01/09/2026
আজ গামদী সেন্টার, ডালাসে বিশ্ব ইসলামী বিশ্বের বিশিষ্ট গবেষক ড. মুহাম্মদ আকরাম নদভী সাহেবের এক বিশেষ বক্তৃতার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের মূল বিষয় ছিল মাওলানা হামিদুদ্দীন ফারাহীর চিন্তাধারা, ইলমি অবদান ও তাঁর প্রভাব।
এই উপলক্ষে ড. ইয়াসির ক্বাধী, ওস্তাদে মোকাররম জাভেদ আহমদ গামদী, ভাই নোমান আলী খান, সম্মানিত আজিজ সাহেবসহ শহরের অন্যান্য বিশিষ্ট বিজ্ঞ ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন।
ড. আকরাম নদভী সাহেব কোনো পরিচয়ের মুখাপেক্ষী নন। ভারতের জৌনপুর জেলায় জন্ম নেওয়া ড. নদভী লখনউয়ের দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা থেকে ‘আলমিয়াত’ ও ‘তাখাস্সুস ফিল হাদীস’ (হাদীসে বিশেষজ্ঞতা) সম্পন্ন করেন এবং সেখানেই শিক্ষকতায় যুক্ত হন। পরবর্তীতে তিনি লখনউ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৮৯ সালে মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী সাহেবের ইচ্ছা ও দিকনির্দেশনায় তিনি তাঁর ইলমি প্রতিনিধি হিসেবে ইংল্যান্ড যান এবং 'অক্সফোর্ড সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজ'-এ রিসার্চ ফেলো হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে গবেষণা ও গ্রন্থ রচনার কাজে পূর্ণ মনোযোগ দিতে তিনি এই পদ থেকে সরে দাঁড়ান। বর্তমানে তিনি অক্সফোর্ডে বসবাস করছেন এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত রয়েছেন।
ফিকহ, হাদীস, ইতিহাস ও আরবি সাহিত্যসহ ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর বহু বই ও গবেষণা নিবন্ধ রয়েছে। তাঁর একটি অসাধারণ ইলমি কীর্তি হলো নারী মুহাদ্দিসদের ওপর লেখা ৪৩ খণ্ডের বিশ্বকোষ "আল-ওয়াফা বি আসমাউন নিসা" (الوفاء بأسماء النساء)। এতে হাজার হাজার নারী পণ্ডিত ও হাদীস বর্ণনাকারীর জীবনী এবং ইলমি অবদান সংকলিত হয়েছে। ইসলামী জ্ঞানের ইতিহাসে নারীদের ভূমিকা এত বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটি বর্তমান যুগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক গবেষণামূলক কাজ।
মাওলানা হামিদুদ্দীন ফারাহীর দ্বীনি চিন্তা ও ইলমি ঐতিহ্যের সাথেও ড. আকরাম নদভীর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তিনি মাওলানা ফারাহীর চিন্তা, পদ্ধতি ও ইলমি অবদানের ওপর একাধিক নিবন্ধ লিখেছেন এবং তাঁর বৈজ্ঞানিক ব্যক্তিত্বের প্রতি গভীরভাবে প্রভাবিত। এই সম্পর্কের পেছনে একটি ইলমি ধারাক্রমও (ছাত্র-শিক্ষক ধারা) রয়েছে। মাওলানা ফারাহীর বিশিষ্ট ছাত্র ছিলেন মাওলানা আখতার আহসান ইসলাহী, তাঁর কাছ থেকে ইলমি ফায়দা নিয়েছেন মাওলানা শাহবাজ সাহেব, আর ড. আকরাম নদভী সাহেব এই ধারার সাথেই যুক্ত।
এই পটভূমির কারণেই আজকের আলোচনায় কেবল মাওলানা ফারাহীর সাধারণ কোনো পরিচয় ছিল না, বরং তা ছিল তাঁর চিন্তা, ইলমি ঐতিহ্য ও মেজাজের সাথে গভীর পরিচিতির এক সুন্দর প্রকাশ। তিনি মাওলানা ফারাহীর গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর পরিচয় তুলে ধরেন, তাঁর ইলমি পদ্ধতি ও ইসলামী জ্ঞানে তাঁর সংস্কারমূলক প্রচেষ্টার ওপর আলোকপাত করেন এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, ইলমি মেজাজ ও ব্যক্তিত্বের নানা আকর্ষণীয় দিক আলোচনা করেন।
বক্তৃতায় ড. নদভী সেই ঐতিহাসিক ও ইলমি প্রেক্ষাপটও স্পষ্ট করেন, যার ওপর ভিত্তি করে মাওলানা ফারাহী ইসলামী জ্ঞানকে নতুন করে অনুধাবন ও গবেষণার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তিনি জানান যে, মাওলানা ফারাহীর পুরো ইলমি প্রচেষ্টার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল কুরআন মাজীদের শৃঙ্খলা (নাজম), ভাষা ও অভ্যন্তরীণ যুক্তির আলোকে একে বোঝা।
এই বিস্তারিত বক্তৃতাটি ইনশাআল্লাহ খুব শিগগিরই ইউটিউবে পাওয়া যাবে।
এখন শুধু এতটুকুই বলতে চাই যে, আজ আমাদের উম্মাহর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই ধরনের ইলমি পরিবেশ ও মানসিকতার। বিভিন্ন মতবাদ, চিন্তাধারা ও ইলমি ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত পণ্ডিতদের উচিত একে অপরের কাছাকাছি আসা, একে অপরের কথা শোনা, ইলমি মতপার্থক্যকে শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করা এবং গবেষণা, সংলাপ ও কুরআনের সাথে জীবন্ত সম্পর্কের ভিত্তিতে ইসলামী ইলমি ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
পাশাপাশি, আমাদের সব ইলমি প্রচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য যেন কখনোই চোখের আড়াল না হয়—আর তা হলো মানুষকে আল্লাহর সাথে যুক্ত করা। এই ধরনের পরিবেশেই জ্ঞানের বিকাশ ঘটে, সংলাপ অর্থবহ হয় এবং হৃদয়গুলোও একে অপরের কাছাকাছি আসে।