29/09/2025
বাম পাশের ছবিটা ২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বরের। সেদিন আমার GRE পরীক্ষা ছিল। আপনারা নিশ্চয়ই জানবেন, GRE হলো যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি পরীক্ষার মতো । পরীক্ষার হলে প্রবেশের সময় নিয়ম অনুযায়ী ETS আমার ছবি তুলেছিলো। কিছুদিন আগে ETS-এর ওয়েবসাইট থেকে ছবিটি ডাউনলোড করেছি।
ক্যালেন্ডারের হিসাবে তিন বছর আগে, জীবনের এক অদ্ভুত সময় পার করছিলাম। ৪৩তম বিসিএস-এর লিখিত পরীক্ষা শেষ করেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স প্রায় সমাপ্তির পথে। GRE শেষ করে মাত্র চার দিন পরে ২৫ সেপ্টেম্বর IELTS পরীক্ষা, আর ২৯ ডিসেম্বর থেকে শুরু হবে ৪৪তম বিসিএস-এর লিখিত।
একই সঙ্গে পরিকল্পনা ছিল, মাস্টার্সের রেজাল্ট হাতে পেলেই ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যাথমেটিক্সের শিক্ষক হিসেবে আবেদন করব। সেই প্রস্তুতিতে আমি উচ্চতর গণিত পড়া শুরু করলাম। গণিতের গভীরতম বিশ্লেষণ এবং অধ্যয়ন। পাশাপাশি ৪৩তম বিসিএস-এর ভাইভার প্রস্তুতিও চলছিলো সমানতালে।
এই এত কিছু একসাথে নিয়ে রাজধানীর এক চিলেকোঠায় আমি একা একা থাকতাম। সারাদিন পড়াশোনার মধ্যে দিন কাটত, আর প্রতি দিনের শেষে সন্ধেবেলায় ফোনের ওপাশে থাকত আমার মা। তাঁর দোয়ার শক্তি কতটা তা তিনি আমাকে বুঝিয়ে দিতেন। মায়ের সাহস আর প্রার্থনা নিয়ে আমি চেষ্টা করেছি নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে।
ডান পাশের ছবিটা ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের—প্রায় তিন বছর পরের একটি মুহূর্ত।৪৩তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করেছি। ছবিটি তোলা হয়েছিল ৭৮তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের জেলা সংযুক্তি মডিউলের অংশ হিসেবে বগুড়ার RDA-তে।
প্রশাসন ক্যাডারে যোগদানের পাশাপাশি এই তিন বছরে আমার জীবনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে, আপনাদের সঙ্গে সেগুলো শেয়ার করতে চাই -
(১) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ উচ্চ CGPA নিয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করি।
(২) দেড় বছর ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে Linear Algebra ও Fourier Analysis পড়িয়েছি। মাস্টার্স-এর রেজাল্ট, নিয়োগ পরীক্ষা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছিলাম।
(৩) ৪৪তম বিসিএসে BCS (PWD) ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি।
(৪) আন্তর্জাতিক জার্নালে আমার ৩টি peer-reviewed রিসার্চ পেপার প্রকাশিত হয়েছে।
(৫) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Governance and Development Studies-এ দ্বিতীয় মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি।
(৬) উচ্চশিক্ষার সব প্রস্তুতি শেষ করেও বিদেশে যাওয়া থেকে কয়েক বছরের জন্য বিরতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
