05/06/2021
বর্ধমান। দ্রুত ত্বরণে বাড়তে থাকা শহর। শহর বাড়লে, দৌড়লে, না-শহরকে গ্রাস করতে হয় আর যা কিছু বাড়তি, ফালতু জিনিস তা ছেঁটে ফেলতে হয়। নাহলে মেট্রো-শহরের গতি রূদ্ধ হয়। উন্নয়নের বুলেট ট্রেন হর্ন বাজায়। তাই, বর্ধমান শহর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অজস্র পুকুর আর নেই। পুকুর, জলাজমি, প্রাকৃতিক নালা নিয়ে গড়ে ওঠা বর্ধমানের বাস্তুতন্ত্র ভোগে গেছে। বিশাল জলা বুজিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ততোধিক বিশালাকার বিল্ডিং তৈরি হয়েছে। জিটি রোড সম্প্রসারণের জন্য রাস্তার দু’ধারের যাবতীয় ছোট, বড়ো, মাঝারী গাছ-লতা কেটে ফেলা হয়েছে। সঙ্গে বিদেয় হয়েছে সেসব উদ্ভিন্ন গুল্মে আশ্রয় নেওয়া প্রাণেরা। ধুলোয় ধুলোয় জিটি রোডে চলাচল করা যায় না। গা-জ্বালা গরমে ছায়ায় দাঁড়ানোর উপায় নেই।
ওদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টির চক্রটারই নাকি দফারফা হয়ে গেছে। হঠাত হঠাত ঝড় হচ্ছে। ধুলোর ঝড়। বৃষ্টি হলে বাড়ির দেওয়ালে, ছাদে ক্ষয়াটে, হলুদ আস্তরণ দেখা যাচ্ছে। স্বস্তির বৃষ্টি পরিণত হচ্ছে অ্যাসিড বৃষ্টিতে। শুধু বর্ধমান নয়, জলাভূমি বোজানো, পুকুর ভরাট, গাছকাটার ঘটনা চারদিকেই ঘটছে। যশোর রোড, লাটাগুড়ি, টাকি, ঝাড়গ্রাম, সেবক থেকে রংপো সড়ক কি রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ শুরু হচ্ছে। নির্বিচারে গাছ কেটে জঙ্গল উচ্ছেদ চলছে। তুতিকোরিণ, ভাবাদিঘী, ভাঙ্গর, কুদানকুলাম, নিয়মগিরি, অরুণাচল, নর্মদা, রামপাল, ডাকোটা, ফুকুশিমা, চের্নোবিল, ভোপাল...। সঙ্কটে খাল-বিল-নদী-সমুদ্র-পাহাড়। সঙ্কটে কোরাল রীফ-সীল মাছ-ডাব-মরু ভল্লুক-শকুন-বাদুড়-বাঘরোল-ধান-দেওয়ালী পোকা সব্বাই। গ’লে যাচ্ছে বরফের ভেতরের স্তর। ভূ-স্তরের ফাটল বাড়ছে। বাড়ছে ভূমিকম্পের প্রবণতা। হঠাত ধ্বস, দাবানল, আগ্নেয়গিরি, জলোচ্ছ্বাস উজাড় করছে ‘প্রথম বিশ্বের’ ‘আধুনিকতম’ নগর-গ্রামকেও। নগরায়ণই যদি সমস্যা হয় তবে বিচিত্র বুনোট জঙ্গলের সাম্রাজ্য সাফ করে গ্রামায়ণও তো সেই সমস্যার একরকমের উৎসমুখ নয় কি? জলবায়ু বদলে যাচ্ছে দ্রুত। বদলে যাচ্ছে ঋতুচক্র। এসব ধ্বংসের কারণ কি আমাদের প্রয়োজন-ভোগ নাকি লোভ? যে প্রাকৃতিক বিন্যাস নির্মানে মানুষের ভূমিকা নগণ্য, সেই বিন্যাসকে অযাচিতভাবে বিকৃত পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া মানুষের সংবেদের প্রকাশ কি?
