25/01/2020
১৯৩০, ২৮ জুন, তিনি স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেছিলেন। বিচারে যাবজ্জীবন। ১৯৩৭ সালের শেষদিকে অনশন করার পরে আন্দামান থেকে বাংলার আলিপুর জেলে আসেন চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের অন্যতম নায়ক অনন্তলাল সিংহ। দমদম ও আলিপুর জেলে তখন কমকরে ৫০/৬০ জন বিপ্লবী রাজবন্দী হয়ে আছেন। অনন্ত সিংহ যখন আলিপুর জেলে তখন সুভাষচন্দ্র বসু আসেন দেখা করতে, এই নিয়ে চতুর্থবার দেখা সাক্ষাৎ হয় তাঁদের। প্রত্যেকের সাথে দেখা করে সুভাষচন্দ্র বসু এক জোড়াল বক্তৃতা দিয়ে বিপ্লবীদের মানসিক জোড় বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৩৮, সেইসময় একদিকে কংগ্রেসের সভাপতি সুভাষচন্দ্র বসু অন্যদিকে বাংলায় তখন প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনে ফজলুক হক-সুরাবর্দীর শাসনভার চলছে। পরিবেশ সম্পূর্ণ পক্ষে - এই চিন্তা করে অনন্ত সিংহ সহ রাজবন্দীরা মুক্তির জন্য আন্দোলন রূপে অনশন করে ইংরেজ সরকারের উপর চাপ বাড়াবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। খবর গেল গান্ধীজীর কাছে। সুভাষচন্দ্র বসু ও গান্ধীজী রাজবন্দীদের সাথে দেখা করতে আসেন, যদিও বিপ্লবী বন্দীদের সাথে কথা বলার অনুমতি দেওয়া হয় শুধু গান্ধীকে।
জেলের ভেতরে রাজবন্দীদের সাথে কথা বলে, রাজবন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থা করতে গান্ধীজী এক বছরের জন্য সময় চান। রাজবন্দীরা প্রথমে রাজি না হলেও পরে এই প্রস্তাব মেনে নেন। কিন্তু দিন যায়, মাস যায় রাজবন্দীদের মুক্তির ব্যাপারে কোনও পদক্ষেপই নেওয়া হয় না; এইভাবে প্রায় একবছর কেটে যায়। হতাশ রাজবন্দী বিপ্লবীরা মুক্তির জন্য আবার অনশন করার সিদ্ধান্ত নেন। বিপ্লবীরা সরকারকে চরম পত্র দিলেন, সেইসঙ্গে জানানো হ'ল গান্ধীকেও। ১৯৩৯ সাল, এইসময় দেশের রাজনীতিতে একরকম বেইমান ও ধোঁকাবাজির রাজ শুরু হচ্ছে। বিপ্লবীদের চরম পত্রের পরেও, না ব্রিটিশ সরকার, না গান্ধী - কারো কোনও হোলদোল নেই, ফলে শুরু হ'ল অনশন।
বিপ্লবীদের অনশনের খবর চারিদিক ছড়িয়ে পড়লো, এবার গান্ধী তাঁর দূত পাঠালেন বিপ্লবীদের কাছে। গান্ধীর সেক্রেটারী মহাদেব দেশাই, বিধান রায় ও সুরেন্দ্র মোহন ঘোষ জেলে এসে অনন্ত সিংহ'দের সাথে দেখা করে জানান, গান্ধীজী অনশন বন্ধ করতে বলেছেন। কিন্তু মুক্তির ব্যাপারে কোনও আশ্বাস নেই, তাই এবারে বিপ্লবীরা গান্ধীর দূতদের সরাসরি 'না' বলে দিলেন, জানালেন গান্ধীজীর কথামত অনশন বন্ধ হবে না। তাঁর নির্দেশ অমান্য করেছে! তাই গান্ধী অনন্ত সিংহ সহ বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে খবরের কাগজে এক মারাত্মক ক্ষতিকর বিবৃতি দিয়েদিলেন। এইঘটনায় বিপ্লবীরা মানসিকভাবে ভেঁঙে পড়লেও অনশন চলতে থাকল।
