17/01/2022
সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতা (প্রাচীন ভারত)
সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতা : সিন্ধু সভ্যতা হল প্রাচীন সভ্যতা । এটি বিস্তার লাভ করেছিল সিন্ধু নদের তীরে যা বর্তমানে । পাকিস্তানের অন্তর্গত এবং উত্তর – পশ্চিম ভারতের ঘর্ঘরা ও হরকা নদীর তীরবর্তী অণ্ডলে ।। এর মধ্যে একটি হল হরপ্পা সভ্যতা এবং এই সভ্যতার নিদর্শন হরপ্পা শহর খনন করে পাওয়া গিয়েছে ।
ঘর্ঘরা – হরকা নদীর তীরবর্তী সভ্যতাকে সরস্বতী – সিন্ধু সভ্যতাও বলা হয় । ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে । আর . বি . দয়ারাম সাহানি ইরাবতী নদীর তীরবর্তী – হরপ্পা সভ্যতা প্রথম আবিষ্কার করেন । ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সিন্ধু নদীর তীরবর্তী অঞল খনন করে মহেনজোদারাে যার অর্থ ‘ মৃতের স্তুপ আবিষ্কার করেন । এই দুটি বিষয়েই স্যার জন মার্শাল প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন ।
হরপ্পা সভ্যতা ভারতের প্রকৃত ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে এবং ব্রোঞ্জ যুগের প্রচলন উদঘাটন
ভূমধ্যসাগর অস্ট্রেলীয় আলপাইন তীরবর্তী অঞলে ঘন জনবসতি গড়ে ওঠে কিন্তু প্রথম দুটি অঞ্চলে ঘন জনবসতি উল্লেখযােগ্য ছিল ।
এই অঞ্চলের একশােরও বেশি অঞ্চলে খনন কার্য চালিয়ে সভ্যতার উদঘাটন করা হয় ।
বিজ্ঞানভিত্তিক রাসায়নিক পদ্ধতির দ্বারা এই সভ্যতার শুরু হয়েছিল ২৫০০ – খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে ।
তখন তামা , রুপাে , ব্রোঞ্জ এবং সােনা প্রভৃতির প্রচলন ছিল কিন্তু লােহা ধাতুর প্রচলন ছিল না।
সিন্ধু সভ্যতার ভৌগােলিক বিস্তার ( Geographical Extent ) :
পাঞ্জাব , সিন্ধুপ্রদেশ , বালুচিস্তান , গুজরাট , রাজস্থান , উত্তরপ্রদেশের পশ্চিমাংশের বেশ কিছু অঞ্চলের অন্তর্গত ছিল । জম্মুর উত্তরে মানডা , দক্ষিণে দৈমাবাদ , উত্তরপ্রদেশের পশ্চিমে আলমগিরপুর থেকে পশ্চিমে বালুচিস্তানের সাকতাজেনদর ( Suktagendor ) পর্যন্ত এই সভ্যতা বিস্তার লাভ করেছিল ।
পাকিস্তানের প্রধান অঞলগুলি হল , পশ্চিম পাঞ্জাবের ইরাবর্তী নদীর তীরের হরপ্পা , সিন্ধু নদীর তীরের মহেনজোদারাে , সিন্ধু নদীর তীরের চানহু পর্যন্ত । ভারতের প্রধান অঞ্চলগুলি হল । লােথাল , গুজরাটের রংপুর , এবং সুরকোড়া , রাজস্থানের কালিবংগান , হিসারের বানওয়ালি এবং উত্তরপ্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলের আলমগিরপুর পর্যন্ত ।
ডক্টর জে . পি . যােশি এবং ডক্টর আর . এস , বিস্ত – এর তত্ত্বাবধানে বৃহত্তম এবং সর্বশেষ আবিষ্কৃত অঞ্চলটি হল গুজরাটের ঢেলাভিরা ।
সিন্ধু সভ্যতার শহর পরিকল্পনা ( Town Planning ) :