বরং, একটা গল্প শোনা যাক।
কম্পানি ঠিক করল আলুর চিপ্স্ বানাবে। কম্পানির নাম? টাটা বা ফাটা কিছু একটা ধরে নেওয়া যাক। আলুর চিপ্স্ বানাতে গেলে আলু লাগবে। প্রত্যেকটা আলু নিটোল, গোল, পাতলা খোসার হতে হবে। আলুর মধ্যে জল কম থাকবে অর্থাৎ শুকনো হতে হবে। এমন আলুর প্রজাতি স্বাভাবিকভাবে প্রকৃতিতে পাওয়া যায়না। তাহলে ফাটা কম্পানি কি করবে? ফাটা, একদল বিজ্ঞানীকে ভাড়া করবে। জীনের বদল ঘটিয়ে যেমন চাই তেমন আলুর বীজ বানাতে ‘ফাটা এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইন্স্টিটিউট’ খুলবে। ছাত্রছাত্রীরা বাপের জমি ফাটার কোনও এক তুতো ভাইয়ের কাছে বন্ধক রেখে গুচ্ছ টাকা সেমেস্টার ফিজ দিয়ে সেখানে ভর্তি হবে। সেই টাকায় ‘রিসার্চ’ হবে। গবেষণায় তৈরী হবে কাঠখোট্টা, নিটোল, গোল, পাতলা খোসার, জল-কম আলুর বীজ। আলুর বীজ হল। এবার তা ফলাতে হবে। রিসার্চ ইন্স্টিটিউটে যারা পড়ায় বা যারা পড়ে তারা তো চাষ জানেনা। ফলত ফাটাকে আলুচাষীদের কাছে যেতে হবে। এদিকে আলুচাষে নিরাপত্তা নেই। হঠাত কোনও বছর ৫০০ টাকা বস্তা পাওয়া গেল তো অন্য বছরগুলোয় ১৫০ টাকা বস্তা। ফাটা বস্তাপিছু ২৫০ টাকা বাঁধা দামের কথা দেবে চাষীদের। ফাটার কেনা নেতা এসে সেচের জন্যে ৪/৫ টা নদী সংযুক্ত করে দেবে। চাষীদের মনে হল এতে লাভ, অনিশ্চয়তা নেই। নদীর মরণে দুঃখ পেলেও, তারা চাষ করতে রাজি হল। কিন্তু এ ধরণের আলু চাষ করতে বেশি বেশি নির্দিষ্ট ধরণের কীটনাশক, রাসায়নিক সার লাগে। এই কীটনাশক, রাসায়নিক কোথা থেকে আসবে? ফাটা কীটনাশক, কেমিক্ল সারের কারখানা খুলবে। কিভাবে খুলবে? খুলতে তো জমি চাই। ফাটা বলল কেমিক্ল হাব বানাবে। এলাকার উন্নয়ন হবে। জমি দাও, জঙ্গল দাও। না দিলে গুলি খাও। ফাটা সরকারের কাছে SEZ (স্পেশাল ইকোনমিক জোন) চাইবে; বিনামূল্যে জল, ইলেক্ট্রিক, ফ্রেট করিডোর নানা কিছুর বায়না করবে। আমাদের একবারও না জিগ্যেস ক’রে আমাদের ট্যাক্সের পয়সায় সরকার-পার্টি সেসব বানিয়ে ফাটার হাতে তুলে দেবে। চিরতরে জঙ্গল হারিয়ে যাবে। সেখানকার বন্যপ্রাণীরা লোকালয়ে ঢুকে কিছুদিন খাবারদাবার জোগাড়ের চেষ্টা ক’রে, বিউটিফিকেশন আর আলোকসজ্জার ধাক্কায় জলাশয় থেকে খাবার জলটুকুও না পেয়ে, শেষে গুলি কি বল্লমের খোঁচায় মরবে। ফাটার পয়সায় চলা এনজিও ‘বন্যপ্রাণী ম্যানেজমেন্ট কেন্দ্র’ খুলে আদিবাসী