22/03/2024
. আমদের বিদ্যালয়ের ছাত্র পরিতোষ ধোলে তার পুরুলিয়া ভ্রমণ খুবই সুন্দরভাবে উপস্থাপনা করেছেন সেটাই সবার সামনে তুলে ধরা হলো,পরিতোষ তুমি আরো অনেক উঁচু জায়গায় পৌঁছও,সবার মুখ উজ্জ্বল করো।
পুরুলিয়া ভ্রমণ
“পলাশের কুঁড়ি
এক রাত্রে বর্ণবহ্নি জ্বালিল সমস্ত বনজুড়ি”
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পলাশের “আগুনবরণ” রূপের হাতছানিকে উপেক্ষা করতে না পেরে নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা ও যান্ত্রিকতাকে ছেড়ে ছুটে চলে এলাম বঙ্গজননীর কোলের এক “শান্তির নীড়” চিরসু্ন্দরী পুরুলিয়ায়। যদিও এই প্রথম নয়, এর আগেও বেশ কয়েকবার পুরুলিয়ার সতেজতা ও সজীবতাকে আলিঙ্গন করার সৌভাগ্য হয়েছে। যাওয়ার ইচ্ছা অনেকদিন ধরেই সুপ্ত ছিল, অপেক্ষা শুধু পলাশ ফোটার...। তো যেমন ভাবা তেমন কাজ। বাবা, মা, কাকা আর আমি চারজন বেড়িয়ে পড়লাম আমাদের ছোট্ট রথ নিয়ে গত মঙ্গলবার ১৯শে মার্চ ভোর পাঁচটায়।রথের সারথী আমার বাবাই। ক্রমে সদ্য উদিত সূর্যদেবের নব বিকিরিত সোনালী আলো পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে থাকলো আমাদের।
ঘড়ির কাঁটায় যখন প্রায় ৮টা পাকস্থলী ক্রমশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল – জানান দিলো যে জলখাবারের সময় আগত। কিন্তু অত সকালে সচরাচর বাঙালীর জলখাবার লুচি-তরকারির দেখা মিলল না কেবল “চা” এবং “আলুর চপ” ছাড়া। তাই রথ এগোতেই থাকল। অবশেষে প্রায় ন’টা নাগাদ আলুর চপ আর মুড়ি দিয়েই পাকস্থলীর আন্দোলন থামানো গেল। আবার ছুটে চলল গাড়ি দুধারের নির্জন বনানীকে সঙ্গী করে.....।
এবার এলো বহু প্রতীক্ষিত সেই ছোটনাগপুর মালভূমির অংশ ----- “পুরুলিয়া”। দুধারে কেবল পলাশ ফুলের গাছ ,, যতদূর তাকানো যায় কেবলই মনে হয় --- “নীল দিগন্তে ওই ফুলের আগুন লাগল”...। পলাশের রক্তিম আভায় চতুর্দিক যেন লাল হয়ে উঠেছে। মাঝখান দিয়ে চলে গিয়েছে আঁকাবাঁকা ঢেউ খেলানো পথ যার সৌন্দর্যের বর্ণনা কয়েকটি লাইনের মাধ্যমে ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। মাটিতে পড়ে থাকা পলাশ ফুলের চাদর প্রকৃতির শোভাকে আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
যাই হোক,, অবশেষে বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ পৌঁছালাম পুরুলিয়ার “বাঘমুন্ডি” অঞ্চলে “জ্যোতি গেস্ট হাউস” অর্থাৎ বাড়িতে ( না না নিজের বাড়ি বা কোন আত্মীয়ের বাড়িতে নয়, বহুবার যাওয়ার জন্য নিজের বাড়ির মতোই হয়ে গিয়েছে... )। পাখি পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই গেস্ট হাউসটির বারান্দায় বসে সামনাসামনি পাহাড় দেখার আনন্দের তুলনা হয় না ( কোনো প্রোমোশন করছি না , প্রথম থেকে যতবারই গেছি ওখানেই উঠেছি , শুধু পাহাড় নয় , ওই বাড়ির মানুষগুলোর ব্যবহার আপনাকে আপ্লুত করবেই )। স্নান-টান সেরে ওখানেই বাঙালীর অতি পরিচিত খাদ্যবস্তু --- ভাত, ডাল, আলুপোস্ত, উচ্ছে-আলু ভাজা, চাটনি আর পাঁপড় দিয়ে মধ্যাহ্নভোজন সারা হল। তারপর একটু ভাতঘুম দিয়েই প্রায় বিকেল তিনটে নাগাদ বেড়িয়ে পড়লাম “খয়রাবেড়া ড্যাম” , “মার্বেল লেক” , “চরিদা গ্রাম” -এর উদ্দেশ্যে।
পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে ক্রমশ এগিয়ে যেতে থাকলাম আমরা। কী অপূর্ব পাহাড়ী গাছপালা , পাহাড়ী মানুষদের ঘরবাড়ি , ছোটদের প্রাইমারী স্কুল , আবার মাঝে মাঝে ফাঁকা খেলার মাঠ — মন জয় করতে বাধ্য।