নর্দমার ঝাঝরি প্রথার মাধ্যমে শহর পরিকল্পনার উন্নতি সাধন করা হয়েছিল । দুভাগ করে রাস্তা তৈরি করে ত্রিভুজাকার ও বর্গাকারভাবে শহরকে অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছিল । রাস্তার বাতিস্তম্ভ তৈরি করে বাতিদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল । বাড়িগুলির পাশে রাস্তা , গলি সব পরিকল্পনা মাফিক করা ছিল ।
পাকা বাড়ি তৈরির রসদ হিসাবে পােড়া ইট ব্যবহার করা হত । এর সঙ্গে সঙ্গে কাচা ইটের বাড়িও তৈরি করত ।
বাড়িগুলাে একতলা ও দুতলা বিশিষ্ট ছিল কিন্তু এগুলি একই রকমের ছিল । একটা বর্গাকার অঞ্চলের মধ্যে অনেক ঘর থাকত । রাস্তার সামনের দিকে কোনাে জানালা রাখত না । শৌচালয়গুলি ছিল টালি দিয়ে অলংকৃত ।
নর্দমার মাধ্যমে জলনিকাশি প্রথা খুব ভালাে ছিল । পরিষ্কার করার জন্য চুন , সুরকি বালি ও জিপসাম দিয়ে নর্দমাগুলি তৈরি করা হত এবং যেগুলাে ইটের বড়াে বড়াে খণ্ড দিয়ে ঢাকা থাকত । এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য রক্ষার বিশেষ নিদর্শন সূচিত হয় ।
শহরগুলি উচ্চতর ও নিম্নতর – এই দুইভাগে ভাগ করা ছিল ।
শহর রক্ষার জন্য দুর্গ হিসাবে ৩০ থেকে ৫০ ফুট উচু এবং প্রায় ৪০০ গজ থেকে ২০০ গজ পর্যন্ত কৃত্রিম মঞ্চ নির্মাণ করা হত । দেয়াল কাঁচা ইট দিয়ে ঘেরা হত ।
কৃত্রিম দুর্গের মধ্যে থাকত সরকারি বাসস্থান , শস্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা , গুরুত্বপূর্ণ কারখানা , উপাসনা গৃহ । নিম্নতর অঞলে লােকেরা বসবাস করত ।
মহেন – জো – দরােতে ১২ মিটার লম্বা ৭ মিটার চওড়া এবং ২.৪ মিটার গভীর একটি জনসাধারণের জন্য স্নানাগারের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে । এই স্নানাগারে সিড়ি ব্যবস্থা ছিল এবং কয়েকটি রুমে বিভক্ত ছিল । সম্ভবত এটি ধর্মীয় স্নানের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত ।
যদিও মহেনজোদারাের সবচেয়ে বড়াে নিদর্শন হল বৃহৎ শস্যগােলা বা Granary ( 45.71-15.23m ) ।
সিন্ধু সভ্যতার কৃষিব্যবস্থা :
সিন্ধু নদের উপত্যকায় লােকেরা নভেম্বরে জমির বন্যার জল চলে যাওয়ার পরে গম ও যবের বীজ বপন করত এবং এপ্রিল মাসে শস্য কেটে ঘরে তুলত । এখানকার অধিবাসীরা গম , যব , সরিষা , কড়াই , রাই , ধান , তুলা , খেজুর এবং তরমুজের চাষ করত । সিন্ধু সভ্যতার লােকেরাই প্রথম তুলা চাষ করতে শেখে ।
কাঠের লাঙল দিয়ে কালিবংগান অঞ্চলের লােকেরা কৃষিজমি আবাদ করতে শেখে ।
বিরাটাকারে গৃহপালিত পশুপালন করতে শেখে । গােরু পালনের পাশাপাশি তারা কুকুর পুষতে লাগল । ঘােড়া সব সময় তারা ব্যবহার করত না , কিন্তু হাতি ব্যবহার করত ।
সুরকোতদা ঘােড়া ও কুকুর এবং রােপার অঞ্চলে মানুষদের সঙ্গে তাদের কবর আবিষ্কৃত হয়েছে ।
জীবনযাপনের জন্য তারা প্রচুর পরিমাণে ফসল ফলাত ।
খামারবাড়িতে তারা শস্যদানা গুদামজাত করত ।
সিন্ধু সভ্যতার যুগে ব্যাবসা – বাণিজ্য :
অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্য তখনকার সময়ে বেশ সুদৃঢ় ছিল । তখন ধাতব মুদ্রার কোনাে প্রচলন ছিল না । সব ব্যাবসা – বাণিজ্য চলত বিনিময় প্রথার মাধ্যমে ।