মানুষদের ‘প্রকৃতিপ্রেম’ শেখাতে যাবে। এভাবে কেমিক্ল হাব হবে। হাবে অ্যালুম্যুনিয়ামও বানাতে ফাটা পাহাড়ের পর পাহাড় কিনে বক্সাইট তুলবে। পাহাড়বাসীদের তাড়িয়ে দেবে, পাহাড় ধ্বংস করবে। হাব থেকে বেশি লাভের জন্য ফাটা কম পারিশ্রমিকে শ্রমিকদের ১৪ ঘন্টা ক’রে খাটাবে। মজুরী চাইলে ছাঁটাই করবে। মজুরদের মধ্যে ধর্মীয় বিভেদ ছড়িয়ে কিছু শ্রমিককে মেরেই ফেলবে, ফাটা রাষ্ট্রীয় শুয়োর-সেবক মঞ্চ্। কারখানার দোহাই দিয়ে মাটির তলার জল তুলে নেবে গ্যালন গ্যালন, সেই জলের একটা অংশ দিয়ে একটাকায় কোকাকোলা বানিয়ে ১৫ টাকায় তা আমাদের বিক্রি করবে। আর সেই কেমিক্ল হাব ভয়ঙ্কর কার্বন দূষণ ছড়াবে চারপাশের নদী-পুকুর-বাতাসে। জল-হাওয়ায় মানুষের আর্সেনিক হবে, চর্মরোগ হবে। মানুষ ক্ষেপে গেলে গ্রামের একটা মেয়েকে রেপ ক’রে থেঁতলে মেরে ফেলবে ফাটার লোকেরা। ফাটার মিডিয়া কম্পানি সেই সুযোগে পরমাণু বিদ্যুতের পক্ষে প্রচার করলে, ফাটার মাইনিং কম্পানি মাটির তলা থেকে ইউরেনিয়াম তোলার জন্যে খনি খুঁড়বে। খনি শ্রমিকের ঘরে বিকলাঙ্গ সন্তান জন্মাবে। স্পঞ্জ আয়রনের ধুলোয়-ভরা গাছের পাতা দেখে সেই সন্তানেরা জানবে গাছের পাতার রঙ – কালো। আর শহরের কিছু ছেলেমেয়ে সেই ধর্ষিত-গ্রামের মেয়েদের মধ্যে ‘কম’ পয়সায় ফাটার তৈরী স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে উৎসাহিত ক’রে ট্যাবু ভাঙতে যাবে। এভাবে ফাটা রাসায়নিক সার, কীটনাশক তৈরি করবে। ফাটার থেকে আলুচাষি, অন্য চাষিরা সেসব কিনবে। সেই রাসায়নিক সার ধোয়া জল গড়িয়ে গিয়ে পুকুরের জলে মিশে পুকুরের বাস্তুতন্ত্র, জৈব চক্রকে বদলে দেবে। এই কীটনাশকই মাটিতে মিশে মাটির অম্লতা বাড়িয়ে প্রাকৃতিক রাসায়নিক চক্রগুলিকেও নষ্ট করবে। মারা পড়বে অসংখ্য কেঁচো, মেঠো ইঁদুর, সাপ, অনুজীবরা। এত ধরণের ধ্বংসের পরে আলু চাষ হলে আলু তোলা হল। পচা আলুর অজুহাত দেখিয়ে চাষির থেকে ফাটা এতোটুকুই আলু কিনবে যাতে চাষি মহাজনের ধার শোধ করতে ফাটাকেই নিজের জমি বেচে দিতে বাধ্য হয়। সেই জমি আর জলা বুজিয়ে ফাটা রিয়েল এস্টেট, শপিং মল, হোটেল, ইকো ট্যুরিজ্ম পার্ক খুলবে কাঠ বেচে লাভ করা যায় এমন একই ধরণের গাছের নকল জঙ্গল বানিয়ে। (সেসব বানাতে আমাদেরই ব্যাঙ্কে রাখা টাকা ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে জীবনেও ফেরত দেবে না ফাটা)। সেসব জায়গার বিজ্ঞাপন করবে অভিনেতা থেকে ক্রিকেট খেলোয়াড়। কিন্তু চাষ-করানো আলু থাকবে কোথায়? তার জন্য কোল্ডস্টোরেজ চাই। ফাটা কোল্ডস্টোরেজও খুলবে। চাষিদের লাভের লোভ দেখিয়ে আবার জমি হাতাবে। কোল্ডস্টোরেজে চাষীদের চাষ করা ৫০০০ ট্রাক আলু জমা হবে। কিন্তু ফাটার চিপ্স্ বানাতে লাগবে মাত্র ৫০০ ট্রাক আলু। কোল্ডস্টোরেজে তখনো ৪৫০০ ট্রাক আলু পড়ে রইল। এদিকে বাজারে অন্য আলু আর নেই। কারণ অন্য আলু চাষ করাই হয়নি। ৫০০০ ট্রাক আলুর ঘাটতি নেহাত কম নয়। দাম আগুনসীমা ছাড়িয়েছে। চাষীদের বাড়িতেও আলুভাতে-ভাতের মেনু নুনভাতে নেমেছে। এমন অবস্থায় খোলা বাজারে চড়া দামে ৪৫০০ ট্রাক আলু বেচে দিল ফাটা। সেই আলু ঢুকে গেল আমাদের রান্নাঘরে। কিন্তু এ তো সাধারণ আলু নয়। এতো ফাটা-420। তবে ফাটার পেট্রোলিয়াম বেচার ইউনিট হাজার হাজার কোটি টাকার টার্নওভার বাড়ালো রান্নার গ্যাস বিক্রি করে। কেন? চিপ্সের ব্যবসার জন্য কাঠখোট্টা, নিটোল, শুকনো আলু রান্না করতে দুগুণ তিনগুণ সময় লাগল, ফাটার তৈরী প্রেশার কুকার কিনতে হল। অতিরিক্ত জ্বালানি পুড়ল। ফলত গ্যাসের খরচাও বাড়ল। এই অতিরিক্ত গ্যাস টাটা বা ফাটা কোম্পানি থেকেই বেশী দাম দিয়ে কিনতে হলো আমাদের। ততদিনে সরকার গ্যাসের ওপর ভর্তুকীও তুলে দিয়েছে ফাটার তুতোভাই ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের পরামর্শ মোতাবেক। তারপর সেই জিনে-ধরা আলুপোস্ত, আলুর দম খেয়ে গণহারে অসুস্থ হতে থাকলাম আমরা। ফাটার তো ওষুধের কোম্পানিও খোলা আছে। সেই ওষুধের বিক্রি বাড়লো জোর ধাক্কায়। ফাটার নার্সিং হোম ২৪x৭ ‘হাউস ফুল’ থাকলো। জেনেটিক্যালি মডিফায়েড আলু খাওয়ার অভ্যেসে আমাদের ক্যান্সারের প্রবণতা বাড়লো। ফাটা খুললো নতুন ‘দোকান’। ফাটা ক্যান্সার রিসার্চ ইন্স্টিটিউট। একদল অঙ্কোলজিস্ট, বিজ্ঞানীদের ভাড়া করা হল। আমরাই রাতজাগা পড়াশোনা করে সেই যোগ্যতা অর্জন করেছি। ফাটার নার্সিং হোম, ফাটার অ্যাম্বুলেন্সের পর বাজারে ফাটা কম্পানির ‘নিশ্চয় যান’ও আছে -- যা আমাদের শ্মশান বা কবরস্থান পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। ফাটা এখন কাফনও বিক্রি করে, শ্মশানের ইলেক্ট্রিক চুল্লীটাও ফাটার R ‘n D-র দান। শ্মশানে গিয়ে আমরা ফাটা চিপ্স-ফাটা কোলা দিয়ে ফাটার রাম খাব।
তাহলে?
