06/01/2026
শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যা – কী করবেন?
বাদল সৈয়দ
(এক)
ছোটোবেলায় স্কুলে এক বন্ধু ছিল। নাম রশিদ। ওর একটা সমস্যা ছিল—তা হচ্ছে, ও কিছু করতে বলা হলে সহজে তা বুঝত না।
দীপক স্যার ক্লাসে অঙ্ক করাতেন। এসেই বলতেন—
‘পাটিগণিতের দশ নাম্বার পাতা খোল।
১, ২, ৪ নাম্বার অঙ্ক কর।
পরিষ্কার করে লিখবি।’
আমরা সবাই অঙ্ক করতাম, কিন্তু রশিদ দশ নাম্বার পাতা বের করে চুপচাপ বসে থাকত। স্যার বিরক্ত হয়ে বলতেন—‘কি রে, তুই বসে আছিস কেন?’
রশিদ অসহায় কণ্ঠে উত্তর দিত—‘স্যার, এখন কী করব?’
শিশুরা মাঝে মাঝে খুব নিষ্ঠুর হয়। আমরা রশিদের ব্যাপারটি নিয়ে হাসাহাসি করতাম। তাকে ডাকতাম, ‘হাবলা’।
পরিণত বয়সে এ ঠাট্টার জন্য খুব খারাপ লাগে।
এখন বুঝি—রশিদের বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যা ছিল। সাইকোলজির ভাষায় একে বলা হয়—ইন্টেলেকচুয়াল ডিজঅ্যাবিলিটি।
স্যার একসাথে তিনটি আদেশ দিতেন। সেগুলো হচ্ছে—
১। পাটিগণিতের দশ নাম্বার পাতা খুলতে হবে।
২। ১, ২, ৪ নাম্বার অঙ্ক করতে হবে।
৩। পরিষ্কার করে লিখতে হবে।
রশিদ ইন্টেলেকচুয়াল ডিজঅ্যাবিলিটির কারণে তিনটি আদেশ একসাথে প্রসেস করতে পারত না। সেজন্য শুধু বই খুলে বসে থাকত—এরপর কী করতে হবে, তা বুঝত না।
রশিদের মতো ইন্টেলেকচুয়াল ডিজঅ্যাবিলিটিতে ভোগা প্রচুর শিশু আমাদের চারপাশে আছে।
তাদের অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে এ লেখা।
(দুই)
লক্ষণ—
(ক) ০–৫ বছর বয়স
১) বয়স অনুযায়ী কথা শুরু করতে দেরি করা। তিন-চার বছর বয়সেও দু/তিনটি শব্দের বাক্য বলতে না পারা।
২) একই কথা বারবার শুনলেও বুঝতে দেরি করা।
৩) বসা ও হাঁটা দেরিতে শেখা।
৪) নিজে খাওয়া ও জামা পরতে শিখতে দেরি করা।
৫) ডাকলে সাড়া কম দেওয়া।
(খ) ৬–১১ বছর বয়স
১) অক্ষর/সংখ্যা শিখতে কষ্ট হওয়া।
২) বহুবার পড়েও মনে রাখতে না পারা।
৩) কয়েকটি কথা একসাথে বললে বুঝতে না পারা (রশিদের এ সমস্যা ছিল)।
৪) বন্ধু বানাতে না পারা।
৫) হাসি-ঠাট্টা না বোঝা।
(গ) ১২–১৮ বছর
১) সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাওয়া বা ভুল করা।
২) টাকা-পয়সার হিসাব না বোঝা।
৩) সহজেই অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া—ব্যবহৃত হওয়া।
তবে দয়া করে একটি উদাহরণ মিলে গেলে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবেন না যে, বাচ্চার বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যা আছে। বয়স অনুযায়ী একাধিক সমস্যাই কেবল এ সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
(তিন)
মা-বাবারা কী করবেন?
প্রথম কথা হচ্ছে—ঘাবড়াবেন না।
এরকম সমস্যা যে শুধু আপনার বাচ্চার হয়েছে, তা নয়—আরও অনেকের হয়েছে, এবং তারা জীবনে খুব ভালো উন্নতিও করেছে।
এক্ষেত্রে আপনি যা করবেন, তাহলো—
১। ভাবুন—‘আমার বাচ্চা অন্যদের মতো নয়—কিন্তু আমি ওকে ওর মতো করে বড় করব।’
২। শিশুমনোবিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন। এটা যত আগে শুরু করবেন, তত ভালো। দয়া করে এর-তার পরামর্শে টোটকা চিকিৎসা করাবেন না।
৩। কুসংস্কারাচ্ছন্ন আচরণ করবেন না। এটা আপনার শিশুর সর্বনাশ ডেকে আনবে। বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা করান।
৪। ওকে শেখানোর ধরন পালটে ফেলুন—একেবারে অনেক কিছু না শিখিয়ে ধাপে ধাপে শেখান।
রিপিট করে শেখান।
ছবি এঁকে বা হাতেকলমে দেখিয়ে শেখান।
যেমন—দাঁত মাজা শেখাবেন?
