08/03/2026
ছোটবেলা থেকে আমি আমার আম্মুকে খুবই organized একজন মানুষ হিসেবে দেখেছি। আমাদের বাসায় একটা ফোনবুক ছিল, যেখানে সবার ফোন নাম্বার সুন্দর করে লিখে রাখত আম্মু। পরিবারের সব গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রও সে খুব যত্ন করে গুছিয়ে রাখতো তোষকের নিচে আলাদা ফাইল করে। টাকা জমিয়ে রাখা, সঞ্চয়পত্র করা এই অভ্যাসগুলো আমি অনেকটাই তার কাছ থেকেই শিখেছি। তার একটা খুব সিম্পল কিন্তু রুচিশীল স্টাইল ছিল। চিকন পাড়ের শাড়ি, মেরুন রঙের লিপস্টিক—একটা খুব স্নিগ্ধ less is more উপস্থিতি। মানুষের সাথে আচরণ, আমার প্রথম ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি, এমনকি ফ্যাশন—সবকিছুর প্রথম শিক্ষক ছিলো আমার আম্মু।
মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় প্রতি মাসে আম্মু হোস্টেলে আমার রুমের জিনিসপত্র গুছিয়ে দিয়ে যেতো। কোনো জিনিস খুঁজে না পেলে আমি ফোন করতাম- “ওটা ডান পাশের তাকের ওপরে, কোণার দিকে আছে।” এত নিখুঁত স্মৃতিশক্তি আর ম্যানেজমেন্ট স্কিল সত্যিই আমাকে মুগ্ধ করত।
যৌথ পরিবারের সবকিছু ম্যানেজ করা, আমাদের দুই বোনকে মানুষ করা, আব্বুকে প্রয়োজনীয় সমর্থন দেওয়া—সবকিছু কত দক্ষতার সঙ্গে করতো ! শুধু তাই নয়, তার ব্যবহার আর আপ্যায়ন নিয়ে সবাই মুগ্ধ থাকত। আমার বন্ধুরাও আমার আম্মুর বড় ভক্ত ছিল।
আমি প্রায়ই আম্মুকে বলি—এই শ্রম আর দক্ষতা যদি কোনো কোম্পানিতে দিতে, তাহলে হয়তো এতদিনে সেই প্রতিষ্ঠানের CEO হয়ে যেতে, কিংবা একজন বড় কর্মকর্তা।
কিন্তু বাস্তবে আমি দেখেছি, তাকে খুব কমই সেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বরং অনেক সময় পরিবারের মানুষই তার ইংরেজি দুর্বল বা পড়াশোনা এগোতে না পারা নিয়ে হাসাহাসি করেছে। এটা আমাকে খুব কষ্ট দিত।
আজও মাঝে মাঝে আম্মু আমাকে বলে - “আমি আসলে ইংরেজিতে একটু দুর্বল ছিলাম… কেউ যদি আমাকে একটু সাপোর্ট দিত, আমি হয়তো পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারতাম।”আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, ছোটবেলায় আমাকে যে সমর্থন আর উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, সেটা যদি আমার আম্মুও পেতো, তাহলে সে আজ অনেক বড় কিছু অর্জন করতে পারতো।
আমাদের সমাজে সব সফলতার পেছনে নারীর অদৃশ্য শ্রম থাকে। কিন্তু সেই শ্রমের কোনো স্বীকৃতি থাকে না, কোনো পারিশ্রমিক থাকে না, কোনো নথিভুক্ত ইতিহাসও থাকে না।
আমরা যখন মায়েদের নিয়ে উদযাপন করি, তখন প্রায়ই তাদের “ত্যাগ” নিয়েই কথা বলি। কিন্তু তাদের মেধা, তাদের দক্ষতা, তাদের নেতৃত্ব - এই গুণগুলো খুব কমই আমরা তুলে ধরি। কেন?