রাস্তা হবে না? কম্পিউটার ব্যবহার করবো না? সেলফি তুলতে অ্যানড্রয়েড ব্যবহার করব না? পরমাণু গবেষণা হবেনা? রকেট যাবে না মঙ্গলে বা শনিতে? জঙ্গলে ফিরে যাব? কাঁচা মাংস খাব? ন্যাংটো হয়ে ঘুরবো? ঘরবাড়ি বলে কিছু থাকবে না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কেউ বলেন ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লহ এ নগর’। পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রকৃতিকে ভোগের সামগ্রী হিসেবে নস্যাৎ না ক’রে কৃচ্ছ্বসাধনের কথা আদতে মানুষের থেকে পরিবেশকে বিচ্ছিন্ন ভাবতেই শেখায়। আরও একদল মানুষ আছেন, যারা পরিবেশ রক্ষায় জৈববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দাওয়াই দেন। কিন্তু, সংরক্ষিত অরণ্য বা চিড়িয়াখানা দিয়ে যে বনের প্রাণ রক্ষা হয়না তা আমাদের কাছে স্পষ্ট। ঠিক যেভাবে, ক্যারাটে শিখিয়ে আসিফাদের বাঁচানো যায়না। ঠিক যেভাবে আম্বেদকরের জন্মদিন পালন করলেই রোহিত ভেমুলাকে বাঁচিয়ে তোলা যায়না, ঠিক তেমন।
আবার রাস্তা-কম্পিউটার-সেলফি-অ্যানড্রয়েড-পরমাণু গবেষণা-রকেট-স্যাটেলাইট-মঙ্গলযান-চিকেন সসেজ-স্ট্রেচেবল জিনস-ফ্ল্যাট-বাংলো উৎসর্গ করে কাঁচা মাংস-ন্যাংটো আদিম শরীর-গুহার আশ্রয়-পাথরের হাতিয়ার নিয়ে বাঁচতে যাওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব।
কোকিল-ময়ূর-পলাশফুল-কাঞ্চনজঙ্ঘা-মেরিনা বিচ-জলদাপাড়া দেখতে দেখতেও আমাদের এক ঢোঁক কোকাকোলা বা এক কামড় মিও-আমোরে লাগে। আমরা স্কুলে-কলেজে জল-মাটি-বায়ু দূষণ নিয়ে প্রবন্ধ লিখতেই পারি, ইভিএস-এর অ্যাসাইনমেন্টে ‘বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ’ কপচাতেই পারি, ‘একটি গাছ একটি প্রাণ’ গলায় ঝুলিয়ে ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল...’ গাইতেই পারি। কিন্তু এই যে ‘আরও চাই, আরও চাই’ মনগুলো ট্যাঙ্কে পেট্রোল (পালে হাওয়া নয়) পেয়ে যায় যে ধাঁধার সামনে প’ড়ে, সেই ধাঁধার উত্তর খুঁজবো কোন রাস্তায়? যে রাস্তা তৈরিতে গাছ কাটা পড়বে না। যে রাস্তা তৈরির কারখানা থেকে বিষাক্ত জল-বিষাক্ত ধোঁয়া বেরোবেনা। যে রাস্তায় চলা যানবাহন এক সিন্থেটিক পৃথিবীর বিজ্ঞাপন করবে না। যে মন নিয়ে আমরা এই ধাঁধার উত্তরের রাস্তা খোঁজার চেষ্টায় আছি, সেই মনও কিন্তু চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে আছে ‘আরও চাই’-এর জাঁতাকলেই। আমরা প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করতে পারি, তাই আমরা নিয়ন্ত্রনও করতে পারি – এই ভাবনা মনে থেকেই যায় আমাদের; মানুষের বিজ্ঞানের, মানুষের প্রযুক্তির। মানুষের, মুনাফার অভিঘাত স্থায়ী বিকৃতি ঘটাচ্ছে নিসর্গের। মানুষের তৈরী অঙ্কগুলোও নিরন্তর মেপে চলে সমস্তকিছু। ‘পরিমাপ’-এর এই মনষ্কতা যে অর্থনীতির কথা বলে তা জঙ্গলকে মাপে সেন্টিগ্রেড (উষ্ণতা), সিসি (বৃষ্টিপাত), গ্যালন (অক্সিজেন), বর্গমিটার (ছায়া), কিলোগ্রাম (ফল), ইঞ্চি (কাঠ)-র হিসেবে। এ হিসেব ধ্বংসাত্বক। অর্থনীতি, অর্থনীতির ভাষা বাতিল করতে হবে। খুঁজতে হবে নতুন ভাবে। খুঁজতে গেলে জানতে হবে। জানলে দায় বর্তায় জানানোর। দায় বর্তায় কিছু করার। তারপরেও পড়ে থাকে নানা তর্ক, প্রশ্ন, খোঁজ, কাজ, ভাবনা।