Histor & Historia

Histor & Historia অজানাকে শুধু জানা নয়,নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তা বিচার্য।

কাউকে ক্ষমা করলে শুধু আত্মতৃপ্তি লাভ হয় এমন নয়, বরং ক্ষমা করার মধ্য দিয়েই মানসিক শান্তি ফিরে আসে।        আমার আজকের ল...
07/07/2025

কাউকে ক্ষমা করলে শুধু আত্মতৃপ্তি লাভ হয় এমন নয়, বরং ক্ষমা করার মধ্য দিয়েই মানসিক শান্তি ফিরে আসে।

আমার আজকের লেখাটি 7th July সম্পর্কে ......
আজ, 🌍 Global Forgiveness Day (বিশ্ব ক্ষমাশীলতা দিবস)

পালিত হয়: প্রতি বছর ৭ জুলাই

🔹 দিবসটির উদ্দেশ্য:

এই দিনটি মানুষকে ক্ষমা করার গুণটি চর্চা করতে এবং জীবনের জটিল সম্পর্ক, আঘাত, ও মানসিক বোঝা হালকা করতে উদ্বুদ্ধ করে। এটি আত্মা ও মনের শান্তি অর্জনে একটি বড় ভূমিকা রাখে।

🔹 ক্ষমার গুরুত্ব:
1. মানসিক শান্তি ও মুক্তি: অপরকে ক্ষমা করলে আত্মিক প্রশান্তি আসে, মানসিক চাপ কমে।
2. সম্পর্ক উন্নয়ন: ক্ষমা পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত করে।
3. স্বাস্থ্যগত উপকার: গবেষণায় দেখা গেছে ক্ষমাশীল ব্যক্তি মানসিক চাপ, হৃদরোগ, ও উদ্বেগে কম ভোগেন।

4. আত্মউন্নয়ন: ক্ষমা আমাদের অহং ত্যাগ করতে শেখায় ও নিজেকে পরিশুদ্ধ করে।

মহাত্মা গান্ধী বা নেলসন ম্যান্ডেলার মতো নেতা ক্ষমার মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।

পারিবারিক বা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি হলে, ক্ষমা সম্পর্কের স্থায়িত্ব আনে।

👉 আজই কাউকে ক্ষমা করে মনটা হালকা করো।
#ক্ষমাশীলতা #মানবিকতা #মনকে_শান্তি_দাও

মিথ্যার সোনালী প্রলেপের চেয়ে, সততার সরলরূপ অনেক বেশি সুন্দর।

🕊️ Tell the Truth Day (সত্য বলার দিবস)

পালিত হয়: প্রতি বছর ৭ জুলাই

🔹 দিবসটির উদ্দেশ্য:

এই দিনটি সত্য বলার নৈতিক গুরুত্ব এবং সমাজে সততার ভূমিকা স্মরণ করায়। এটি ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের স্তরে সততার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়।

🔹 সত্য বলার গুরুত্ব:

1. আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি: সত্য বললে নিজের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা তৈরি হয়।

2. সম্পর্কে স্বচ্ছতা: মিথ্যার কারণে সম্পর্ক নষ্ট হয়, সত্য সম্পর্ককে গভীর করে।

3. সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা: একটি সত্যভিত্তিক সমাজ দুর্নীতিমুক্ত হয় এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।

4. নৈতিক চরিত্র গঠন: শিশুদের মধ্যে সত্য বলার অভ্যাস গড়ে তুললে ভবিষ্যতের জন্য শক্তিশালী নেতৃত্ব তৈরি হয়।

🔹 চ্যালেঞ্জ:

অনেক সময় পরিস্থিতির চাপে মিথ্যা বলা সহজ মনে হয়, কিন্তু তাতে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যাই বাড়ে।

সত্য বলার সময় ভাষা ও ভঙ্গিমা সংবেদনশীল হওয়া জরুরি।

🔹 অনুপ্রেরণা:

আব্রাহাম লিঙ্কনকে "Honest Abe" বলা হতো তার সত্যনিষ্ঠ আচরণের জন্য।
সত্য বলার মহিমা নিয়ে অনেক ধর্মীয় গ্রন্থেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
👉 #সত্য #সততা #নিয়মিতসত্য #নৈতিকতা