সম্প্রতি আমরা দেখেছি—শুধু পুরুষ নয়, অনেক মেয়েরাও নারী অধিকার, সক্রিয় অংশগ্রহণ আর নেতৃত্বের পক্ষে দাঁড়ায়নি। আন্দোলনে নারীদের যে অবদান তা নেতৃত্বে প্রতিফলিত হয়না। আমাদের সমাজে এমনভাবে সবাইকে সামাজিকীকরণ করা হয় যে নারীদের কাজ হবে সমর্থন করা, নীরবে পরিশ্রম করা—কিন্তু নেতৃত্ব নয়, স্বীকৃতি নয়।
মেয়েরাও এই সামাজিকীকরণের শিকার।
ছোটবেলা থেকেই যদি একটি মেয়েকে বলা হয়—
“তুমি যথেষ্ট না”,
“ছেলেরা সিদ্ধান্ত নিতে ভালো পারে”,
“তাদের নেতৃত্বের গুণ বেশি”—
তাহলে সে ধীরে ধীরে সেটাই বিশ্বাস করতে শুরু করে। তার আত্মবিশ্বাসও সেই অনুযায়ী গড়ে ওঠে।
বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ গুলো female economy-র দিকে এগোচ্ছে। সেখানে মেয়েরা বেশি উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই নেতৃত্বের জায়গায় উঠে আসছে।
অক্সফোর্ডে এসে আমি এই বিষয়টা আরও গভীরভাবে অনুভব করেছি। এখানে আমার তিনজন সুপারভাইজারই নারী। বিভিন্ন নেতৃত্বের ভূমিকায় নারীদের দেখে আমারও মনে হয়েছে—আমিও পারি।
অক্সফোর্ডে আমি চার বছর ধরে আছি—পিএইচডি করছি, জুনিয়র ডীন হিসেবে কাজ করছি, বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমেও যুক্ত আছি। যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার টেবিলে আমাকে বলা হয় —
“তুমি ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছো।”
“তোমার কথার ভিত্তি আছে।”
"ধন্যবাদ তোমার কাজ অনেক ইমপ্যাক্ট তৈরি করেছে।"
এই ধরনের ছোট ছোট স্বীকৃতি আর উৎসাহই ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে।
কিন্তু আমাদের সমাজে ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের এমনভাবে বড় করা হয়, যাতে তারা নিজেদের নিয়ে কম আত্মবিশ্বাসী হয়। তাদের শেখানো হয়—চুপ থাকা, মানিয়ে নেওয়া, অন্যকে খুশি রাখা।
অথচ ভবিষ্যতের জন্য আমাদের মেয়েদের প্রস্তুত করা খুব জরুরি। তাদের প্রাপ্য স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।
মনে রাখি—
যোগ্যতা → স্বীকৃতি → আত্মবিশ্বাস নয়,
স্বীকৃতি → আত্মবিশ্বাস → যোগ্যতা → নেতৃত্ব।
আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের থিম— “Give to Gain”।
চলুন শুরুটা হোক পরিবার, স্কুল, অফিস, আমাদের প্রতিদিনের জায়গা থেকেই।
মা বা স্ত্রী কে স্বীকৃতি দি যে কোনো কাজের, sometimes it can be a simple "thank you", "you did great"! তাদের শুধু নিজের প্রয়োজনে সাপোর্ট নেওয়া না। কোনটাতে তাদের empowerment হয়, তাদের সাপোর্ট হয় সেটা ভেবে দেখি। Let’s listen to what they want!
উৎসাহ দিয়ে, আত্মবিশ্বাস তৈরি করি বাড়ির ছোট মেয়েটার, বা আমার ছাত্রীর। আমার বান্ধবীর ঔদ্ধত্যপূর্ন সপ্নটাকে বিশ্বাস করি।
আরও সুযোগ আর সমর্থন তৈরি করি মেয়েদের জন্য।
সবাইকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা। 🌸