03/01/2022
মনে করুন একটা টাইটানিক জাহাজে আপনারা ১০০০ জন মানুষ নতুন একটা দেশে যাচ্ছেন। পথে, আইসবার্গের সাথে ধাক্কা লেগে, আপনাদের জাহাজ ডুবে যাওয়ার আগে সবাই মিলে একটি জনমানবহীন দ্বীপে আশ্রয় নিলেন।
এই দ্বীপে সবাই আপনাকে সর্দার মানলো।
আপনারা দেখতে পেলেন এই দ্বীপে প্রচুর মাছ আছে, কৃষি কাজের জন্যে প্রচুর ভুমি আছে, বেশ কিছু বন্য হরিন আছে যেইটা শিকার করে -প্রোটিনের প্রয়োজন মেটানো যাবে।
ফলে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে কেউ কেউ ধান চাষ করলো , কেউ কেউ হাত দিয়ে মাছ ধরলো, কেউ কেউ বল্লম বানিয়ে হরিন শিকার করলো, কেউ কেউ মাছ ধরার জাল বানিয়ে মাছ শিকারিকে দিলো , কেউ কেউ সুতো দিয়ে কাপড় বুনলো ।
প্রাথমিক পর্যায়ে পুরো বিনিময় টা ছিলো বারটার পদ্ধতিতে।
যে জাল বানালো সে জেলেকে বললো, এই জালের বিনিময়ে আমাকে ১০ টা মাছ দিতে হবে। এই মাছ নিয়ে জেলে গেলো ধান উৎপাদকের কাছে। ধান উৎপাদক ১ টা মাছের বিনিময়ে সে এক কেজি ধান নিলো।
কিন্তু, কিছু দিনের মধ্যে দেখা গেলো এই পদ্ধতিটা খুব প্রব্লেমেটিক।
যে ধান বেচতেছে তার আর মাছের দরকার নাই, তার দরকার কাপড়। অন্য দিকে কাপড় উৎপাদকের দরকার মাছ।
একই সাথে একটা টাইম প্রব্লেম আছে, সবাই সব কিছু একই সময়ে উৎপাদন করছেনা, একই জিনিষ সবার একই সময়ে লাগতেছেও না । যে কাপড় বানায় তার সাপ্লাই আসে মাসের শেষে , অন্য দিকে তার প্রতিদিনই ধানের দরকার হয়।
ফলে সবাই আপনার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, সর্দার, একটা সমাধান দেন , কি করা যায় ?
আপনি বল্লেন, আচ্ছা আমি একটা সলিউশান দিচ্ছে। এই দ্বীপে একটা নীল রঙের পাথর পাওয়া যায়। এই পাথর গুলোতে আমি আমার নাম খোদাই করে একটা সিল দিচ্ছি। এই সিল দেওয়া পাথর সবাই বিনিময় করতে পারবে।
আর এই সিল দেওয়া পাথরের মুল্যে তোমরা নিজেরা নির্ধারণ করবে।
যে মাছ বিক্রয় করে ধান কিনতে চায়, সে বললো প্রতিটা সিল দেওয়া পাথরের বিনিময়ে সে এক কেজি ধান কিনতে রাজি, আর তাকে একটা মাছের বিনিময়ে ১০টা সিল দেওয়া পাথর দিতে হবে।
তাই, একজন ধান বিক্রেতা যখন একটা মাছ কিনবে সে আপনার কাছ থেকে ১০টা সিল দেওয়া পাথর নিয়ে গেলো, এই প্রমিজে যে সে ধান বিক্রয় করে সেই পাথর গুলো আপনাকে ফেরত দেবে।
অন্য দিকে, কাপড় বিক্রেতা একই প্রমিজে ধান কেনার জন্যে আপনার কাছে সিল দেওয়া পাথর নিয়ে গেলো।
এবং সেই সিল দেওয়া পাথর দিয়ে সে ধান কিনলো।
তো এই সিল দেওয়া পাথর টাই আপনার দ্বীপে টাকা হিসেবে চালু হলো। যেটা ইন্টেরেস্টিং এইখানে কোন গোলড ব্যাকিং প্রয়োজন হচ্ছেনা। সবাই ভলান্টারিলি আপনার কাছে, ফিউচারে ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে অর্থ নিয়ে যাচ্ছেে এবং ভলান্টারিলি ট্রাঞ্জেকশান করতেছে। ফলের অর্থ তৈরি করতে গোল্ড ব্যাকিং লাগবে এ ধারণা থেকে আমরা এখানে বের হয়ে আসলাম।
এই দ্বীপে টাকা তৈরি হচ্ছে, মুলত ট্রাঞ্জেক্সানের মাধ্যমে ।
একটা পর্যায়ে আপনার কাছে পুরো কাজটা ঝামেলা মনে হলো। কারন সিল দেওয়া পাথরে সিল মারতে, , সেইটা ফেরত নিতে হয়, হিসাব রাখতে হয় যা অনেক কঠিন কাজ। আপনি একটা টাকশাল তৈরি করে বললেন, তোমরা এইটা ডিল করো।
এইটাই হলো সেন্ট্রাল ব্যাংক।
এই সময়ে এই দ্বীপে খুব স্মার্ট একটা লোক বললো আচ্ছা অনেকের কাছেই সিল দেওয়া পাথর জমে গ্যাছে, এই পাথর গুলো তোমাদের কাছে রেখে লাভ কি ?
