17/08/2026
খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নঃ
তিনজন বোন লন্ডন থেকে কোনো মাহরাম পুরুষ ছাড়া বাংলাদেশে যাবেন। এরপর বাংলাদেশ থেকে তাঁদের ভাইয়ের ছেলে (ভাতিজা) সঙ্গে নিয়ে হজে যাবেন। প্রথম পর্যায়ে মাহরাম ছাড়া লন্ডন থেকে বাংলাদেশে যাওয়া এবং পরবর্তীতে ভাতিজাকে মাহরাম হিসেবে নিয়ে হজে যাওয়ার শরয়ি বিধান কী?
উত্তর দিচ্ছেনঃ
শায়খ ডঃ আবুল কালাম আজাদ মাদানী
চেয়ারম্যান, সাফীর এডুকেশন, লন্ডন
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
এ প্রশ্নে দুটি সফরকে আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে:
১. লন্ডন → বাংলাদেশ: মাহরাম ছাড়া সফর।
২. বাংলাদেশ → সৌদি আরব: ভাতিজাকে সঙ্গে নিয়ে হজের সফর।
এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই শুধু একটি মত উল্লেখ না করে হাদীসের মূল নির্দেশনা এবং হানাফি, মালিকি ও শাফেয়ি ফিকহের প্রাসঙ্গিক মতগুলো জানা জরুরি।
১. নারীর সফরে মাহরাম সম্পর্কে মূল হাদীস
ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ
অর্থ: “কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া সফর না করে।”
এক ব্যক্তি বললেন, আমার স্ত্রী হজের উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন, অথচ আমার নাম অমুক যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন:
انْطَلِقْ فَحُجَّ مَعَ امْرَأَتِكَ
“যাও, তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হজ করো।”
—সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম। এই হাদীসকেই মাহরামের শর্তের প্রধান দলিল হিসেবে ফকীহগণ গ্রহণ করেছেন।
অন্য হাদীসে এক দিন, দুই দিন বা তিন দিনের সফরের কথাও এসেছে। ফকীহগণ এসব বর্ণনার ব্যাখ্যায় কিছুটা ভিন্ন মত গ্রহণ করেছেন।
২. হানাফি মাযহাবের হুকুম
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, শরয়ি সফরের দূরত্বে কোনো নারীর স্বামী অথবা প্রাপ্তবয়স্ক বিশ্বস্ত পুরুষ মাহরাম ছাড়া সফর করা জায়েয নয়। প্রচলিত হানাফি হিসাবে এই দূরত্ব আনুমানিক ৪৮ মাইল/৭৭–৭৮ কিলোমিটার। আধুনিক বিমান কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার মাইল অতিক্রম করলেও এর কারণে শরয়ি সফরের বিধান উঠে যায় না।
অতএব, হানাফি মত অনুযায়ী তিন বোন একসঙ্গে থাকলেও তাঁরা পরস্পরের মাহরাম হিসেবে গণ্য হবেন না। মাহরাম বলতে এখানে এমন পুরুষ আত্মীয় বোঝানো হচ্ছে যার সঙ্গে স্থায়ীভাবে বিবাহ হারাম। শুধু একাধিক নারী একসঙ্গে সফর করলেই হানাফি মতে মাহরামের শর্ত পূরণ হয় না।
সুতরাং হানাফি মত অনুসরণ করলে লন্ডন থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত মাহরাম ছাড়া তাঁদের এই সফর করা উচিত নয়।
৩. অন্য মাযহাবে কি ভিন্ন মত আছে?
হ্যাঁ, আছে—এটি উল্লেখ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ফরয হজের ক্ষেত্রে শাফেয়ি ও মালিকি ফকীহদের উল্লেখযোগ্য অংশ নিরাপদ ও বিশ্বস্ত সঙ্গের সঙ্গে মাহরাম ছাড়া নারীর হজ সফরের অনুমতি দিয়েছেন। সমসাময়িক কিছু আলেম আরও বিস্তৃতভাবে বলেছেন, আধুনিক নিরাপদ বিমানবন্দর, বিমানযাত্রা ও নিরাপদ গন্তব্যের ক্ষেত্রে মাহরাম ছাড়া সফরেরও অবকাশ রয়েছে।
ইমাম ইবন বাত্তাল (রহ.) মালিক, আওযাঈ ও শাফেয়ি (রহ.)-এর মত উল্লেখ করেছেন যে ফরয হজে বিশ্বস্ত নারীদের দলের সঙ্গে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। মালিকি ফকীহ ইমাম আল-বাজী (রহ.) নিরাপদ বৃহৎ কাফেলা ও জনবহুল নিরাপদ পথের বিষয়টিও বিবেচনা করেছেন।
সুতরাং “মাহরাম ছাড়া নারীর কোনো অবস্থাতেই কোনো সফর বৈধ নয়”—এটিকে সকল মাযহাবের সর্বসম্মত মত বলা সঠিক হবে না।
তবে হানাফি মাযহাবের অবস্থান অধিক কঠোর এবং প্রশ্নকারী যদি হানাফি ফিকহ অনুসরণ করেন, তাহলে মাহরামের ব্যবস্থা করাই শরয়ি দিক থেকে নিরাপদ ও অনুসরণীয় পথ।
৪. ভাতিজা কি মাহরাম?