হরপ্পা সভ্যতার সময় ওজন ও পরিমাপ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হত । চুনাপাথর প্রভৃতি দিয়ে ওজনের পরিমাপ নির্দিষ্ট করা হত এবং বাটখারাগুলি ছিল কীলক আকারের ( Cubical ) ।
পরিমাপের একক ছিল ১৬ ; যেমন ১ , ২ , ৪ , ৮ , ১৬-৩২-৬৪ এই ভাবে ভাগ ছিল ।
মসৃণ যন্ত্রপাতি , শাখ , গয়না , কাপড়িশ প্রভৃতির কাজ শিখেছিল ।
এগুলির কাঁচামাল বিভিন্ন দেশ থেকে আসত যেমন – উত্তর কর্ণাটক থেকে সােনা ও রুপাে , আফগানিস্তান এবং ইরান থেকে গাঢ় নীল রঙের মুল্যবান পাথর , বালুচিস্তান ও ক্ষেত্রি থেকে তামা আসত ।
চানহুড়াে এবং লােথালে পুঁতির মালা তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে এবং এগুলি বিদেশে রপ্তানিও করা হত ।
লােথালে বন্দরের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে । রংপুর , সােমনাথ এবং বালাকোট সমুদ্র বন্দরের সন্ধান মিলেছে । বিদেশে যাওয়ার পথ ছিল সাতকাজেনদড় ও সাতকাহাে । অভ্যন্তরীণ পরিবহনের মাধ্যম ছিল গােরুর গাড়ি ।
প্রত্যেক ব্যবসায়ী তাদের নিজস্ব সিলমােহর ব্যবহার করত । সিলমােহরে থাকত ধর্মীয় কোনাে বৈশিষ্ট্য এবং এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ লেখা থাকত । হরপ্পার সিলমােহর শক্ত পাথরে বর্গাকারে তৈরি ছিল ।
সম্ভবত এই সিলমােহরের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল নিজ নিজ সম্পত্তির মালিকানার অধিকার বজায় রাখা । রক্ষাকবচ হিসাবে এটি ব্যবহার করত ।
সিন্ধু সভ্যতার শিল্প ও হস্তশিল্প ( Artand Craff ) :
হরপ্পা সভ্যতা আমলে ব্রোঞ্জ যুগের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে ।
টিন ও তামা ধাতু মিশিয়ে ব্রোঞ্জ তৈরি হয় । তামা এবং ব্রোঞ্জ দিয়ে যন্ত্রপাতি তৈরি হত । রাজস্থানের ক্ষেত্রি অঞ্চল ও বালুচিস্তান থেকে তামা পাওয়া যেত এবং আফগানিস্তান থেকে টিন পাওয়া যেত ।
সেসময় সাধারণত সুতির পােশাক ব্যবহার করা হত কিন্তু শীতকালে পশমের পােশাকেরও প্রচলন ছিল ।
তারা সােনা , রূপাে , হাতির দাঁতের , তামা , ব্রোঞ্জ এবং মূল্যবান পাথরের অলংকার পরত । স্ত্রী পুরুষ সকলেই অলংকার পরত । স্ত্রীলােকেরা বালা , হার , কানের দুল প্রভৃতি ব্যবহার করত । তারা পুঁতির তৈরি গয়না তৈরিতে খুব দক্ষ ছিল ।
মাটির বাসনপত্র তৈরির জন্য চাকা ব্যবহার করত । কালাে এবং লাল রঙের বাসনপত্রের প্রচলন ছিল । তখনকার সময়ে পাশা খেলার প্রচলন ছিল । জুয়া খেলার প্রচলন ছিল । খােদাই কাজ এবং জন্তুজানােয়ারের সিলমােহর প্রচলনই হরপ্পা সভ্যতার উল্লেখযােগ্য শিল্পের কৃতিত্ব । লাল বেলে পাথরের নির্মিত মানুষের প্রতিমূর্তি প্রকৃতই চিত্তাকর্ষক ছিল । ব্রোঞ্জের তৈরি সুন্দরী নৃত্যরত দেবদাসী – র মূর্তিরও এখানে সন্ধান পাওয়া গিয়েছে ।