কথায় না বলে নিজে দাঁত মেজে শেখান। দেখবেন, ও খুব দ্রুত শিখছে।
৫) বিরক্ত হবেন না। তাহলে ও ঘাবড়ে যাবে।
ধীরে কথা বলুন।
প্রশ্ন ছোট রাখুন।
উত্তর দিতে সময় দিন।
মোদ্দা কথা—আপনার প্রশ্ন ওকে প্রসেস করতে সময় দিন।
দীপক স্যার রশিদকে খুব সুন্দর করে বোঝাতেন, কী করতে হবে। সে কিন্তু পরে অঙ্কগুলো ঠিকই করে ফেলত। আপনার সন্তানও পারবে।
৬) সম্ভব হলে ওর জন্য ফ্রেন্ডলি স্কুল খুঁজে বের করুন। যেখানে ওকে নিয়ে কেউ ঠাট্টা করবে না। সেটা পাওয়া না গেলে ওর শিক্ষকদের সাথে কথা বলে সাহায্য চান।
৭) ওর শক্তির জায়গাটি বের করুন। দেখবেন, ও কিছুতে না কিছুতে ভালো।
হয়তো ভালো আঁকে,
ভালো গায়,
ভালো ছড়া লেখে।
ওর এ শক্তিকে কাজে লাগান। এটা দিয়েই ও হিরো হবে। দয়া করে এসব কাজে বাধা দেবেন না।
৮) ওর সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিন।
ওকে—
বন্ধু বানাতে উৎসাহ দিন।
সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়ে যান।
বিভিন্ন খেলাধুলায় অংশ নিতে উৎসাহ দিন।
‘না’ বলতে শেখান।
গুড টাচ–ব্যাড টাচ সম্পর্কে ধারণা দিন।
৯) ভুলেও মারধর করবেন না। ভুল করলে আদর করে বুঝিয়ে বলুন। কোনো কিছু না পারলে আবার চেষ্টা করার উৎসাহ দিন। মারধর মানে ওর সর্বনাশ করলেন।
১০) এ লড়াইয়ে একা থাকবেন না। বিশ্বস্ত আত্মীয়স্বজন বা এ ধরনের শিশুদের জন্য নিবেদিত কোনো সংগঠনের সাহায্য নিন।
বুদ্ধিমত্তার এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা কঠিন, কিন্তু সঠিক যত্ন ও শিক্ষার মাধ্যমে শিশুর দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব।
আপনি সে চেষ্টাই করুন—দেখবেন, আপনার বাচ্চা এ সমস্যা থাকার পরও ভালো করবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার—
আমার এ লেখা পড়ে শিশুর মধ্যে নিজে নিজে এসব লক্ষণ আবিষ্কার করবেন না। প্রতিটি শিশুর কিছু সমস্যা থাকে। শুধুমাত্র কয়েকটি লক্ষণ একত্রে দেখা গেলেই ব্যবস্থা নেবেন। তবে সবার আগে ডাক্তারের কাছে যাবেন—নিজে উপসংহারে পৌঁছাবেন না।
আমাদের সন্তান থাকুক দুধে-ভাতে। তারা আয়ুষ্মান হোক—মহৎ হোক।
পাদটীকা:
১. ইন্টেলেকচুয়াল ডিজ্যাবিলিটি আর অটিজম পুরো ভিন্ন সমস্যা—দয়া করে দুটোকে গুলিয়ে ফেলবেন না।
২. রশিদ ক্লাস এইটের পর রংপুর চলে গিয়েছিল। আর যোগাযোগ হয়নি। যদি এ লেখা তার চোখে পড়ে, ছোটবেলার আচরণের জন্য ক্ষমা চাইছি।
৩. আমি চিকিৎসক নই। অভিজ্ঞতা ও সামান্য পড়াশোনা থেকে লিখলাম।
শুভ কামনা রইলো।
(লেখাটি শেয়ার করা যাবে)
সরওয়ার স্যার
Sarwar Sir English Blog
Sarwar Golam