28/09/2025
প্রসঙ্গ: অমুসলিমদের শুভেচ্ছাজ্ঞাপন
**** ****
অমুসলিমদের পূজা-পার্বণ উপলক্ষে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জ্ঞাপন সম্পর্কে শরীয়তের নির্দেশনা কী— জানতে চেয়ে গতকাল থেকে আমার সুপ্রিয় এফবি ফ্রেন্ডদের মধ্যে কেউ কেউ ম্যাসেজ পাঠাচ্ছেন। গতকাল থেকে ফেসবুক পাড়াও—দেখি—এ নিয়ে বেশ সরগরম।
প্রথমেই বলে রাখি, এ প্রসঙ্গে কথা বলার মতো মুফতী আমি নই। ফ্রেন্ডদের আবদারের পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রসঙ্গে অতি সংক্ষেপে জাস্ট আমার কিছু চিন্তা তোলে ধরছি। কেউ আবার আমার কথাকে চূড়ান্ত ভাববেন না। বিস্তারিত হয়তো কোনো একদিন লেখবো, ইন্ শা’আল্লাহ।
আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে কথা বলার সময় যেসব বিষয় আমাদের বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন মনে করি, তা হলো-
ক. আমাদের দেশে নানা জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে, যদিও মুসলিমদের তুলনায় তাদের সংখ্যা কম।
খ. একই সমাজে বা পরিমণ্ডলে বসবাসকারী—মুসলিম হোক বা অমুসলিম— পরস্পর দেখা-সাক্ষাতে একে অপরকে শুভেচ্ছা ও অভিবাদন জানাবে, দুঃখে-সুখে শরীক হবে, পরস্পর একে অপরের খোঁজখবর নেবে এবং কুশলাদি জিজ্ঞেস করবে—এটা স্বাভাবিকভাবে মানবিক সৌজন্য ও ভদ্রতার মধ্যে পড়ে। বিভিন্ন হাদীসে এ কথা এসেছে।
গ. যদি শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানোর মানে ও উদ্দেশ্য— তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস বা উপাসনাকে স্বীকৃতি দেওয়া বা সমর্থন করা হয় এবং শব্দ ও ভাষা থেকেও সেটা বোঝা যায়, তবে সেটা স্পষ্টভাবে হারাম ও ইসলামী আকীদার পরিপন্থি। এটা প্রকারান্তরে তাদের কুফর-শিরককে স্বীকৃতি দেওয়ার বা সমর্থন করার শামিল। এ বিষয়ে সকল আলিমই একমত।
ঘ. যদি শুভেচ্ছা জানানো হয় কেবল সৌজন্য, সদ্ভাব ও নাগরিক সম্প্রীতির জন্য; কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাস সমর্থন উদ্দেশ্য নয়— তবে এ প্রসঙ্গে আলিমদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে।
কেউ কেউ এটিকে নিষিদ্ধ বা অপছন্দনীয় বলেছেন। কারণ, তারা মনে করেন যে, এতে প্রকারান্তরে তাদের ধর্মীয় রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি সমর্থন বোঝায়।কেউ কেউ আবার আকীদা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেও সতর্কতামূলক এরূপ মত ব্যক্ত করেছেন।
আবার কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বা সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য, বিশেষ করে বহুজাতিক সমাজে এটিকে অনুমোদনযোগ্য বলেছেন, তবে শর্ত হলো- আকীদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক যেন কোনো শব্দ বা বাক্য না থাকে।
তারা এটিকে স্বাভাবিক সৌজন্য রক্ষা ও নিছক আনুষ্ঠানিকতা মনে করেন, যা পরস্পরের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে এবং ইসলামের উদার প্রকৃতি ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে এর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিকে প্রমোট করে। ড. ইউসূফ আল কারযাভী (রাহ.)-সহ আধুনিক অনেক গবেষক এরূপ মত ব্যক্ত করেছেন।
এখন কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে এরূপ শুভেচ্ছাজ্ঞাপনকে নিষিদ্ধ বা অপছন্দনীয় মনে করেন, তিনি তা করতেই পারেন; আমি নিজেও ব্যাপকহারে এরূপ শুভেচ্ছাজ্ঞাপনকে সমর্থন করি না; তবে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিগণ এ জাতীয় শুভেচ্ছা জানালে তাকে কঠিন ভর্ৎসনাযোগ্যও মনে করি না। (আল্লাহু আ‘লামু বিস সাওয়াব)
