15/06/2026
আলা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান, প্রফেসর মাওলভী হাকিম আলী ও আল্লামা ইকবাল : এক আধ্যাত্মিক ত্রিভুজ (Triangle)
----------------------------------
লাহোরের জি.টি. রোডে শালিমার বাগের কিছু আগে বাম পাশে হযরত ঈশান রহমতুল্লাহি আলাইহির পবিত্র মাযার অবস্থিত। তিনি নকশবন্দি তরিকার একজন মহান বুযুর্গ।
কোথাও থেকে এ সম্পর্কে জানতে পেরে আমি চিন্তা করলাম যে, তাঁর মাযারে হাজিরা দেব এবং দেখব, নকশবন্দি তরিকা তাঁর মাধ্যমে কখন ও কীভাবে লাহোরে পৌঁছেছে।
মাযারে পৌঁছলাম, হাজিরা দিলাম, ইতিহাসের কিছু পৃষ্ঠা উল্টালাম। যখন মাযার থেকে বের হলাম, তখন একটি কবরের ফলকে আমার দৃষ্টি পড়ল— “প্রফেসর মাওলভী হাকিম আলী”।
আমার সঙ্গে থাকা এক ভদ্রলোক আমাকে প্রফেসর সাহেব সম্পর্কে কিছু বললেন। তখন আমার মনে হলো, যেন আল্লাহ তাআলা আমাকে এখানে সম্ভবত এ উদ্দেশ্যেই পাঠিয়েছেন।
নতুন প্রজন্মকে উত্তম মুসলমানদের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার যে সংকল্প আমার অন্তরে সর্বদা আলোড়ন তোলে, হয়তো সেই আবেগ কিছুটা প্রশান্তি পাবে যদি আমি আপনাদের এ শিক্ষাবিদ, গণিতবিদ ও অধ্যক্ষের কাহিনি শুনাতে পারি।
আমি প্রফেসর মাওলভী হাকিম আলী সাহেব সম্পর্কে পড়েছি, আর এখন ভাবছি আপনাদেরও তাঁর সম্পর্কে জানাই।
অবশেষে, প্রফেসর মাওলভী হাকিম আলী কে ছিলেন? তিনি কেন আজ বিস্মৃত ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠছেন?
এবং এই সমগ্র আধ্যাত্মিক ধারাবাহিকতা ও নীরব ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কই বা কী?
কিছু বর্ণনা অনুযায়ী, প্রফেসর মাওলভী হাকিম আলী ১৮৬৯ সালে এক শিখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং কৈশোরেই ইসলাম গ্রহণ করেন।
ইংরেজি, আরবি, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন ছিল তাঁর বিশেষ বিষয়। তিনি এসব বিষয়ে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগুলো কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।
১৮৯১ সাল থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত তিনি শিক্ষা ও অধ্যাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
আহলুল্লাহর প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ছিল। তিনি সৈয়দ মীর জান কাবুলীর নিকট সিলসিলায়ে আলিয়া নকশবন্দিয়া মুজাদ্দিদিয়ায় বায়আত গ্রহণ করেছিলেন। প্রায় ১৯১৭ সালে তিনি খাজা সৈয়দ খাওয়ান্দ মাহমুদ, যিনি হযরত ঈশান নামে পরিচিত, তাঁর দরবার-সংলগ্ন একটি হুজরায় আসেন এবং পরে সেখানকারই হয়ে যান। তাঁর মাযারও সেই দরগাহের অভ্যন্তরে অবস্থিত। কবরফলকে ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দ তাঁর মৃত্যুসাল হিসেবে উৎকীর্ণ রয়েছে।
প্রফেসর মাওলভী হাকিম আলীর সঙ্গে আলা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খানের গভীর সম্পর্ক ছিল। সম্ভবত এ কারণেই তাঁর কবর আমাকে এত আকৃষ্ট করেছিল।
আমি আজকের প্রজন্মকে বোঝাতে চাই যে, আল্লাহওয়ালা, দ্বীনি আলেম, বিজ্ঞানী ও গণিতবিদদের সম্মান করা উচিত। আর এ কথা বোঝাতে আমার এমন একজন প্রফেসরের উদাহরণ প্রয়োজন ছিল, যিনি আবার ইসলামিয়া কলেজ লাহোরের প্রিন্সিপালও ছিলেন।
আসুন, প্রফেসর মাওলভী হাকিম আলীর শিক্ষাক্ষেত্রের অবদানের দিকে এক নজর দিই।
১৮৯১ সালে তিনি মিশন কলেজ লাহোরে গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
