29/10/2023
#প্রাথমিক_টেট_প্রস্তুতি
#বাংলা_পেডাগোগী
ভাষার উপাদান:
ভাষা তাত্ত্বিকদের মতে ভাষার চারটি উপাদান বর্তমান
1. *ধ্বনি তত্ত্ব (Phonology)
2. *বাক্য বিন্যাস (Syntax)
3. *শব্দের অর্থ (Semantics )
4. *প্রয়োগ(Pragmatics)
• *ধ্বনি তত্ত্ব (Phonology) :
প্রত্যেক ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তার মৌলিক ও স্বতন্ত্র ধ্বনি | এগুলি হল ভাষার ক্ষুদ্রতম একক| এই ধ্বনি বা এককগুলি নির্দিষ্ট নিয়মে উচ্চারিত হয়ে অর্থ ব্যক্ত করে, এই অর্থসহ ভাষার ক্ষুদ্রতম একককে Morphene বলে | যেমন রাম, শ্যাম, যদু,মধু,বই,গাছ প্রভৃতি সবই হল Morphene | শিশু প্রথমে ধ্বনি উচ্চারণ এবং পরে তা অর্থ যুক্ত শব্দের রূপ পায় | শৈশবে ধ্বনি সঙ্গে অর্থযুক্ত হয় অনুবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে |
• *বাক্য বিন্যাস (Syntax):
বাক্য বিন্যাস এর অর্থ হল শব্দগুলি বিন্যস্ত হয়ে বাক্যে পরিণত হওয়া | এর কাজ হল Morphene বা ধ্বনি গুলিকে একত্রিত হয়ে অর্থপূর্ণ বাক্য গঠন করা | যেমন - রাম বাড়ি যায়|
• *শব্দের অর্থ (Semantics):
এটির অর্থ হল চিন্তার সঙ্গে শব্দের সম্পর্ক শিশু যা চিন্তা করছে সেটিকে প্রকাশ করার জন্য অর্থ যুক্ত শব্দের ব্যবহার এটিই হল মূল বৈশিষ্ট্য |
• *প্রয়োগ(Pragmatics):
পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী উপযুক্ত শব্দ নির্বাচন ও তার সঠিক ব্যবহারকেই প্রয়োগ বলে, প্রথম স্তর থেকে তাকে নজর রাখতে হয়, সে ঠিক ঠিক মতো শব্দ ব্যবহার করতে পারছে কিনা |
*শিশুর সঞ্চালন মূলক বিকাশ:
জন্মের পর- চোখ বোঝাতে পারে, হাত-পা নাড়াতে পারে।
২ মাস - ঘাড় শক্ত হয়, বিছানায় শুয়ে মাথা তুলতে পারে।
৪ মাস - সাহায্য পেলে বসতে পারে |
৬ মাস - নিজে বসতে পারে ও ঝোলানো জিনিস ধরতে পারে।
৮ মাস – কোন কিছু ধরে দাঁড়াতে পারে |
৯ মাস - হামাগুড়ি দিতে শেখে |
১০-১১ মাসে- অন্যের হাত ধরে দাঁড়াতে পারে ১২ মাসে- নিজে নিজে দাঁড়াবার চেষ্টা করে
১৪- নিজে দাঁড়াতে পারে ও হাঁটার চেষ্টা করে
তিন বছরে - অনেকটা জেদি মনোভাব আসে, হাঁটতে শিখে যায় ,হাঁটার গতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসে যায় |
• *শিশুদের ভাষা শিক্ষার আধুনিক তত্ত্ব:
বিশিষ্ট ভাষাবিজ্ঞানী নম চমস্কির মতে- "কোন পশু বা পাখি নয়, কেবলমাত্র মানুষের শিশুই ভাষা শেখার জন্মগত ক্ষমতার অধিকারী" | মানুষের শিশুর জৈবিক বিবর্তনের মাধ্যমেই মানব শিশু এ ক্ষমতা নিয়ে এসেছে।