ঙ. শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানোর শব্দ ও বাক্যও এমন হতে হবে, যা কেবল স্বাভাবিক সৌজন্য ও সদ্ভাব প্রকাশ করবে। এরূপ কোনো শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা আদৌ সমীচীন নয়, যা থেকে জনমনে কাফিরদের ধর্মীয় বিশ্বাস বা উপাসনার প্রতি স্বীকৃতি বা সমর্থন দানের ধারণা তৈরি হবার কোনোরূপ আশঙ্কা তৈরি হতে পারে, যদিও শুভেচ্ছাজ্ঞাপকের উদ্দেশ্যের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে এরূপ কোনো ধারণা থাকে না। হাদীসে যেকোনোরূপ অবাঞ্ছিত সংশয় তৈরি করতে পারে বা মিথ্যা অভিযোগ আরোপিত হতে পারে—এমন কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কাজেই এ ক্ষেত্রে শব্দ প্রয়োগে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।সরাসরি ধর্মীয় বিষয় উল্লেখ না করে স্বাভাবিক সৌজন্যের মধ্যে পড়ে— এমন নিরপেক্ষ ভাষায় শুভেচ্ছা জানানো যেতে পারে। যেমন— বলা যেতে পারে, ‘আপনাদের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করি।’
চ. রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্ব যেহেতু জনগণের সাথে—এমনকি তারা অমুসলিম হলেও—সুসম্পর্ক রাখা এবং অন্যান্য অধিকারের সাথে তাদের ধর্মীয় অধিকারও সংরক্ষণ করা, তাই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও শাসকরা চাইলে বা প্রয়োজন মনে করলে নিরপেক্ষ ভাষায় সাধারণ মানবিক শুভেচ্ছা জানাতে পারেন,
তবে এ সময় তাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে, তাদের কথায় যেন কোনোভাবেই তাদের বিশ্বাস ও ধর্মীয় উৎসবের প্রতি— ক্ষীণভাবে হলেও—সমর্থন বোঝা না যায়।
ছ. এটাও লক্ষণীয় যে, অনেক অমুসলিম ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতাও নাগরিক সম্প্রীতির জায়গা থেকে মুসলিমদের নানা ধর্মীয় উৎসব ও সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো উপলক্ষে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করে থাকেন।
এ অবস্থায় মানবিক শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধের জায়গা থেকেও তাদের শুভেচ্ছার জবাব দেওয়া মুসলিমদের ওপর একটা নৈতিক দায়িত্ব বর্তায়। তবে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে— আমাদের শুভেচ্ছা বাণীর মধ্যে যাতে কোনোভাবেই শিরকের কোনোরূপ আমেজ না থাকে, তাদের শিরকের প্রতি কোনোরূপ সমর্থন বোঝা যায়—এরূপ কোনো শব্দ বা বাক্য না থাকে।
জ. কতিপয় নিরপেক্ষ শুভেচ্ছা বাক্য (ধর্মীয় সমর্থন ব্যতীত):
1. “আপনাদের এই বিশেষ দিনে শান্তি, সুখ ও কল্যাণ কামনা করছি।”
2. “আপনারা যেন পরিবার-পরিজনসহ সুস্থ ও আনন্দময় সময় কাটান—এই কামনা করছি।”
3. “এই উপলক্ষ আপনাদের জীবনে নিয়ে আসুক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বার্তা।”
4. “জাতির সকল নাগরিকের জন্য আমরা চাই শান্তি, সম্প্রীতি ও অগ্রগতি।”
5. “আপনাদের উৎসব হোক আনন্দময় এবং সমাজে বয়ে আনুক সৌহার্দ্যের আলো।”
রাজনৈতিক নেতাদের জন্য উপযোগী রূপ:
1. “বাংলাদেশের সকল নাগরিকের সুখ-সমৃদ্ধি আমাদের কাম্য। এই উপলক্ষ আমাদের মধ্যে আরও ভ্রাতৃত্ব, শান্তি ও সম্প্রীতি বয়ে আনুক।”
2. “আমরা সবাই মিলে শান্তি ও কল্যাণের পথে এগিয়ে যাব—এই শুভ কামনা করছি।”