এখানে একটা জিনিস খেয়াল করার মতো — পাহাড়ী মানুষদের নান্দনিকতাবোধ। তাদের বাড়ির দেওয়ালে আঁকা বিবিধ কারুকার্য তাদের মনের এই নান্দনিকতার পরিচয় দেয় যা আমাদের মতো তথাকথিত ‘শহুরে’-‘শিক্ষিত’-‘সভ্য’ মানুষদের মধ্যে প্রায় নেইই।
দুধারের পরিবেশকে সঙ্গী করে এগিয়ে চললাম সামনের দিকে। লক্ষ্য করলাম আকাশে ঘন কালো মেঘের সঞ্চার হয়েছে। মনকে মেঘের সঙ্গী করে ‘দিকদিগন্তের পানে’ ছুটে চললাম আমরা। ঘন কালো মেঘ আর সুউচ্চ উদ্ভিদের সবুজ চূড়ার মিলনরেখা এই সৌন্দর্যকে এক অন্য মাত্রায় উন্নীত করেছিল। হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়া শুরু হল, সঙ্গে বৃষ্টি। মনে হল যেন পাহাড়, তার কোলে বেড়াতে আসা অতিথিদের স্বাগত জানাতে বড়ো উত্তেজিত ও ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে। হিল্লোলিত পাতার কলরবের দ্বারা প্রকৃতি মা যেন তার বহুদিনের অদেখা সন্তানদের আলিঙ্গন করতে চাইছে। তবে প্রকৃতির এই উন্মত্ততা দেখে মনে কিঞ্চিত ভয়েরও সঞ্চার হয়েছিল। প্রকৃতি মায়ের ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরে শেষমেশ পৌঁছালাম খয়রাবেড়া ড্যামে। বিশেষ পাওয়া হিসেবে একটা ময়ূরের দেখা পেয়েছিলাম। গোধূলি বেলায় এই ড্যামের সৌন্দর্য বর্ণনাতীত। সেখান থেকে এবার গেস্ট হাউসে ফেরার পালা। খয়রাবেড়া ড্যাম থেকে চরিদা গ্রাম হয়ে ফিরলাম আমরা। বলে রাখি, চরিদা গ্রামে ছৌ নাচের মুখোশ তৈরি হয়, এশিয়ার মধ্যে এই একটি মাত্র স্থানেই ছৌ মুখোশ তৈরি হয়।
পরের দিন সকাল। ২০শে মার্চ ২০২৪।
সকাল হয়নি তখনো। ভোর ৫:৩০ তখন। অযোধ্যা পাহাড়ের গা কেটে তৈরি রাস্তা দিয়ে এগোচ্ছে আমাদের রথ। গন্তব্যস্থল — আপার ড্যাম, লোয়ার ড্যাম, বামনী জলপ্রপাত, তুর্গা জলপ্রপাত। আপার ড্যাম থেকে সূর্যোদয় দেখার বাসনা নিয়ে গেলেও বিষন্ন প্রকৃতির কারণে তা তার সম্ভব হয়নি। যদিও আগের বার যখন গিয়েছিলাম, এই সূর্যোদয়ের সাক্ষী হতে পেরেছিলাম আমরা। যাই হোক, গত রাত্রে বৃষ্টি হওয়ার কারণে গাছগুলো যেন আরও সতেজ হয়ে উঠেছিল। আর যেটা সবচেয়ে ভালো লাগে অত ভোরে বেরোনোর কারণে আমাদের সাথে দ্বিতীয় কোন ট্যুরিস্ট দল নেই। তাই কোনরূপ কোলাহলও নেই। প্রকৃতির সৌন্দর্যের রস নিজের মত করে আস্বাদন করার সুবর্ণ সুযোগ এটা। বৃষ্টি ভেজা সতেজ পরিবেশের গন্ধ মনকে নাড়া দিয়ে যাবে। বনানী পরিবেষ্টিত পাহাড়ের কোলে কেবল চারজন মানুষ... আর কেউ নেই তখন ... কেবল নিস্তব্দতা... শুধু পাখির ডাক... আর প্রকৃতি মায়ের সাথে তার সন্তানদের নিবিড় কথপোকথন........
বৃহৎ পরিবেশের কিছু অংশকে ক্যামেরাবন্দি আর তার চেয়ে আরও বেশী স্মৃতিকে হৃদয়ের মণিকোঠায় বহন করে ফিরে এলাম আমাদের গেস্ট হাউসে।
এবারে পাখি পাহাড়ে আর যাইনি। কারণ মেঘাচ্ছন্ন প্রকৃতি আবার বিষন্ন হয়ে পড়ল। তাই তাকে আর বিরক্ত করা ঠিক হবে না। গত বার গিয়েছিলাম ওখানে। কোন অজানা শিল্পীর হাতের জাদুতে খোদাই করা বিভিন্ন পাখির ছবি আঁকা আছে সেখানে। জানি না কে এঁকেছে? কেন এঁকেছে? পাহাড়কেও আর এই নিয়ে প্রশ্ন করা হয়নি কখনো।
পুরুলিয়ার সব জায়গায় যাওয়া হয়নি আর। ভবিষ্যতের জন্য তুলে রেখেছি। সেই টানেই যাবো আবার। ঠিক করা হল ওই দিনই মধ্যাহ্নভোজন সেরে বাড়ির পথে রওনা হবো। তাছাড়া বৃষ্টি বাড়ার সঙ্গে ঠান্ডাটাও সমান্তর প্রগতিতে বাড়ছে। মধ্যাহ্ন ভোজে ছিলো — ভাত, ডাল, তরকারি, আলুভাজা, ডিমভাজা, চাটনি, পাঁপড়, মিষ্টি, দই। অবশেষে বেড়োলাম এক বাড়ি ছেড়ে আরেক বাড়ির উদ্দেশ্যে, প্রকৃতি মায়ের কোল ছেড়ে বহুদূরে... কথা দিলাম ‘আবার আসবো মা’...
“তুমি মিশেছ মোর দেহের সনে
তুমি মিলেছ মোর প্রাণে মনে
তোমার ওই শ্যামলবরণ কোমল মূর্তি মর্মে গাঁথা।”
✍️ পরিতোষ ধোলে। বৈদ্যবাটী
২১/০৩/২০২৪