Singuria Lokerpara Sir Abdul Halim Ghaznavi High School, Tangail

Singuria Lokerpara Sir Abdul Halim Ghaznavi High School, Tangail

Share

It is one of the famous school in Ghatail, Tangail. Let's connect with us all of the alma matter of this school.

01/06/2022

কেমন বড়াই -- হাবীবুর রহমান

লোকটা শুধু করত বড়াই–
'দেখে নিতাম লাগলে লড়াই !’
উইঢিবিতে মারতো ঘুষি
চোখ পাকিয়ে জোরসে ঠুসি।
বাহু ঠুকে ফুলিয়ে ছাতি
বলত- ‘আসুক বাঘ কি হাতি !
আমি কি আর কারেও ডরাই ?
ভাঙতে পারি লোহার কড়াই।’
শুনে সবে কাঁপত ডরে,
খিল লাগিয়ে থাকত ঘরে।
এক দিন এক ভোরের বেলায়
বেবাক লোকের ঘুম ভেঙে যায়,
ঘর ছেড়ে সব বাইরে এসে
বাড়িয়ে গলা দেখল শেষে;
ঢিবির পাশে বাঁধের গোড়ায়,
লোকটা কেবল গড়িয়ে বেড়ায়।
‘ব্যাপার কি ভাই, ব্যাপার কি ভাই’-
ফিসফিসিয়ে বলল সবাই।
লোকটা তখন চেঁচিয়ে জানায়–
'উই ধরেছে নাকের ডগায় !’ 😀

28/12/2021

পাগলা দাশু
- সুকুমার রায়

আমাদের স্কুলের যত ছাত্র তাহাদের মধ্যে এমন কেহই ছিল না, যে পাগলা দাশুকে না চিনে। যে লোক আর কাহাকেও জানে না, সেও সকলের আগে পাগলা দাশুকে চিনিয়া ফেলে। সেবার এক নতুন দারোয়ান আসিল, একেবারে আন্‌কোরা পাড়াগেঁয়ে লোক, কিন্তু প্রথম যখন সে পাগলা দাশুর নাম শুনিল, তখনই আন্দাজে ঠিক ধরিয়া লইল যে, এই ব্যক্তিই পাগলা দাশু। কারণ মুখের চেহারায়, কথাবার্তায়, চাল-চলনে বোঝা যাইত যে তাহার মাথায় একটু ‘ছিট’ আছে।

তাহার চোখ দুটি গোল গোল, কান দুটি অনাবশ্যক রকমের বড়, মাথায় এক বস্তা ঝাঁক্‌ড়া চুল। চেহারাটা দেখিলেই মনে হয়—

ক্ষীণদেহ খর্বকায় মুণ্ড তাহে ভারি
যশোরের কই যেন নরমূর্তিধারি।

সে যখন তাড়াতাড়ি চলে অথবা ব্যস্ত হইয়া কথা বলে, তখন তাহার হাত পা ছোঁড়ার ভঙ্গী দেখিয়া হঠাৎ কেন জানি চিংড়িমাছের কথা মনে পড়ে।

সে যে বোকা ছিল তাহা নয়। অঙ্ক কষিবার সময়, বিশেষত লম্বা লম্বা গুণ-ভাগের বেলায় তাহার আশ্চর্য মাথা খুলিত। আবার এক এক সময় সে আমাদের বোকা বানাইয়া তামাশা দেখিবার জন্য এমন সকল ফন্দি বাহির করিত যে, আমরা তাহার বুদ্ধি দেখিয়া অবাক হইয়া থাকিতাম।

‘দাশু’ অর্থাৎ দাশরথি, যখন প্রথম আমাদের ইস্কুলে ভরতি হয়, তখন জগবন্ধুকে আমাদের ‘ক্লাশের ভালো ছেলে’ বলিয়া সকলে জানিত। সে পড়াশুনায় ভালো হইলেও, তাহার মতো অমন একটি হিংসুটে ভিজেবেড়াল আমরা আর দেখি নাই। দাশু একদিন জগবন্ধুর কাছে কি একটা ইংরাজি কথার মানে জিজ্ঞাসা করিতে গিয়াছিল। জগবন্ধু তাহাকে খামখা দুকথা শুনাইয়া বলিল, “আমার বুঝি আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই? আজ এঁকে ইংরিজি বোঝাব, কাল ওঁর অঙ্ক কষে দেব, পরশু আর একজন আসবেন আর এক ফরমাইস নিয়ে—ঐ করি আর কি!” দাশু সাংঘাতিক চটিয়া বলিল, “তুমি তো ভারি ছ্যাঁচড়া ছোটলোক!” জগবন্ধু পণ্ডিত মহাশয়ের কাছে নালিশ করিল, “ঐ নতুন ছেলেটা আমায় গালাগালি দিচ্ছে।” পণ্ডিত মহাশয় দাশুকে এমনি ধমক দিয়া দিলেন যে বেচারা একেবারে দমিয়া গেল।

