27/10/2021
ll শুভঙ্কর চ্যাটার্জি : কৃষ্ণনগর দেখেছিল দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন ll
কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পূজো হবে আর তাঁর নাম উঠে আসবে না এ কোনদিন হয়, না হতে পারে, না হবার যো আছে ! গতকালও একজনের মুখে শুনলাম পূজো কমিটির সাথে প্রশাসনিক বৈঠকের আগে মিটিং হলের বাইরে পূজো উদ্যোক্তাদের মুখে তাঁর নাম উঠে এসেছে বারংবার। এটাই স্বাভাবিক, এটাই কাঙ্খিত, এটাই ভালো কাজের স্বীকৃতি, একেই বোধহয় বলে অমরত্ব।
১৯৮৪। অঞ্জন চৌধুরীর শত্রু সিনেমায় মানুষ দেখেছিল সৎ, কর্তব্যে অবিচল, নির্ভীক এক পুলিশ অফিসার শুভঙ্কর সান্যালকে, যিনি কড়া হাতে করতেন দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন। তার ঠিক বছর কয়েক পরই কৃষ্ণনগর পেয়েছিল একেবারে প্রায় একই ছাঁচে ঢালা এক পুলিশ অফিসার ( ডি. এস. পি) যাঁর নাম শুভঙ্কর চ্যাটার্জি।
একজন পুলিশ অফিসারকে যে মানুষ দেবতার আসনে বসাতে পারে সে নিজে চোখে না দেখলে ও নিজ কানে না শুনলে বিশ্বাস করা মুশকিল। কৃষ্ণনগরের হারিয়ে যাওয়া ছন্দ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। পুলিশের ওপর থেকে মাতব্বরির ছড়িটি সরিয়ে নিলে তাঁরা দেশের জন্যে কি অসাধারণ কাজ করতে পারেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ শুভঙ্কর চ্যাটার্জি।
বাইরের মানুষের কেমন ধারণা ছিল কৃষ্ণনগর সম্পর্কে সেসময় ? একটি উদাহরণ দিই। আমি ১৯৯৫ সালে কলকাতা চলে যাই পড়া ও চাকরির সন্ধানে। থাকতে শুরু করি গড়িয়া স্টেশন সংলগ্ন একটি মেসে। সেই মেসের কিছু ছেলের এবং পরবর্তীতে মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভের চাকরি করার সময় আমার কলিগদের দৃঢ় ধারণা ছিল, কৃষ্ণনগরে নিশ্চয়ই আমি কোন মারাত্মক অপরাধ করে কলকাতায় এসে আত্মগোপন করেছি। ব্যথিত হলেও কৃষ্ণনাগরিক হিসেবে এই ছিল সেসময় প্রাপ্য, কারণ খবরের কাগজ ও জনশ্রুতি তাঁদের এমনি ভাবতে বাধ্য করেছিল। পরবর্তীতে ধারণা আজ পাল্টে গেছে যাঁর জন্যে তাঁর নাম শুভঙ্কর চ্যাটার্জি। আর তার যোগ্য উত্তরসূরী সুমনবাবুর কল্যানে (আরো হয়ত অনেক নামই আছে এবং থাকাই স্বাভাবিক)।
সেসময় নানা কথা শুনতাম আমরা। আদৌ তিনি বলতেন কিনা জানিনা। যেমন ঠেকে একদিন শুনলাম, শুভঙ্কর নাকি বলেছে, জগদ্ধাত্রী পূজোয় যতখুশি মদ খাও কিন্তু পা যেন একটুও না টলে। আর পা টললেই বাটাম। একথা শোনার পর আমার ধারণা অতি বড় কুছ পরোয়া নেহী মহাশয়ও মদের গ্লাস হাতে নিয়ে ঠোঁট ছোঁয়ানোর আগে একশ আটবার ভেবেছিলেন। কারণ শুভঙ্করের হাতের ব্যাটনটি ঠিক ড্রেসকোড মেইনটেইন করার জন্য ছিল না। আর সেসময় শুভঙ্করকে অনেককেই বলতে শুনেছি ভয়ঙ্কর চ্যাটার্জি।