🔹 7th July -এ পালিত এই দুইটি দিবস — ক্ষমা ও সত্য — দুটি শক্তিশালী মানবিক গুণকে তুলে ধরে। একটি মানুষকে মানসিক শান্তি দেয়, অন্যটি সমাজে ন্যায় ও বিশ্বাস গড়ে তোলে। আমরা যদি এই দুটিকে জীবনের প্রতিদিনের চর্চায় রূপান্তর করতে পারি, তাহলে একটি সুস্থ, শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠা সম্ভব।

জগৎশেঠ: শ্ৰেষ্ঠ ব্যাংকার থেকে দেউলিয়াইতিহাসে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে মীরজাফরের নাম যতবার উঠে এসেছে, জগৎশেঠের নাম ততবেশি শোনা ...
06/07/2023

জগৎশেঠ: শ্ৰেষ্ঠ ব্যাংকার থেকে দেউলিয়া

ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে মীরজাফরের নাম যতবার উঠে এসেছে, জগৎশেঠের নাম ততবেশি শোনা যায় না। যাদের চক্রান্তের শিকার হয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হন, তাদের মধ্যে জগৎশেঠ ছিলেন অন্যতম।

রাজা বল্লাল সেনের সময় বাংলার স্বর্ণ ব্যাবসায়ীরা একেবারেই ঘরে বসে যায়। ঠিক তখনই বাংলার ব্যাংকিং জগতে মাথা ঢোকানোর সুযোগ পেয়ে যায় বিদেশী শেঠরা।

মোঘল আমলে মাড়োয়াররা ভারতীয় উপমহাদেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। মাড়োয়ারের পালি বাজার ছিল পশ্চিম ভারতের সমুদ্র উপকূল ও উত্তর ভারতের ব্যবসার সংযোগস্থল। এখন থেকেই ইউরোপীয়রা ভারতীয় পণ্য এবং ভারতীয়রা ইউরোপীয়, আরব, আফ্রিকা ইত্যাদি দেশের পণ্য আমদানি - রপ্তানি করতো। মাড়োয়াররা ছোট বেলা থেকেই এই ব্যবসাগুলো বুঝতো। কিন্তু বিরূপ, শুষ্ক আবহাওয়া ও অনুর্বর অঞ্চলের কারণে তারা নিজেদের জন্মভুমিতে টিকতে পারেনি এবং ১৬৫২ সালে হিরানন্দ সাহু নাম একজন মাড়োয়ার বাংলার পাটনায় এসে বসবাস শুরু করেন।

পরবর্তীতে তিনি পাটনা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হন এবং একটি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তখন থেকেই তারা ছোট খাটো ধার দিয়ে ব্রিটিশদের ব্যাবসায় বিনিয়োগ করতো। ভারতবর্ষে তখনও তারা পরিচিত হয়ে ওঠেনি।

বাংলা ছিল মোঘল আমলের সব থেকে সম্মৃদ্ধশালী সুবাহ। আর ঢাকা ছিল তার রাজধানী। সেই সময় শুধু ঢাকার নদী বাণিজ্য পথ থেকেই বছরে আয়ের পরিমান ছিলো এক কোটি টাকারও বেশি। ডাচ, ফরাসি, ইংরেজরাসহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যের ব্যবসায়ীরা প্রচুর পণ্য কিনতো এই ঢাকা থেকে। হিরানন্দ সাহুর ব্যবসা ছিল সেইসব ব্যবসায়ীদের অর্থ ধার দেয়া ও টাকা ভাঙানো। ঢাকার এই প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার প্রধান শর্তই ছিল সময়মতো টাকা ধার পাওয়া ও পরিশোধ করা। যার ফলে হিরানন্দ সাহুর ব্যবসা রাতারাতি ফুলে ফেঁপে উঠেছিল।

