02/09/2026
আপনিও কি এমন সন্তান মানুষ করছেন যে পড়তে চায় না? তাহলে অবশ্যই নীচে শ্রী বিশ্বজিত ঝাঁ মহাশয়ের এই লেখাটি পড়ুন।
২ বছর আগে আমাদের বাড়িটা একটা যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে গিয়েছিল।
হোমওয়ার্ক। সিলেবাস। পরীক্ষা।
প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলা একই অশান্তি।
"জিকো, পড়তে বস।"
"মা, পরে করবো।"
চিৎকার, কান্না, মোবাইল কাড়াকাড়ি।
আমরা সবরকম চেষ্টা করেছি। আদর করে, বকে, ট্রিক করে। কিছুতেই কিছু হয়নি। যত বেশি জোর করেছি, ছেলেটা তত বেশি দূরে সরে গেছে। যে বাড়িতে শান্তি থাকার কথা, সেখানে রোজ টেনশন।
অথচ আমার ছেলেটা খারাপ নয়। অঙ্কে বেশ ভালো। সায়েন্স, কম্পিউটারে দারুণ। ইংরেজি লেখা আর বলা — বেশ ভালোই পারে। কিন্তু ওই বই মুখস্থ করে থিওরি পড়া, SST, সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ — এগুলো ও পড়তে চায় না।
একদিন নিজেকেই প্রশ্ন করলাম — বদলাতে হবে কাকে? আমার ছেলেকে, নাকি আমাদেরকে?
আমরাই বদলে গেলাম।
জিকোর সাথে একটা ডিল করলাম।
বললাম, "তোকে রোজ সব সাবজেক্ট পড়তে হবে না। তুই যেটা ভালোবাসিস — অঙ্ক, সায়েন্স, কম্পিউটার — সেটা সারা বছর মন দিয়ে কর। ইংরেজি, SST, বাংলা পরীক্ষার আগে পড়লেই হবে। আমি রোজ জোর করবো না।"
বদলে তোকে একটা কথা দিতে হবে — অকারণে মোবাইল দেখবি না।
আর ওর পুরো দিনটা ভরে দিলাম ও যা ভালোবাসে তাই দিয়ে।
সকালে বাঁশি। 🪈
বিকেলে নাচ। 🕺
সন্ধ্যায় দাবা, ব্যাডমিন্টন। 🏸
এর বাইরের ও শর্ট ফিল্মও বানায়। 🎥
গত বছর ও জাতীয় স্তরের শর্ট ট্র্যাভেলগ তৈরির প্রতিযোগিতায় জিতেছে। আমার যে ছেলে "পড়তে ভালোবাসে না", তার বানানো ফিল্ম জাতীয় স্তরে সেরা হয়েছে।
ও নিজে একটা ওয়েবসাইট বানিয়েছে, একটা অ্যাপও বানিয়েছে। ক্লাস ৮-এ পড়ে, কোনো কোচিং ছাড়াই, শুধু নিজের আগ্রহে ইউটিউব দেখে শিখে।
যেহেতু ফুটবল দেখতে ও খুব ভালোবাসে তাই এবার বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালীন ওকে বলেছিলাম ম্যাচ রিপোর্ট-এর ভিডিও বানাতে। ও প্রায় সব ম্যাচের ম্যাচ রিপোর্ট-এর ভিডিও ইংলিশে বানিয়েছিল এবং সেগুলো বেশ ভালো হয়েছিল। নিজে থেকে স্ক্রিপ্ট লিখে সেগুলো ক্যামেরার সামনে বলেছিল।
এত কিছুর মধ্যে ও মোবাইলের কথা মনেই করতে পারে না। নাচ আর খেলার জন্য ফিট থাকতে হয়, তাই নিজে থেকেই জাঙ্ক ফুড খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। আমাকে আর বলতেই হয় না।
সাথে ছোট ছোট বাড়ির কাজের দায়িত্বও দিয়েছি। আর আশ্চর্যের ব্যাপার, ও অনেক বেশি দায়িত্ববান হয়ে গেছে।
বাড়ির কাজ করেও যে একটা বাচ্চা কত কিছু শেখে — দায়িত্ববোধ, ম্যানেজমেন্ট, সহানুভূতি — যেটা কোনো বই শেখাতে পারে না।
রেজাল্ট?