শুভঙ্কর চ্যাটার্জি ছিলেন সৌম্য দর্শন, না আমি রূপবান শব্দটিই ব্যবহার করব। যেখানেই যেতেন ফিল্ম স্টারের মতো সব আলো শুষে নিতেন তা তাঁর পাশে যে কেউই থাকুক না কেন। তাঁকে দেখার জন্য ভিড় জমে যেত। ফিসফিসিয়ে একজন আরেকজনকে চিনিয়ে দিতেন ওই, ওইটি হলেন শুভঙ্কর। খুব কম পুলিশ অফিসারই নিজেকে করে তুলতে পেরেছেন তাঁর মতো হিরো।
গতকালই ছবিটা পাবার পর দেখিয়েছিলাম আমার এক বন্ধুকে। সে বললো, একবার তাদের বারোয়ারীর জগদ্ধাত্রী পূজোর উদ্বোধন করেছিলেন শুভঙ্কর। তাঁর হাতে কোল্ড-ড্রিঙ্কের বোতল এগিয়ে দিয়ে (অর্থাৎ শুভঙ্করের খুব কাছে পৌঁছে) ধন্য হয়েছিল ও। আমার পিতৃদেব কৃষ্ণনগর উইমেন্স কলেজের হেড ক্লার্ক থাকাকালীন কয়েকবার মুখোমুখি হয়েছিলেন তাঁর। বাড়িতে এসে আমাদের গর্বের সাথে তাঁর বিনয়ের গল্প করেছিলেন।
তাঁর আমলের আগের থেকে চলে আসা জগদ্ধাত্রী পূজোর অরাজক ভাসান বা আড়ংকে কড়া হাতে ও সুষ্ঠ পরিচালন দক্ষতায় ঐতিহ্যের কোনরূপ হানি না ঘটিয়ে বেঁধে দিয়েছিলেন নিয়মের বেড়াজালে। প্রত্যেকটি পূজো কমিটিকে বিসর্জনের দিন বেঁধে দিয়েছিলেন সময়ের ঘেরাটোপে। সেই সময়ের এক চুল এদিক ওদিক করার কথা কেউ কখনো স্বপ্নেও ভাবার সাহস দেখিয়েছেন কিনা জানা নেই। কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পূজোয় এই যে মানুষের ঢল বা অন্যদিনগুলোতেও রাত বিরেতে মানুষের অবাধ যাতায়াত তার পেছনে যাদের অবদান আছে তার প্রথমটি হবে নিশ্চিতভাবেই শুভঙ্কর চ্যাটার্জির নাম।
শুভঙ্কর চ্যাটার্জি কৃষ্ণনগর ছেড়ে চলে গেছেন। শুধু কৃষ্ণনগর কেন চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়েই। তাঁর রোড অ্যাকসিডেন্টে মৃত্যুর খবর যেদিন এসে পৌঁছল খবরের কাগজ মাধ্যমে কাউকে ঘড়ি ধরে বলতে হয়নি এক মিনিট নীরবতা পালনের কথা। কৃষ্ণনগরের মানুষ চোখে জল নিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছিলেন এমনিতেই।
নদীয়া জেলা প্রশাসনের কাছে আমার বিনীত নিবেদন জগদ্ধাত্রী পূজোর বিসর্জনের সময় আপনাদের টেন্টের নাম শুভঙ্কর চ্যাটার্জির নামে যদি করা যায় ও তাঁর একটা বড় ও স্পষ্ট ছবি যেন থাকে সেখানে টাঙানো (একবার যেন দেখেছিলাম বলে মনে হচ্ছে, স্মৃতি তো, ভুল হতেও পারে)।
বি.দ্র. : কেউ যদি তাঁর জন্ম ও মৃত্যু সাল, ও পড়াশোনা ইত্যাদি সম্পর্কে কিছু জানেন বা কারো কাছে তাঁর কোন ছবি থাকে কমেন্টে জানাতে পারেন।
চিত্র ঋণ : সঙ্গের ছবিটি শ্রী অসিত কুমার সাহা মহাশয়ের সৌজন্যে প্রাপ্ত, ঘূর্ণী স্বর্ণময়ী বিদ্যাপীঠের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সেবার প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন শুভঙ্কর চ্যাটার্জি।
কপিরাইট :Amra Krishnagar basi