আমাদের ইংরাজি পড়াইতেন বিষ্টুবাবু। জগবন্ধু তাঁহার প্রিয় ছাত্র। পড়াইতে পড়াইতে যখনই তাঁহার বই দরকার হয়, তিনি জগবন্ধুর কাছে বই চাহিয়া লন। একদিন তিনি পড়াইবার সময় ‘গ্রামার’ চাহিলেন, জগবন্ধু তাড়াতাড়ি তাহার সবুজ কাপড়ের মলাট দেওয়া ‘গ্রামার’খানা বাহির করিয়া দিল। মাস্টার মহাশয় বইখানি খুলিয়াই হঠাৎ গম্ভীর হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “বইখানা কার?” জগবন্ধু বুক ফুলাইয়া বলিল, “আমার।” মাস্টার মহাশয় বলিলেন, “হুঁ—নতুন সংস্করণ বুঝি? বইকে-বই একেবারে বদলে গেছে।” এই বলিয়া তিনি পড়িতে লাগিলেন— ‘যশোবন্ত দারোগা—লোমহর্ষক ডিটেকটিভ নাটক।’ জগবন্ধু ব্যাপারখানা বুঝিতে না পারিয়া বোকার মতো তাকাইয়া রহিল। মাস্টার মহাশয় বিকট রকম চোখ পাকাইয়া বলিলেন, “এই সব জ্যাঠামি বিদ্যে শিখচ বুঝি?” জগবন্ধু আম্তা আম্তা করিয়া কি যেন বলিতে যাইতেছিল কিন্তু মাস্টার মহাশয় এক ধমক দিয়া বলিলেন, “থাক্ থাক্, আর ভালমানুষি দেখিয়ে কাজ নেই—ঢের হয়েছে।” লজ্জায় অপমানে জগবন্ধুর দুই কান লাল হইয়া উঠিল—আমরা সকলেই তাহাতে বেশ খুশি হইলাম। পরে জানা গেল যে, এটি দাশু ভায়ার কীর্তি, সে মজা দেখিবার জন্য গ্রামারের জায়গায় ঠিক ঐরূপ মলাট দেওয়া একখানা বই রাখিয়া দিয়াছিল।

দাশুকে লইয়া আমরা সর্বদাই ঠাট্টাতামাশা করিতাম এবং তাহার সামনেই তাহার বুদ্ধি ও চেহারা সম্বন্ধে অপ্রীতিকর সমালোচনা করিতাম। তাহাতে একদিনও তাহাকে বিরক্ত হইতে দেখি নাই। এক এক সময়ে সে নিজেই আমাদের মন্তব্যের উপর রঙ চড়াইয়া নিজের সম্বন্ধে নানারকম অদ্ভুত গল্প বলিত। একদিন সে বলিল, “ভাই আমাদের পাড়ায় যখন কেউ আমসত্ত্ব বানায় তখনই আমার ডাক পড়ে। কেন জানিস?” আমরা বলিলাম, “খুব আমসত্ত্ব খাস বুঝি?” সে বলিল, “তা নয়। যখন আমসত্ত্ব শুকোতে দেয়, আমি সেইখানে ছাদের উপর বার দুয়েক চেহারাখানা দেখিয়ে আসি। তাতেই, ত্রিসীমানার যত কাক সব ত্রাহি ত্রাহি করে ছুটে পালায়। কাজেই আর আমসত্ত্ব পাহারা দিতে হয় না।”

একবার সে হঠাৎ পেন্টেলুন পরিয়া স্কুলে হাজির হইল। ঢল্ঢলে পায়জামার মতো পেন্টেলুন আর তাকিয়ার খোলের মতো কোট পরিয়া তাহাকে যে কিরূপ অদ্ভুত দেখাইতেছিল, তাহা সে নিজেই বুঝিতেছিল এবং সেটা তাহার কাছে ভারি একটা আমোদের ব্যাপার বলিয়া বোধ হইতেছিল। আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম, “পেন্টেলুন পরেছিস্ কেন?” দাশু এক গাল হাসিয়া বলিল, “ভালো ইংরিজি শিখব ব’লে।” আর একবার সে খামখা নেড়া মাথায় এক পট্টি বাঁধিয়া ক্লাশে আসিতে আরম্ভ করিল এবং আমরা সকলে তাহা লইয়া ঠাট্টা তামাশা করায় যারপরনাই খুশি হইয়া উঠিল। দাশু আদপেই গান গাহিতে পারে না, তাহার যে তালজ্ঞান বা সুরজ্ঞান একেবারে নাই, একথা সে বেশ জানে। তবু সেবার ইনস্পেক্টার সাহেব যখন ইস্কুল দেখিতে আসেন, তখন আমাদের খুশি করিবার জন্য চিৎকার করিয়া গান শুনাইয়াছিল। আমরা কেহ ওরূপ করিলে সেদিন রীতিমতো শাস্তি পাইতাম কিন্তু দাশু ‘পাগলা’ বলিয়া তাহার কোনো শাস্তি হইল না।