শিশুদের জন্য ঘুরন্ত মাথা বিশিষ্ট জীবজন্তুর বাচ্চার মূর্তি তৈরি করত , দড়ির ওপর হেলে থাকা খেলনা , বাঁদর , ছােটো খেলনা , গােরুর গাড়ি , পাখি প্রভৃতি । মাটির মূর্তি আগুনে পুড়িয়ে তৈরি করত ।
সিন্ধু সভ্যতার ধর্মীয় জীবন ( Religious Life ) :
মাতৃ দেবীর পুজো করাই মূল উদ্দেশ্য ছিল । উচ্চবর্ণের লােকেরা পশুপতি শিবের মতাে উলঙ্গ দুই শিং বিশিষ্ট দেবতার পুজো করত । তাদের শিলমােহরে শিংওয়ালা তিন মাথা বিশিষ্ট যােগীর মূর্তি শােভা পেত । এই মূতিটি হাতি , বাঘ ও গণ্ডার দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকত এবং সিংহাসনের নীচে এক মহিষ থাকত । পায়ের নীচে দুটি হরিণ থাকত । পশুপতিনাথ আসলে পুরুষ দেবতার প্রতীক ছিল ।
লিঙ্গ এবং যােনি পুজোও ছিল অসাধারণ ।
বিভিন্ন গাছ , ষাঁড় , ঘুঘু , পায়রা এবং পাথরের পুজো করত । এক শিংওয়ালা ঘােড়ারও পুজো করা হত । পুতুল পুজোর প্রচলন ছিল কিন্তু কোনাে মন্দিরের সন্ধান পাওয়া যায়নি ।
কালিবংগান এবং লােথাল – এ আগুনের বেদির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে । মৃতদেহ সৎকারের কোনাে সঠিক সন্ধান পাওয়া যায়নি — তিন রকম ভাবে মৃতদেহ সৎকারের হদিশ পাওয়া গিয়েছে । যেমন পুরােপুরি সমাধিস্থ করা , সমাধির পরে পশুপাখিকে দিয়ে খাওয়ানাে এবং মৃতদেহ দাহ করা । মৃতদেহের ভস্ম পাত্রে সংরক্ষিত করে রাখত । এই তৃতীয় প্রথার সন্ধানই সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে পাওয়া গিয়েছে । হরপ্পার একই স্থানে কবরস্থ করা হত । সেখানকার মানুষেরা ভূত প্রেতে বিশ্বাস করত । মৃতদেহগুলি উত্তর – দক্ষিণ দিকে করবস্থ করা হত ।
সিন্ধু সভ্যতার লিপি ( Script ) :
তখনকার লিপিগুলি বর্ণমালার আকারে ছিল না প্রায় ছয়শাের মতাে ছবির সংকেতে ছিল । এই লিপিগুলি ঠিকমতাে উদ্ধার করা যায়নি । এগুলির প্রথম লাইন ডান দিক থেকে বাম দিকে এবং দ্বিতীয় লাইন বামদিক থেকে ডান দিকে লেখা হত । এই পদ্ধতিকে ‘ বৌস্ট্রোফেডন ’ ( Boustrophedon ) বলা হত ।
সিন্ধু সভ্যতার রাজনৈতিক সংগঠন ( Political Organization ) :
সিন্ধু সভ্যতার আমলের লােকেদের রাজনীতির বিষয়ে সেরকম কোনাে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায় । প্রধানত তারা ব্যাবসা – বাণিজ্য বিষয়েই সচেতন ছিল এবং এক শ্রেণির ব্যবসায়ী তাদের নিয়ন্ত্রণ করত ।
তারা সর্বদা সাংগঠনিকভাবে থাকত । এখানকার নাগরিকদের মধ্যে পৌরসভা বা পুর সমিতির নমুনা পাওয়া যায় ।
সিন্ধু সভ্যতার হরপ্পার গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহ ( Important Harappan Sites ) :
হরপ্পা –
এই অঞ্চল খনন করে বিশেষ বিশেষ যে স্থানগুলি পাওয়া গিয়েছে সেগুলি হল ( ক ) দুই সারিতে ছয়টি করে ইট দিয়ে বাঁধানাে শস্য সংরক্ষণের স্থান । এই বারােটি স্থান মহেনজোদারােতে পাওয়া বিরাট শস্যাগারের সমান । ( খ ) কফিন – এর সাহায্যে সমাধিক্ষেত্রে কবরস্থ করা হত । ( গ ) এক কক্ষ বিশিষ্ট রক্ষী নিবাস । ( ঘ ) মেসােপটেমিয়ার সঙ্গে সরাসরি ব্যাবসা – বাণিজ্যের আদান – প্রদান । ( ঙ ) লাল বেলে পাথরের তৈরি মস্তকহীন পুরুষের মূর্তি । ( চ ) পাথরের মধ্যে স্ত্রী জননেন্দ্রীয় – এর চিহ্ন ।
