18/05/2019
নির্বাচিত ৬টি অণুগল্প।
সর্বমোট গল্প জমা পড়েছিল ৬০টি। তাঁর মধ্যে থেকে ৬টি অণুগল্প নির্বাচন করা হলো। সকলেই ভালো লেখার চেষ্টা করেছেন। নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমি শুধু গল্পটিকেই মাথায় রেখেছি। বানান, বাক্যগঠন সহ অন্যান্য বিষয়গুলোকে প্রাধান্য তেমন দেওয়া হয়নি। ছোটগল্প লেখা বেশ কঠিন। অনেক কিছু অল্প কথায় লিখতে হয়। অনুগল্প লেখা আরও বেশি কঠিন। হেমিংওয়ের একটা গল্প আছে, "বাচ্চাদের এক জোড়া পুরনো জুতা বিক্রি হবে। কখনো পরানো হয়নি।" "For sale: baby shoes, never worn." কথিত আছে যে বাজি ধরে উনি এই গল্পটি লিখেছিলেন। শর্ত ছিল ৬টি শব্দের মধ্যে গল্প লিখতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করতেন---
বড়ো গল্প....মাল-বোঝাইওয়ালা।
ছোটো গল্প....বোঝা বইবার জন্যে....নয়, একেবারে সে মার লাগায় মর্মে।
আমি সেরকম কিছু 'মর্মে লাগা' গল্পের খোঁজ করছিলাম। তবু যা পেয়েছি তা মর্মে না লাগলেও ভবিষ্যতে এদের মধ্যে থেকেই বিখ্যাত গল্পকারের যে উপস্থিতি তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। গল্প নির্বাচনে কে প্রথম কে দ্বিতীয় এই ক্রমিক নিয়ম মেনে চলা হয় নি। নিচের ৬টি গল্প ভালো লেগেছে বেশি। গল্পগুলো পড়ে মনে হচ্ছিল কারুকার্য-খচিত একটি ছোট পাত্রে সমগ্র জীবন-প্রবাহের গতিবেগ তাঁরা ধরার চেষ্টা করেছেন যেখানে সমুদ্রাভিসারের ইঙ্গিতটুকু পাওয়া যাচ্ছে।
দিব্যদৃষ্টি
Mashrur Imtiaz
আজও কিচ্ছু মেলেনি- শিকার থেকে খালি হাতে ফিরছি। পাথরঘষা বল্লম, বাকলের ছাল পরা আমাদের ক্লান্তিতে পায়ের নীচের মাটির চমকাচ্ছে। জঙ্গলের পশুদের মড়কে খাবার জোটানোই কষ্ট হয়ে পড়েছে। উলটো দলের দ্বিতীয় সেরা শিকারী পাহাড়িপথে পা ফসকে ভয়াবহ রক্তারক্তি কাণ্ড। অন্যরাও বিরক্ত, তাও ওকে বয়ে আনছে রাগ চেপে। এখনো দু’দিনের পথ বাকী আমাদের গুহাগ্রামে ফিরতে, সাথের খাবারও শেষ – গুহাগ্রামের মানুষেরা বসে আছে খাবারের অপেক্ষায়। একটা জলাশয়ের ধারে এসে আমাদের শিকারী দলটা বসি। ঠিক পাশেই একটা বুনোমোষের রক্তাক্ত দেহ, ছটফটাচ্ছে! মরবে শিগগির, উপরে আকাশে মরণপাখি উড়ছে প্রবল চওড়া ডানা মেলে। ঠিক মরবে ও! আমরা থামি, ঐখানেই একটাদিন জিরোই। পরদিন দেখি শবদেহে নেমে এসেছে পালকহীন গলা-মাথার মৃত্যুদেব। ক্রমাগত ঠুকরে ঠুকরে চোখে-মুখে রক্তরঙ মেখেছে – খিদে মেটাচ্ছে, আমাদের দিকে ক্রুরচোখে তাকাচ্ছে। আমরা সভয়ে মাথা নামাই ঐশ্বরিক দৃষ্টির সামনে, দলনেতা সাহস করে চোখ তুলে দেখে - ঐ তীক্ষ্ণ চোখ একটা কী যেন বলতে চাচ্ছে!
আমরা ধীরে ধীরে, আমাদের রক্তাক্ত সঙ্গীর দিকে এগুনো শুরু করলাম - একইচোখে।
সত্যি শকুন মিথ্যে শকুন
Ashes Banerjee
বুকপকেটে; টিং! ফেসবুক আপডেট। সাহিত্যের এক গ্রুপ একটা রক্ত মাখা শকুনের ছবি টাঙিয়েছে। বীভৎস মুখ। তা নিয়ে গল্প কম্পিটিশন। যত্তসব! সকালের তাজা মুডটাই নষ্ট।
" কাকু আজ দেরী হলো যে?"