একবার ছুটির পরে দাশু অদ্ভুত এক বাক্স লইয়া ক্লাসে হাজির হইল। মাস্টার মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি দাশু, ও বাক্সের মধ্যে কি এনেছ?” দাশু বলিল, “আজ্ঞে, আমার জিনিসপত্র।” জিনিসপত্রটা কিরূপ হইতে পারে, এই লইয়া আমাদের মধ্যে বেশ একটু তর্ক হইয়া গেল। দাশুর সঙ্গে বই, খাতা, পেনসিল, ছুরি সবই তো আছে, তবে আবার জিনিসপত্র কিরে বাপু? দাশুকে জিজ্ঞাসা করিলাম, সে সোজাসুজি কোনো উত্তর না দিয়া বাক্সটিকে আঁকড়াইয়া ধরিল এবং বলিল, “খবরদার, আমার বাক্স তোমরা কেউ ঘেঁটো না।” তাহার পর চাবি দিয়া বাক্সটাকে একটুখানি ফাঁক করিয়া, সে তাহার ভিতর কি যেন দেখিয়া লইল, এবং ‘ঠিক আছে’ বলিয়া গম্ভীরভাবে মাথা নাড়িয়া বিড় বিড় করিয়া হিসাব করিতে লাগিল। আমি একটুখানি দেখিবার জন্য উঁকি মারিতে গিয়াছিলাম—অমনি পাগলা মহা ব্যস্ত হইয়া তাড়াতাড়ি চাবি ঘুরাইয়া বাক্স বন্ধ করিয়া ফেলিল।

ক্রমে আমাদের মধ্যে তুমুল আলোচনা আরম্ভ হইল। কেহ বলিল, “ওটা ওর টিফিনের বাক্স—ওর মধ্যে খাবার আছে।” কিন্তু একদিনও টিফিনের সময় তাহাকে বাক্স খুলিয়া কিছু খাইতে দেখিলাম না। কেহ বলিল, “ওটা বোধ হয় ওর মানি-ব্যাগ—ওর মধ্যে টাকা পয়সা আছে, তাই ও সর্বদা কাছে কাছে রাখতে চায়।” আর একজন বলিল, “টাকা পয়সার জন্য অত বড় বাক্স কেন? ও কি ইস্কুলে মহাজনী কারবার খুলবে নাকি?”

একদিন টিফিনের সময় দাশু হঠাৎ ব্যস্ত হইয়া, বাক্সের চাবিটা আমার কাছে রাখিয়া গেল আর বলিল, “ওটা এখন তোমার কাছে রাখো, দেখো হারায় না যেন। আর আমার আসতে যদি একটু দেরি হয়, তবে তোমরা ক্লাশে যাবার আগে ওটা দারোয়ানের কাছে দিও।” এই বলিয়া সে বাক্সটি দারোয়ানের জিম্মায় রাখিয়া বাহির হইয়া গেল। তখন আমাদের উৎসাহ দেখে কে! এতদিনে সুবিধা পাওয়া গিয়াছে, এখন দারোয়ানটা একটু তফাৎ গেলেই হয়। খানিক বাদে দারোয়ান তাহার রুটি পাকাইবার লোহার উনানটি ধরাইয়া, কতকগুলি বাসনপত্র লইয়া কলতলার দিকে গেল। আমরা এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম, দারোয়ান আড়াল হওয়া মাত্র, আমরা পাঁচ-সাতজনে তাহার ঘরের কাছে সেই বাক্সের উপর ঝুঁকিয়া পড়িলাম। তাহার পর আমি চাবি দিয়া বাক্স খুলিয়া দেখি বাক্সের মধ্যে বেশ ভারি একটা কাগজের পোঁটলা ন্যাকড়ার ফালি দিয়া খুব করিয়া জড়ানো। তাড়াতাড়ি পোঁটলার প্যাঁচ খুলিয়া দেখা গেল, তাহার মধ্যে একখানা কাগজের বাক্স—তাহার ভিতরে আর একটি ছোট পোঁটলা। সেটি খুলিয়া একখানা কার্ড বাহির হইল, তাহার এক পিঠে লেখা ‘কাঁচকলা খাও’ আর একটি পিঠে লেখা ‘অতিরিক্ত কৌতূহল ভালো নয়।’ দেখিয়া আমরা এ-উহার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে লাগিলাম। সকলের শেষে একজন বলিয়া উঠিল, “ছোকরা আচ্ছা যা হোক, আমাদের বেজায় ঠকিয়েছে।” আর একজন বলিল, “যেমন ভাবে বাঁধা ছিল তেমনি করে রেখে দাও, সে যেন টেরও না পায় যে আমরা খুলেছিলাম। তাহলে সে নিজেই জব্দ হবে।” আমি বলিলাম, “বেশ কথা। ও আস্‌লে পরে তোমরা খুব ভালোমানুষের মতো বাক্সটা দেখাতে বলো আর ওর মধ্যে কি আছে, সেটা বার বার করে জানতে চেয়ো।” তখন আমরা তাড়াতাড়ি কাগজপত্রগুলি বাঁধিয়া, আগেকার মতো পোঁটলা পাকাইয়া বাক্সে ভরিয়া ফেলিলাম।