তার সাত ছেলের মধ্যে বড় ছেলে মানিকচাঁদ বাবার ব্যবসায় জড়িত ছিল। মুর্শিদকুলি খান ঢাকা থেকে মুকসুদাবাদে (বর্তমান মুর্শিদাবাদ) রাজধানী সরিয়ে নিলে মানিকচাঁদ নতুন রাজধানীতে তাদের নতুন কুঠি খোলেন। ঢাকা থেকে রাজধানী সরানো হলেও নায়েব সুবেদারী থেকেই যায় এবং টাকা ছাপানোর টাকশালও রয়ে যায়। টাকশালটি ছিল বর্তমান কেন্দ্রীয় কারাগারের ভিতরে পরবর্তীতে যা মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করা হয়। মানিকচাঁদের ব্যবসা তখন খুব রমরমা অবস্থা। ঢাকা ছিল তাদের গুরুত্বপূর্ণ কুঠি। ঢাকার বাইরেও কলকাতা, বেনারস, হুগলি ইত্যাদি বিভিন্ন ব্যবসার জায়গায় তাদের নতুন নতুন কুঠি খুলতে শুরু করেন। মুর্শিদাবাদে মানিকচাঁদ ছিলেন নবাবের খুব প্রিয় মানুষ এবং পরবর্তীতে নবাবের ব্যাংকার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৭১৪ সালে মানিকচাঁদের মৃত্যুর পরে তার ছেলে ফতেহ চাঁদ এই দায়িত্ব পালন করেন। ১৭২৩ সালে সম্রাট মাহমুদ শাহ তাকে 'জগৎ শেঠ' উপাধি প্রদান করেন। এতে বোঝা যায়, দিল্লিতেও তারা তাদের কুঠি খুলতে সমর্থ হয়েছিল।

তখনকার বিভিন্ন দলিল দস্তাবেজ থেকে জানা যায়, এই মাড়োয়ারি হিন্দু পরিবারটি ছিল ভারতবর্ষ ও মোঘল সাম্রাজ্যের সব থেকে বড় ধনী। তাদের লেনদেনকে ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ডের সাথে তুলনা করা হয়েছিল। শেঠেরা সরকারি রাজস্ব জমা গ্রহণ করতো, জমা দিতো ও নবাবরা এর মাধ্যমেই তাদের বার্ষিক যায় দিল্লিতে পাঠাতো। শেঠদের কুঠি থেকে পরে নির্দিষ্ট পরিমাণের টাকা দিল্লির দরবার থেকে হুন্ডি হিসেবে কাটা হতো। ডাচ বিবরণীতে এই শেঠদের সব থেকে বড় মানি চেঞ্জার হিসাবে আখ্যা দেয়া হয়েছে। বাংলার বাইরে থেকে যেসব মুদ্রা বাংলা বিহারে আসতো সবই পরিবর্তনের বাটা নির্ধারণ কত শেঠের কুঠি। এছাড়া দামি ধাতু ভাঙিয়ে টাকশাল মুদ্রা করতে শেঠের কুঠি বাটা নিতো।

১৬৫০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় বসবাস শুরু করে এবং মোঘলদের কাছ থেকে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য করার অনুমতি নেয়। তারা বছরে তিন হাজার টাকা প্রদানের বিনিময়ে এ অধিকার পায়। তারা হুগলি ও কাশিমবাজারে বাণিজ্যকেন্দ্র খোলে এবং কলকাতা গোবিন্দপুর ও সুতানটি নামে তিনটি গ্রাম কিনে সেখানে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু মুর্শিদকুলি খানের সময় থেকেই ব্রিটিশদের সাথে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের ভুয়া ফরমান নিয়ে নবাবের সাথে তাদের দ্বন্দ্বের শুরু হয়। বলা হয় এটি ছিল পরবর্তী পলাশীর যুদ্ধের কারণ। আসলে আরও অনেক কারণের মধ্যে একটি কারণ ছিল ফরাসিদের সাথে বাঙালির সুসম্পর্ক। ব্রিটিশদের সাথে ফরাসিদের ৭ বছরের একটি দীর্ঘ যুদ্ধ হয়। সেই কারণেই বাঙালির সাথে ফরাসিদের এই সম্পর্ক তারা মেনে নিতে পারেনি। তাই এই পলাশীর যুদ্ধ শুধু মাত্র একটি খন্ড যুদ্ধ নয়, বরং এটি ছিল সমস্ত বিশ্বের যুদ্ধ।

