12/11/2020
|| সোভিয়েতের ধর্ম ||
ধর্মের নাগপাশ আর কুসংস্কার থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করার কাজে হাত দিয়েছিল সদ্যোজাত সোভিয়েত। অর্থোডক্স খ্রিস্টধর্ম বা ইসলাম যাইহোক না কেন, ধর্ম ছিল দীর্ঘদিন মানুষকে শোষণ করার হাতিয়ার। আর ধর্মীয় নিপীড়ন-বঞ্চনা, তা তো চলে মানুষের অজান্তে, মানুষের বুঝে ওঠার আগেই। নতুন রাষ্ট্র কিন্তু ভীষণ সংবেদনশীল কাজটা সম্পাদন করল ধর্মচর্চার অধিকার না কেড়েই, রাষ্ট্রীয় ফতোয়া জারী না করেই। হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা মানুষের বিশ্বাস একদিনে পরিবর্তন করে ফেলা জায় না, অথচ তাই বলে সেটা ছেড়ে রাখারও পক্ষপাতী ছিল না সোভিয়েত। ধৈর্য্যের সাথে মৌলিক পন্থায় কাজটা সম্পাদন করার প্রচেষ্টা তারা নিয়েছিল। ধর্মাচরণ করার অধিকারের পাশাপাশি যে ধর্মচর্চা করতে চায় না, তাকে সরকারি নিরাপত্তা প্রদান মারফৎ তার ধর্মচর্চা না করার অধিকারও যাতে সুরক্ষিত থাকে, তা রাষ্ট্র নিশ্চিত করল। আজ ১০০ বছর পরেও শুধু ভারতীয় উপমহাদেশে কেন, গোটা বিশ্বে নাস্তিকদের লাঞ্ছিত হতে হয়, খুন হয়ে যেতে হয় ধার্মিকদের হাতে। আর রাষ্ট্র এই অমানবিক ঘটনাগুলিকেই স্বীকৃতি দেয়। উল্টে মানবতাবাদী নাস্তিকদেরই চোখ রাঙায় পুলিশ।
সোভিয়েত চার্চ থেকে রাষ্ট্রকে পৃথক করেছিল। ধর্মীয় খাতে সরকারি ব্যয়বরাদ্দ নিষিদ্ধ করেছিল। আর জোর করে মানুষের থেকে ধর্মের নামে টাকা আদায়ের পথও বন্ধ করেছিল। চার্চের উৎপাদনশীল সম্পত্তি জাতীয়করণ করে- আর বাকি পাঁচটা ভূ-সম্পত্তির মত মঠ ও গির্জার ভূ-সম্পত্তি কৃষক প্রতিনিধিদের হস্তান্তর করেছিল। মাথায় রাখার বিষয়, সে সময় ৭৫ লক্ষ একর উর্বর জমি ছিল এরকম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে। ব্যাপারটা আমাদের দেশের দেবত্র সম্পত্তির মত। এই বিপুল পরিমাণ জমিতে নামমাত্র পারিশ্রমিকে অথবা বিনা পারিশ্রমিকে বাধ্যতামূলকভাবে চাষ করিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী আর পাঁচটা রাজা-সামন্তপ্রভুর মত তা কুক্ষিগত করেছে গির্জা, চার্চ, মঠগুলো। এছাড়াও অসুস্থতা, বাচ্চা না হওয়া, চাষ না হওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদির সময় কুসংস্কারাচ্ছন্ন নিরুপায় মানুষগুলোর থেকেও বিপুল অর্থ উপার্জন করত ধর্মস্থানগুলো। অথচ সেই অর্থ কোনো জনকল্যাণে ব্যবহৃত হত না। কৃষি উদ্বৃত্ত থেকে যা আয় হত, তা ব্যবহৃত হত না কৃষকের শ্রম লাঘব করার জন্য কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়নে বা গবেষণায়; ভারতবর্ষেও হাজার হাজার বড় বড় মন্দির আর মন্দিরের বিপুল বহুমূল্য সম্পত্তি (ধরা যাক সোমনাথ মন্দির, একটা মন্দিরই নাকি ১৭ বার লুট হয়েছিল, মানুষের শ্রমকে নিংড়ে নিয়ে তৈরি কি বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি জমা ছিল তাহলে ভাবুন) কিংবা ধরা যাক পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটা, তাজমহল সবই গড়ে উঠেছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী গরিব কৃষিজীবী মানুষের রক্তশোষণ ক’রে। রাশিয়ারও চমৎকার দেখতে সব মঠ, গীৰ্জা, চার্চ, মসজিদ গড়ে ওঠার পিছনের ইতিহাসটা এমনই নিষ্ঠুর। সাধারণ হিসেব বলে মানুষেরই শ্রমে গড়ে ওঠা সম্পদের মালিকানাটা সাধারণ মানুষেরই হওয়া উচিত। আর সেটাই প্রতিষ্ঠা করেছিল সোভিয়েত।