বাক্সে চাবি দিতে যাইতেছি, এমন সময় হো হো করিয়া একটা হাসির শব্দ শোনা গেল—চাহিয়া দেখি পাঁচিলের উপরে বসিয়া পাগলা দাশু হাসিয়া কুটিকুটি। হতভাগা এতক্ষণ চুপি চুপি তামাশা দেখিতেছিল। তখন বুঝিলাম আমার কাছে চাবি দেওয়া, দারোয়ানের কাছে বাক্স রাখা, টিফিনের সময় বাহিরে যাওয়ার ভান করা, এ সমস্ত তাহার শয়তানি। খামখা আমাদের আহাম্মক বানাইবার জন্যই সে মিছামিছি এ কয়দিন ধরিয়া ক্রমাগত একটা বাক্স বহিয়া বেড়াইয়াছে।

সাধে কি বলি ‘পাগলা দাশু?

05/12/2021

ছোটবেলার কবিতা!

05/09/2021

আবদুল হালীম গজনবী,(১৮৭৬-১৯৫৩) আবদুল হালীম আবু হুসাইন খান গজনবী, ছিলেন ব্রিটিশ-ভারতীয় উপমহাদেশের একজন বিশিষ্ট রাজনীতিক, শিক্ষা-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক, জমিদার ও সফল শিল্পপতি। প্রাদেশিক পর্যায়ে অবিভক্ত বাংলা এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ভারতের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় বহু প্রতিষ্ঠানের কর্মকান্ডের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন এবং এসব ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

আবদুল হালীম খান গজনবী ১১ নভেম্বর ১৮৭৬ সালের বর্তমান টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার গ্রামের জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আবদুল হাকিম খান গজনবীর দ্বিতীয় পুত্র এবং নওয়াব বাহাদুর স্যার আবদুল করীম আবু আহমদ খান গজনবীর সহোদর। তিনি কোলকাতার সিটি কলেজ-স্কুলে ও সেন্ট জেডিয়ার্স কলেজে শিক্ষা লাভ করেন।

আবদুল হালীম গজনবীর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯০০ সালে। কর্মজীবনের প্রারম্ভে তিনি ছিলেন স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রতিনিধি, তদানীন্তন ময়মনসিংহ মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান, লোকাল বোর্ডের সদস্য ও অনারারী ম্যাজিস্ট্রেট। বঙ্গ বিভাগের শুরুতেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সুত্রপাত হয়। রাজনীতি ক্ষেত্রে তিনি সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের শীর্ষস্থানীয় জননেতা অশ্বিনী কুমার দত্ত (১৮৫৬-১৯২৩), বিপিন চন্দ্র পাল (১৮৫৮-১৯৩২), সুরেন্দ্রনাথ বানার্জী (১৮৭০-১৯২৫), চিত্তরঞ্জন দাশ (১৮৭০-১৯২৫), অরবিন্দ ঘোষ (১৮৭২-১৯৫০) প্রমুখ থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করেন। তাঁর ব্যবসার কেন্দ্র ছিল কোলকাতায় এবং সেখানে ছিল কংগ্রেসী হিন্দুদের প্রাধান্য, সেহেতু বৈষয়িক স্বার্থে তিনি কংগ্রেসীদের সমস্বরে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলন এ কিছু দিন (১৯০৫-০৬) নেতৃত্ব দেন।

১৯০৫ সালের ২৭ আগষ্ট ঢাকার জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) প্রাঙ্গনে আনন্দ চন্দ্র রায়ের (১৮৪৪-১৯৩৫) সভাপতিত্বে বঙ্গবিভাগের বিরুদ্ধে এক জনসভায় আবদুল হালীম গজনবী যোগদান করেন এবং তার ভাষণে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে ব্রিটিশ দ্রব্য সামগ্রি বর্জনের আহবান জানান।