পোষা তোতা,ময়না অবশ্য মানুষের ভাষায় কথা বলে কিন্তু তা একেবারেই অনুকরণ মাত্র | যে তোতা রামকৃষ্ণ বলে, সেই তোতা হঠাৎ করে কৃষ্ণ রাম বলতে পারবে না। , কিভাবে শিশু তার নিজের ভাষা বা মাতৃভাষা থেকে এ নিয়ে চমস্কি ভেবেছেন-- তিনি মনে করেছিলেন, শিশুর মধ্যে ভাষা শিক্ষার উপায় (Language Acquisition Device - LAD) বা ভাষা শিক্ষার প্রণালী (Language Acquisition System-LAS) কাজ করে, তার ফলেই এত তাড়াতাড়ি সে ভাষা শিখে ফেলতে পারে |
*অধ্যাপক পবিত্র সরকার তার প্রবন্ধে Jean Aitchisan এর আর্টিকুলেট ম্যানুয়াল (The Articulate) গ্রন্থ থেকে শিশুর ভাষা শিক্ষার প্রথম পর্যায়ে নিয়ে বিশেষ আলোচনা করেছেন | তার তালিকা নিচে দেওয়া হল-
➢ কান্না –জন্মকাল
➢ কু কু Cooing-- ছয় সপ্তাহ
➢ কলধ্বনি Babbling--ছয় মাস
➢ কথার সুর Intonation Patterns --আট মাস
➢ এক-শব্দ পর্ব--এক বছর
➢ দুই—শব্দ পর্ব--দেড় বছর
➢ পদনির্মাণ--দু-বছর
➢ প্রশ্ন,নিষেধ বাক্য- দুই থেকে আড়াই বছর
➢ জটিল বাক্য--পাঁচ বছর
➢ পরিণত ভাষা দক্ষতা- দশ বছর
• *শিশুর ভাষা শিক্ষা ক্ষেত্রে স্তর :
শিশুর ভাষা শিক্ষাক্ষেত্রের তিনটি স্তর রয়েছে
১)প্রাক-প্রাথমিক স্তর
২) প্রাথমিক স্তর
৩)নিম্ন মাধ্যমিক স্তর
• *প্রাক-প্রাথমিক স্তর:
*অতি শৈশবে শিশু কান্নার মধ্যে দিয়ে ভাব প্রকাশ করে |
*দুই থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর জীবনে ভাষা শিক্ষার প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়
*এটি প্রস্তুতির কাল
*এ পর্যায়ে শিক্ষাদান হবে খেলাধুলার মাধ্যমে
*শিশু ছবি ও ছড়৷ ভালবাসে বলে তাকে ছবির বই ও ছড়াতে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে।
*ভাষা শিক্ষাদানে ছড়া,গান,আবৃত্তিতে জোর দিতে হবে |
*প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ভাষা শিক্ষাদানের পদ্ধতি :
আগে ভাষা পরবর্তীতে বর্ণমালা,ইন্দ্ৰিয় সচেতনতার শিক্ষা, শব্দের প্রতিকতায় যথার্থ উপলব্ধি |
*প্রাথমিক স্তর (Primary stage):
এই স্তরের গড় বয়স ৬ থেকে ১০ বছর
*মনের ভাব সম্পূর্ণ প্রকাশ করতে পারে,
*শব্দ সংখ্যা বৃদ্ধি পায়
*শিক্ষার্থীদের পক্ষে এটি ভাষা শিক্ষার প্রস্তুতিপর্ব
*লেখার উপর জোর দিতে হবে
*পাঠ্যপুস্তক ব্যতীত নানা বিধিদান, খেলাধুলার বিষয়ক বই পড়তে দিতে হবে |
*শিশুদের কথা বলার প্রবণতা নিরন্তর জিজ্ঞাসার আগ্রহকে উৎসাহ দিতে হবে,দমিয়ে রাখলে চলবে না
*মাতৃভাষার এবং ইংরেজি ভাষার সংস্কার চিরদিনই পাশাপাশি বিরুদ্ধ হইয়া বাস করিবে --একটা আর একটাকে আত্মসাৎ করিয়া লইবে না | এজন্যই পরভাষা শেখা এবং তাহাকে ব্যবহার করা এত দুঃখ
রবীন্দ্রনাথ পরভাষা শেখা কে দুঃখ বলেছেন |
• *প্রাথমিক স্তরে ভাষা শিক্ষা দানের পদ্ধতি হল:
• *বর্ণক্রম পদ্ধতি (Alphabetic Method):- এই পদ্ধতিতে শিশুকে একের পর এক বর্ণ শিক্ষা দেওয়া হয়। প্রথমে স্বরবর্ণ পরে ব্যঞ্জনবর্ণ, তারপর মাত্রা চিহ্নগুলি উদাহরণ সহযোগে বোঝানো হয় |
• *শব্দক্রম পদ্ধতি (Word Method):
একেবারে পরিচিত শব্দ ধরে ধরে পরিচিতি করাতে হবে যেমন আ দিয়ে -আম আলু | শুধু শব্দ জানালে হবে না, শব্দের অর্থও জানাতে হবে |
• *বাক্যক্রম পদ্ধতি (Sentence Method):
এই পদ্ধতিতে শিশুর পরিচিত শব্দ দিয়ে ছোট ছোট বাক্য গঠন করার কৌশল শেখাতে হবে। যেমন- আমি ভাত খাই |
*ধ্বনিসাম্য পদ্ধতি (Phonetic Method):
এই পদ্ধতিতে প্রত্যেকটি ধ্বনিসাম্যযুক্ত শব্দ গুলি দ্বারা ভাষা শিক্ষা দিতে হবে | যেমন জল,ফল,কল,চল,মল ইত্যাদি
*গল্প বলা পদ্ধতি (Story telling Method):শিশুদের আকর্ষণীয় গল্প বলার মাধ্যমে শিক্ষাদান করতে হবে। গল্পগুলি হবে শিক্ষামূলক, হবে সহজ সরল, থাকবে চিত্রধর্মিতা ,গল্পের বিষয়বস্তু আয়তন শিশুদের বয়সের উপযোগী হবে |
• *দেখা ও বলা পদ্ধতি ( Look & Say Method):
শিশুকে কোন ছবি, বস্তু,প্রাণী, গাছ প্রভৃতি ছবি দেখিয়ে সেগুলির নাম বলতে বলা | শিক্ষককে বারবার উচ্চারণ করে বস্তুটি ধ্বনিরূপ শিক্ষার্থীর অন্তর রূপে অন্তরে গেঁথে দিতে হবে |
*আবৃত্তি পদ্ধতি (Recitation Method):ছড়া সহজেই শিশুদের আকর্ষণ করে | শিক্ষার্থীদেরও ধীরে ধীরে আবৃতি শেখাতে হবে| । সুষ্ঠু উচ্চারণ, শ্বাসাঘাত, ছন্দ, জ্যোতিচিহ্ন লক্ষ্য রেখে আবৃত্তি করতে হবে | শিক্ষকের স্পষ্ট ও যথার্থ উচ্চারণ শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করে |
*লিঙ্গাফোন পদ্ধতি (Linguaphone Method):
কিছু বিশুদ্ধ পাঠরেকর্ড করে শিশুদের বারবার শুনিয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়, শিক্ষক শিক্ষার্থীদের চাহিদা রুচি বয়স সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের শিক্ষা দেবেন। পাঠদান চলাকালীন পাঠ পরিকল্পনা ও শিক্ষা সহায়ক উপকরণ ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি |
*নিম্ন মাধ্যমিক স্তর (Upper Primary Level):
• বিদ্যালয় স্তরের ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম হল নিম্ন-মাধ্যমিক পর্যায়। শিক্ষার্থীদের গড় বয়স 11-14 বছর।
*এইস্তর বয়ঃসন্ধিকালের স্তর।এই স্তরে নানা চাহিদ৷ দেখা যায়— স্বাধীনতা ও সাক্রিয়তার চাহিদা, আত্মপ্রকাশের চাহিদা, আত্মনির্ভরতার চাহিদা,নীতিবোধের চাহিদা |
*শিক্ষার্থীকে সৃজনশীল সাহিত্য রচনায় উৎসাহিত করতে হবে। ‘ছোটো গল্প রচনা করার দিকে নজর দিতে হবে।
*দেওয়াল পত্রিকা, সাময়িক পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে তাদের প্রবৃত্তিসমূহের উন্নয়ন ঘটানো।
*শিক্ষাদানের সঙ্গে সঙ্গে ছবি আঁকার প্রতি যত্ন নিতে হবে।