12/07/2025
ছাত্রীটির জন্য মন খারাপ, আপনারাও পরামর্শ দিতে পারেন…
📝Kajalkanti Karmakar[M>9933066200]: আজ(১২ জুলাই ২০২৫, শনিবার) আমার মনটা খুব ভারাক্রান্ত। ঘাটাল বসন্তকুমারী বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক ছাত্রীর ফোনকল আমাকে এক চরম বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। আমার ফোন নম্বর অনেকের কাছেই রয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়াতে দেওয়া থাকে, ছাত্রীটি তার এক পরিচিত দিদির কাছ থেকে নম্বর সংগ্রহ করে আমাকে খুব ভয় ভয় করে ফোন করেছে বলে জানাল। ওর কথাগুলো শুনে মনে হল যেন এক বুক চাপা কষ্ট আর হতাশা নিয়ে ও আমাকে কিছু বলতে চেয়েছে। ওর প্রতিটি শব্দে ছিল এক অব্যক্ত যন্ত্রণা, যা আমার হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করেছে। তবে সমস্ত কথা বলার পর জানতে পারলাম, ছাত্রীটি চেয়েছিল তার পরিচয় গোপন রেখে তার বর্তমান পরিস্থিতিটি সোশ্যাল মিডিয়া তুলে ধরতে, যদি তাতে কিছুটা সমাধান হয়! কিছু অভিভাবক সচেতন হন।
👧ছাত্রীটি জানাল, ওর বাড়ি কুশপাতা এলাকায়। বসন্তকুমারী বালিকা বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে। বাবার ঘাটাল শহরের বাজারে ছোট একটা দোকান আছে। সেই দোকানের সামান্য আয় দিয়েই কোনোমতে তাদের সংসার চলে। এর ওপর আছে দুই ভাইবোনের পড়াশোনার খরচ, যা তাদের কাছে এক বাড়তি বোঝা। তাই প্রয়োজন মতো টিউশনিও সে পায়নি। এই কঠিন বাস্তবতা সে পুরোপুরি উপলব্ধি করে। তাই এই বয়সে যখন ওর বান্ধবীরা, সহপাঠীরা দামী পোশাক পরে রেস্তোরাঁয় খেতে যায়, মুঠো মুঠো হাত খরচ করে, তখনও সে কখনও প্রভাবিত হয়নি। নিজের পরিস্থিতি মেনে নিয়েই সে এগিয়ে চলেছে।
কিন্তু ওর আসল আক্ষেপ অন্য জায়গায়। যেখানে বাবা দিনরাত এক করে পরিশ্রম করছেন, ঘাম ঝরাচ্ছেন পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে, সেখানে ওর মা মেতে আছেন ফেসবুক রিল আর ভ্লগিং-এর জগতে। বাড়ির কাজগুলো দায়সারাভাবে সেরে মোবাইল নিয়ে বসে পড়েন। যেন মোবাইলটাই তার একমাত্র জগৎ। রিলে নতুন নতুন পোশাক দেখানোর জন্য বাবার সাথে ঝগড়া করে দামী চুড়িদার, কুর্তা কিনে নিতে বাধ্য করান। নিয়মিত মায়ের মোবাইলে রিচার্জের টাকাও বাবাকেই দিতে হয়। আর্থিক কারণে বাবা কখনো মায়ের এই সমস্ত দাবি পূরণ করতে না পারলে বাবাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুনতে হয়। বাড়িতে অশান্তি হয়, যা তাদের পড়াশোনার পরিবেশ সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়। এমনকি মা যখন রিল বা Vlog বানায় তখন তাদেরও বাধ্য হতে হয় রিল বানানোর জন্য ক্যামেরা ধরে দিতে! ইচ্ছের বিরুদ্ধে রিলের ‘সাইড রোল’ও করতে হয় ভাইবোনকে। মায়ের রিলে সহযোগিতা না করতে পারলে ভাই-বোনের কপালে জুটে ভর্ৎসনা।
মেয়েটি আরও জানালো যে এই সমস্যাটা শুধু তাদের বাড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়। ওর কয়েক জন বান্ধবী, সহপাঠীর মা, দিদি বা বউদিরাও নাকি ঠিক একইরকম আচরণ করেন। ফলে সহপাঠীরাও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। ওদের স্বপ্ন, বড় হয়ে বাবার কষ্ট লাঘব করবে, প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বাড়িতে যদি পড়াশোনার এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থাকে, তাহলে কিভাবে তারা পড়াশোনা করবে? মেয়েটা মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। ওর শেষ প্রশ্ন ছিল, "আমি কী করব? আমাকে পরামর্শ দিন।"