(৭) ইউটিউবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিসিএস প্রস্তুতি নিয়ে আমার আলোচনা এখন প্রায় এক লাখ মানুষ নিয়মিত দেখে; ফেসবুক পেজেও প্রায় একই সংখ্যক অনুসারী।
(৮) আর সবচেয়ে বড় কথা, কয়েক হাজার চাকরিপ্রার্থী আমার দিকনির্দেশনায় সিভিল সার্ভিসের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সত্যি বলতে, তাদের অনেকে আমার কথা শুনে জীবনে নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস পাচ্ছে।
আসুন, আবার ৩ বছর আগে ফিরে যাই। তখনকার আমি ছিলাম একেবারেই ভিন্ন। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ২.৫৪ CGPA নিয়ে পাশ করেছি। ৪ বছরের গ্রাজুয়েশন শেষ করতে সময় লেগেছিল ৯ বছর। হ্যাঁ ভাই, আমি ৮টি সেমিস্টারের জায়গায় ১৫টি সেমিস্টার পড়ে ৯ বছরে গ্রাজুয়েশন শেষ করেছি।
তখন আমার কী মনে হতো জানেন? মনে হতো—একাডেমিক জীবনে বা লেখাপড়া করে আমার আর কিছু হবে না। তাই উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, মানে ব্যবসা করে নিজের ব্যর্থতাকে ঢেকে ফেলতে চাইতাম। ব্যবসায় কিছুটা সাফল্য পেলেও ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেতাম। কারণ আমি আসলে ব্যবসায়ী হতে চাইনি। একাডেমিকে এত খারাপ করার হতাশা থেকে ব্যবসায়িক সাফল্য আর টাকার জোরে নিজেকে বোঝাতে চেয়েছিলাম যে আমি জীবনে ব্যর্থ নই।
ঠিক তখনই আমার গল্পে এক বিরাট মোড় নিলাম। সুন্দর, গোছানো জীবন বিসর্জন দিয়ে ঢাকার এক চিলেকোঠায় আশ্রয় নিলাম। একসাথে অনেক কিছু শুরু করলাম। এত বেশি পড়াশোনা করতাম তখন, যে এক মুহূর্তের জন্যও নিজেকে ফাঁকি দিইনি। কী হবে না হবে; এসব নিয়ে হতাশা কাজ করত, কিন্তু আমি ছাড়িনি। শক্ত হাতে, দৃঢ়ভাবে লেগে ছিলাম। নিজেকে ফিরে পাওয়ার সেই লড়াইয়ে বরাবরের মতোই ঢাল হয়ে পাশে ছিলো আমার ভাইয়া। কথাপ্রসঙ্গে ভাইয়া আমাকে একদিন বলেছিলেন: “Hosen, sky is not your limit. You must go beyond that.”
সত্যি বলতে, তখন যেটুকু পাওয়ার আশায় যাত্রা শুরু করেছিলাম, আজ তার থেকে অনেক, অনেক বেশি অর্জন করেছি।
আজ যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেল করেছেন বলে মনে হচ্ছে এক-দুইটা বছর নষ্ট হয়ে গেলো? রেজাল্ট ৩.০০-এর নিচে নেমে গেছে বলে খারাপ লাগছে ভাই? আজ বিসিএস প্রিলির রেজাল্ট বের হলো, আপনি ফেল করলেন! মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যর্থ মানুষ আপনি? সুইসাইড করতে ইচ্ছে করছে? সবাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, আর আপনি কোনো এক কলেজে অনার্স করছেন বলে নিজেকে ছোট মনে হচ্ছে ভাই?
আজ আপনাকে জোর দিয়ে বলবো- নিজের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন ভাই। নিজেকে সমৃদ্ধ করুন, পড়ুন, জানুন। আপনি আকাশ পেরিয়ে মহাশূন্যের যদি কোনো শেষ বিন্দু থাকে, সেখানেও পৌঁছাতে পারবেন। হতাশ হয়ে ছেড়ে দেবেন না, প্লিজ। জীবনে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। জীবন টি-টোয়েন্টি ম্যাচ নয়, এটা একেবারে লম্বা টেস্ট ম্যাচ ভাই। নিজেকে ভেঙে নতুন এক নিজেকে গড়বেন। প্রাণ খুলে হাসবেন। মনে রাখবেন, “The end justifies the means.”
পারবেন না ভাই??
Courtesy : Hosen A Ali