07/04/2025
কেউ কাঁদে রাজপথে, কেউ নিঃশব্দে অন্ধকার ঘরের কোণে—চাকরি হারানোর গল্প কি কেবল সরকারি চাকরির?
২০১৬। এক অলৌকিক আশার সূচনা।
হাজার হাজার শিক্ষিত, পরিশ্রমী যুবক-যুবতী ঝাঁপিয়ে পড়লেন স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায়। কেউ প্রাইভেট টিউশন ছেড়ে, কেউ পরিবার চালানোর টাকা কোচিংয়ে ঢেলে, কেউ আবার নিজের শেষ সম্বল—জমি-জায়গা বিক্রি করে দালালের শরণাপন্ন হয়ে “নিশ্চিত নিয়োগ”-এর স্বপ্ন দেখলেন।
পরীক্ষা দিলেন, ইন্টারভিউয়ের পর এল সেই কাঙ্ক্ষিত মেসেজ—
“আপনি নির্বাচিত হয়েছেন”।
চোখে জল। আনন্দের।
আর আজ?
সেই চোখেই জল কিন্তু এবার কেবল অভিমান আর বেদনার।
প্রায় ২৬,০০০ চাকরি বাতিল SSC দুর্নীতির কারণে।
যারা চাকরি পেয়েছিলেন, তারা হারিয়ে ফেলেছে।
অনেকে অনশন করছেন দিনের পর দিন, কেউ আবার নিঃশব্দে গলায় দড়ি দিয়েছেন।
এ এক কান্নার গল্প—যা আমরা টিভির পর্দায় দেখি, খবরের কাগজে পড়ি এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করি।
কিন্তু অন্যদিকে—
অসংখ্য মানুষ, যারা প্রাইভেট সংস্থায় কাজ করতেন, তারাও যে কাঁদছিলেন—সেই গল্প কিন্তু খুব বেশি শুনিনি আমরা।
COVID-19: কান্নার এক নিঃশব্দ মহামারী
২০২০ সালের সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলোর কথা মনে আছে?
সরকারি স্কুলের অনেক শিক্ষক ঘরে বসেই পেলেন বেতন।
আর ঠিক তখনই, প্রাইভেট সংস্থার কর্মীরা—দিনরাত Work From Home করে, নিজস্ব ইন্টারনেট খরচে, নিজের ঘরে অফিস বানিয়ে—চালিয়ে গেলেন কোম্পানির কাজ।
তারপর?
বেতন কমে গেল।
কেউ পেলেন হাফ স্যালারি, কেউ পেলেনই না।
অনেককে সরাসরি “Thank you, we’re downsizing” বলে ছেঁটে ফেলা হলো।
অনেকে তিন মাস কাজ করেও পেলেন না এক টাকাও।
তখন কি তারা কাঁদেননি?
কেন তাদের কান্নার কোনও নিউজ ট্রেন্ড তৈরি হয়নি?
সাম্প্রতিক চিত্র: নীরব ছাঁটাই চলছে প্রতিদিন
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই প্রায় ৬৫,০০০ প্রাইভেট চাকরি হারিয়েছে মানুষ।
কেউ কোম্পানির “cost cutting”-এর শিকার, কেউ “performance review”-এর নামে ছাঁটাই, কেউ আবার “automation”-এর চাপে।
একজন ১৫ বছরের অভিজ্ঞ আইটি কর্মী হঠাৎ বেকার।
একজন ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষক, যার বদলে কম বেতনের নবীন শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন।
একজন সাংবাদিক, যার নিউজরুম এখন শুধু অনলাইন।
আরও আছে—বিক্রয় প্রতিনিধি, কল সেন্টার এক্সিকিউটিভ, HR, মিডিয়া কর্মী, হাসপাতালের কনট্রাকচুয়াল নার্স—তালিকাটা বিশাল।
তবু—
তাদের নিয়ে নেই কোনও রাজপথের আন্দোলন।
নেই মিডিয়ার হেডলাইন।
নেই আদালতের বিশেষ নজরদারি।
কারণ?
কারণ গুলি সংক্ষেপে:
১. সংগঠনহীনতা — প্রাইভেট চাকরি হারানোদের নেই কোনো ইউনিয়ন বা শক্ত সংগঠন।
২. ভয় — আজ প্রতিবাদ করলে কাল চাকরির বাজারে ফিরলে বিপদ হতে পারে।
৩. অস্থায়িত্ব মেনে নেওয়া — অনেকেই প্রাইভেট চাকরিকে “নিরাপদ নয়” জেনেই চুপচাপ সয়ে যান।
৪. মিডিয়ার নির্লিপ্ততা — আন্দোলন বা রাজনৈতিক উত্তেজনা না থাকলে সেই খবর “TRP” পায় না।
সত্যিকারের গল্পের প্রতিচ্ছবি:
“আমি একটা স্কুলে ইংরেজি পড়াতাম। হঠাৎ একদিন জানানো হলো—‘আমরা একজন নবীন শিক্ষক নিচ্ছি, যিনি কম বেতন নেবেন।’ বুঝে গেলাম, যোগ্যতার মূল্য নয়—এখানে দাম দেয় সস্তায় পাওয়াকে।”
— মৈনাক ধর, প্রাক্তন শিক্ষক, কলকাতা
চাকরি হারানো শুধু অর্থের ক্ষতি নয়—এটা স্বপ্নভঙ্গ, সামাজিক অপমান, আত্মসম্মানের ভাঙন।
সরকারি চাকরি হারানো যেমন আন্দোলনের দাবিদার,
তেমনি প্রাইভেট চাকরি হারানো মানুষগুলোর প্রতিও সহানুভূতি, সমর্থন এবং ন্যায়ের দরকার আছে।
তাদের কান্না সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ড হয় না বলে, কষ্টটা কম নয়।
তাদের গল্পগুলো চুপচাপ, তবে বুকচিরে ওঠা বাস্তব।
যারা সরকারি চাকরি হারিয়ে আজ রাজপথে কাঁদছেন, তারা যেন ভয়কে জয় করে প্রাইভেট জগতের দিকে তাকাতে শিখুন। কারণ লড়াই থামালেই অন্ধকার, কিন্তু অন্য দরজা খোলার সাহস থাকলেই ফেরে জীবনের আলো।