23/08/2026
তথ্যচিত্র:
“বিজেপির প্রতি ক্ষোভ কেন? আত্মসমালোচনার সময় কি এসে গেছে?”
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপিকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা গত কয়েক বছরে অনেকটাই বেড়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশ পরিবর্তনের রাজনীতির দিকে তাকিয়ে ছিল।
কিন্তু সেই প্রত্যাশার পাশাপাশি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা প্রশ্নও ক্রমশ সামনে আসছে—বিজেপির প্রতি মানুষের একাংশের ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কয়েকটি বিষয় নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করা দরকার।
প্রথমত, বাংলার মনীষীদের নিয়ে রাজনীতি।
ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বাংলার গর্ব, ভারতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁকে সম্মান করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু বাংলার ইতিহাস শুধু একজন মনীষীকে ঘিরে নয়।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, কাজী নজরুল ইসলামসহ অসংখ্য মনীষীর অবদান বাংলার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তাই কোনও একজনকে সামনে আনতে গিয়ে অন্য মনীষীদের গুরুত্ব যেন আড়ালে চলে না যায়—এটাই মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
সম্প্রতি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে বিজেপির এক রাজ্যসভা সাংসদের মন্তব্যও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছে। পরে ওই সাংসদ প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। একই ঘটনায় রাজ্য সরকার তাঁর ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান প্রত্যাহারও করে।
এখানে প্রশ্নটা কোনও দলকে ছোট করা নয়।
প্রশ্নটা আরও বড়—
যে ব্যক্তি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান প্রতীক, তাঁকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করলে দলীয় পরিচয় নয়, আইনের শাসন ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা কি সবার ক্ষেত্রেই সমান হওয়া উচিত নয়?
আমার মতে, অবশ্যই হওয়া উচিত।
একইভাবে, তৃণমূল সরকারের আমলে কেউ যদি দুর্নীতি, অপরাধ বা অন্যায় করে থাকে, তার বিরুদ্ধে তদন্ত হোক, প্রমাণ থাকলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হোক।
কিন্তু শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হওয়ার কারণে কাউকে রাস্তায় হেনস্থা করা, ডিম ছোড়া কিংবা ব্যক্তিগতভাবে অপমান করা কোনও সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ হতে পারে না।
রাজনীতি হোক কঠিন, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেন নোংরা না হয়।
আরেকটি বিষয় মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করছে—দলবদল।
যে সমস্ত রাজনৈতিক নেতা বা কর্মীর বিরুদ্ধে অতীতে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি কিংবা অন্যায়ের অভিযোগ ছিল, তারা যদি রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে নতুন দলে যোগ দেন, তাহলে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক—
আগের অভিযোগগুলোর কী হল?
অভিযোগ সত্য হলে তদন্ত কোথায়?
আর অভিযোগ মিথ্যা হলে এতদিনের রাজনৈতিক প্রচারের ভিত্তিটাই বা কী ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক দলগুলোকেই দিতে হবে।
কারণ মানুষ শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন চায় না।
মানুষ চায় ব্যবস্থার পরিবর্তন।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির মধ্যেই চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগে বহু কর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার খবর প্রকাশ্যে এসেছে। অর্থাৎ সমস্যাগুলো যে দলের নজরেও এসেছে, তার কিছু প্রমাণ রয়েছে।
এটাই হয়তো সময় আত্মসমালোচনার।
বিজেপি যদি সত্যিই বাংলায় দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাহলে শুধু বিরোধী দলের ভুল দেখালে হবে না।
নিজেদের ভুলও স্বীকার করতে হবে।
পুরনো কর্মীদের সম্মান দিতে হবে।
নতুনদের জায়গা দিতে হবে।
দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা দেখাতে হবে।
দলবদল করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করতে হবে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
আইন সবার জন্য সমান হতে হবে।
তরুণ প্রজন্ম আজ অনেক বেশি প্রশ্ন করে।
তারা শুধু স্লোগান শুনতে চায় না।
তারা জানতে চায়—কথার সঙ্গে কাজের মিল কতটা?
তারা দেখতে চায়—যে দল দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে, সেই দল নিজের ঘরেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কতটা কঠোর?
তাই বিজেপির প্রতি আজ যে ক্ষোভ বা প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, সেটাকে শুধু বিরোধীদের ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।
বরং এটাকে দেখা উচিত একটি সতর্কবার্তা হিসেবে।
মানুষের এই প্রশ্নগুলো যদি দল গুরুত্ব দিয়ে শোনে, ভুল স্বীকার করে এবং সংগঠনের ভিতরে শুদ্ধিকরণ করে, তাহলে সেই ক্ষোভই ভবিষ্যতে আস্থায় পরিণত হতে পারে।
কারণ কোনও রাজনৈতিক দলই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়।
কিন্তু যে দল নিজের ভুল বুঝতে পারে, ভুল সংশোধন করতে পারে এবং মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে পারে—সেই দলই দীর্ঘদিন মানুষের আস্থা ধরে রাখতে পারে।
শেষ কথা একটাই—
বিজেপি হোক বা তৃণমূল, যে-ই অন্যায় করবে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হোক।
রাজনীতিতে প্রতিহিংসা নয়, বিচার চাই।
ব্যক্তিপূজা নয়, নীতি চাই।
স্লোগান নয়, কাজ চাই।
আর দল নয়—
সবার আগে দেশ, সবার আগে মানুষ।