26/09/2025
থুবড়ি
- অশোক বেরা
মাত্তামশাই ও মাত্তামশাই, আপনি বললেন--রামায়ণ রচনা করেছেন আল হাদিস। কিন্তু বাড়িতে বাবা রামায়ণের গল্প বলতে বলতে তো বলল- রামায়ণ লিখেছেন বাল্মিকী। মাস্টারমশাই বললেন বইটার লেখকের নাম তুমি নিজে দেখেছো? হ্যাঁ মাত্তামশাই নিজে দেখেছি। ও থুবড়ি খুবড়ি, তুমি ঠিকই বলেছো। তবে বলব কি তিনি ছিলেন একজন ঠাঁয়াড়ে ডাকাত। তাছাড়া গোটা রামায়ণ কাহিনীটা ছিল কাল্পনিক। রাম সীতা অন্যান্য চরিত্র পৃথিবীতে জন্মগ্রহণই করেননি। কারও না কারোর স্বার্থে এসব চরিত্র গল্প করার জন্য তৈরী করা হয়েছে। জানেন মাত্তামশাই আমার ঠাকুমার মাটির এক ভাঁড়ে মরচে ধরা সিঁদুর মাখানো তিন-চারটে বড় পয়সা দেখেছি। ঠাকুমা বলতো-- এই দ্যাখ, এতে রাম সীতা সিংহাসনে বসে আর হনুমানটা হাঁটু গেড়ে বসে প্রণাম করছে। ঠাকুমা আরো বলতো এইসব রাম রাজত্বের পয়সা। দেখছিস না এই যুগেও তো সব কয়েনে এমনটাই চলছে। মাস্টারমশাই বললেন সবই কাল্পনিক। ওসব তৈরীও করা যায়।
অষ্টম শ্রেণীতে পড়া এক ছাত্র বলে বসল মাস্টারমশাই, তাহলে এখনের যে পয়সায় গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, ইন্দিরা গান্ধী, নেতাজি সুভাষ, আম্বেদকরের ছবি কয়েনে যেটা আমরা এখনো দেখছি, এখন থেকে ১ থেকে ২ হাজার বছর পর তাহলে তখনের মানুষ কি আপনার মত বলবে এইসব কাল্পনিক? এইসব মানুষ পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণই করেনি? কিন্তু স্যার আমি বলিকি আমি না দেখলেও আমার বাবা দাদুর বয়স্করা সবাই ঐ মানুষদের দেখেছে এটা তো সত্য। মাস্টারমশাই শুনে বললেন তোমার দাদু যখন দেখেছেন তোমাদের বলেছেন তাহলে থুবড়ি থুবড়ি ভুলটা হচ্ছে আমারই।
যা দেবী আমি ভূতেষু মিথ্যা রুপেন সংস্কৃতা, নমতস্মৈ নমতস্মৈ নমতস্মৈ নমঃ নমঃ। পাশেই বসে গৃহকর্তা শুনে ব্রাহ্মণকে বললেন ও ঠাকুর মশাই, চণ্ডীপাঠটা ভুল করে পাঠ করছেন কেন। এতো সবটাই অমঙ্গলের লক্ষণ। আমি আপনাকে আনলাম গৃহস্থের মঙ্গলের জন্য, আপনি কিনা আমি ভূতেষু মিথ্যা রুপেন এইসব পাঠ করছেন। হবে তো সর্ব্বভূতেষু শক্তি রূপেন। হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিকই বলেছ বাবা। থুবড়ি-- থুবড়ি। ভুলটা হয়েছে তো আমারই। দ্যাখনা বয়সতো হয়েছে।