সে সময়কার অভিজ্ঞ ইংরেজ অধ্যাপক ও অধ্যক্ষদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রফেসর জে.জি. গিলবার্টসন এবং প্রফেসর জে.সি. আর. ইয়ং। সাত বছর সেখানে দায়িত্ব পালনের পর ১৮৯৮ সালে তিনি ইসলামিয়া কলেজ লাহোরে গণিত বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। দুই বছর ভাইস-প্রিন্সিপাল ও গণিত বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তাঁকে কলেজের প্রিন্সিপাল নিযুক্ত করা হয়।
১৯০৪ সালের ৬ মার্চ কিছু অভ্যন্তরীণ ও ব্যক্তিগত কারণে তিনি কলেজ থেকে পদত্যাগ করেন। কিন্তু ইসলামিয়া কলেজ আবারও তাঁকে স্মরণ করে। বহু অনুরোধের পর ১৯০৭ সালের ১ ডিসেম্বর তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে মাসিক ১৮৫ রুপি বেতনে পুনরায় ইসলামিয়া কলেজে যোগ দেন এবং দশ বছর প্রিন্সিপাল থাকার একটি অঙ্গীকারনামা স্বাক্ষর করেন। ১৯২০ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবারও প্রফেসর মাওলভী হাকিম আলীকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
সেটি ছিল এমন এক সময়, যখন উপমহাদেশের রাজনৈতিক তাপমাত্রা অত্যন্ত উত্তপ্ত ছিল। গান্ধীর পৃষ্ঠপোষকতায় আবুল কালাম আজাদ এবং অন্যান্য কংগ্রেসপন্থী মাওলভীরা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ‘তরকে মুওয়ালাত’ (Non-Cooperation Movement) আন্দোলন পরিচালনা করছিলেন, যার প্রভাব প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ছিল।
প্রফেসর মাওলভী হাকিম আলীর দুইজন প্রধান পরামর্শদাতা ছিলেন— আলা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান এবং আল্লামা ইকবাল। উভয়ের পক্ষ থেকেই তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, তিনি যেন তাঁর কলেজের ছাত্রদের তরকে মুওয়ালাত আন্দোলনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখেন।
আলা হযরতের অবস্থান ছিল, যে রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব একজন হিন্দুর হাতে, তা মুসলমানদের কোনো প্রকৃত উপকার বয়ে আনতে পারে না।
এসব কারণেই কলেজ পরিচালনাকারী সংস্থা তাঁকে ইসলামিয়া কলেজ থেকে পৃথক করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রফেসর হাকিম আলী অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তে সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেন এবং নিজেকে ইসলামিয়া কলেজ থেকে দূরে সরিয়ে নেন। এভাবে তিনি শুধু পাকিস্তান আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি রচনায় ভূমিকা রাখেননি, বরং তরুণদের সঠিক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাও দিয়েছিলেন।
প্রফেসর হাকিম আলী রাজনীতি, গণিত ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আলা হযরতকে নিজের শিক্ষক মনে করতেন। তিনি শুধু আল্লামা ইকবালেরই নৈকট্য লাভ করেননি, আলা হযরতেরও ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। তিনি আলা হযরতকে “ইয়া সাঈদী” বলে সম্বোধন করতেন এবং প্রায়ই বেরেলী শরীফে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য যেতেন। তাঁদের মধ্যে নিয়মিত পত্রালাপও হতো। আলা হযরত তাঁকে “মুজাহিদে আকবর” উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