মহেনজোদারাে –
মহেনজোদারাের মাটি খুঁড়ে পাওয়া নিদর্শনগুলি হল ( ক ) মহাবিদ্যালয় , বহুস্তম্ভ বিশিষ্ট জনসাধারণের জন্য হল ঘর । ( খ ) বিরাটাকার স্নানাগার , এটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সাধারণের জন্য ব্যবহৃত স্নানাগার । ( গ ) এখানকার সর্ববৃহৎ শস্যাগার ।। ( ঘ ) বস্ত্র বয়নের টাকু , উঁচ প্রভৃতি । ( ঙ ) অস্পষ্ট ঘােড়ার নিদর্শন । ( চ ) পাথরের তৈরি মেসােপটেমিয়ার পাত্র । ( ছ ) মেসােপটেমিয়ার সঙ্গে সরাসরি ব্যাবসা – বাণিজ্যের আদানপ্রদান । ( জ ) ব্রোঞ্জের তৈরি নৃত্যরতা বালিকার মূর্তি । ( ঝ ) কিছু অধিবাসীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হিসাবে পাকৃত কঙ্কাল আবিষ্কার । ( ঞ ) দেবী জঠরে বর্ধিত চারাগাছ – এর চিহ্ন সহ সিলমােহর এবং পুরুষের হাতে ছুরি সহ স্ত্রী লােককে হত্যা করার দৃশ্য সহ সিলমােহর । ( ট ) গোঁফ দাড়ি বিশিষ্ট পুরুষ মূর্তি । ( ঠ ) পশুপতি শিবের ছবি সহ সিলমােহর ।
কালিবান –
কালিবঙ্গান হল হরপ্পার একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর । ‘ কালিবঙ্গান ‘ শব্দটির অর্থ হল কালাে বালা । প্রথমদিকে খনন কাজ চালিয়ে চাষ দেওয়া কৃষিতে আবিষ্কৃত হয়েছে । এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার । খনন কাজ চালিয়ে নীচের নিদর্শন গুলি পাওয়া গিয়েছে । ( ক ) কাঠের তৈরি লাঙলের ফাল । ( খ ) সাতটি অগ্নিবেদির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে যা ধর্মীয় বলিদানের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত । ( গ ) ইটের পাঁচিল দিয়ে দুর্গগুলি এবং শহরের উঁচুনীচু অঞ্চলগুলি ঘেরা ছিল । ( ঘ ) উটের হাড় – এর নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে । ( ঙ ) সুসজ্জিত টালি বেষ্টিত বৃত্তাকার স্থানের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে । ( চ ) লম্বা ডিম্বাকার চোখ , মােটা ঠোট , চওড়া কপাল এবং দীর্ঘ সূচালাে নাক বিশিষ্ট মানুষের মাথার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে । ( ছ ) দুই ধরনের সমাধিক্ষেত্র ছিল । যেমন – বৃত্তাকার ও ত্রিভুজাকার সমাধিক্ষেত্র ।
লােথাল –
হরপ্পা সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর হল লােথাল । এই শহরটির পরিকল্পনা হরপ্পা ও মহেন – জো , দারাে থেকে পৃথক ধরনের ছিল । ছয়টি ভাগে এই শহরটিকে ভাগ করা হয়েছিল । কাঁচা ইট দিয়ে এই ভাগগুলিকে ভাগ করা ছিল । ১২ ফুট চওড়া ২০ ফুট লম্বা রাস্তা দিয়ে পৃথক করা ছিল । খননকাজের ফলে আরও কিছু নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে । যেমন ( ক ) আমেদাবাদের কাছে