১৯০৬ সালে বরিশালে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস সম্মেলনে (১৪ ও ১৫ এপ্রিল) তিনি অংশ গ্রহণ করেন। ১৯০৭ সালে ২৬-২৭ ডিসেম্বর সুরাটে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডয়া ন্যাশনাল কংগ্রেস-এর ২৩ তম অধিবেশনে আবদুল হালীম গজনবী যোগদান করেন। ওই সময় কংগ্রেসে ভাঙ্গন ধরায় তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগে যোগদান করেন। বঙ্গভঙ্গ রদের পর ১৯১২ সালের ২ মার্চ তারিখে কোলকাতা ডালহৌসী স্কোয়ারে নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহ এর সভাপতিত্বে উভয় বঙ্গের মুসলিম নেতৃবৃন্দেন এক গুরুত্বপূর্ণ যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় আবদুল হালীম গজনবী যোগদান করেন। ১৯২৬ সালের ২৯-৩০ ডিসেম্বর তারিখে দিল্লীতে ‘অলইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’-এর আঠারোতম বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ওই অধিবেশনে রয়েল কমিশনের নিকট পরিকল্পনা দাখিল করার জন্য গঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন আবদুল হালীম গজনবী।

আবদুল হালীম গজনবী অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সদস্য ও সেন্ট্রাল লোজিসলেটিভ এসেম্বলীতে মুসলিম লীগ পালামেন্টারি পার্টিরও সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯২৭ সালে ঢাকা বিভাগের মুসলিম গ্রামীন এলাকা থেকে, ১৯৩১ সালে ঢাকা-ময়মনসিংহ (মুসলমান) গ্রামীন এলাকা হতে এবং ১৯৩৫ সালে শেষোক্ত এলাকা থেকে ভারতীয় ব্যবস্থা্পক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৭ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত একটানা ওই পদে বহাল ছিলেন। ১৯২৯ সালে তিনি কানপুরে নিখিল ভারত মুসলিম কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করেন। ভারতের শাসন সংস্কারের জন্য ১৯৩০, ১৯৩১ ও ১৯৩২ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত তিনটি গোলটেবিল বৈঠকেই আবদুল হালীম গজনবী প্রতিনিধি রূপে যোগদান করেন। তিনি কলকাতা কর্পোরেশন-এর শেরিফ ছিলেন। তিনি সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি এবং ব্রিটিশ ইন্ডয়ান এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি ছিলেন। ১৯৩৫ সালে আবদুল হালীম গজনবী নাইট উপাধিতে ভূষিত হন।

১৯৪৩ সালের ২৮শে মার্চ ফজলুল হক মন্ত্রিসভার পর ২৪শে এপ্রিল গভর্নরের আমন্ত্রণে খাজা নাজিমউদ্দীন নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ওই দিনই কোলকাতার টাউন হলে হালীম গজনবীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় নাজিমউদ্দীন মন্ত্রিসভা গঠনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হয়। ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি ঢাকা-ময়মনসিংহ এলাকা থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীরূপে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য পদের জন্য মুসলিম লীগ মনোনীত প্রার্থী মৌলভী তমিজউদ্দীন খান এর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। এই পরাজয়ের পর তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটে।

আবদুল হালীম গজনবী কোলকাতার ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত মুসলিম চেম্বার অফ কমার্স (১৯৩৯-৪০) ও ইন্ডিয়া চেম্বার অফ কমার্স (১৯৪৫-৪৬)-এই দুটি সংস্থার সভাপতি ছিলেন। তিনি একাধিকবার ইন্ডিয়া স্টিমশিপ কোম্পানীর চেয়ারম্যান থাকাকালে দেশে জলযান নির্মাণ-শিল্পের উন্নতিসাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ ছাড়া কোলকাতার এক্সপোর্ট অ্যাডভাইজারি কমিটি এবং ইন্ডিয়ান সেণ্ট্রাল জুট কমিটিরও তিনি সদস্য ছিলেন। তিনি রেলওয়ে অ্যাডভাজিারি কমিটি (১৯২৭-৩২), রেলওয় স্ট্যান্ডিং ফাইন্যান্স কমিটি (১৯২৭-৩২), বার্মা সেপারেশন কমিটি (১৯৩৪), ফ্র্যাঞ্চাইজ কমিটি (১৯৩০), ফেডারেল ফাইনান্স কমিটি (১৯৩২), কনসালটেটিভ কমিটি (১৯৩৩), মাইনরিটিজ কমিটি (১৯৩০-৩২), পাবলিক একাউন্টস কমিটি (১৯৩৩) প্রভৃতির কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯৩৩ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক কনফারেন্সে প্রেরিত ভারতীয় প্রতিনিধিদলের অ্যা্ডভাইজারি বোর্ডেরও তিনি অন্যতম সদস্য ছিলেন। সম্রাট ৫ম জর্জের রাজত্বকালের সিলভার জুবিলী-উৎসব পালনের জন্য গঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আবদুল হালীম কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোর্টের সদস্য, আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় কোর্টের সদস্য, বেঙ্গল রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য, কোলকাতা সিটি কলেজেন গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। জাতীয় জাগরণে সংবাদপত্রের গুরুত্ব অনুধাবন করে গজনবী ব্যারিস্টার আবদুল রসুল এর সঙ্গে একযোগে দি মুসলমান (১৮৮৫) এবং খাজা নাজিমুদ্দীনের সহযোগে The Star of India নামে দুটি পত্রিকা প্রকাশের কাজের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। এ দুটি পত্রিকা বাংলার মুসলিম জাগরণে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৪৭ সালের পর হালিম গজনবী পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। এরপর তিনি আমৃত্যু দেলদুয়ারের গ্রামের বাড়িতেই কাটান। ১৯৪৮ সালে আবদুল হালীম গজনবী তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির জন্য যে ট্রাস্ট ডীড করেছিলেন, তাতে তিনি সিটি কলেজে-স্কুলের জন্য বার্ষিক দু’টি রৌপ্য পদকের ব্যবস্থা রেখেছিলেন। আবদুল হালীম গজনবী ১৯৫৩ সালের ১৮ই জুন তারিখে দেলদুয়ার গ্রামের বাড়িতে ইন্তেকাল করেন।

