09/09/2026
শিক্ষকের রক্তাক্ত মুখ, সমাজের বিবেকের প্রশ্ন-----
চন্দন হালদার।
“যে সমাজে শিক্ষক নিরাপদ নন, সেই সমাজের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ?”
জলপাইগুড়ির একটি প্রাচীন বিদ্যালয়ে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আমাদের সকলকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। শিক্ষক দিবসের আবহ কাটতে না কাটতেই একজন প্রধান শিক্ষককে ঘিরে ছাত্রদের সঙ্গে সংঘাত, মারধর এবং বিদ্যালয় চত্বরে উত্তেজনার যে ছবি সামনে এসেছে, তা শুধু একটি স্কুলের ঘটনা নয়। এটি আমাদের শিক্ষা, মূল্যবোধ, পরিবার এবং সামগ্রিক সামাজিক পরিবেশ নিয়ে এক কঠিন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
একটি বিদ্যালয় শুধু ইট-পাথরের একটি বাড়ি নয়। সেখানে শিক্ষক জ্ঞান দেন, ছাত্র মানুষ হয়ে ওঠে। একজন শিক্ষক কেবল বই পড়ান না, তিনি শৃঙ্খলা, বিবেক, সহনশীলতা এবং মানবিকতার পাঠও দেন। অথচ সেই বিদ্যালয়ের মাটিতেই যদি শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক সংঘর্ষে পরিণত হয়, যদি রাগের বশে হাত ওঠে, যদি প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে হিংসা, তাহলে আমাদের থমকে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতেই হয়—আমরা আসলে আমাদের সন্তানদের কী শেখাচ্ছি?
অন্যায় হলে প্রতিবাদ অবশ্যই করতে হবে। কোনও শিক্ষক যদি অন্যায় করেন, ছাত্রকে অপমান করেন, শারীরিকভাবে আঘাত করেন বা প্রশাসনিক অনিয়ম করেন, তার বিরুদ্ধে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা উচিত। তদন্ত হওয়া উচিত। দোষ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তিও হওয়া উচিত।
কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরেকটি অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া যায় না।
কোনও অভিযোগের বিচার করার অধিকার ছাত্রের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। বিদ্যালয় আদালত নয়, আর শিক্ষককে মারধর করে বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আজ যদি ছাত্ররা শিক্ষককে মারধর করাকে স্বাভাবিক বলে মনে করে, আগামীকাল সেই একই হিংসা সমাজের অন্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়বে।
এখানেই আসে পরিবারের ভূমিকা।
একটি শিশু জন্ম থেকেই হিংস্র হয় না। তার আচরণের পেছনে পরিবার, পরিবেশ, বন্ধুমহল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মূল্যবোধ এবং বড়দের আচরণের গভীর প্রভাব থাকে। সন্তান যখন দেখে, “ক্ষমতা থাকলে জোর করে নিজের কথা আদায় করা যায়”, তখন সে সেই শিক্ষাই গ্রহণ করে।
আমরা সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করাই, দামি বই কিনে দিই, ভালো ফল করার জন্য চাপ দিই। কিন্তু তাকে কি যথেষ্ট শেখাই—বয়োজ্যেষ্ঠকে সম্মান করতে? মতের অমিল হলে যুক্তি দিয়ে কথা বলতে? রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে? ভুল করলে ক্ষমা চাইতে? অন্যায় দেখলে আইনসম্মত পথে প্রতিবাদ করতে?
শুধু পরীক্ষার নম্বর দিয়ে শিক্ষিত হওয়া যায়, মানুষ হওয়া যায় না।
তাই এই ঘটনায় শুধু ছাত্রদের দিকে আঙুল তুলে থেমে গেলে চলবে না। শিক্ষকের আচরণও যদি প্রশ্নের মুখে থাকে, তারও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কারণ শিক্ষকও মানুষ, তাঁরও দায়িত্ব আছে। ছাত্রকে শাসন করার অধিকার থাকলেও অপমান বা শারীরিক নির্যাতনের অধিকার কারও নেই।
একইভাবে ছাত্রেরও অধিকার আছে সম্মান পাওয়ার, কিন্তু সেই অধিকার কখনও শিক্ষককে মারধর করার লাইসেন্স হতে পারে না।
শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক ক্ষমতার নয়, বিশ্বাসের।
আজ সেই বিশ্বাসের জায়গাটিই যেন ক্রমশ ক্ষয়ে যাচ্ছে।
আর সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হল, আমরা অনেক সময় এই ধরনের ঘটনাকে কেবল একটি “ভাইরাল ভিডিও” হিসেবে দেখি। কয়েকদিন আলোচনা করি, সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করি, তারপর ভুলে যাই।
কিন্তু প্রশ্নটা থেকে যায়—
আমাদের সন্তানরা কোন সমাজে বড় হচ্ছে?