আলা হযরত তাঁর আন্তরিক ভালোবাসা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। মাওলভী হাকিম আলী জটিল ইলমি, ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক বিষয়সমূহ নিয়ে তাঁর সঙ্গে চিঠিপত্রের মাধ্যমে আলোচনা করতেন।
ইমাম আহমদ রেযা খানের দুটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ প্রকৃতপক্ষে মাওলভী হাকিম আলীর প্রশ্নের জবাবেই রচিত হয়েছিল—
১. نزولِ آیاتِ فرقان بسکونِ زمین و آسمان
২. المَحجّةُ المُؤتَمَنَة فی آیاتِ المُمتحَنَة
প্রথম গ্রন্থ “নুযূলে আয়াতে ফুরকান বিসুকূনে যমীন ও আসমান” সম্পর্কেই আগে আলোচনা করা যাক।
এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রাঞ্জল গ্রন্থ রচনার কারণও ছিলেন মাওলভী হাকিম আলী নিজেই।
১৯২১ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনি আরবি ও ফারসি ভাষায় একটি চিঠি ইমাম আহমদ রেযা খানের নিকট প্রেরণ করেন এবং পৃথিবীর গতিশীলতার (Motion of Earth) মত গ্রহণ করার অনুরোধ জানান।
কিন্তু ইমাম আহমদ রেযা খান পৃথিবীর গতিশীলতার প্রবক্তা ছিলেন না এবং পরবর্তীতেও হননি।
এখানে মনে রাখা দরকার, যিনি এই চিঠি লিখেছিলেন, তিনি নিজেই গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন।
অপরদিকে আলা হযরত তাঁর প্রশ্নের জবাবে “নুযূলে আয়াতে ফুরকান বিসুকূনে যমীন ও আসমান” নামক গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি ২৮টি তাফসির থেকে উদ্ধৃতি উপস্থাপন করেন এবং মাওলভী হাকিম আলীর যুক্তিগুলোকে দুর্বল আখ্যা দিয়ে নিউটন, আইনস্টাইন এবং আলবার্ট এফ. পোর্টা প্রমুখ আধুনিক বিজ্ঞানীদের সমালোচনা করেন। তিনি লিখেছিলেন, ইউরোপীয়দের যুক্তি প্রদর্শনের পদ্ধতি (Method of Reasoning) এবং যৌক্তিক পদ্ধতিবিদ্যা (Logical Methodology) সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান নেই। তারা দাবির প্রমাণ (Proof of Claim) ও প্রতিষ্ঠার (Substantiation of a Claim) সঠিক রীতিও জানে না।
মাওলভী হাকিম আলী তাঁর চিঠির শেষে লিখেছিলেন—
“গরীবনওয়াজ! অনুগ্রহ করে আমার সঙ্গে একমত হয়ে যান। তাহলে ইনশাআল্লাহ বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের মুসলমান হয়ে যেতে দেখবেন।”
এর উত্তরে আলা হযরত লিখেন—
“আমার প্রিয় বন্ধু! বিজ্ঞান এভাবে মুসলমান হবে না যে, কুরআনের আয়াত ও শরঈ দলিলের দূরবর্তী ব্যাখ্যা করে সেগুলোকে বিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বানিয়ে দেওয়া হবে। এমন করলে তো (নাউযুবিল্লাহ) ইসলাম বিজ্ঞানকে গ্রহণ করল, বিজ্ঞান ইসলামকে গ্রহণ করল না।”
আলা হযরতের জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত মুফতি হামিদ রেযা খানের জামাতা মুফতি তকদ্দুস আলী খান বর্ণনা করেন, তাঁর ছাত্রজীবনে যখনই তিনি মাওলভী হাকিম আলীকে বেরেলী শরীফে দেখেছেন, তখন দেখেছেন মাওলভী সাহেব ও আলা হযরত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক যন্ত্র কূপে ঝুলিয়ে পৃথিবীর গতি বা স্থিরতা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও দীর্ঘ আলোচনা করতেন।
যদিও সে সময় তিনি এসব আলোচনার গভীরতা বুঝতেন না, তবুও অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে এ দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করতেন।
মাওলানা মুফতি তকদ্দুস আলী খান সাহেব নিজেও আলা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খানের একজন শাগরিদ ছিলেন। হযরত মাওলানা হাসনাইন রেযা খান তাঁর লিখিত স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেন—
