে তিনি মাংস, মদ এবং উচ্ছৃঙ্খলতা ত্যাগ করার হিন্দু নৈতিক উপদেশ পালন করবেন। যদিও তিনি ইংরেজ আদব কায়দা পরীক্ষামূলকভাবে গ্রহণ করেছিলেন; যেমন নাচের শিক্ষা, কিন্তু তিনি তার বাড়িওয়ালীর দেওয়া ভেড়ার মাংস এবং বাঁধাকপি খেতেন না। তিনি লন্ডনের গুটি কয়েক নিরামিষভোজী খাবারের দোকানের একটিতে নিয়মিত যেতেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের ভোটাধিকার ছিল না। এই অধিকার আদায়ের বিল উত্থাপনের জন্য তিনি আরও কিছুদিন দেশটিতে থেকে যান। বিলের উদ্দেশ্য সিদ্ধি না হলেও এই আন্দোলন সেদেশের ভারতীয়দেরকে অধিকার সচেতন করে তুলেছিল। ১৮৯৪ সালে গান্ধী নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে সেখানকার ভারতীয়দেরকে রাজনৈতিকভাবে সংঘবদ্ধ করেন।
১৯০৬ সালে ট্রান্সভাল সরকার উপনিবেশের ভারতীয়দের নিবন্ধনে বাধ্য করানোর জন্য একটি আইন পাশ করে। ১১ই সেপ্টেম্বর জোহানেসবার্গে সংঘটিত এক গণ প্রতিরোধে গান্ধী সবাইকে এই আইন বর্জন করতে বলেন। তিনি বলেন, আইন না মানার কারণে তাদের উপর যে অত্যাচার করা হবে দরকার হলে তা মেনে নেবেন, কিন্তু আইন মানবেন না। এই পরিকল্পনা কাজে দেয়, এবং ৭ বছর ব্যাপী এক আন্দোলনের সূচনা ঘটে। অগত্যা, দক্ষিণ আফ্রিকার জেনারেল ইয়ান ক্রিশ্চিয়ান স্মুট গান্ধীর সাথে সমঝোতা করতে বাধ্য হন। এর মাধ্যমেই গান্ধীর আদর্শ প্রতিষ্ঠা পায়, সত্যাগ্রাহ তার আসল রূপ পেতে শুরু করে।
গান্ধীর প্রথম সাফল্য অর্জন আসে ১৯১৮ সালের চম্পারন বিক্ষোভ এবং খেদা সত্যাগ্রহের মাধ্যমে । অন্যায়ের বিরুদ্ধে গান্ধীর অস্ত্র ছিল অসহযোগ এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ । পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড, যা সাধারণ মানুষের উপরে ব্রিটিশ সরকার দ্বারা সংগঠিত হয়েছিল তা জনসাধারণ ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং মারামারির মাত্রা বৃদ্ধি পায় । ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়েছিল অসহযোগ আন্দোলন । ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাঝে মহাত্মা গান্ধী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নির্বাহী দায়িত্বপ্রাপ্ত হন । গান্ধী গ্রেপ্তার হন ১৯২২ সালের ১০ মার্চ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে তাকে ছয় বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয। ১৯২২ সালের ২৮ মার্চ শুরু হওয়া শাস্তির কেবল দুই বছরের মত ভোগ করতে হয় তাকে। ১৯২৪ সালের ফ্রেব্রুয়ারিতে এপেনডিসাইটিসের অপারেশনের পর তাকে মুক্তি দেয়া হয।
গান্ধী ১৯২০ এর দশকের বেশির ভাগ সময় নীরব থাকেন, এ সময় তিনি স্বরাজ পার্টি এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মাঝে বাধা দুর করতে চেষ্টা করেন। অস্পৃশ্যতা, মদ্যপান, অবজ্ঞা এবং দারিদ্রতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন। ১৯২৮ সালে তিনি আবার সামনে এগিয়ে আসেন ।