মার্কসবাদ লেলিনবাদ সর্ব্বহারার মতবাদ। এই শ্লোগানের রাজপথ উত্তাল। এক ভদ্রলোক স্লোগানধারী নেতাকে বললেন মার্কস বাদ লেলিন বাদ এইসব না হয় যুগের তালে বাদই দিলাম। কিন্তু সর্ব্বহারার মতটাকেও বাদ দিলেন? মার্কস লেলিনকে আমি সম্মান করি। সবাইকে যদি বাদই দিলেন আপনারা তাহলে কাকে ধরে রাখতে চাইছেন বলুন তো? সম্বিৎ ফিরে পেয়ে হাসতে হাসতে বললেন থুবড়ি থুবড়ি। অন্য আর এক ভাবনায় ডুবে থেকে আরে ভুলটা হচ্ছেতো আমারই।
গ্রাম্য হাটের পূর্ব দিকে রাস্তার এক কর্নারে মাথায় ঝাঁকরা চুলে ভরা আলুথালু অচেনা এক ব্যক্তি পথচারীকে বলল আচ্ছা ভাই, চা দোকানটা কোথায় বলতে পারেন? পথচারী বলল সোজা এই রাস্তাটায় গিয়ে হাটের মেন রাস্তা পাবেন। এই রাস্তায় কয়েক পা এগিয়ে ডান দিকে তাকালে দেখবেন সাইনবোর্ডে লিখা সরকারের চা দোকান। আবার দোকানের সামনে রাস্তার উল্টো দিকেই দেখবেন একই লোকের সরকার হোটেল। লোকটা ভাবল মন্দ নয় তো। সরকারি পরিষেবার এতো তুলনা হয় না। সাবাস সরকার সাবাস চা দোকানে উঠে লোকটা পাউরুটি কেক দামী বিস্কুট এমন কতো কি খেল। গল্পদারদের সঙ্গে গল্পেও মাতল। তারপর ভিড়ের মধ্যে লোকটা দোকানদারকে পয়সা না দিয়ে পান চিবুতে চিবুতে কখন আবার হাওয়াও হোল।
বেলা তখন সাড়ে বারোটা। লোকটা ঢুকলো সরকার হোটেলে। সিটে বসে হলদে ইউনিফর্ম পরা হোটেল কর্মীকে অর্ডার করল ফুল প্লেট ভাত ও মটন। পোস্ত বড়া ভাপা ইলিশ থাকলে দিন। হ্যাঁ, আমের কাসুন্দি অবশ্যই দিবেন। খাওয়া শেষে হাত ধুয়ে রুমালে হাত মুছতে মুছতে সরকারী হোটেল হলে যা হওয়ার কথা সরকার চা দোকানের মতোই হল এবং লোকটা রাস্তায় বেরিয়েও পড়ল।
হোটেল কর্মী হাঁক দিল-ওদাদা, খাওয়া সেরে পয়সা না দিয়ে চলে যাচ্ছেন? লোকটা বলল সরকারি হোটেলে পয়সা দেব কেন? ঐ তো সামনে সরকার চা দোকানে কতো কি খেয়ে বেরিয়ে এলাম। কেউ তো পয়সা চায়নি। যাক, এসব ছাড়ুন। আপনি ফাঁকি দিয়েছেন। এখন দুটি দোকানের বিল দিন আড়াইশো টাকা। অন্যথায় পুলিশে জানাবো। উত্তরে লোকটি বলল পদবী যে সরকার হয় এটা জানতাম না। থুবড়ি-থুবড়ি, সত্যিই তো ভুলটা হচ্ছে আমারই।
বয়স্ক গ্রামকর্তা খেয়ে হাত মুছে মৌরি চিবুতে চিবুতে বললো ওহে সরকার, সবই তো শুনলাম। আজকাল বিবেক বোধেরও যা হাল হয়েছে তাতে করে তোমাদের দুটি দোকানেরই সাইনবোর্ডকে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক যা হচ্ছে এবং আরো হবে এতো পিলে চমকে দিবার মত অবস্থা দেখছি। তবে বলি তোমাদের দুটি দোকানেরই সাইনবোর্ডটা পাল্টে একটু এদিক ওদিক করা যায় কিনা একটু ভেবোতো?