১৭১৭ সাল থেকে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত শেঠদের ব্যবসা ছিল খুবই জাকজমকপূর্ণ। ১৭৪০ সালে সিংহাসন লাভের লড়াইয়ে অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা আলীবর্দী খাঁকে সাহায্য করেছিল। এমনকি সরফরাজ খানের মৃত্যুর পর তারা আলীবর্দী খাঁয়ের জন্যে দিল্লির ফরমানেরও ব্যবস্থা করেছিল। এভাবেই তারা নবাবদের তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতো।

পলাশীর যুদ্ধের পিছনে বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থা দায়ী ছিল। আর এই অর্থনীতির রাশ ছিল এই জগৎশেঠদের হাতে। বলা হয়, পলাশীর চক্রান্ত সফল করার উদ্দেশ্যেই তারা ব্রিটিশদের ৩ কোটি টাকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। তারা ভেবেছিলো ব্রিটিশরা তাদের ব্যবসার মুনাফা নিয়ে এই দেশ থেকে চলে যাবে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, ব্রিটিশরা মনে মনে অন্য পরিকল্পনা এঁটেছিলো। পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা মুর্শিদাবাদের কোষাগার লুট করে। সেসময় মুর্শিদাবাদের কোষাগারে ছিল প্রায় ৪০ কোটি টাকা। শেঠরা এই লুটের বিরোধিতা করেছিলো। তারা চায়নি তাদের পরবর্তী পুতুল নবাব খালি হাতে তার রাজত্ব শুরু করুক।

পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলার বাণিজ্য শেঠদের জন্য নিরপেক্ষ হয়ে যায়। জগৎশেঠ মাহতাব রাই ও রাজা স্বরূপচাঁদ নিজেদের তৈরী ষড়যন্ত্রে নিজেরাই ডুবে মরলেন। টাকশালের ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়লেন। ব্রিটিশরাও আর তাদের কাছ থেকে টাকা ধার করেনি। অন্যদিকে সারা ভারত জুড়ে গড়ে উঠেছিল ছোট ছোট ব্যাবসায়ীর দল। ব্যবসার পতন ঠেকানো তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিলো। ১৭৪০ সালের পর জগৎশেঠরা যেভাবে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছিলো, ঠিক সেভাবেই ১৭৫৭ সালের বিশ্বাসঘাতকতা তাদেরকে মিশিয়ে দিয়েছিলো মাটির সাথে। পরবর্তীতে মীর কাশিম ১৭৬৩ সালে শেঠ পরিবারের উত্তরাধিকারী দুই ভাইকে হত্যা করে এই শেঠ পরিবারের পতন ঘটায়।

১৭৭৩ সালে রাজধানী কলকাতাতে স্থানান্তরিত হলে এবং বাংলার নবাবের কাছ থেকে ব্রিটিশদের কাছে ক্ষমতা চলে এলে জগৎ শেঠ পরিবারের কার্যক্রম চিরকালের মতো অবসান ঘটে।

তথ্যসূত্র:
১। পলাশীর পূর্বে বাংলার বাণিজ্য, বিশ্বেন্দু নন্দ
২। চেপে রাখা ইতিহাস, গোলাম আহমেদ মর্তুজা

একটি সাদা থান পড়া ছোট্ট ৬/৭ বছরের মেয়ে দৌড়ে এসে বাবাকে বলছে........."বাবা বাবা, মা কে বলোনা, আমার খুব খিদে পেয়েছে। দাদার...
01/07/2023