এই গুলো তোমরা আমার কাছে জমা রাখো, আমি তোমাদের এক বছর পরে যত টা পাথর জমা রাখবা তার চেয়ে বেশী ফেরত দিবো।
মাছওয়ালা বা ধান ওয়ালা ভাবলো ঠিকই তো, এই সিল ওয়ালা পাথর আমার কাছে রেখে লাভ কি ? আমি বরং এই লোকটার কাছেই জমা রাখি, যদি সেইটা আমি এক বছর পরে বেশী ফেরত পাই। ভালোই তো।
তো এই লোকটা হইলো ঐ দ্বীপের প্রথম ব্যাংক। এই ধরনের মনে করেন তিন চারটা ব্যাংক হইলো।
একটা পর্যায়ে কাপড় ওয়ালা ব্যাংকে গিয়ে বললো আমি শিতকালের জন্যে অনেক গুলো কাপড় বানাতে চাই, কারন শীতকালে কাপড়ের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। সে ব্যাংককে গিয়ে বললো তুমি আমাকে ১০০ টা সিলওয়ালা পাথর দাও যেইটা দিয়ে আমি অনেক গুলো সুতো কিনে অনেক গুলো শিতের কাপড় বানাবা আর শিত কালে আমি কাপড় গুলো অনেক চড়া দামে বেচবো। বিক্রয়ের পরে, প্রতি ১০০টা সিলওয়ালা পাথরের স্থলে এক বছর পরে আমি তোমাকে ১১০ টা পাথর ফেরত দেবো।
ব্যাংক যখন ১০০ পাথরটা কাপড় ওয়ালাকে দিলো , সেইটা হচ্ছে ডেবট। এবং এই ডেবটের ইন্টেরেস্ট রেট হচ্ছে ১০ টা সিলওয়ালা পাথর।
নাও, ফ্রেকশানাল রিজার্ভ ব্যাংকিং কি ?
মনে করুন, এই ব্যাংকের কাছে বিভিন্ন কাস্টমারের ১০০ টা সিলওয়ালা পাথর আছে। এখন এই ব্যাংক যদি দি কাপড় ওয়ালাকে ১০০ টা পাথর দিয়ে দেয়। তাহলে কাস্টমাররা যদি তার কাছে এই টাকা ফেরত চায় সেইটা টাকা সে ফেরত দিতে পারবে না।
এই সময় সেন্ট্রাল ব্যাংকের ম্যানেজার তাকে বললো ডোন্ট ওরি। তোমার কাছে, ১০০ টা সিল ওয়ালা পাথর থাকলে তুমি ৯০ টা পাথর ঋণ দিতে পারবে। তোমার কাস্টমার যদি তোমার কাছে টাকা চায় আমি তোমাকে সেইটা ওই সময় ঋণ দিবো।
এই ভরসায় ব্যাংক, কাপড় ওয়ালাকে ৯০ টা সিলওয়ালা পাথর দিলো। এর ফলে সেই দ্বীপের অর্থনীতিতে নতুন ৯০ টাকা সৃষ্টি হইলো।
এখন সেই কাপড় ওয়ালা এই ৯০ টাকা নিয়ে পরবর্তিতে আরো একটা ব্যাংকে জমা রাখলো। সেই ব্যাংক আবার সেই ৯০ টা সিল ওয়ালা পাথরের বিনিময়ে আর ৮০ টা পাথর ঋণ দিলো স্কুলের টিচারকে। সেই স্কুলের টিচার সেই ৮০ টাকা যে ব্যাংকে জমা রাখলো সেই ব্যাংক সেই ৮০ টাকা থেকে ৭০ টাকা ঋণ দিলো লোহার পাতিল বানানোর কামারকে।
তো এই ভাবে সকল ব্যাংক মিলে যে অর্থ সৃষ্টি করে, সেইটাকে বলে ফ্র্যাকশানাল রিজার্ভ ব্যাংকিং।
এখন একটা জিনিষ খেয়াল করবেন। এই দ্বীপে কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অর্থ তৈরি হচ্ছে মূলত বিভিন্ন ধরনের ট্রাঞ্জেকশানের ভিত্তিতে। এই ট্রাঞ্জেকশান গুলোর ভ্যালু ডিসাইড করতেছে বাজার তার চাহিদা আর যোগানের ভিত্তিতে। কত কেজি ধানের বিনিময়ে, এক কেজি মাছ হবে সেইটা ডিসাইড করতেছে চাহিদা আর জোগান। এর সেই ট্রাঞ্জেকশান গুলোর ভিত্তিতে নতুন অর্থ তৈরি হচ্ছে।