সুত্রঃ বাংলাপিডিয়া

02/09/2013

ছেলেবেলায় আমার এক বন্ধু ছিল তার নাম
লালু। অর্ধ শতাব্দী পূর্বে—অর্থাৎ,
সে এতকাল পূর্বে যে, তোমরা ঠিকমত
ধারণা করতে পারবে না—আমরা একটি ছোট
বাঙলা ইস্কুলের এক ক্লাসে পড়তাম। আমাদের
বয়স তখন দশ-এগারো। মানুষকে ভয় দেখাবার,
জব্দ করবার কত কৌশলই যে তার মাথায় ছিল
তার ঠিকানা নেই। ওর মাকে রবারের সাপ
দেখিয়ে একবার এমন বিপদে ফেলেছিল যে,
তিনি পা মচ্কে প্রায় সাত-আটদিন
খুঁড়িয়ে চলতেন। তিনি রাগ করে বললেন—ওর
একজন মাস্টার ঠিক করে দিতে।
সন্ধ্যেবেলায় এসে পড়াতে বসবেন, ও আর
উপদ্রব করবার সময় পাবে না।
শুনে লালুর বাবা বললেন, না। তাঁর নিজের
কখনো মাস্টার ছিল না, নিজের চেষ্টায় অনেক
দুঃখ সয়ে লেখাপড়া করে এখন তিনি একজন বড়
উকিল। ইচ্ছে ছিল, ছেলেও যেন তেমনি করেই
বিদ্যা লাভ করে। কিন্তু শর্ত হলো এই যে, যে-
বার লালু ক্লাসের পরীক্ষায় প্রথম
না হতে পারবে তখন থেকে থাকবে ওর
বাড়িতে পড়ানোর টিউটার। সে যাত্রা লালু
পরিত্রাণ পেলে, কিন্তু মনে মনে রইল ও মা’র
‘পরে চটে। কারণ, উনি তার ঘাড়ে মাস্টার
চাপানোর চেষ্টায় ছিলেন। সে জানত
বাড়িতে মাস্টার ডেকে আনা আর পুলিশ
ডেকে আনা সমান।
লালুর বাপ ধনী গৃহস্থ। বছর কয়েক
হলো পুরানো বাড়ি ভেঙ্গে তেতলা বাড়ি
করেছেন; সেই অবধি লালুর মায়ের
আশা গুরুদেবকে এ-বাড়িতে এনে তাঁর পায়ের
ধুলো নেন। কিন্তু তিনি বৃদ্ধ, ফরিদপুর
থেকে এতদূরে আসতে রাজী হন না, কিন্তু
এইবার সেই সুযোগ ঘটেছে। স্মৃতিরত্ন
সূর্যগ্রহণ উপলক্ষে কাশী এসেছেন, সেখান
থেকে লিখে পাঠিয়েছেন—ফেরবার
পথে নন্দরানীকে আশীর্বাদ করে যাবেন।
লালুর মা’র আনন্দ ধরে না—উদ্যোগ-
আয়োজনে ব্যস্ত—এতদিনে মনস্কামনা সিদ্ধ
হবে, গুরুদেবের পায়ের ধুলো পড়বে।
বাড়িটা পবিত্র হয়ে যাবে।
নীচের বড় ঘরটা থেকে আসবাবপত্র
সরানো হলো, নতুন ফিতের খাট, নতুন
শয্যা তৈরি হয়ে এলো,—গুরুদেব শোবেন। এই
ঘরেরই এক কোণে তাঁর পূজো-আহ্নিকের
জায়গা হলো, কারণ তেতলার
ঠাকুরঘরে উঠতে নামতে তাঁর কষ্ট হবে।
দিন-কয়েক পরে গুরুদেব এসে উপস্থিত হলেন।
কিন্তু কি দুর্যোগ! আকাশ ছেয়ে কালো মেঘের
ঘটা, যেমন ঝড়, তেমনি বৃষ্টি—তার আর
বিরাম নেই।
এদিকে মিষ্টান্নাদি তৈরি করতে, ফল-ফুল
সাজাতে লালুর মা নিঃশ্বাস নেবার সময় পান
না। তারই
মধ্যে স্বহস্তে ঝেড়েঝুড়ে মশারি গুঁজে দিয়ে
বিছানা করে গেলেন। নানা কথাবার্তায় রাত
হয়ে গেল, পথশ্রমে ক্লান্ত গুরুদেব
আহারাদি সেরে শয্যা গ্রহণ করলেন। চাকর-
বাকর ছুটি পেলে। সুকোমল শয্যার
পারিপাট্যে প্রসন্ন গুরুদেব
মনে মনে নন্দরানীকে আশীর্বাদ করলেন।