বেশ কিছুদিন অনশন চলার পরে অনেক বিপ্লবীই অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগলেন। এই খবর পেয়ে বসে থাকতে পাড়লেন না শুধু দুজন। সেই সময় সুভাষচন্দ্র বসু শারীরিকভাবে বেশিরভাগ সময় অসুস্থ থাকতেন এবং রাজনৈতিকভাবে পদত্যাগ করেছেন কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে। তবু তিনি ও মেজদা শরৎচন্দ্র বসু ছুটে এলেন দমদম ও আলিপুর জেলে। সুভাষচন্দ্রের সাথে অনন্ত সিংহের সেখানে দেখা হয় পঞ্চমবার; প্রথমবার দেখা হয় ১৯২৮ সালে কলকাতা কংগ্রেসে, ১৯২৯ সালে দুবার চট্টগ্রামে, এবং ১৯৩৭ সালে চতুর্থবার আলিপুর জেলেই। অনন্ত সিংহের কথায়, সুভাষবাবু খুব উৎকন্ঠা নিয়ে হাতজোড়ে বারে বারে আমাদের'কে বলেছিলেন, "হয়তো এখনই ইংরেজ সরকার আপনাদের মুক্তি দেবে না, তবে মুক্তি খুব তাড়াতাড়ি একদিন হবেই। আমরা স্বাধীনতার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে, এবারে এক চরম আন্দোলন শুরু হবে। আপনারা অনশনের সিদ্ধান্ত নেবেন না, ভারত মায়ের পরবর্তী মুক্তি আন্দোলনে আপনাদের সকলকে দেশের প্রয়োজন"...
সুভাষচন্দ্র বসু তখন কোনও প্রতিশ্রুতি বিপ্লবীদের দিতে পারেননি, তিনি রাজনৈতিক ভাবে কোনও পদে নেই, প্রতিশ্রুতি দেবার মতো সেই পরিস্থিতিও ছিল না। তবু অনন্ত সিংহ সহ সকল বিপ্লবীরাই অনশন তুলে নিলেন। কেন তাঁরা অনশন বন্ধ করলেন? - অনন্ত সিংহ বলেছেন, "সে এক দুর্বার আকর্ষণ, অসুস্থ দুর্বল শরীরেও এক অমিত শক্তিশালী ক্ষমতা, শ্রদ্ধায় মাথা নত হয় এমনি। তাঁর সম্মোহন শক্তি এড়াবে কার সাধ্যি!"
শেষপর্যন্ত অনন্ত সিংহ ব্রিটিশ জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন ১৯৪৬ সালে। এরপর কিছু বছর তাঁর একটু অন্যরকম ভাবে কাটে, টাকা রোজগারে তিনি জড়িয়ে পড়েন সিনেমার প্রযোজনার কাজে। এইসময় ১৯৪৬ সালেই চট্টগ্রাম বিদ্রোহের অন্যতম এই বিপ্লবীর সাথে আর একজনের আলাপ হয়েছিল, তিনি ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর আদর্শ, কর্মকাণ্ড গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে, সখ্যতা গড়ে ওঠে দুজনের মধ্যে। অনন্ত সিংহ পরে তাঁর বেশ কয়েকটি ছবি প্রযোজনাও করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’, ‘সখের চোর’, ‘নতুন প্রভাত’, ‘শেষ পরিচয়’ ইত্যাদি। এর মধ্যে কয়েকটি ছবিতে শুধুমাত্র অনন্ত সিংহের সম্মানে বিনা পারিশ্রমিকেও কাজ করে দিয়েছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। অনন্ত সিংহ নিজেও অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন ভানুর সম্পর্কে, বলতেন - ‘ছায়াছবির মাধ্যমে সামাজিক দুষ্কর্ম, সরকারের অক্ষমতা ও তথাকথিত নেতাদের প্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে তাঁর শ্লেষপূর্ণ ও বিদ্রুপাত্মক অভিনয় যাঁরা দেখেছেন তাঁরা বলবেন, ভানুবাবুর অন্তরে দেশপ্রেমের আগুন প্রজ্জ্বলিত আছে।’