রংপুরে ধানের তুষ এর নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে । ( খ ) কৃত্রিম নৌবন্দরের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে । ( গ ) মাটির টেরাকোটা কাজের ঘােড়ার মুর্তির সন্ধান মিলেছে । ( ঘ ) কাপড়ের উপর সিলমােহরের ছাপ পাওয়া গিয়েছে । ( ঙ ) মেসােপটেমিয়ার সঙ্গে সরাসরি ব্যাবসা – বাণিজ্যের আদানপ্রদান – এর প্রচলন ছিল । ( চ ) বাড়িতে প্রবেশ করার দরজা প্রধান রাস্তার দিকে মুখ করা ছিল । ( ছ ) সিলমােহরে জলজাহাজের ছাপের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে । ( জ ) টেরাকাটা কাজে জলজাহাজের ছবির নিদর্শন ছিল । ( ঝ ) পঞতন্ত্রে বর্ণিত ধূর্ত খেকশিয়ালের ছবি পাত্রের উপর আঁকা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে । ( ঞ ) একই সমাধির মধ্যে পুরুষ ও স্ত্রীলােকের দেহের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে । ( ট ) দাবা খেলার প্রচলনের নিদর্শন মিলেছে । ( ঠ ) ৪৫ ° , ৯০ ° ও ১৮০ ° কোণ পরিমাপের যন্ত্র – এর সন্ধানও এখানে পাওয়া গিয়েছে ।
চানহুড়াে –
এই অঞ্চল খনন করে তিন রকম সংস্কৃতির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে । এই তিনটি সংস্কৃতি হল সিন্ধু সংস্কৃতি , ঝুকার সংস্কৃতি এবং ঝংকার সংস্কৃতি । এই অঞ্চলগুলিতে হরপ্পার বিভিন্ন রকমের । কারখানার অবস্থিতি ছিল । এখানে সিলমােহর , খেলনা এবং হাড়ের তৈরি সামগ্রী তৈরি হত । এই অঞলে কোনাে দুর্গ ছিল না । ব্রোঞ্জের মূর্তি , গােরুর গাড়ি , এক্কাগাড়ি , ছােটো পাত্র , হাতির পায়ের ছাপ এবং একটা কুকুর বিড়ালকে তাড়া করছে এরকম ছবির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে ।
আলমগিরপুর –
সিন্ধু সংস্কৃতির পূর্বদিকের সীমায় আলমগিরপুর অবস্থিত । হরপ্পার অন্যান্য অঞ্চলের মতাে এই অঞলেও বিক্রয়যােগ্য পণ্যদ্রব্যের সন্ধান মিলেছে আবার অনেকে বলেছেন হরপ্পা সংস্কৃতির পরবর্তীকালে এই অঞ্চলের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে । কাপড়ের উপর আঁকা ঢাকনা বিহীন লম্বা সরু পাত্রের নিদর্শন এখানে পাওয়া গিয়েছে ।
কোডজি –
কোবডজি প্রাক হরপ্পীয় স্থান হিসাবে পরিচিত । প্রাক হরপ্পীয় যুগের বাজেয়াপ্তযােগ্য উপনিবেশ হিসাবে ধারণা দেয় । এখানকার বাড়িঘরগুলি ছিল পাথরের তৈরি । কোডজির অস্তিত্ব ছিল তৃতীয় সহস্র খ্রিস্টপূর্বের প্রথম দিকে । খনন করে জানা গিয়েছে যে – কোনাে যুদ্ধ বিগ্রহের ফলেই এই শহরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল ।
আমরি –
আমরিও প্রাক হরপ্পীয় উপনিবেশ হিসাবে পরিচিত । এই সময়ে দুর্গ নির্মাণ – এর অভাব লক্ষিত হয়েছে । আমরির বিশেষত্ব হল যে প্রাক হরপ্পীয় ও পরবর্তী হরপ্পীয় সভ্যতার মধ্যে যুগ পরিবর্তনের কাল । এই সময়কালে গণ্ডারের উপস্থিতি , ঝংকারের সংস্কৃতির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে ।