কিন্তু গভীর রাতে অকস্মাৎ তাঁর ঘুম
ভেঙ্গে গেল। ছাদ চুঁইয়ে মশারি ফুঁড়ে তাঁর
সুপরিপুষ্ট পেটের উপর জল পড়চে।—উঃ,
কি ঠাণ্ডা সে জল! শশব্যস্তে বিছানার
বাইরে এসে পেটটা মুছে ফেললেন, বললেন,
নতুন বাড়ি করলে নন্দরানী, কিন্তু পশ্চিমের
কড়া রোদে ছাতটা এর মধ্যেই
ফেটেচে দেখচি। ফিতের খাট, ভারী নয়,
মশারি-সুদ্ধ সেটা ঘরের আর
একধারে টেনে নিয়ে গিয়ে আবার
শুয়ে পড়লেন। কিন্তু আধ মিনিটের বেশি নয়,
চোখ দুটি সবে বুজেছেন, অমনি দু-চার
ফোঁটা তেমনি ঠাণ্ডা জল টপটপ টপটপ কর
পেটের ঠিক সেই স্থানটির উপরেই ঝরে পড়ল।
স্মৃতিরত্ন আবার উঠলেন, আবার খাট
টেনে অন্যধারে নিয়ে গেলেন, বললেন, ইঃ—
ছাতটা দেখচি এ-কোণ থেকে ও-কোণ পর্যন্ত
ফেটে গেছে। আবার শুলেন, আবার পেটের উপর
জল ঝরে পড়ল। আবার উঠে পেটের জল
মুছে খাটটা টেনে নিয়ে আর একধারে গেলেন,
কিন্তু শোবামাত্রই তেমনি জলের ফোঁটা। আবার
টেনে নিয়ে আর একধারে গেলেন, কিন্তু
সেখানেও তেমনি। এবার দেখলেন
বিছানাটাও ভিজেছে, শোবার জো নেই।
স্মৃতিরত্ন বিপদে পড়লেন। বুড়ো-মানুষ;
অজানা জায়গায় দোর খুলে বাইরে যেতেও ভয়
করে, আবার থাকাও বিপজ্জনক।
কি জানি ফাটা ছাত ভেঙ্গে হঠাৎ মাথায়
যদি পড়ে! ভয়ে ভয়ে দোর খুলে বারান্দায়
এলেন, সেখানে লণ্ঠন একটা জ্বলচে বটে,
কিন্তু কেউ কোথাও নেই,—ঘোর অন্ধকার।
যেমন বৃষ্টি তেমনি ঝড়ো হাওয়া! দাঁড়াবার
জো কি! কোথায় চাকর-বাকর, কোন্ ঘরে শোয়
তারা—কিছুই জানেন না তিনি।
চেঁচিয়ে ডাকলেন, কিন্তু কারও সাড়া মিলল
না। একধারে একটা বেঞ্চি ছিল, লালুর
বাবার গরীব মক্কেল যারা, তাহারই
এসে বসে। গুরুদেব অগত্যা তাতেই বসলেন।
আত্মমর্যাদার যথেষ্ট লাঘব হলো;
অন্তরে অনুভব করলেন, কিন্তু উপায় কি!
উত্তরে বাতাসে বৃষ্টির ছাঁটের আমেজ
রয়েছে—শীতে গা শিরশির করে—কোঁচার
খুঁটটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে, পা দুটি যথাসম্ভব
উপরে তুলে, যথাসম্ভব আরাম পাবার আয়োজন
করে নিলেন। নানাবিধ শ্রান্তি ও
দুর্বিপাকে দেহ অবশ, মন তিক্ত, ঘুমে চোখের
পাতা ভারাতুর, অনভ্যস্ত গুরু-ভোজন ও রাত্রি-
জাগরণে দু-একটা অম্ল উদগারের আভাস
দিলে—উদ্বেগের অবধি রইল না। হঠাৎ
এমনি সময় অভাবনীয় নতুন উপদ্রব। পশ্চিমের
বড় বড় মশা দুই কানের পাশে এসে গান
জুড়ে দিলে। চোখের
পাতা প্রথমে সাড়া দিতে চায় না, কিন্তু মন
শঙ্কায় পরিপূর্ণ হয়ে গেল—
কি জানি এরা সংখ্যায় কত। মাত্র মিনিট-দুই
—অনিশ্চিত নিশ্চিত হলো; গুরুদেব বুঝলেন
সংখ্যায় এরা অগণিত।
সে বাহিনীকে উপেক্ষা করে বিশ্বে এমন
বীরপুরুষ কেউ নেই। যেমন তার