অঙ্ক, সায়েন্স, কম্পিউটার — খুব ভালো।
ইংরেজি, SST, বাংলা — মোটামুটি, এবং আমাদের কাছে এটাই ঠিক আছে।
ও এখন কোডিং শিখছে, প্রোগ্রামিং করছে, আমাকে PPT বানাতে সাহায্য করে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় রেজাল্ট মার্কশিটে নয়।
বাড়িতে এখন শান্তি আছে।
ওর জেদ, চিৎকার অনেক কমে গেছে। ও যা ভালোবাসে, তাই করছে। ও ভালো আছে, আমরাও ভালো আছি।
আর আমি একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস বুঝতে পেরেছি —
ওকে জোর করে ২৪ ঘণ্টা পড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে, আমরা আসলে ওকে জীবনের আসল শিক্ষাগুলো থেকে বঞ্চিত করছিলাম।
খেলাধুলা করে ও কী শেখে? হারতে এবং জিততে, টিমওয়ার্ক।
বাঁশি বা গান থেকে কী শেখে? ধৈর্য আর মনোযোগ।
ফিল্ম বানিয়ে কী শেখে? গল্প বলা, ক্রিয়েটিভিটি, টেকনোলজি — তাই তো ও জাতীয় পুরস্কার জিততে পেরেছে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ কভার করে দেখিয়ে দিয়েছে যে ওর কমিউনিকেশন এবং ইংলিশের দখল ভালো এবং সময়মত কাজ শেষ করতে পারে। ক্যামেরার সামনেও ও ভালো কথা বলতে পারে।
ওয়েবসাইট-অ্যাপ বানিয়ে কী শেখে? আসল সমস্যার সমাধান করা, যেটা কোনো SST বই শেখায় না।
নাচ থেকে কী শেখে? শৃঙ্খলা আর শরীরের নিয়ন্ত্রণ।
আর বাড়ির কাজ করে কী শেখে?
জীবনটা শুধু নম্বরের নয়, দায়িত্বেরও।
এই আসল শিক্ষাগুলোই তো আমরা হারিয়ে ফেলছিলাম, শুধু SST-র দুটো চ্যাপ্টার বেশি মুখস্থ করানোর জন্য।
ও বদলায়নি। বাবা-মা হিসেবে আমরা বদলেছি। ও শুধু সেটাই করছে যেটা ও ভালো পারে, যেটা ও ভালোবাসে।
তাই যে বাবা-মায়েরা এটা পড়ছেন, তাদের কাছে একটাই অনুরোধ —
ওর ভেতরের আসল ট্যালেন্ট খুঁজে নিন এবং সেটাকে উৎসাহিত করুন।
আপনার সন্তান ৯৫% পাওয়ার মেশিন নয়। ও একজন মানুষ, ওর নিজের ভালো লাগা আছে, নিজের প্রতিভা আছে।
রোজ বাচ্চাটাকে বদলানোর চেষ্টা করে বাড়িতে যুদ্ধ না করে, একবার নিজেদের অ্যাপ্রোচটা বদলে দেখুন না।
তর্কে জেতার দরকার নেই, সম্পর্কটা জিতুন।
ওকে ওর প্রতিদিনের লড়াইগুলো ওর মতো করে জিততে দিন। জীবনের বড় যুদ্ধটা ও নিজেই জিতে নেবে।
পৃথিবীর সমস্ত ডেটা একত্রিত করে দেখুন যে ক্লাসে ভালো নম্বর পাওয়ার সাথে জীবনের সাফল্যের কোনো সম্পর্কই নেই।