“লাহোর কলেজের প্রফেসর হাকিম আলী সাহেব যখন শুনলেন যে, আলা হযরত কিবলা বিজ্ঞানেরও গভীর জ্ঞান রাখেন, তখন তিনি লাহোর কলেজে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বিজ্ঞানের কিছু জটিল বিষয়ে তিনি সংশয়ে ভুগছিলেন। সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য তিনি ছুটি নিয়ে বেরেলী আসতেন এবং প্রতিদিন কোনো না কোনো বৈজ্ঞানিক বিষয়ে আলা হযরতের সঙ্গে আলোচনা করতেন।
প্রায় এক মাস ধরে এ আলোচনা চলেছিল। ফিরে যাওয়ার সময় তিনি তাঁর সফরের সাফল্যে অত্যন্ত আনন্দিত ছিলেন। এ সময় তিনি আলা হযরতের মেহমান হিসেবেও অবস্থান করেছিলেন।”
হযরত মাওলানা হাসনাইন রেযা খান ছিলেন আলা হযরতের ভাতিজা।
এবার দ্বিতীয় গ্রন্থটির দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক, যা আলা হযরত প্রফেসর মাওলভী হাকিম আলীর এক প্রশ্নের উত্তরে রচনা করেছিলেন—
«المَحجَّةُ المُؤتَمَنَةُ فی آیاتِ المُمتحَنَة»
প্রফেসর মাওলভী হাকিম আলী সাহেব ১৯২০ সালের ২৫ অক্টোবর আলা হযরতের খিদমতে একটি চিঠি প্রেরণ করেন। তিনি লেখেন—
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কাফির, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু আবুল কালাম আজাদ জোরপূর্বক ‘বন্ধুত্ব না করা’-এর এ বিষয়টিকে নন-কো-অপারেশন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করছেন।
চিঠিতে তিনি আরও লেখেন যে, ১৯২০ সালের ২০ অক্টোবর জেনারেল কাউন্সিল কমিটির বৈঠকে উপস্থিত হয়ে এ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত ইসলামিয়া কলেজ লাহোরের সরকারি অনুদান বন্ধ না করা হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এর সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন না করা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইংরেজদের সঙ্গে ‘তরকে মুওয়ালাত’ (সম্পর্ক বর্জন) বাস্তবায়িত হতে পারে না।
এখানে ‘তরকে মুওয়ালাত’ বা নন-কো-অপারেশন আন্দোলন সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলা প্রয়োজন।
সে সময়ের কংগ্রেসপন্থী মাওলভীগণ হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রবল সমর্থক ছিলেন। এ কারণেই মুসলমানদের ধর্মীয় বা আবেগগতভাবে সংশ্লিষ্ট প্রায় প্রতিটি আন্দোলনের নেতৃত্ব মহাত্মা গান্ধীর হাতে তুলে দেওয়া হতো।
আমি এ বিষয়ে অধিক বিস্তারিত আলোচনা করতে চাই না; তবে এটি একটি বাস্তবতা যে, কংগ্রেস-সমর্থিত দেওবন্দি আলেমদের একটি বড় অংশ হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রবক্তা ছিলেন, দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধী ছিলেন এবং সর্বত্র গান্ধীকে নিজেদের নেতা হিসেবে মেনে নিতেন।
প্রফেসর হাকিম আলী সাহেব এ বিষয়টি ভালোভাবেই জানতেন। তাই ‘তরকে মুওয়ালাত’ হোক বা অন্য কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন, তিনি প্রায়ই আলা হযরত ও আল্লামা ইকবালের নিকট থেকে দিকনির্দেশনা গ্রহণ করতেন।
মাওলভী সাহেবের এ চিঠির জবাবে ইমাম আহমদ রেযা খান উল্লিখিত শিরোনামে প্রায় একশত পৃষ্ঠার একটি গ্রন্থ রচনা করেন। সেখানে তিনি কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিষয়টির অত্যন্ত সুন্দর ও সুসংবদ্ধ আলোচনা করেন।