যেখানে কথার বদলে হাত ওঠে, যুক্তির বদলে হিংসা আসে, সম্মানের বদলে অপমান স্বাভাবিক হয়ে যায়, সেখানে শুধু শিক্ষক নয়, শেষ পর্যন্ত সমাজের প্রত্যেক মানুষই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে।
এই কারণেই জলপাইগুড়ির ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের প্রতিবাদ শুধু একজন শিক্ষককে মারধরের বিরুদ্ধে নয়; আমাদের প্রতিবাদ শিক্ষাঙ্গনে হিংসার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে।
আমাদের প্রতিবাদ সেই পরিবারগুলির বিরুদ্ধেও, যারা সন্তানের ভুলকে ভুল বলে স্বীকার করতে শেখায় না।
আমাদের প্রতিবাদ সেই সামাজিক মানসিকতার বিরুদ্ধে, যেখানে নিজের পক্ষের অন্যায়কে আমরা “ভুল বোঝাবুঝি” বলে ঢেকে দিই, আর অন্যের অন্যায়কে “অপরাধ” বলে চিৎকার করি।
তবে প্রতিবাদ মানে অন্ধ পক্ষপাত নয়।
সত্য সামনে আসুক। তদন্ত হোক। যার দোষ, তার শাস্তি হোক। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হোক।
কারণ একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক যখন দাঁড়িয়ে পড়ান, তখন তাঁর সামনে শুধু কয়েকজন ছাত্র থাকে না। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকে একটি প্রজন্ম, একটি ভবিষ্যৎ।
সেই ভবিষ্যৎ যদি সম্মান করতে না শেখে, তবে আমাদের সমস্ত শিক্ষা, সমস্ত উন্নয়ন, সমস্ত সাফল্যই একদিন প্রশ্নের মুখে পড়বে।
আজ তাই আমাদের প্রত্যেক অভিভাবককে নিজের সন্তানকে একটি কথা শেখাতে হবে—
“তুমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, কিন্তু অন্যায় করে নয়।
তুমি প্রতিবাদ করবে, কিন্তু হিংসা দিয়ে নয়।
তুমি প্রশ্ন করবে, কিন্তু অসম্মান করে নয়।
আর মনে রাখবে, শিক্ষককে সম্মান করা মানে অন্ধভাবে সবকিছু মেনে নেওয়া নয়; আর শিক্ষকের ভুলের প্রতিবাদ করা মানে তাঁকে অপমান বা আঘাত করা নয়।”
সমাজকে সুস্থ করতে হলে প্রথমে আমাদের ঘরকে সুস্থ করতে হবে।
পরিবারকে মূল্যবোধের বিদ্যালয় বানাতে হবে।
বিদ্যালয়কে আবার জ্ঞান ও মানবিকতার নিরাপদ আশ্রয় করতে হবে।
কারণ শিক্ষককে রক্ষা করা মানে শুধু একজন মানুষকে রক্ষা করা নয়;
একটি প্রজন্মের সামনে সভ্যতার শেষ সীমারেখাটুকু রক্ষা করা।
আর যে সমাজ সেই সীমারেখা মুছে ফেলে, সে সমাজ একদিন নিজের সন্তানদের কাছেই নিরাপত্তা চাইবে।
জলপাইগুড়ির ঘটনা তাই শুধু একটি খবর নয়।
এটি আমাদের সমাজের সামনে রাখা একটি আয়না।
প্রশ্ন একটাই—আয়নায় নিজেদের মুখ দেখে আমরা কি সত্যিই লজ্জিত হব, নাকি আবারও অন্যের দিকে আঙুল তুলে চলে যাব?