21/09/2026
আদমপুর ইউনাইটেড কলেজ বাস্তবায়ন তহবিলে লন্ডন প্রবাসী কমিনিউনিটির অন্যতম প্রিয়মুখ জনাব হাসান কাওসার চৌধুরী শিপন (Hasan Kawsar Chowdhury Shipon), ২,০০০০০ (দুই লক্ষ টাকা) নগদে অনুদান দিয়েছেন। আমরা আদমপুর ইউনাইটেড কলেজ কর্তৃপক্ষ উনার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
হাসান কাওসার চৌধুরী শিপন, শিক্ষা, সমাজসেবা ও মানবিকতার এক নিরব পথিক, কমলগঞ্জ উপজেলার সলিমগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত একমাত্র সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষার আলো ছড়ানো তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা হাসান কাওসার চৌধুরী শিপন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত তিনি ও তাঁর পরিবার নিষ্ঠা ও ভালোবাসায় বিদ্যালয়টির পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
জনাব হাসান চৌধুরীর পিতা তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন তৎকালীন সময়ের উচ্চশিক্ষিত বি.কম পাস করা একজন কর্মকর্তা এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয় (CGA)-এর সুপারিনটেনডেন্ট। তাঁর মাতা রুনা বেগম চৌধুরী দীর্ঘদিন কমলগঞ্জ বহুমুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ডেপুটি হেড টিচার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ২০০৪ সালে কমলগঞ্জ উপজেলার শ্রেষ্ঠ গার্লস গাইড এবং ২০১৮ সালে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ গার্লস গাইড শিক্ষক নির্বাচিত হন।
জনাব হাসান চৌধুরীর দাদা আব্দুল করিম চৌধুরী (ইন্তাজ মিয়া) মাস্টার সাহেব ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সংস্কৃতিমনা ও শিক্ষানুরাগী। সমাজসেবা ও জনকল্যাণে অবদানের কারণে ষাটের দশকে তিনি প্রথমবার ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতেও বহুবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিন ভাই-বোনের মধ্যে হাসান কাওসার চৌধুরী শিপন সবার বড়। তাঁর ছোট ভাই আহসান কবির চৌধুরী (রিপন) নিউইয়র্কে হ্যাবিলিটেশন স্পেশালিস্ট হিসেবে কর্মরত; তিনি এর আগে মৌলভীবাজার জনতা ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার ছিলেন। ছোট বোন চৌধুরী তানজিয়া ইসলাম (মুন) বর্তমানে লন্ডনে বসবাস করছেন।
জনাব হাসান কাওসার চৌধুরীর বড় মেয়ে জয়নাব চৌধুরী সর্বকনিষ্ঠ ব্রিটিশ বাংলাদেশি লেখিকা মাত্র ১১ বছর বয়সে বই প্রকাশ, লন্ডনে স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ মর্যাদা সিভিক অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়ে সম্মানিত হয়েছেন। যুক্তরাজ্য ও আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য তাঁকে “Young Ambassador” হিসেবে এই সম্মাননা প্রদান করা হয় এবং তার নাম স্থায়ীভাবে কাউন্সিল নিবন্ধিক করা হয়।
মাত্র ১২ বছর বয়সী তরুণ লেখিকা জয়নাব চৌধুরীর অসাধারণ লেখনী, নাগরিক কর্মকাণ্ড ও নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আমন্ত্রণের মাধ্যমে পার্লামেন্টের হাউসগুলো পরিদর্শন করিয়েছেন লন্ডনে নির্বাচিত প্রথম ব্রিটিশ বাংলাদেশি এমপি রোশনারা আলী।
জনাব হাসান চৌধুরীর একমাত্র ফুফু জ্যোৎস্না আরা বেগম চৌধুরীর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জ্যোৎস্না হেলথকেয়ার সেন্টার। এর প্রতিষ্ঠাতা শিপনের ফুফা, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও দানশীল ব্যক্তিত্ব এবং কমলগঞ্জের প্রাচীনতম দাতব্য প্রতিষ্ঠান নজরানা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা নজির উদ্দিন চৌধুরী।
তাঁর চাচাদের মধ্যে আব্দুল হাকিম চৌধুরী বিএডিসিতে কর্মরত এবং তাজুল ইসলাম চৌধুরী ৬ নম্বর আলীনগর ইউনিয়ন পরিষদের চারবার নির্বাচিত সদস্য ছিলেন; সাহসিকতা ও গ্রাম্য সালিশে দক্ষতার জন্য তিনি সুপরিচিত ছিলেন।
জনাব হাসান চৌধুরীর নানা মরহুম তাজুদ আলী মিরাশদার ছিলেন বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক, বিচারক ও সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি; একইসঙ্গে তিনি তৎকালীন তাজুদ আলী ব্রিকফিল্ডের স্বত্বাধিকারী ছিলেন।
শিক্ষাজীবন ও যুক্তরাজ্যে পথচলা:
১৯৮৮ সালে জন্মগ্রহণকারী হাসান কাওসার চৌধুরী শিপনের প্রাথমিক শিক্ষার শুরু ঢাকার স্বনামধন্য মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে। পরবর্তীতে নিজ বাড়ির প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত ছলিমগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে কমলগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও সক্রিয়। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বিদ্যালয়ের সুনাম অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় উপজেলা পর্যায়ে চিত্রাঙ্কনে প্রথম, উপস্থিত বক্তৃতায় দ্বিতীয় এবং রচনা প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অর্জনের কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর।
সুজা মেমোরিয়াল কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষে ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে অধ্যয়ন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি ধানমন্ডির একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতাও করেন। তৎকালীন সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে ইঁদুরের ওপর ক্যান্সার রোগের ওষুধ নিয়ে গবেষণাতেও যুক্ত ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কো-অর্ডিনেটর আবুল কালাম আজাদ এবং অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন কবির চৌধুরীর পরামর্শ ও সহযোগিতায় ইউনিভার্সিটি অব ব্র্যাডফোর্ডে স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। পড়াশোনার পাশাপাশি অ্যালাইড হেলথকেয়ার গ্রুপ ও সেন্ট জনস কেয়ার হোমে কাজ করেন। পরবর্তীতে লন্ডনের ইস্টমস গ্র্যাজুয়েট স্কুলে হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল কেয়ার এবং রিজেন্ট কলেজে সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনা করেন।
নর্থাম্পটনশায়ারে বসবাসকালে লেস্টারের DNA Care Services-এ কাজ করেন। বর্তমানে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে প্রতিষ্ঠিত দার আল আরকামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ফান্ডরাইজিং, কোর্স উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন।
মানবিক ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড:
কোভিড-১৯ মহামারির কঠিন সময়ে হাসান চৌধুরী টাওয়ার হ্যামলেটসের ইমার্জেন্সি কোভিড-১৯ রেসপন্স টিমের সঙ্গে কাজ করেন। তিনি প্রতিবন্ধী, আইসোলেশনে থাকা এবং অসহায় ও কর্মহীন পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ান। কোভিডে মৃত্যুবরণকারী পরিবারের জন্য বুরিয়াল অর্ডার, গোসল, দাফন-কাফন, জানাজা ও কবরের ব্যবস্থা এবং শোকাহত পরিবারের মানসিক সহায়তায়ও ভূমিকা রাখেন।
এছাড়াও তিনি যুক্তরাজ্যস্থ কমলগঞ্জ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং বিভিন্ন চ্যারিটি প্রতিষ্ঠানের লাইভ ফান্ডরাইজিং কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চ্যারিটি সংস্থা ওয়ান উম্মাহ-এর কার্যক্রমেও সহযোগিতা করেছেন।
লন্ডনে বসবাস ও পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও দেশের মানুষের প্রতি তাঁর টান অটুট। অসহায়, দরিদ্র ও এতিমদের সহায়তার পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানে অনুদান দিয়ে আসছেন। সুবিধাবঞ্চিত এলাকার শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ছলিমগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করেছেন তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।
বর্তমান দায়িত্ব:
বর্তমানে হাসান কাওসার চৌধুরী শিপন লন্ডনে দার আল আরকামের ফান্ডরাইজিং ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং লন্ডনের একটি বৃহৎ বিনামূল্যে পরামর্শসেবা প্রদানকারী সেন্টারের ডাইরেক্টর। তিনি ইটানেল গিভিং চ্যারিটির প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি, লন্ডনের স্কুল গভর্নর এবং টাওয়ার হ্যামলেটসের বৃহত্তম কেয়ারার সেন্টারের সাবেক সভাপতি।
এক ছেলে ও দুই মেয়ের জনক হাসান কাওসার চৌধুরী শিপন পরিবার নিয়ে পূর্ব লন্ডনে বসবাস করছেন। শিক্ষা, মানবসেবা ও কমিউনিটি উন্নয়নের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারই তাঁর পথচলার অন্যতম প্রধান পরিচয়। নীরবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সুযোগ সৃষ্টি করা এবং সমাজের জন্য কিছু করার প্রত্যয়ই তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রার মূল সুর।