কেবলমাত্র ভবন আর ধর্মীয় কাজের জন্য যে সকল বস্তুর প্রয়োজন তার বন্দোবস্ত করা হল। তার ওপর সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ধর্মের নামে চাঁদা বা কর সংগ্রহকে নিষেধ করেছিল ডিক্রি। ধর্মপ্রতিষ্ঠান আরও একটি বিশেষ ক্ষমতা সৃষ্টি করেছিল- সামাজিক নীতি-নৈতিকতা প্রণয়ন, বিচার আর শাস্তি প্রদান। কোনো লিখিত বিধানের বদলে চলত ক্ষমতার চরম অপব্যবহার আর স্বাভাবিকভাবেই সমস্ত ফয়সালা হত বড়লোকদের, সমাজকর্তাদের পক্ষে। সোভিয়েত এই বিশেষ ক্ষমতাটিরও অবসান ঘটালো। দেখুন, ধর্ম যদি আধ্যাত্মবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে তাকে কলুষিত করত ধর্মের আচ্ছাদনে ঢাকা তথাকথিত ধার্মিকদের সম্পত্তির প্রতি লোভ আর বিধান দেওয়ার নামে ধর্মস্থানকে ষড়যন্ত্রের কুটিল আখড়ায় পরিণত করে ফেলা। তাহলে বলতে হয়, সোভিয়েত এই দুটোকে অপসারিত করে প্রকৃত আধ্যাত্মিক চর্চার ক্ষেত্র তৈরী করেছিল ধর্মের স্থানকে। কিন্তু তথ্য বলে অন্য কথা। তথ্য বলছে, অর্থের লালসা মেটার পথ বন্ধ হওয়ায় বেশিরভাগ ‘ধার্মিক’ ধর্মস্থান ত্যাগ করে চলে গেল, এক দশকের মধ্যে ৫৪ হাজার চার্চের অর্ধেকই ভগ্নদশা প্রাপ্ত হয়।
আরো ঘোষিত হল
১. প্রজাতন্ত্রের চৌহদ্দির মধ্যে বিবেকের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ ক’রে বা সীমাবদ্ধ ক’রে কোন স্থানীয় আইন বা বিধি প্রণয়ন অথবা বিশেষ কোনো বিশ্বাসের বশবর্তী হওয়ার কারণে নাগরিকদের বিশেষ অধিকার বা সুবিধা প্রদান নিষিদ্ধ ঘোষিত হল।
২. সরকারি বা আধা সরকারি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানগুলোতে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা রীতিনীতি পালন করা হবে না।
৩. কারোর নিজস্ব ধর্মবিশ্বাসের কারণে কেউই তার নাগরিক কর্তব্য পালন করতে অস্বীকার করতে পারবে না। গণআদালতের বিশেষ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই বিধানটির ব্যতিক্রম ঘটতে পারে, তবে সেই দায়িত্বটি অন্য একটি দায়িত্ব দ্বারা প্রতিস্থাপিত হবে।
৪. ধর্মীয় শপথ গ্রহণ অবলুপ্ত হল। প্রয়োজনে যথাবিহিত প্রতিশ্রুতিই যথেষ্ট।
৫. বিবাহ ও জন্মের নিবন্ধন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষই কেবলমাত্র সমস্ত নাগরিক আইনগুলি সম্পাদন করবে।
৬. প্রাইভেট সমিতি ও সংগঠনগুলি যে আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, চার্চ ও ধর্মীয় সমিতিগুলি সেই একই আইনের অধীন।
৭. চার্চ এবং ধর্মীয় সমিতিগুলির নিজস্ব সম্পত্তির স্বত্ত্বাধিকার নেই। বৈধ ব্যক্তিস্বত্ত্বার অধিকার তাদের নেই।
৮. প্রত্যেক নাগরিকের কোনো ধর্মগ্রহণ বা আদৌ কোনো ধর্মগ্রহণ না করার অধিকার আছে। কোনো নির্দিষ্ট বিশ্বাস অনুসরণ করার ক্ষেত্রে অথবা না করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সমস্ত আইনী বাধা বিলোপ করা হল। দ্রষ্টব্যঃ সরকারি আইনে নাগরিকের বিশ্বাস সম্পর্কে কোনোরূপ উল্লেখ থাকবে না।
৯. যতক্ষণ পর্যন্ত না রুশ প্রজাতন্ত্রের নাগরিকদের অধিকারে হস্তক্ষেপ করছে অথবা আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ধর্মীয় কার্যকলাপ অবাধে পালন করা যেতে পারে।