একটি সাদা থান পড়া ছোট্ট ৬/৭ বছরের মেয়ে দৌড়ে এসে বাবাকে বলছে.........
"বাবা বাবা, মা কে বলোনা, আমার খুব খিদে পেয়েছে। দাদারা লুচি খাচ্ছে, আর আমি চাইলেই মা বলছে, 'ছিঃ আজ একাদশী না।খাবার কথা বলতে নেই মা।' কিন্তু বাবা,আমি সকাল থেকে কিচ্ছু খাইনি। একটু জল পর্যন্ত না। তুমি, মা, দাদারা কেউ একাদশী করোনা। আমায় কেন করতে হবে! আমার বুঝি খিদে পায়না?"
সালটা ১৮৫৩। হুগলী বর্ধমান সীমান্ত অঞ্চলে দশঘরার কাছে এক অভিজাত বাড়ি।বেলা ১১টা হবে। ঘরের মধ্যে আয়োজন করা হয়েছে এক আলোচনা সভার। পাড়ার গন্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত, রয়েছেন গৃহকর্তা স্বয়ং। জলখাবারের লুচি ছোলার ডাল নানা মিষ্টি পরিবেশিত হচ্ছে। সুখাদ্যের সুঘ্রানে ঘর মাতোয়ারা। আহার সমাপনে হবে আলোচনা। বিষয়বস্তু একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা যাতে মেয়েদের জন্যও শিক্ষার সুযোগ থাকবে। গৃহকর্তা উদার মানসিকতা সম্পন্ন। তিনি খুবই উদ্যোগী এই ব্যাপারে। কিন্তু গ্রামের মানুষেরা মেয়েদের বাইরে আসতে দিতে নারাজ। তাই আজ তিনি বিদ্যাসাগর মহাশয়কে আমন্ত্রন জানিয়ে এনেছেন মানুষকে বোঝানোর জন্য। চলছে তারই প্রস্তুতি।
এমন সময় একটি সাদা থান পড়া ছোট্ট ৬/৭ বছরের মেয়ে দৌড়ে এলো ঘরে।
"বাবা বাবা, মা কে বলোনা, আমার খুব খিদে পেয়েছে। দাদারা লুচি খাচ্ছে, আর আমি চাইলেই মা বলছে, 'ছিঃ আজ একাদশী না।খাবার কথা বলতে নেই মা।' কিন্তু বাবা,আমি সকাল থেকে কিচ্ছু খাইনি। একটু জল পর্যন্ত না। তুমি, মা, দাদারা কেউ একাদশী করোনা। আমায় কেন করতে হবে! আমার বুঝি খিদে পায়না?"
সকলের সামনে লজ্জায়, আর মেয়ের প্রতি মায়ায় করুন হয়ে ওঠে জমিদার বাবুর মুখ। আস্তে করে বলেন,
*"এখানে সভা চলছে মা, তুমি ঘরে যাও।"*
করুন দৃষ্টিতে সকলের পাতের দিকে তাকিয়ে বিফল মুখে ভেতরের ঘরে ঢুকে যায় একরত্তি অভাগা মেয়েটি। আর তার পরেই রূপোর থালা বাটিতে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্য সুখাদ্য সাজিয়ে ঘরে আসে বামুন ঠাকুর। বিদ্যাসাগর বলেন,
*"শরীরটা ঠিক নেই, আমি খাবোনা কিছু। নিয়ে যাও৷"*
বামুন ঠাকুর নিয়ে যান থালা ধরে। গৃহকর্তার অনুরোধ উপরোধেও দাঁতে কাটেন না কিচ্ছু।
শুরু হয় সভা। গ্রামের মানুষদের কাছে প্রথমেই তিনি তুলে ধরেন নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা। সমাজে নারীদের অবদানের কথা। ইতিহাসের পাতা থেকে তুলে ধরেন পশুপালন, কৃষিকাজ সবকিছুরই সূত্রপাত নারীদের হাত ধরে, সেই অমুল্য তথ্য। এক এক করে বলে চলেন ইউরোপে কিভাবে শিক্ষিত নারীরা বিপ্লবে, সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে তার উদাহরন। জোরালো আপত্তি ওঠে গ্রামের মানুষগুলির কাছ থেকে।ইউরোপের কথা বাদ দিন, আমাদের ধর্মে সমাজে নারীদের বাইরে বেরনো, শিক্ষা নেওয়া পাপ। ব্রহ্মাস্ত্র ছাড়েন বিদ্যাসাগর। কালিদাস কার বরপুত্র?শিক্ষার জন্য আমরা কার কাছে প্রার্থনা করি? দেবী সরস্বতী, তিনি একজন নারী। এর পরেও বলবেন পাপ?