ফলে কোন জিনিষের দাম কত হবে, সেইটা মার্কেট ডিসাইড করতেছে। এবং নতুন কত টাকা তৈরি হবে, সেইটা ওই দ্বীপের অর্থনৈতিক এক্টিভিটির পরিমাণের উপরে নির্ভর করছে।
কিন্তু মনে করুন, এই দ্বীপে একটা দুস্ট লোক সিদ্ধান্ত নিলো সে এই ট্রাষ্ট বেজড সিস্টেমটাকে গেইম করবে।
সে ব্যাংকে গিয়ে বললো, আমি একটা জাহাজ বানাবো যে জাহাজ দিয়ে সবাই এই দ্বীপ থেকে বের হয়ে যেতে পারবে।
কিন্তু এই জাহাজটা বানানোর জন্যে যে জিনিষ পত্র লাগবে, সেইটা কিন্তে আমাকে ১০০০ টা সিল ওয়ালা পাথর দিতে হবে।
তো সেই লোকটাকে ব্যাংক ১০০০ টা সিল ওয়ালা পাথর দিলো। সেই ১০০০ টা পাথর দিয়ে লোক টা কিছুই বানালো না, সে ধান কিনলো, মদ কিনলো, জমি কিনলো, ভালো ভালো মাছ কিনলো এবং তার চাহিদার কারনে এই জিনিষ গুলোর দাম বৃদ্ধি পেলো।
সবার শেষে এই লোকটা সিল ওয়ালা পাথর ব্যাংকে ফেরত দিতে পারলো না।
ফলে এই লোকটার ঋণ খেলাপি হলো ।
এর ফলে কি হবে ?
ওই দ্বীপে মানি সাপ্লাই বৃদ্ধি পাবে। ইউসি পূর্বের ট্রাঞ্জেকশান গুলোতে মানি সাপ্লাই সব সময়ে একটা একসপানশন ও কন্ট্রাকশন প্রসেসের ভেতর দিয়ে গ্যাছে।
কারন, ট্রাঞ্জেকশান শেষে সবাই যখন সিলওয়ালা পাথর ব্যাংকে বা সেন্ট্রাল ব্যাংকে ফেরত দিয়েছে তখন মানি সাপ্লাইয়ের কন্ট্রাকশান হয়েছে।
ফলে, যত টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে তত টাকা নয় বরং বিভিন্ন সাপ্লায়াররা যে ভ্যালু তৈরি করেছে, তার পরিমান নতুন টাকা তৈরি হয়েছে।
কিন্তু, জাহাজ তৈরির প্রমিসে যে লোকটা ১০০০ টা সিল ওয়ালা মুদ্রা ওই দ্বীপে জেনারেট করলো সেই অর্থটা ব্যাংকে ফেরত আসবে না। ফলে, সেই দ্বীপে এই ১০০০ টা সিলওয়ালা পাথরের বা মানি সাপ্লাইয়ের কন্ট্রাকশনটা হবেনা।
ফলে মনিটারি সাপ্লাই বৃদ্ধি পাবে। অতিরিক্ত টাকা সবাই ট্রাঞ্জেক্ট করবে। ফলে সবার পন্যের মুল্য বৃদ্ধি পাবে।
এই টাই বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের একটা বড় রিফ্লেকশান। বর্তমানে আমাদের টোটাল ডেবটের প্রায় ৪০% খেলাপি বা অবলোপিত বা আইনি প্রক্রিয়ায় স্থগিত।
বাংলাদেশের বিগত এক দশকে খেলাপি ঋণের যে স্ফীতি হয়েছে এবং একই সাথে সরকার ভ্যালু তৈরি না করেও, অনেক বড় অংকের ব্যয় করছে -
এই দুইটি এক্টিভিটি আমাদের সামগ্রিক মানি সাপ্লাইকে বৃদ্ধি করেছে যার ফলে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি প্রচন্ড ভাবে বৃদ্ধি করেছে।
এইটা বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় একটা সংকট, যেইটা নিয়ে অর্থনীতিবিদেরা আলচনা করছে না।
(জিয়া হাসান)