13/01/2025
আমাদের প্রিয় স্কুল রুদ্রপুর রাধাবল্লভ হাইস্কুল শতবর্ষে পদার্পণ করলো। ভাবা যায়! সুদীর্ঘ শতবর্ষের ইতিহাস জুড়ে আছে এই স্কুলের সঙ্গে। একটা স্কুল শুধু ইঁট-কাঠ-সিমেন্ট-বালি-পাথর দিয়ে তৈরি হয় না। এর সাথে মিশে থাকে ছাত্রছাত্রীদের হাসি-কান্না , আনন্দ, উচ্ছাস, পরীক্ষার টেনশন, রেজাল্টের টেনশন, পরীক্ষা ভালো হওয়ার উচ্ছাস, খারাপ হওয়ার দুঃখ, স্কুলে তাড়াতাড়ি এসে পছন্দের জায়গায় বসা, বন্ধুর জন্য জায়গা রাখা, ক্লাশের সময় স্যার/ম্যাডামের চোখ ফাঁকি দিয়ে খুনসুটি, টিফিন পিরিয়ডে খেলাধুলার হুটোপুটি, ভাগ করে টিফিন খাওয়ার আনন্দ, স্কুল গেটের পাশে দোকানের ঝালমুড়ি,আলুকাবলি, ঘুগনি, খাওয়া, স্কুল শেষ হলে দৌড়াদৌড়ি করে বেরোনো, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের স্নেহমাখানো শাসন, কখনো গুরুগম্ভীর, কখনো স্নেহময় চাহনি, পড়া না পারলে শাস্তি, পড়া পারলে সস্নেহে পিঠ চাপড়ানো, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক শিক্ষিকা সবার সম্মিলিতভাবে স্কুলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নিরলস চেষ্টা ইত্যাদি ইত্যাদি। এই এ্যাত্তো কিছু মিলেমিশে তৈরি হয় একটা স্কুল। একটু আবেগের সাথে খুঁজলে দেখা যাবে স্কুলের ইঁট-কাঠ-পাথরের খাঁজে খাঁজে মিশে আছে প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রছাত্রীর হাসি-কান্না, আবেগ উচ্ছাস। প্রথম যেদিন আমরা স্কুলে ঢুকি সেদিন মনখারাপ নিয়ে ঢুকি, আবার যেদিন স্কুল ছেড়ে চলে যাই সেদিনও মন খারাপ নিয়েই যাই।
যেদিন উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টটা হাতে নিয়ে স্কুলের গেটটা পেরিয়ে এলাম, হঠাৎ করেই মনটা ভারী হয়ে গেছিল। মনে হলো, 'যাঃ! এতদিনের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল? আর তো এই গেট পেরিয়ে আসা হবে না। যদিও আসি , সেটা আর আগের মত থাকবে না। ছাত্র হিসেবে আর এই স্কুলে আসা হবে না। এখন থেকে এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র হয়ে গেলাম।' পরপর অনেকগুলো দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে আসলো , ঠিক সিনেমার মতো। মনে হলো,'এই তো সেদিন এই গেট দিয়ে ঢুকলাম। এই তো এখানে বসতাম। এখানে রোজ প্রার্থনা করতাম।' প্রথমদিন যে গেট, যে পাঁচিল উঁচু মনে হচ্ছিল, আজ আর অত উঁচু মনে হচ্ছে না, চুপিচুপি কখন যেন বড় হয়ে গেছি।
তারপর একে একে বন্ধুবান্ধবরা জীবন সংগ্রামে নেমে একেকজন একেক দিকে চলে গেছি। যাদের সাথে রোজ দেখা না হলে চলতো না, তাদের সাথে এখন মাসে একবারো দেখা হয় না। কয়েকজনের সাথে তো অনেক বছর দেখা হয় নি। কারোর সাথে হয়তো শুধু ফোনেই যোগাযোগ আছে, দেখা আর হয়ই না। আমার ক্লাশের শুধু দুজন এই স্কুলে ফিরে আসতে পেরেছে শিক্ষক-শিক্ষিকা হিসাবে। জানিনা ওদের কেমন লাগে এই স্কুলে এভাবে ফিরতে পেরে।
সবশেষে আমার এই স্কুলের বর্তমান ছাত্রছাত্রীর প্রতি কিছু কথা বলব।তোমরা এখন ভাবতেও পারবে না যে কি দারুন সময়ের মধ্যে দিয়ে তোমরা যাচ্ছ। সারা জীবনের মধ্যে সবচেয়ে সেরা সময় এই স্কুল জীবন। আমরাও তখন বুঝিনি। আজ জীবনের এতগুলো বছর কাটিয়ে, বিভিন্ন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে, এই পর্যায়ে এসে বুঝতে পারি যে ঐ স্কুলের সময়টাই খুব ভালো ছিল। স্কুলজীবনে টেনশন তো আছেই, কিন্তু বাস্তবজীবনে টেনশন আরো বেশি। তাই চেষ্টা করো এই সময়টাকে ভালোভাবে কাজে লাগানোর। আর একটা অনুরোধ তোমাদের করবো, পড়াশোনাটা মন দিয়ে কোরো। জানি পড়াশোনা করতে ভালো লাগে না, আমারো ভালো লাগতো না, কিন্তু কি করা যাবে বলো? পড়াশোনা না করে উপায় নেই। এখন পড়াশোনা করে নিলে কষ্ট কম, বয়সটা পেরিয়ে গেলে তখন পড়াশোনা অনেক কষ্ট। আর পড়াশোনা মানে শুধু ঘাড় গুঁজে ক্লাশের বই পড়া নয়, বিভিন্ন গল্পের বই, জেনারেল নলেজ, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এর বইও পড়তে হবে। এটা আমার উপদেশ নয়, অনুরোধ । আর একটাই বিশেষ অনুরোধ তোমাদের কাছে রাখবো যে জীবনে এমন কিছু ভালো কাজ কোরো যাতে করে এই স্কুল ও তোমার পরিবার তোমাকে নিয়ে গর্ব করতে পারে। ব্যাস এই পর্যন্তই। সবাই ভাল থেকো।
বড়দের প্রণাম, ছোটদের স্নেহ,আশীর্বাদ ও বন্ধু-বান্ধবদের ভালোবাসা জানিয়ে লেখাটা শেষ করছি।
কলমে: Dr. Swarnavo Gain (MP Batch: 2004)