তারপর বেদের পাতা থেকে তুলে আনেন অপালা, ঘোষা, গার্গী, লোপামুদ্রাদের। নারী শিক্ষা বিষয়ে শ্লোকগুলি বলতে থাকেন একের পর এক। তীক্ষ্ণ যুক্তি, উদাহরন আর বাগ্মীতার সামনে ভেঙে পড়ে সংস্কারের দেওয়াল। সকলে সম্মত হন নারী শিক্ষার বিষয়ে। বিদ্যাসাগর মহাশয় উপলব্ধি করেন, _ইউরোপ নয়, সংস্কার ভাঙতে হবে বেদ কে হাতিয়ার করেই।গৃহকর্তার মুখে তখন বিজয়ীর গৌরব।_
সকলে চলে যাবার পর গৃহকর্তা বলেন,
*"এবার আপনার ভোজনের ব্যবস্থা করি। একাদশী তাই অন্নের ব্যবস্থা নেই। এইবার লুচি খান কয়েকটা। শরীর আশাকরি সুস্থ হয়েছে।"*
বিদ্যাসাগর মহাশয় বলেন,
*"শরীর আমার সুস্থই আছে, ক্ষত আমার মনে। আমি নারীদের শিক্ষার জন্য ছুটছি, কিন্তু এই বিধবা নারীরা, তাদের দুঃখ, তাদের প্রতি এই ধর্মীয় অমানবিকতা -- এই দিকে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলাম আমি। ছিঃ ছিঃ, ভাবতেই আমার গ্লানি হচ্ছে। রামমোহন রায় মহাশয় তাদের বাঁচিয়ে ছিলেন জ্বলন্ত চিতা থেকে। কিন্তু ওরা মরছে, রোজ জ্বলছে খিদেয়, অবহেলায়, অমানবিকতায়। আপনার কন্যা আজ চোখ খুলে দিয়েছে। আচ্ছা, আপনি পারেন না, মেয়ের পুনর্বিবাহ দিতে? ওর সামনে তো সারা জীবনটা পড়ে আছে। ও বাঁচুক নতুন করে। বিদেশে তো কতো হচ্ছে। আপনি শুরু করুন।"*
গম্ভীর হয়ে উঠলো গৃহকর্তার মুখ। তিনি বললেন,
*"প্রথমত সমাজ মানবে না। আমাদের প্রাচীন ধর্মেও এর কোন স্বীকৃতি নেই। তারপর হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্টেও রি-মেরেজের কোন আইন নেই। তাই ওর কপাল নিয়েই ওকে এইভাবেই বাঁচতে হবে। আমি নিরুপায়।"*
বিদ্যাসাগর মহাশয় বললেন,
*"স্ত্রী শিক্ষার পাশাপাশি আমার নতুন লড়াই শুরু হোল। এদেশের ছোট ছোট অসহায় বিধবা কন্যাদের বাঁচানোর লড়াই। সমাজ এবং আইন দুটোই পরিবর্তন করবো। শপথ নিলাম আজ। আমায় বিদায় দিন।"*
জলগ্রহন না করে বেরিয়ে পরলেন তিনি।
শুরু হোল লড়াই, আক্ষরিক অর্থেই লড়াই। একদিকে কলেজে অধ্যাপনা,বই ছাপানোর কাজ, তাঁর গড়ে তোলা বিদ্যালয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ, সেগুলিকে তো আর বন্ধ হতে দেওয়া যায়না, তার সঙ্গে রাতের পর রাত জেগে বেদ উপনিষদ পুরান মনু সংহিতা ঘেঁটে চলা, কোথায় আছে নারীর পুনর্বিবাহের বিধান। সিন্ধুর থেকে মুক্তো তোলার মতোই কঠিন সে অনুসন্ধান। দিনের পর দিন,রাতের পর রাত।অবসরের সময় কই? এর সঙ্গে কলকাতার শিক্ষিত সমাজের স্বাক্ষর সংগ্রহ, সরকারের কাছে বিধবা বিবাহ প্রচলনের জন্য পিটিশন জমা দেওয়া।
এদিকে শুরু হয়েছে নতুন বিপত্তি। কলকাতার রক্ষনশীল দল, পুরোহিত সমাজ বিধবা বিবাহের ঘোর বিপক্ষে। তারা কিছুতেই মেনে নেবেনা এই অনাচার। তারা পাল্টা আবেদন করেছে সরকারের কাছে, ধর্মবিরোধী এই আইন চালু হলে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে তারা। বিদ্যাসাগরের বাড়ির সামনে চলছে প্রতিবাদ ব্যঙ্গ বিদ্রুপের ঝড়। নারীদের প্রতি তাঁর সহানুভুতি নিয়ে অশ্লীল কটূক্তি। বাড়িতে যখন তখন পড়ছে ঢিল, ময়লা, আবর্জনা। একদিন বিদ্যাসাগরকে হামলার মুখেও পড়তে হয়েছে রাস্তায়। বঙ্কিমচন্দ্র বিষবৃক্ষ উপন্যাসে সূর্যমুখীকে দিয়ে বলালেন-
