11/02/2024
স্বরিন্দ্র মুখার্জী বাবু লিখেছেন👇
গত বৃহস্পতিবার বি এডের প্র্যাক্টিস টিচিং'এ গিয়েছিলাম একটা সরকারি ইস্কুলে। আমি যে কটা ইস্কুলে এতদিন পড়িয়েছি বা এখন যে ইস্কুলে পড়াই তার চেয়ে সরকারি ইস্কুলে পড়ানোর পদ্ধতি সম্পূর্ন আলাদা।
সপ্তম শ্রেণীর ক্লাসে সব মিলিয়ে জনা পঁচিশ ছাত্রছাত্রী। অধিকাংশেরই পোশাকে অপরিচ্ছন্নতা স্পষ্ট। প্রত্যেকের সাদা জামার বুক পকেটে বিশ্ববঙ্গের লোগো, নিচে লেখা "পশ্চিমবঙ্গ সরকার।"
টেন্স শেখাচ্ছিলাম। কিছুটা বোঝানোর পর ট্রান্সলেশন করতে দিলাম। দু'এক জন যত্ন করেই করল। আমি ক্লাসে ঘুরে ঘুরে প্রত্যেকের খাতায় নজর রাখছিলাম। শেষ বেঞ্চিতে বসা একটা ছেলেকে ডাকলাম। সে ডাক শুনে নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল। বুঝলাম কিছুই বোঝেনি। আবার বোঝালাম এবং বাংলা বাক্যটা পড়তে বললাম। ছেলেটি একটি অসংলগ্ন বাক্য পড়ল। আমি ভাবলাম, আমিই বুঝি ভুল শুনছি। ছেলেটিকে ডাকলাম কাছে। ছেলে খাতাখানা নিয়ে আমার কাছে এসে সলজ্জ ভঙ্গিতে দাঁড়াল। আমি ওর খাতায় চোখ রাখতে দেখি, পাঁচটা অতি সাধারণ বাংলা বাক্যের সবকটিই ভুল। ভুল মানে ছোটখাট বানান ভুল নয়, এক্কেবারে ভুল। মানে "আমি ভাত খাবে গতকাল" -- এরকম ভুল।
আমি তাকে খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করলাম, "বাবা, তুই বাঙালী তো?"
সে ঘাড় নাড়ল।
-"বাড়িতে বাবা মায়ের সঙ্গে বাংলায় কথা বলিস তো?"
ছেলেটি আবার ঘাড় নাড়ল।
আমি ছেলেটির মাথায় হাত রেখে বললাম, "এরকম বাংলা কি কখনও বলেছিস? বা কাউকে বলতে শুনেছিস?"
ছেলেটি বলল, "না।"
-"তাহলে এমন অদ্ভুত বাক্য লিখলি কী করে, বাবা?"
ছেলেটি আমার দিকে তাকাল। ওর চোখ ছলছল করছে। ভেবেছিল স্যার বুঝি খুব পেটাবে। কিন্তু এক্কেবারে বিপরীত ব্যবহার পেয়ে ও হতবাক।
ছেলেটি চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি কোনো উত্তর পাব না জেনেও ওকে নিস্পলক দেখছিলাম। ওর দৃষ্টিতে মিশে ছিল নিদারুণ অসহায়তা, দৈন্যতা আর হীনমন্যতা।
ওই দৃশ্য আমি সেদিনের পর এখনও ভুলতে পারিনি। মাথার চুল কপাল ঢেকে চোখ ছুঁয়েছে। চোখ দুটো ছলছল করছে। আর জামার বুক পকেটে মুচকি হাসছে বিশ্ববঙ্গের লোগো আর বিষন্ন হাসির মত জেগে আছে "পশ্চিমবঙ্গ সরকার" ।
ছবি সৌজন্যে: ইন্টারনেট