ওর এই প্রশ্ন আমাকে গভীর চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। একদিকে দারিদ্র্য, অন্যদিকে পারিবারিক অশান্তি—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে একটি নিষ্পাপ শৈশব। স্মার্টফোন যখন বিনোদনের মাধ্যম না হয়ে পারিবারিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়াটা খুবই দুঃখজনক। এই মেয়েটি সমাজের ব্যতিক্রম। কারণ নিজের মায়ের মতোই সে হতে পারতো, সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় হতে পারত। আর সেটাই স্বাভাবিক। ঘাটাল মহকুমায় অনেকেই তো মা, দিদি, বউদিকে নকল করে পড়াশোনা শিকেয় তুলে দিয়ে সপ্তম-অষ্টম শ্রেণি থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় Reel/Vlog করে চলেছে। বিভিন্ন রকম ফাঁ/দেও পড়ছে। ডিজিটাল জগৎ আমাদের জীবনে অনেক সুবিধা এনেছে ঠিকই, কিন্তু এর অতিরিক্ত লাগামহীন ব্যবহার কিভাবে একটি পরিবারের শান্তি কেড়ে নিতে পারে, এই ঘটনা তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
আমি তাকে গতানুগতিক কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছি, এর বাইরে আমার আর কিছু করারও ছিল না। কারণ, আমি এই বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে বাড়াবাড়ি করলে ছাত্রীটিকে পারিবারিক ভাবে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। কারণ, একজন সাংবাদিক হিসেবে আমার সঙ্গে সে যোগাযোগ করেছে সেটা কেউ জানতে পারুক সেটা সে চায় না। তাই তাকে শুধু বললাম—
✔️বাবার সাথে কথা বল: তোমার বাবার সাথে খোলামেলা কথা বলো। তাকে তোমার মায়ের এই আচরণের কারণে তোমাদের পড়াশোনার যে ক্ষতি হচ্ছে, তা বোঝাও। হতে পারে তিনি তোমার কথা শুনে কিছু একটা করার চেষ্টা করবেন।
✔️বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাহায্য নিতে পার: তোমার বিদ্যালয়ের কোনও পছন্দের শিক্ষিকার সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পার। অনেক সময় শিক্ষিকারা শিক্ষার্থীদের এই ধরনের সমস্যা সমাধানে সাহায্য করেন। প্রয়োজন হলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও পারিবারিক কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থা করতে পারে।
✔️আত্মীয়-স্বজনের সাহায্য নাও: তোমাদের এমন কোনও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় (তুত দাদা, জেঠু, মাসি, পিসি) আছেন কিনা যার কথা তোমার মা শোনেন, তার সাথে কথা বলতে পার। তিনি হয়তো তোমার মাকে বোঝাতে পারবেন।
✔️নিজের পড়াশোনায় মনোযোগ দাও: এটা কঠিন জানি, কিন্তু বাড়িতে অশান্তি হলেও তুমি নিজের পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করো।
✔️মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নাও: এই পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে সুস্থ থাকা খুব জরুরি।
✔️মায়ের সাথে শান্তভাবে কথা বলার চেষ্টা করো: যদিও এটা কঠিন, তবুও তুমি শান্তভাবে তোমার মাকে বোঝানোর চেষ্টা করতে পার যে তার এই আচরণ তোমাদের জন্য কতটা ক্ষতিকর। তবে এটা করতে গিয়ে যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, তবে জোর করো না।