ইচ্ছাকৃত ভাবে ইংরেজদের কর্তৃক লবণের দাম বৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ হয়ে ১৯৩০ সালের মার্চে তিনি ডাণ্ডির উদ্দেশ্যে লবণ হাঁটা আয়োজন করেন ও ১২ই মার্চ থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৪০০ কিলোমিটার হেঁটে এলাহাবাদ থেকে ডাণ্ডিতে পৌঁছান নিজের হাতে লবণ তৈরির জন্য।
হাজার হাজার ভারতীয় তাঁর সাথে হেঁটে সাগরের তীরের পৌছান। এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তার আন্যতম সফল প্রয়াস। ব্রিটিশরা এর বদলা নিতে ৬০,০০০ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। সরকার গান্ধীর সাথে সমঝোতা করতে লর্ড এডওয়ার্ড আরউইনকে প্রতিনিধি নিয়োগ করে। গান্ধী-আর উইন প্যাক্টস হয় ১৯৪১ সালের মার্চ মাসে সরকার সকল গণ অসহযোগ আন্দোলন বন্ধের বিনিময় সকল রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে রাজি হয়।
এছাড়া ১৯৪২ এ তিনি ইংরেজদের কাছ থেকে তিনি সম্পূর্ণ স্বরাজ দাবি করে ভারত ছাড়াে আন্দোলন শুরু করে । যা সম্পূর্ণভাবে সফল হওয়ার আগেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয় I গান্ধীজি বিশ্বযুদ্ধের সময় আক্রান্ত ইংল্যান্ডের বিরোধিতা করতে চাননি, তাই তিনি এই আন্দোলন অসম্পূর্ণ পর্যায়ে ত্যাগ করেন । বৃটিশ সরকার প্রতিশ্রুতি দেয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতকে স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার ।
১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গান্ধীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সে সময় তিনি নতুন দিল্লীর বিরলা ভবন (বিরলা হাউস) মাঝে রাত্রিকালীন পথসভা করছিলেন। তার হত্যাকারী নাথুরাম গডসে ছিলেন একজন হিন্দু মৌলবাদী যার সাথে চরমপন্থী হিন্দু মহাসভার যোগাযোগ ছিল। হিন্দু মহাসভা পাকিস্তানীদের অর্থ সাহায্য দেবার প্রস্তাব করে ভারতকে দূর্বল করার জন্য গান্ধীকে দোষারোপ করে। গোডসে এবং সহায়তাকারী নারায়ণ আপতেকে পরবর্তীতে আইনের আওতায় এনে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ১৯৪৯ সালের ১৪ নভেম্বর তাদের ফাঁসি দেয়া হয়। নতুন দিল্লীর রাজঘাটের স্মুতিসৌধে আছে "হে রাম" যাকে অনুবাদ করে বলা যায় "ও ঈশ্বর" এত দুটি শব্দ দুটিকে গান্ধীর শেষ কথা বলে বিশ্বাস করা হয়, অবশ্য এই উক্তির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ আছে। জওহরলাল নেহরু রেডিওতে জাতীর উদ্দশ্যে ভাষণে বলেন:
"বন্ধু ও সহযোদ্ধারা আমাদের জীবন থেকে আলো হারিয়ে গেছে, এবং সেখানে শুধুই অন্ধকার এবং আমি ঠিক জানি না আপনাদের কি বলব কেমন করে বলব। আমাদের প্রেমময় নেতা যাকে আমরা বাপু বলে থাকি, আমাদের জাতীর পিতা আর নেই। হয়ত এভাবে বলায় আমার ভূল হচ্ছে তবে আমরা আর তাকে দেখতে পাব না যাকে আমরা বহুদিন ধরে দেখেছি, আমরা আর উপদেশ কিংবা স্বান্ত্বনার জন্য তার কাছে ছুটে যাব না, এবং এটি এক ভয়াবহ আঘাত, শুধু আমার জন্যই নয়, এই দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য।"
গান্ধীর ইচ্ছানুযায়ী, তার দেহভস্ম বিম্বের বেশ কয়েকটি প্রধান নদী যেমন: নীলনদ, ভোলগা, টেমস প্রভৃতিতে ডুবানো হয়। সামান্য অংশ ডঃ ভি এম নোলের (পুণের একজন সাংবাদিক ও প্রকাশক) পক্ষ থেকে পরমহংস যোগানন্দকে পৌছে দেয়া হয়। এরপর তার দেহভস্ম সেলফ রিয়ালাইজেশন ফেলোশিপ লেক স্রাইনের মহাত্মা গান্ধী বিশ্ব শান্তি সৌধে একটি হাজার বছরের পুরনো চৈনিক পাথরের পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়।
একনজরে গান্ধীজি :~
১৮৬৯ সালে ভারতের গুজরাটে জন্মগ্রহণ
করেন।
# আসল নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী।
# গোন্দলের এক সংবর্ধনায় পন্ডিত শ্রী জীবরাম
কালিদাস শাস্ত্রী তাঁকে সর্বপ্রথম ‘মহাত্মা’
খেতাবে ভূষিত করেন।
# পিতা করমচাঁদ গান্ধী এবং মাতা পুতলী বাই
গান্ধী।
# গান্ধীর পিতা রাজকোট অঞ্চলের দেওয়ান
ছিলেন।
# ১৮৮২ সালে ১৩ বছর বয়সে বালক মোহনদাস
সাড়ে ১৩ বছরের বালিকা কস্ত্তরবাকে বিয়ে
করেন।
# ১৮৮৫ সালে পিতার মৃত্যু ঘটে।
# ১৮৮৭ সালে শতকরা ৩৯.৫২ নম্বর নিয়ে
প্রবিশিকায় উত্তীর্ণ হন।
# ১৮৮৮ সাল থেকে ১৮৯১ সাল পর্যন্ত
লন্ডনে ব্যরিষ্টারি পড়ে কাটান।
# ১৮৯৩ থেকে ১৯১৮ পর্যন্ত, একুশ বছর
দক্ষিণ আফ্রিকায় কাটান।
# ১৯০৮ সালে ১ম কারাবরণ, ২ মাসের জন্য।
# মোহনদাস ধর্মীয় কুসংস্কার প্রশ্রয় দিতেন
না। ধর্মের বিরুদ্ধে তাঁর প্রথম প্রতিবাদ মাংস
খাওয়া। তিনি স্বিকার করতেন যে ঈশ্বরে তাঁর
জোরালো বিশ্বাস নেই। তিনি নাস্তিকতার দিকেও
ঝুঁকে পড়েন।
# রাশিয়ার মহান সাহিত্যিক লিও তলস্তয়কে গুরু
মানতেন।
# তাঁর ‘চরকা’ আন্দোলনকে অনেকে মানতে
পারেননি। চরকা আন্দোলনের বিরোধীতা করে
রবিন্দ্রনাথ ১৯২৫ সালে ‘চরকা’ প্রবন্ধ
লিখেন।
# ১৯৩০ সালে হাজার হাজার লোক নিয়ে
সবরমতি তীর থেকে হেঁটে ২৪ দিনে ২১১ মাইল
দূরে সমুদ্রতীরে ডান্ডি শহর পৌছে সমুদ্রের লোনা
পানি হাতে তুলে লবণ আইন অমান্য করেন।
# ১৯৮৮ সালে গান্ধী-পত্নী মহীয়সী নারী
কস্তুরবা বাঈ মৃত্যুবরণ করেন।
# রেঙ্গুনে কুচকাওয়াজে সুভাষচন্দ্র বসু মোহনদাস
গান্ধীকে ভারতের জাতির জনক ঘোষণা করেন।
# ১৯৪৮ সালে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় দিল্লির
বিড়লা ভবন থেকে প্রার্থনা সভার দিকে যাওয়ার
সময় নাথুরাম বিনায়ক গডসে খুব
কাছ থেকে মোহনদাস গান্ধীকে পরপর চারটি গুলি
করেন। মুহুর্তেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ভারতের
জাতির জনক, পৃথিবীর এই মহান রাজনীতিবিদ।
জয় হিন্দ l