১০. চার্চ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির অধিকৃত সম্পত্তি অতঃপর জনগণের সম্পত্তি (হিসেবে বিবেচিত হবে)। ভবন ও যেসকল বস্তু ধর্মীয় কাজের জন্য প্রয়োজন, তা কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সোভিয়েতগুলির সঙ্গে বিশেষ বন্দোবস্তের মাধ্যমে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে স্বাধীন ব্যবহারের জন্য ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
১১. নাগরিকরা ব্যক্তিগতভাবে ধর্মীয় বিষয় অধ্যয়ন বা শিক্ষাদান করতে পারে।
অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন মানুষের ধর্মাচরণের ব্যক্তিগত অধিকারে হস্তক্ষেপ করেনি, এবং ধর্মীয় প্রচারেও বাধানিষেধ আরোপ করেনি। শুধু এই ডিক্রীগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্রকে চার্চ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। অচিরেই দেখা গেল, হাজার হাজার মঠ, চার্চ, মসজিদ পরিত্যক্ত ও ভগ্নদশাপ্রাপ্ত হল। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল শিক্ষাব্যবস্থার থেকে চার্চকে পৃথক করা। বিদ্যালয়গুলোতে ধর্মাচরণ ও ধর্মীয় শিক্ষা বন্ধ করা হল। ভবিষৎ নাগরিকদের বিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তিবাদী মানসিকতা আর মুক্তমনা গড়ে তোলার জন্য এটা ছিল একটা ভীষণ জরুরী পদক্ষেপ। খুব যত্ন নিয়ে শিশুদের সুখপাঠ্য, সাহিত্য-ইতিহাস-বিজ্ঞান ইত্যাদির স্কুল পাঠ্যপুস্তক রচনার কাজটা সম্পাদন করেছিল নতুন রাষ্ট্র। যার ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাই পরবর্তীকালে রাশিয়ায় তাত্ত্বিক বিজ্ঞানচর্চায় এবং প্রযুক্তিতে অসাধারণ সব সাফল্য। অথচ দেখুন ভারতীয় উপমহাদেশের বিজ্ঞানেও আরোপিত হয়ে আছে মুনাফালোভী পুঁজিপতিদের স্বার্থের শিকল আর ধর্মীয় মৌলবাদীদের বিজ্ঞানকে ধর্মীয় তত্ত্বের কানাগলিতে টেনে নিয়ে আসার নিরলস চক্রান্ত। আর সোভিয়েত প্রথমেই এই দুটি শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিয়েছিল বিজ্ঞানকে, কেননা বিজ্ঞান তার নিজের পথে চলতে পারলেই সে আচার সংস্কার চূর্ণ ক’রে মানুষকে প্রকৃত মুক্তি দিতে পারে। পার্থিব জারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর যেমন ধর্মের আর্থিক শোষণ থেকে মুক্তি দিয়েছিল সোভিয়েত, তেমনি ঐশ্বরিক জারকে সিংহাসনচ্যুত করে মানুষকে ধর্মের কথাটিও ভোলেনি। ১৯২২ সালে তৈরী হয় 'লীগ অফ মিলিটান্ট এথেইস্ট'। প্রচুর বিজ্ঞানের বই পুস্তিকা অনুবাদ করেছিল নতুন নতুন লিখেছিল। লিফলেট, পোস্টার সহ কুসংস্কারগুলোর অযুক্তি কথা ব্যাখ্যা করত। ধার্মিকদের পরিত্যাগ করে যাওয়া মঠ, গীর্জায় বানানো হল নাস্তিক মিউজিয়াম। সেখানে চিত্র সহযোগে প্রদশিত হত ধর্মের মাতব্বরদের অন্যায়ভাবে আয়ের পন্থা, যাজকদের অত্যাচার ও শাস্তিদানের বিবরণ। চিত্র সহযোগে ব্যাখ্যা করা হত- ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত, সূর্যগ্রহণ, জোয়ারভাটার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
লেখা - শোভন
ডিজাইন - বাপ্পাদিত্য
নভেম্বর বিপ্লবের প্রাপ্তি - পর্ব ৬ (সোভিয়েতের ক্রীড়া) :
https://www.facebook.com/108856240561653/posts/373122404135034/