রােপার –
রােপার অঙ্কুলেই প্রাক হরপ্পীয় এবং তৎকালীন হরপ্পার সংস্কৃতির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে । মাটি এবং পাথর দিয়ে এখানকার বাড়িঘরগুলি প্রধানত তৈরি হত । এখানকার উল্লেখযােগ্য আবিষ্কারগুলি হল – বাসনপত্র , গয়নাপত্র , তামার কুঠার , টাডা ফলা , মাটির তৈরি টেরাকোটা ফলা , সিলমােহর , বিশেষ ধরনের চিত্র , ডিম্বাকৃতি গর্তের মধ্যে সমাধিক্ষেত্র এবং ত্রিভুজাকৃতি কাচা ইটের তৈরি কক্ষ বিশেষ । এখানে মানুষের সমাধির সঙ্গে একটি কুকুরের সমাধিও দেওয়া হত । এটা অবশ্য কাশ্মীরের বার্জহােম অঞ্চলে প্রচলন ছিল , হরপ্পার অন্যান্য অঞ্চলে এর সেরকম প্রচলন ছিল না।
বানওয়ালি –
হরিয়ানার হিসার জেলায় বানওয়ালি অবস্থিত , খননকাজের পর এখানে দুই – রকমের সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে । প্রথমটি হল প্রাক হরপ্পীয় এবং পরবর্তী হরপ্পীয় সভ্যতা । যদিও দ্বিতীয় পর্যায় হরপ্পা সভ্যতায় দাবা খেলার বাের্ড , শহরের ঝাঝরি প্রথার প্রচলন সব জায়গায় দেখা যায় নি । রাস্তাগুলি সবসময় সােজাসুজি ছিল না এবং এগুলি সমকোণ অবস্থায় বিভক্ত ছিল । না । এখানকার বিশেষত্ব হল সুশৃঙ্খল নিকাশি ব্যবস্থা । খনন করার সময় উচ্চ ধরনের শস্য যব – এর সন্ধান পাওয়া গিয়েছে । অন্য উল্লেখযােগ্য যেসব বস্তু এখানে পাওয়া গিয়েছে সেগুলি হল – সিরামিক শিল্প , সিলমােহর এবং সিন্ধু লিপির বিশেষ ধরনের সিলমােহর ।
সুরকোতদা –
গুজরাটের কচ্ছ অর্থাৎ ভুজ জেলায় সুরকোটাডা অবস্থিত । ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে জে . পি . যােশি এই অল খনন করে আবিষ্কার করেন । সারকোডাটা হল হরপ্পা অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ উপনিবেশ । এই অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ হল এখানেই প্রথম ঘােড়ার হাড় – এর সন্ধান পাওয়া যায় । একটি সমাধিক্ষেত্রে চারটি পাত্রসহ বেশ কিছু মানুষের হাড় – এর সন্ধান মিলেছে । এখানে বিরাটাকার পাথরখণ্ডের মধ্যে সমাধির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে যা তখনকার দিনে বিরল ছিল ।
সাতকাজেন্দর –
এই অঞ্চলটি বর্তমান পাকিস্তানের অন্তর্গত সিন্ধু অঞ্চলে অবস্থিত । এই শহর সিন্ধু সভ্যতার যুগে এক উপকূলবর্তী শহর । এখানে দ্বি – স্তর বিশিষ্ট শহর পরিকল্পনার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে ।। একটি হল দুর্গ প্রধান এবং অপরটি হল নিম্নস্তর শহর । কথিত আছে যে এই অঞ্চলটি আসলে একটি বন্দর ছিল । উপকূলীয় উন্নতির প্রভাবে এই অঞ্চলটি শহর – এ পরিণত হয় ।
সিন্ধু সভ্যতার যুগের অবসান :
প্রায় একহাজার বছর হরপ্পা সভ্যতা টিকে ছিল ।
আর্যদের আগমন , উপর্যুপরি বন্যা , হরপ্পাবাসীগণের সামাজিক অবস্থার ভাঙন , ভূমিকম্প প্রভৃতিই হল হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসের কারণ ।