06/02/2020
।।আমার বিদ্যালয় ও ১৭৫ বছর।।
সৈদাবাদ মনীন্দ্র চন্দ্র বিদ্যাপীঠের ১৭৫ বছর পূর্তি উদযাপনের প্রথম পর্ব শেষ হল বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। দীর্ঘ চার দিন ব্যাপী যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল, তা স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং সহ শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এব্যাপারে কিছু কথা বলার জন্যই আমার এই লেখা।
প্রায় তেত্রিশ বছর হল এই স্কুল ছেড়েছি। মনে মনে অনেকদিন থেকেই প্রস্তুত ছিলাম এই অনুষ্ঠানে যাওয়ার ব্যাপারে। সেই মত 1st ফেব্রুয়ারি বিকেলে কয়েকশো (সংখ্যাটা হাজার ও হতে পারে) বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকার সঙ্গে পা মিলিয়েছিলাম শোভাযাত্রায়। অসাধারণ অনুভূতি। ভেতরে অনবরত একটা চাপা উত্তেজনা অনুভব করছিলাম। গর্বে বুক ভরে যাচ্ছিল। জানিনা, ঠিক কতগুলো স্কুল দেড়শ বছর পার করেছে!!! তবে যে কটায় হোক, তাদের মধ্যে আমাদের স্কুল যে ওপরের দিকেই আছে, এটা ভেবেই ভাল লাগে। প্রায় ছয় থেকে সাত কিলোমিটার শোভাযাত্রায় বহু ষাটোর্ধ প্রাক্তনী অনায়াসে পা মেলালেন। তাঁরা অনেকেই বয়সের ভারে নুজ্ব্য হলেও এতটুকু ক্লান্তি দেখিনি। আমার মেয়ে, যে এক পা হাঁটে না, সে অনায়াসে সম্পূর্ণ করল শোভাযাত্রা। এটা এই কারনেই উল্লেখ করলাম, এটাই হচ্ছে ভালবাসা, যেখানে বয়স ও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। আমার পিছনে কয়েকজন প্রাক্তনীর মুখে শুনছিলাম, ওনারা ১৯৬৫ র মাধ্যমিকের ব্যাচ, কেউ ছিলেন ১৯৬২র ব্যাচের। এগুলো কি ভালবাসা ছাড়া হয়!!! আমি মনে করি, অন্তর থেকে টান অনুভব না করলে, এই বয়সে ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার অনায়াসে হাঁটা যায় না। শোভাযাত্রার শেষে স্কুল সকলের টিফিনের ব্যাবস্থা করেছিল। হ্যাঁ, প্রায় হাজার জনের, যা অভাবনীয়। কি আন্তরিকতা শিক্ষকদের!!! এ নিয়ে আমি পরে বলছি।
দ্বিতীয় দিন আমরা বেশ কিছু বন্ধু মিলে স্কুলে গিয়েছিলাম নিজেদের পুরোনো স্মৃতিগুলো একটু ঝালিয়ে নিতে। যা আমাদের আগে থেকেই ঠিক ছিল। আমি, উত্তম, চিন্ময়, মলয়, শুভজিত, অসীম, রাকেশ, টোটন, অসিত, মুকুল, গোবিন্দ, সকলেই ঠিক বিকেল ৪টের সময় স্কুলে উপস্থিত হই। একসঙ্গে সেই পুরোনো বন্ধুদের নিয়ে সকলেই খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম পুরোনো স্মৃতি গুলো। পুরোনো ক্লাস রুমে গিয়ে স্মৃতি হাতরাচ্ছিলাম, বেঞ্চে বসে অনুভব করার চেষ্টা করছিলাম সেই পুরোনো আবেগ। সত্যি বলছি, ওই টুকু সময় আমরা ফিরে গিয়েছিলাম সেই সেই স্কুল জীবনে, যেখানে, বন্ধুদের পিছনে লাগা, স্যারদের পিছনে লাগা, স্যারদের হাতে মার খাওয়া ....। আমাদের সময়ের একজনের সঙ্গেই দেখা হল, তিনি শুভেন্দু দা, এখনো একই রকম আছেন। তিনি নিজে আমাদের সমস্ত ঘর ঘুরিয়ে দেখালেন। না, তাঁকে বলতে পর্যন্ত হয়নি, উনি নিজেই উদ্যোগ নিয়ে আমাদের পুরোনো ঘর, নতুন বিল্ডিং, সব নিজে ঘুরিয়ে দেখালেন। সেদিনের সেই স্কুলের সঙ্গে আজ অনেক কিছুরই মিল পাচ্ছিলাম, আবার বেশ কিছু নতুনভাবে তৈরি করা হয়েছে। বর্তমান শিক্ষকদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হল, যাঁরা কয়েকজন আমার পূর্ব পরিচিত, আবার কয়েক জনের সঙ্গে নতুন পরিচয় হলো। সত্যি কথা বলতে তাঁদের ব্যবহারে আমরা অভিভূত। অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁরা আমাদের সকলকে বসান, আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন, গল্প করেন, পরামর্শ চান। যদিও আমরা কেউই তাঁদের সময়ের ছাত্র নয়, তবুও তাঁদের আন্তরিকতা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছি আমরা। সকলের নাম হয়ত জানিনা, তবে পার্থবাবু, সৌমেন দা, সুখেন্দু দা, অমিতাভ, বীরু, তারিক বাবু, মামুন বাবু সর্বোপরি হেডমাস্টার মহাশয়, এনারা সকলে যেভাবে আমাদের আপ্যায়ন করেছেন, তা আলাদাভাবে বলতেই হয়। শুধু আমাদেরকেই নয়, সকল পুরোনো ছাত্র-ছাত্রীদের, এবং প্রাক্তন শিক্ষক-শিক্ষিকাদের, যেভাবে বর্তমান শিক্ষকরা গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের সম্মান করেছেন তা অতুলনীয়। এ প্রসঙ্গে বলি, আমাদের সময়ের অঞ্জলিদি কে প্রদীপ জ্বালাতে দেখে অত্যন্ত আনন্দ পেয়েছি।
তৃতীয় দিন ছিল রি-ইউনিয়ন। আমি যেতে পারিনি। আমাদের বার বার যেতে বলেছিলেন বর্তমান শিক্ষকরা। কিন্তু সোমবার হওয়ায়, আমার অফিস থাকায়, অন্যান্য বন্ধুদেরও অফিস এবং নিজস্ব কাজ থাকায় কেউ ই সেখানে অংশ নিয়ে পারিনি। একটু আক্ষেপ থেকে গেল। এক বছর ধরে অনুষ্ঠান চলবে। অবশ্যই চেষ্টা করবো পরেরবার সকলে উপস্থিত থাকার।
চতুর্থদিন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পর বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী শুভমিতার গান দিয়ে প্রথম পর্বের অনুষ্ঠান শেষ হয়। যদিও সেদিন ও উপস্থিত থাকতে পারিনি বলে দুঃখিত।
শেষে স্কুলের সকল শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ জানায়, এতবড় একটা অনুষ্ঠান এত সুন্দরভাবে সাফল্যমন্ডিত করার জন্য। আবার বলব, প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী এবং প্রাক্তন শিক্ষক-শিক্ষিকাদের এভাবে গুরুত্ব সহকারে আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁদের সম্মান জানানোর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ প্রাপ্য প্রধান শিক্ষক এবং সহ শিক্ষকদের। এ একমাত্র আমার স্কুলই পারে। সব ভালবাসা শুধু আমার স্কুলের জন্য।
💖💖💖💖💖💖💖