3. “আপনাদের আনন্দের এই দিনটি আমাদের সমাজে ঐক্য ও সম্প্রীতির বন্ধনকে দৃঢ় করুক।”
লক্ষণীয়, এ বাক্যগুলোতে কোথাও অমুসলিম ধর্মীয় বিশ্বাস বা পূজা-পার্বণকে সত্য বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি; বরং সামাজিক সম্প্রীতি ও কল্যাণ কামনা করা হয়েছে। ইসলামী দৃষ্টিতে এ ধরণের শুভেচ্ছা অনুমোদনযোগ্য।
ঝ. ১. হালকা-আনুষ্ঠানিক (ব্যক্তিগত/সাধারণ ব্যবহারের জন্য) কতিপয় শুভেচ্ছা বাক্য:
ব্যক্তিগত আলাপচারিতা, সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা বার্তা বা স্থানীয় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় নিম্নোক্ত অভিব্যক্তি প্রকাশ করা যায়—
1. “আপনাদের জীবনে সুখ, শান্তি ও কল্যাণ নেমে আসুক—এই শুভ কামনা করি।”
2. “এই উপলক্ষ আপনাদের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দের মুহূর্ত বয়ে আনুক।”
3. “আপনাদের উৎসব হোক ভালোবাসা, সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতির প্রতীক।”
4. “আমাদের সমাজে যেন ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা আরও দৃঢ় হয়—এই কামনা করি।”
জ. ২. অফিসিয়াল (রাষ্ট্রীয়/রাজনৈতিক নেতাদের জন্য) কতিপয় শুভেচ্ছা বাক্য:
রাষ্ট্রীয় বার্তা, প্রেস বিজ্ঞপ্তি বা নেতাদের বক্তৃতায় প্রযোজ্য:
1. “বাংলাদেশের সকল নাগরিকের সুখ, শান্তি ও অগ্রগতি আমাদের কাম্য। এই উপলক্ষ আমাদের জাতির মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করুক।”
2. “আমরা প্রত্যাশা করি, এই আনন্দঘন মুহূর্ত আমাদের দেশকে ঐক্য, শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে।”
3. “এই বিশেষ দিনটি হোক আমাদের জাতীয় জীবনে পারস্পরিক সম্মান, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক।”
4. “আমরা সবাই একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তোলার জন্য একসাথে কাজ করব—এই আমাদের প্রত্যয়।”
লক্ষণীয়, হালকা-আনুষ্ঠানিক বার্তায় ব্যক্তিগত ও সামাজিক দিককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, আর অফিসিয়াল বার্তায় রাষ্ট্রীয় ঐক্য, সম্প্রীতি ও জাতীয় অগ্রগতিকে জোর দেওয়া হয়েছে। এসব কথায় এমন কিছু নেই, যাতে ইসলামি আকীদার বিরোধিতা হয়, অপরদিকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও সুন্দরভাবে পালন করা হয়।
ঞ. হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিরপেক্ষ ভাষায় কীভাবে অমুসলিমদের জন্য দুআ করা হবে— তার পদ্ধতি উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন,
إذا دعوتم لأحدٍ من اليهودِ والنصارى فقولوا أكثر اللهُ مالَك وولدَك
‘‘যখন তোমরা কোন ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানের জন্য দুআ করো, তখন বলবে, আল্লাহ তোমার সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিন।”
ইবরাহীম আন নাখ‘ঈ (রাহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
একবার এক ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে আবেদন করলো, আমার জন্য আল্লাহ তা‘আলার কাছে দুআ করুন।
তখন তিনি বললেন,
أَكْثَرَ اللَّهُ مَالَك وَوَلَدَك وَأَصَحَّ جِسْمَك وَأَطَالَ عُمْرَك.
‘‘আল্লাহ তা‘আলা তোমার সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিন, তোমাকে সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু দান করুন!”
(ভিন্ন মত প্রকাশের জন্যও ধন্যবাদ রইলো।)
- প্রফেসর আহমদ আলী স্যার