'৭০ দশকে অনন্ত সিংহ আগে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ব্যাঙ্ক ডাকাতির কারণে গ্রেপ্তার হন। ১৯৬০ সালে কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে ঘটে যাওয়া এক ব্যাঙ্ক ডাকাতির ঘটনার প্রায় দশ বছর পরে ১৯৭০ সালের ১০ জানুয়ারি গড়িয়া'য় সম্পর্কে তাঁর কাকাবাবুর বাড়ী থেকে গ্রাপ্তার হয়েছিলেন অনন্ত সিংহ ও তাঁর বেশ কিছু অনুগামী। তাঁর মতো বিপ্লবীর এহেন কাজ অনেককেই ব্যথিত করেছিল। সেসময় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে এক সাংবাদিক অনন্ত সিংহকে ডাকাত বললে তিনি প্রচণ্ড রেগে গিয়ে গালাগাল দিয়ে সেই সাংবাদিককে বাড়ী থেকে বের করে দেন। বিপ্লবী অনন্ত সিংহ ডাকাতি কাণ্ডে জেল খেটেছিলেন - এটা ইতিহাস সত্য। কিন্তু কেন তিনি এই কাজ করেছিলেন - তা অনেকেই বোঝার চেষ্টা করেন না। ১৯৫৯ সালে খাদ্য-আন্দোলনে অসংখ্য অসহায় মানুষদের সাহায্যার্থে অনন্ত সিংহ সংগঠন গড়ে দরিদ্র দেশের মানুষের সেবা করার কাজ শুরু করেছিলেন। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি নিজে একপ্রকার নিঃস্ব হয়ে গেছিলেন। তিনি দেখলেন দেশে একদলের কাছে শুধু টাকা আর টাকা, অন্যদিকে একদল প্রায় খেতেই পায়না, অথচ স্বাধীন দেশের সরকার কোনও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিচ্ছে না। স্বাধীন দেশেই অসহায় মানুষ শুধু না খেতে পেয়ে একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে - এই স্বাধীনতা তাঁরা চাননি বলেই অনন্ত সিংহের মনে হয়েছিল। কিন্তু সময় তখন অনেক দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। নতুন ভাবে সংগঠন তৈরি করে দরিদ্র মানুষের দুঃখ দূর করার সঙ্কল্প নিয়েই তিনি ব্যাঙ্ক ডাকাতির রাস্তায় যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি নিজে সশরীরে সরাসরি ডাকাতিতে যুক্ত ছিলেন না, পরিকল্পনা তৈরি করে দিয়েছিলেন। ইতিহাস যাঁরা জানেন কিন্তু অন্তর দিয়ে বোঝেন না, তাঁরা অনন্ত সিংহের এই কাজের জন্য শ্রদ্ধা জানান না, আজও জানান না। কিন্তু যাঁরা সরকারি তথ্যটুকু না পড়ে আর একটু বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করেন, অন্তর দিয়ে, তাঁরা আগেও সম্মান জানিয়েছেন, আজও জানান। অনন্ত সিংহের নিজের কথায়, 'তবু অপরাধ তো অপরাধই হয়, সে যে জন্যেই হোক, কারণটা কেউই বুঝবে না।' ডাকাতির অপরাধে অনন্ত সিংহ তখন স্বাধীন দেশের আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি। সেইসময় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেয়ে বাসবী দেবীর বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। মেয়ের বিয়ের খাবারভোজ নিজের হাতে জেলবন্দি অনন্ত সিংহের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় ভানু।
প্রায় আট বছর মামলা চলেছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত সরকার প্রমাণ করতে পারেনি যে অনন্ত সিংহ ডাকাতি করেছেন। সরকার তাই এই মামলা বন্ধ করে দেয়। ১৯৭৯ সালের ২৫ জানুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন স্বাধীনতার পরেও প্রকৃত সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখা বিপ্লবী রণক্লান্ত অনন্ত সিংহ।
জয় হিন্দ্
-সোমনাথ.সিংহ@s.sinha
তথ্যসূত্র: অনন্ত সিংহের দুটি বই - 'ক্ষণিকের সান্নিধ্য' ও 'কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত'।