ঘাড় তুলল সুদীপ্ত। টিনা। বছর আট দশের হয়তো হবে। প্ল্যাটফর্মেই থাকে ঠাকমার সাথে। রোজই কিছু না কিছু দেয় বলে ওর কাছে এসেছে। একটা কয়েন দিয়ে সুদীপ্ত দেখে মায়াভরা মুখটার খুশি। স্টেশনের অন্যদের থেকে যেন আলাদা মেয়েটা। খুব মিষ্টি।
ম্যানেজারের ধমক, ট্রেন মিস সব সামলে মাঝরাত পার করে সুদীপ্ত নামল নিজের স্টেশনে। লাইন পেরিয়ে শর্টকাট। অন্ধকার ঝোঁপের দিকটায়
জটলা। অনেক লোক। সবার হাতেই মোবাইল ফ্ল্যাশ।
"টিং! "
ইসসস! শকুনে ছিঁড়ে খেয়েছে ছোট্ট মেয়েটাকে।
সবাই ফোনে ভরে নিচ্ছে উলঙ্গ ছোট্ট শরীর টা। সবকটাকে মনে মনে ঘৃণা ছিটিয়ে বাড়ি ফেরে সুদীপ্ত।
রাতে শোবার আগে ছাদে সিগারেট। টিং! হোয়াটস্যাপ মেসেজ। দেখামাত্র গোটা শরীর জেগে উঠলো। খুব প্রিয়। সদ্য ছিন্ন হওয়া কিশোরী যোনি। আহা! যদিও ক্রপড ছবি তবুও কয়েকটা রাত এ দিয়েই কাজ চলে যাবে। বন্ধুকে রিকোয়েস্ট করে গোটা শরীরটা দিতে। পেয়েও যায় আবদারের জিনিস।
"টিং!"
ফোন হাতেই ধরা। আবারও ফেসবুক নোটিফিকেশন। সেই গ্রুপে শকুনের ছবি নিয়ে গল্প জমা পড়ছে। একের পর এক।
ভাগাড়
Debabrata Sarkar
শহরের শেষে ভাগাড়। ভাগাড়ের পরে এক তালগাছে শকুন, শকুনি, আর তার ছানা নিয়ে সুখের সংসার।
তারা দিনে খাবার খোঁজে; পালা করে ছানা পাহারা দেয়। ছানাটা এখনও ঠিক করে উড়তে পারে না। তারা মুখে করে খাবার আনে। ছানাটা খায়। এখানে এখন খাবারের আকাল। ভাগাড়ে মরা পশু পড়ার আগেই একদল লোক আসে ছুরি নিয়ে; কেটে নিয়ে যায় সব। শকুনদের ভাগে হাড়ও জোটে না। ছানাটাও শেখেনা খুবলে খাবার খাওয়া। তবে শকুন সুযোগ পেলেই ছানাটাকে নিয়ে নিচে আসে। শেখায় মরা থেকে খাবার খুবলে খাওয়া। ওপরে শকুনি থাকে পাহারায়। যদি বিপদ আসে। হাজার হোক শকুনের চোখ তো!
এদিকে রমেনের নতুন ব্যবসা ভালোই চলছে। লোকে কিনা খায়! মড়া, সড়া, গরু, শুয়োর, কুকুর, বিড়াল... সবকিছু। শুধু ঠিক করে কেটে পরিস্কার করে ওষুধ দিয়ে প্যাকেট করলেই হল। চেনা দায়। চলেও ভালো রেষ্টুরেন্টে, মলে...। কেউ জানতেও চায়না ভিতরে ওটা কিসের মাংস। এতে জাতও যায়না। ভাগাড়ের মাংসের রমরমা দেখে রমেনের লোভ বাড়ে। বিনে পয়সায় এমন ব্যাপার! লোককে শকুন দিলেও খাবে। তখনই চোখ পড়ে শকুনের ওপর। ছানাটা বেশ নাদুস নুদুস। ফাঁদ পাতে। ধরা পড়লেই কাটলেট বা কাবাব হবে।
শকুনের মুখ তখন রক্তে রাঙা। ছানাটাকে খাওয়া শেখাচ্ছিল। শকুনির বুক কাঁপে। শব্দ করে।রক্ত মাখা মুখ নিয়ে ছানাটাকে আড়াল করে পালাতে থাকে শকুন। কানে বেঁধে শকুনির চীৎকার – পালাও মানুষ!
ফাঁদ
Rupam Chatterjee
"সে তো লাগবেই। সময় নষ্ট না করে, তাড়াতাড়ি MRI রিপোর্ট করিয়ে নিন, যাতে আমি ওর চিকিৎসা শুরু করতে পারি।"
ডাক্তারের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন জগদীশ মোদক। ঘরে একটা এ সি চলছে, তবু তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। এইমাত্র যে ছবিটা করাতে বললেন উনি, তার খরচ আটহাজার টাকা! রিসেপশনিস্ট বলার পর ছুটে এসেছিলেন ডাক্তারবাবুর কাছে। মাথার একটা ছবির দাম অত হয় কখনো!
