17/03/2026
১৯৬৪ থেকে শুরু হওয়া বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কার্যক্রম-- এসময় থেকে আমৃত্যু তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ প্রায় নির্ভুল, গণিতের মতো হিসেব করা।
১৯৬৩ সালের ডিসেম্বরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মারা যান। এই মৃত্যু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজনৈতিকভাবে নির্ভার করে। মওলানা ভাসানী কখনোই তাঁর রাজনৈতিক গুরু ছিলেন না, ভাসানীর রাজনীতি ছিলো আসামে আর বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি অবিভক্ত বাংলায়। ১৯৫৭ সালে ভাসানীর আলাদা হয়ে যাওয়া শেখ মুজিবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী আদতেই তাঁর গুরু। ভাসানীর ইসলাম ও কম্যুনিজমের মিশেল, খাজাদের সামন্তবাদ- এর বিপরীতে মুসলিম লীগের ভেতর আধুনিক নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি সোহরাওয়ার্দীই করতেন।
পাকিস্তানের রাজনীতিতে শেখ মুজিব যে সোহরাওয়ার্দীর একেবারে অনুগামী থেকেছিলেন তাও নয়। ভাষা আন্দোলন, সংখ্যা সাম্য নীতি নিয়ে তিনি সোহরাওয়ার্দীর উপর খুশী ছিলেন না। আইয়ুব খানের রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ সময়ে আওয়ামীলীগ গুটিয়ে এনডিএফ এর রাজনীতিও তাঁর পছন্দ ছিলো না। ১৯৬৩ সালে লন্ডনে ছুটে গেছেন- আওয়ামীলীগের কার্যক্রম শুরু করার অনুমতি পেতে। অনুমতি পাননি। সোহরাওয়ার্দী বড় নেতা, গোটা পাকিস্তান তাঁর ভাবনায় ছিলো। শেখ মুজিব অতো বড় নেতা নন, তাঁর চিন্তায় শুরু থেকেই শুধু বাংলা। বাংলার প্রশ্নে মতদ্বৈততা স্বত্বেও শেখ মুজিব কখনো সোহরাওয়ার্দীর মতের বাইরে যাননি। ধৈর্য্য ধরেছেন, অপেক্ষা করেছেন।
সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর থেকে শেখ মুজিব তাঁর অভিষ্ঠ লক্ষ্যে স্বাধীনভাবে চলা শুরু করতে পেরেছিলেন। আওয়ামীলীগকে পুনরুজ্জীবিত করা, কাউন্সিল অধিবেশনে পাকিস্তানপন্থী পুরনো নেতাদের বাদ দিয়ে একেবারে নিজের অনুগত নতুন নেতৃত্ব তুলে নিয়ে আসা, এবং ১৯৬৬ সালে ছয়দফা প্রণয়ন।
ছয়দফা ছিলো মাস্টারস্ট্রোক। যে কাজ কমিউনিস্টদের করার কথা ছিলো, সেটি করেছেন শেখ মুজিব। একেবারে সরল ভাষায় সারা দেশের মানুষকে বুঝিয়েছেন- বাংলা হচ্ছে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উপনিবেশ। এই উপনিবেশ থেকে মুক্তি পেতে হলে এই এই দাবী আদায় করতে হবে। ছয়দফা থেকে তাঁকে দমাতেই আগরতলা মামলা, ‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান। বের হয়ে এসে ছয়দফার ভিত্তিতেই ‘৭০ এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ।
ভাসানীকে ব্যবহার করে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর উদ্দেশ্য ছিলো নির্বাচন বানচাল করা। আইয়ুব খানের সময় একবার, ইয়াহিয়া খানের সময়ও আরেকবার ভাসানী ব্যবহৃত হয়েছেন। কিন্তু শেখ মুজিব অটল থেকেছেন- নির্বাচন হতেই হবে, কারণ এটিই জনগনের দেয়া বৈধ ম্যান্ডেট। তাঁর এই ম্যান্ডেটের প্রয়োজন ছিলো। নির্বাচনে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তিনি ছয়দফায় অটল থেকেছেন। পাকিস্তানী শাসকেরা তখন প্রমাদ গুনেছে। ছয়দফা বাস্তবায়ন মানে বাংলার স্বাধীকার শুধু নয় গোটা পাকিস্তান কাঠামোই ভেঙ্গে পড়া। ছয়দফা থেকে সরাতে পারেনি বলেই ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞের সূচনা।
২৫ মার্চ মধ্যরাতে, ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে যে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন তিনি কিন্তু কেবল আওয়ামীলীগের নেতা নন। তিনি গোটা পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের জন্য জনগণের নির্বাচিত নেতা। তাঁর আইনী ও নীতিগত বৈধতা পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের চেয়েও প্রবল। ফলে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও অনন্য। তাঁর সহকর্মীরা ১০ এপ্রিল তাঁকে রাষ্ট্রপতি করে যে সরকার গঠন করলেন সেটিই বৈধ সরকার। এই বৈধ সরকার, জনগণের নির্বাচিত সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছে- সেনাপতি, সেক্টর কমাণ্ডার থেকে শুরু করে সাধারন যোদ্ধা পর্যন্ত নিয়োগ দিয়েছে।
শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের নির্বাচিত নেতা এবং তাঁর বন্দী অবস্থায় গঠিত সরকারটি নির্বাচিত সরকার বলেই ভারত সহ বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রগুলোর সহায়তাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বৈধতার প্রশ্ন তুলতে পারেনি।
১০ জানুয়ারি ১৯৭২ যখন তিনি মুক্ত স্বদেশে ফিরে এলেন তখনো তিনি সেই বৈধতার ধারাবাহিকতাতেই রাষ্ট্রপ্রধান। যেহেতু সংসদীয় সরকার পদ্ধতির পূর্ব প্রতিশ্রুতি ছিলো সেহেতু দুদিন পর সরকার পদ্ধতি পরিবর্তন করে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান থেকে সরকার প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতা দখল করেননি, কেউ তাঁকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়নি। জনগণের নিরংকুশ ম্যান্ডেটেই তিনি ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন। সামরিক শক্তি ব্যবহার করে বা বিপ্লবের নামে সহিংসতায় শেখ মুজিব ক্ষমতা দখল করেননি। ঘাতকের বুলেটে ঝাঁঝড়া হয়ে মৃত্যুবরণ করা পর্যন্ত তিনি জনগণের নির্বাচিত, জনগণের ম্যান্ডেটে ক্ষমতাসীন ছিলেন।
জনরায়ে তাঁকে পরাজিত করার সাহস হয়নি কারো।
লেখাঃ হাসান মোর্শেদ