*"যে বিধবা বিবাহের ব্যবস্থা করে, সে যদি পণ্ডিত হয়, তবে মূর্খ কে!"*
এইসব কটাক্ষেও কিন্তু বিদ্যাসাগর অনড়। লড়াই তাঁর জীবনে। যিনি ওই দারিদ্র কাটিয়ে কলকাতায় ছাপাখানার ব্যবসা খুলতে পারেন, যিনি উত্তাল নদী সাঁতরে পার হতে পারেন দুর্যোগের রাত্রে, যিনি নিজ খরচে ২১টি বালিকা বিদ্যালয় চালানোর সাহস দেখান, যিনি স্পর্ধা রাখেন ব্রিটিশের সামনে জুতো পড়া পা তুলে ধরার, তার কাছে কোন বাধাই বাধা নয়। কিন্তু বড়লাটের দপ্তর বলেছে বেদ পুরানে কী কোন উদাহরন আছে পুনর্বিবাহের? না হলে আইন পাশ করা মুশকিল। রক্ষনশীলদের চটিয়ে কিছু করার ইচ্ছা নেই ডালহৌসির।
তাই রাতের পর রাত জেগে পুঁথি পত্র পড়ছেন তিনি। কম আলোয় চোখের সমস্যা হচ্ছে, ক্লান্তিতে অনিদ্রায় শরীর ভেঙে পড়ছে, হতাশা আসছে মনে। কিন্তু পরক্ষনেই চোখে ভাসছে ওই একরত্তি বিধবা মেয়েটির করুণ মুখখানি, সারা দেশের হাজার হাজার বিধবা নাবালিকার অসহনীয় জীবনের দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাচ্ছেন তিনি। আবার শুরু হচ্ছে তাঁর অন্বেষণ। তারপর, তারপর পাওয়া গেলো সেই মুক্তো। পরাশর সংহিতার অমর সেই শ্লোক
*"নষ্টে মৃতে প্রবরজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ/ পচস্বাপতসু নারীনাং পতিরন্যো বিধয়তে।"(স্বামী মারা গেলে, সন্ন্যাস নিলে, নিখোঁজ হলে, সন্তানগ্রহনে অক্ষম হলে, অধার্মিক ও অত্যাচারী হলে পত্নী আবার বিবাহ করতে পারে।)*
তিনি ছুটলেন সরকারের দ্বারে। প্রমান করলেন বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত। আর বাধা রইলো না কিছুই। ১৮৫৬ সালের ১৬ই মতান্তরে ২৬ শে জুলাই পাশ হোল বিধবা বিবাহ আইন। লক্ষ লক্ষ বাল্য বিধবা পেলো মুক্তির আশ্বাস। শুধু চালু করেই ক্ষান্ত থাকলেন না। নিজের পুত্রের বিধবার সাথে বিবাহ দিয়ে দেখিয়ে দিলেন সমাজকে। এখানেই তিনি অনন্যসাধারন। সিংহহৃদয় এর মধ্যে কুসুমকোমল অনুভুতির প্রকাশ। আমরা আজ বহু বছর পরেও যে সংস্কার কাটিয়ে উঠতে পারলাম না, তিনি সেই যুগে দাঁড়িয়ে করে দেখালেন তা।
তিনি চলে গেছেন সেই ১৮৯১ সালে। কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর লড়াই, তাঁর আদর্শ, তাঁর অবদান। যে আদর্শ আলো দেখিয়েছে আপামর বাঙালিকে। যার হাত ধরে আমাদের অক্ষর চিনতে শেখা। সেই মহামানবকে জানাই শত প্রনাম।
"বেঁচে থাকো বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে।"
(সংগৃহীত)

Address

Vill+po– Chagram, Ps–khandaghosh, Dist–purba Bardhaman
Burdwan
713423

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Histor & Historia posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The School

Send a message to Histor & Historia:

Shortcuts

Share