একশো দশ টাকার দৈনিক মজুরিতে মিষ্টির কারিগর জগদীশবাবুর সাধ্য ছিল না এই হাসপাতালে আসার। বউয়ের মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া রোগে, দু'কিলোমিটার দূরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তারবাবু হাসিমুখে যে দু'টো 'বড়ি' দিতেন, তাতেই তো ঠিক হয়ে যেত ফুল্লরা!
অনেকটা জোর করেই তাঁকে এখানে নিয়ে এসেছে গ্রামের পঞ্চায়েত মেম্বার হরিচরণ। তাঁদের গ্রামের অনেক অসুস্থ রুগীকেই নিয়ে আসে শহরের এই ঝাঁ-চকচকে হাসপাতালে। এরকম পরোপকারী লোক আজকাল পাওয়া যায় না।
হরিচরণ এখন ডাক্তারবাবুর পাশে দাঁড়িয়ে একমনে হিসেব করে চলেছে প্রাপ্য কমিশনের। উদাসীন মুখে বসে ডাক্তার, শিকারীর নিস্তব্ধতায় অপেক্ষা করছেন পরবর্তী রুগীর।
ওদের মাথার ওপর দেওয়ালে একটা ভিনদেশী পাখির ছবি, তাজা রক্তে রাঙানো লাল ঠোঁট আর তীক্ষ্ণচোখে সদ্যলব্ধ মাংসের উল্লাস…
সীমান্ত
Nilima Sultana
বসন্ত এসে গেছে এই সীমান্ত এলাকায়, গাছে নতুন ফুল, নতুন পাতা, । তবু সীমান্তরক্ষীদের মনে রং লাগেনা।সীমান্তের নো মেনস ল্যান্ড এর কাছে সতর্ক পাহাড়ায় এক প্রহরী, কাধে তার অত্যাধুনিক রাইফেল। পাইন গাছের নিচে দিয়ে ওপারে এক কিশোরকে চোখে পড়ে।কাধে ব্যাগ, ব্যাগ! হল্ট, হল্ট চেচায় প্রহরী, কানে যায় না কিশোরের। সে তখন ঝোপের আড়ালে প্রজাপতির উড়াউড়ি দেখায় ব্যস্ত। ঠিক বিপদসীমার কাছে চলে এসেছে কিশোর, সব ভুলে গিয়ে মাতৃভাষায় চেচিয়ে ওঠে প্রহরী, এসো না, এসো না এদিকে, আসতে নেই, কিশোর তখনো নির্বিকার, তার গতি চলমান এদিকেই। শেষবারের সতর্কবাণী না শোনায় রাইফেল তুলে নিতেই হয়। একঝাঁক গুলি তাকে এ ফোড় ও ফোড় করে দেয়। কিশোরের নিথর দেহ পড়ে আছে নো ম্যানস ল্যান্ডে, তার সাদা শার্ট রক্তে লাল, প্রহরীর মনে তখন ভেসে ওঠে দূরের শহরে ফেলে আসা নিজের ছেলের মুখ, কি আশ্চর্য মিল এই ছেলেটার সাথে। নিজেকে মনে হয় এক পাহাড়ী শকুন, যে কেবল শিকার করতে জানে, আর কিছু না।
সপ্তদশী
Sudesna Ghosh Chowdhury
সদ্য এই বাড়িটায় এসেছে ওরা। মা ,বাবা আর সপ্তদশী ফ্লোরেন্স। এখনও প্যাকিং খোলা হয়নি আর কেয়ারটেকার তেমন কাজ করেনি বলে বাড়িটা হদ্দ নোংরা হয়ে আছে।এসব নিয়ে মায়ের চিরাচরিত গজগজানি শুনবে না বলে ফ্লোরেন্স একা একই ঘুরে বেড়াচ্ছিল সারা বাড়ি। চোখ টানল বেসমেন্টের বন্ধ দরজাটা।আলতো ধাক্কা দিতেই খুলে গেল সেটা ।সিঁড়ি দিয়ে চুপি চুপি নেমে এলো ফ্লোরেন্স। পাশে তাকিয়ে প্রায় চেঁচিয়েই উঠছিল আরেকটু হলে। আধো অন্ধকারে, একটা শকুন না? আরে না, ছবি একটা। হাতে আঁকা.... অথচ কি জীবন্ত। আর ঠোঁট থেকে একফোঁটা রক্ত ঝরে পড়া...অসাধারণ!!! হাত বাড়িয়ে ছুঁতে গিয়ে চটচটে লাগলো হাতটা। শকুন টা আস্তে করে ঘাড় টা ঘোরাল....