সে সময় মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর, মাওলানা জাফর আলী খান, মাওলানা শওকত আলী, ড. সাইফুদ্দীন, মাওলানা আজাদ সুবহানী এবং মাওলানা মুহাম্মদ হাসান প্রমুখ নেতৃবৃন্দ ‘তরকে মুওয়ালাত’ আন্দোলনকে সফল করার জন্য আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামিয়া কলেজ লাহোরকে নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে, মুসলমানদের শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতার বিষয়টি বিবেচনা করে প্রফেসর মাওলভী হাকিম আলী মুসলিম ছাত্রদের এ আন্দোলনের কর্মী হতে নিরুৎসাহিত করছিলেন।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পরিবর্তে দ্বিজাতিতত্ত্বের সমর্থক ছিলেন।
এভাবে প্রফেসর মাওলভী হাকিম আলী রাজনীতি, ধর্ম, শিক্ষা ও বিজ্ঞান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই আলা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান এবং আল্লামা ইকবাল উভয়ের কাছ থেকেই উপকৃত হতেন।
নাজিরীন! হযরত ঈশান রহমতুল্লাহি আলাইহির মাযার প্রাঙ্গণে অবস্থিত একটি নীরব কবর আজ আমাদের এমন এক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল, যিনি একই সঙ্গে ছিলেন আলেম, বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, শিক্ষক এবং জাতির চিন্তাগত পথপ্রদর্শক।
প্রফেসর মাওলভী হাকিম আলীর জীবন আমাদের এ শিক্ষাই দেয় যে, জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতা পরস্পরের বিরোধী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। তিনি ছিলেন গণিতের শিক্ষক, কিন্তু আওলিয়ায়ে কিরামের দরবারের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
তিনি ছিলেন বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ, কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর দিকনির্দেশনাকেই চূড়ান্ত সত্য বলে বিশ্বাস করতেন।
তিনি ছিলেন একটি কলেজের অধ্যক্ষ, কিন্তু নিজের জ্ঞানগত জটিলতার সমাধানের জন্য আওলিয়ায়ে উম্মত ও মুজাদ্দিদগণের দ্বারস্থ হতে কখনো সংকোচবোধ করতেন না।
আজ যখন নতুন প্রজন্মকে এ ধারণা দেওয়া হচ্ছে যে, ধর্ম ও বিজ্ঞান দুটি সম্পূর্ণ পৃথক জগৎ, তখন প্রফেসর মাওলভী হাকিম আলী, আল্লামা ইকবাল এবং ইমাম আহমদ রেযা খানের এই ত্রিভুজ আমাদের জানিয়ে দেয় যে, উপমহাদেশের প্রকৃত জ্ঞান-ঐতিহ্য ছিল এমন এক ঐতিহ্য, যেখানে গবেষণাগার ও খানকাহ, কলম ও তাসবিহ, গণিত ও ফিকহ, বিজ্ঞান ও তাসাউফ—সবই একই কাফেলার সহযাত্রী ছিল।
সম্ভবত এ কারণেই ইতিহাসের এ নীরব চরিত্রগুলো আজও আমাদের আহ্বান জানায় যে— জাতি শুধু রাজনীতিবিদদের দ্বারা গড়ে ওঠে না; জাতি গড়ে ওঠে সেইসব শিক্ষক, গবেষক ও জ্ঞানীদের দ্বারা, যারা প্রজন্মের চিন্তাধারাকে নির্মাণ করেন।
আমি হযরত ঈশানের মাযারে হাজিরা দিতে গিয়েছিলাম; কিন্তু ফেরার সময় আমার এমন অনুভূতি হলো, যেন এক অজ্ঞাতনামা শিক্ষক কবরের ওপার থেকে আমাকে ডেকে বলছেন—
“তোমার নতুন প্রজন্মকে সেইসব মানুষের সঙ্গে পরিচিত করাও, যারা জ্ঞানকে ইবাদত এবং শিক্ষাকে দ্বীনের সেবা বলে মনে করতেন।”
আল্লাহ তাআলা প্রফেসর মাওলভী হাকিম আলী, হযরত ঈশান রহমতুল্লাহি আলাইহি, আল্লামা ইকবাল এবং ইমাম আহমদ রেযা খানের মর্যাদা আরও সমুন্নত করুন এবং আমাদেরকেও জ্ঞান, ইখলাস ও সত্যভাষিতার এ মহান ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হওয়ার তাওফিক দান করুন।
— জাওয়াদ রেযা খান (পাকিস্তান)
উর্দূ থেকে অনুদিত