হ্যাঁ। আপন ভাইয়ের ছেলে তথা ভাতিজা একজন নারীর স্থায়ী মাহরাম।
আল্লাহ তা‘আলা যেসব নারীর সঙ্গে বিবাহ স্থায়ীভাবে হারাম করেছেন, তাদের বিবরণ সূরা আন-নিসা ৪:২৩-এ এসেছে। এর ভিত্তিতে বংশগত মাহরাম সম্পর্কের মধ্যে ভাইয়ের ছেলে/ভাতিজাও অন্তর্ভুক্ত।
অতএব, ভাতিজা যদি বালিগ, সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন এবং সফরে তাঁদের যথাযথ দেখাশোনা করার উপযুক্ত হন, তাহলে তিনি তাঁর ফুফুদের মাহরাম হিসেবে তাঁদের সঙ্গে হজে যেতে পারবেন।
৫. বাংলাদেশ থেকে ভাতিজাকে নিয়ে হজে যাওয়া
যদি তাঁরা বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর তাঁদের বালিগ ও উপযুক্ত ভাতিজাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে হজে যান এবং পুরো হজ সফরে তিনি তাঁদের সঙ্গে থাকেন, তাহলে মাহরামের দিক থেকে এই হজ সফরে সমস্যা নেই।
অর্থাৎ দ্বিতীয় সফরটি প্রথম সফরের হুকুম থেকে পৃথক।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার: বাংলাদেশ থেকে মাহরাম নিয়ে হজে যাওয়া আগের লন্ডন → বাংলাদেশ মাহরামবিহীন সফরকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ করে দেয় না। প্রতিটি সফরের হুকুম আলাদাভাবে বিবেচিত হবে।
৬. মাহরাম ছাড়া প্রথম সফর করলে হজ কি বাতিল হবে?
না। এটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।
যদি কেউ এমন ফিকহি মত অনুযায়ী সফর করেন যেখানে মাহরাম আবশ্যক এবং তিনি মাহরাম ছাড়া সফর করেন, তাহলে সফরের গুনাহের প্রশ্ন এবং হজ সহীহ হওয়ার প্রশ্ন দুটি আলাদা।
হজের আরকান ও শর্ত যথাযথভাবে আদায় হলে কেবল মাহরামবিহীন সফরের কারণে হজ বাতিল হয়ে যায় না। এমনকি যেসব আলেম মাহরামবিহীন সফরকে নিষিদ্ধ বলেছেন, তাঁদের আলোচনাতেও হজের বৈধতা এবং সফরের বিধানকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা হয়েছে।
সারকথা
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী: তিন বোনের একসঙ্গে লন্ডন থেকে বাংলাদেশে মাহরাম ছাড়া সফর করা জায়েয নয়। তিনজন নারী একসঙ্গে থাকলেও একজন আরেকজনের মাহরাম হয়ে যান না।
কিন্তু বাংলাদেশ থেকে তাঁদের বালিগ ও উপযুক্ত ভাতিজাকে সঙ্গে নিয়ে হজে যাওয়া জায়েয, কারণ ভাতিজা তাঁদের শরয়ি মাহরাম।
অন্যদিকে, মালিকি ও শাফেয়ি ফিকহের কিছু স্বীকৃত মত এবং কিছু সমসাময়িক ফতোয়া অনুযায়ী, নিরাপত্তা সম্পূর্ণ নিশ্চিত হলে—বিশেষত বিশ্বস্ত দল ও আধুনিক নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থায়—মাহরাম ছাড়া নারীর সফরের অবকাশ রয়েছে; ফরয হজের ক্ষেত্রে এ মতের classical ভিত্তি আরও সুস্পষ্ট।
তবে প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় যদি তাঁরা হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন, তাহলে উত্তম ও সতর্ক পদ্ধতি হলো লন্ডন থেকেই একজন উপযুক্ত মাহরামের সঙ্গে সফরের ব্যবস্থা করা। এতে সরাসরি সহীহ হাদীসের নির্দেশনা অনুসরণ হয় এবং ফিকহি মতভেদের ক্ষেত্র থেকেও বেরিয়ে আসা যায়।
والله تعالى أعلم بالصواب