জ্বলুনি তেমনি তার চুলকুনি। স্মৃতিরত্ন দ্রুত
স্থান ত্যাগ করলেন, কিন্তু তারা সঙ্গ নিলে।
ঘরের মধ্যে জলের জন্য যেমন, ঘরের
বাইরে মশার জন্য তেমন। হাত-পায়ের
নিরন্তর আক্ষেপে, গামছার সঘন
সঞ্চালনে কিছুতেই তাদের আক্রমণ প্রতিহত
করা যায় না। স্মৃতিরত্ন এ-পাশ থেকে ও-
পাশে ছুটে বেড়াতে লাগলেন, শীতের মধ্যেও
তাঁর গায়ে ঘাম দিলে। ইচ্ছে হলো ডাক
ছেড়ে চেঁচান, কিন্তু নিতান্ত বালকোচিত
হবে ভেবে বিরত রইলেন। কল্পনায় দেখলেন
নন্দরানী সুকোমল শয্যায় মশারির
মধ্যে আরামে নিদ্রিত, বাড়ির
যে সেখানে আছে পরম নিশ্চিন্তে সুপ্ত—শুধু
তাঁর ছুটোছুটিরই বিরাম নেই। কোথাকার
ঘড়িতে চারটে বাজলো, বললেন,
কামড়া ব্যাটারা যত পারিস, কামড়া,—
আমি আর পারিনে।—বলেই বারান্দায়
একটা কোণে পিঠের দিকটা যতটা সম্ভব
বাঁচিয়ে ঠেস দিয়ে বসে পড়লেন। বললেন,
সকাল পর্যন্ত যদি প্রাণটা থাকে ত এ
দুর্ভাগা দেশে আর না।
যে গাড়ি প্রথমে পাব সেই
গাড়িতে দেশে পালাব। কেন
যে এখানে আসতে মন চাইত না তার হেতু
বোঝা গেল। দেখতে দেখতে সর্বসন্তাপহর
নিদ্রায় তাঁর সারারাত্রির সকল দুঃখ
মুছে দিলে—স্মৃতিরত্ন অচেতনপ্রায়
ঘুমিয়ে পড়লেন।
এদিকে নন্দরানী ভোর না হতেই উঠেছেন,—
গুরুদেবের পরিচর্যায় লাগতে হবে।
রাত্রে গুরুদেব জলযোগ মাত্র করেছেন—যদিচ
তা গুরুতর—তবু মনের মধ্যে ক্ষোভ ছিল,
খাওয়া তেমন ভাল হয় নাই। আজ দিনের
বেলা নানা উপচারে তা ভরিয়ে তুলতে হবে।
নীচে নেমে এলেন, দেখেন দোর খোলা।
গুরুদেব তাঁর আগে উঠেছেন ভেবে একটু
লজ্জা বোধ হলো। ঘরের মধ্যে মুখ
বাড়িয়ে দেখেন তিনি নেই, কিন্তু এ
কি ব্যাপার! দক্ষিণ দিকের খাট উত্তর দিকে,
তাঁর ক্যাম্বিসের
ব্যাগটা জানালা ছেড়ে মাঝখানে নেমেচে,
কোষাকুষি, আসন প্রভৃতি পূজা-আহ্নিকের
জিনিসপত্রগুলো সব এলোমেলো স্থানভ্রষ্ট,—
কারণ কিছুই বুঝলেন না।
বাইরে এসে চাকরদের ডাকলেন, তারা কেউ
তখনও ওঠেনি। তবে একলা গুরুদেব গেলেন
কোথায়? হঠাৎ দৃষ্টি পড়ল—ওটা কি? এক
কোণে আলো-অন্ধকারে মানুষের মত
কি একটা বসে না! সাহসে ভর করে একটু
কাছে গিয়ে ঝুঁকে দেখেন তাঁর গুরুদেব। অব্যক্ত
আশঙ্কায় চেঁচিয়ে উঠলেন, ঠাকুরমশাই!
ঠাকুরমশাই!
ঘুম ভেঙ্গে স্মৃতিরত্ন চোখ মেলে চাইলেন, তার
পরে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসলেন।
নন্দরানী ভয়ে, ভাবনায়, লজ্জায়
কেঁদে ফেলে জিজ্ঞাসা করলেন, ঠাকুরমশাই,
আপনি এখানে কেন?
স্মৃতিরত্ন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, সারা রাত
দুঃখের আর পার ছিল না যে মা!
কেন বাবা?
নতুন বাড়ি করেচ বটে মা, কিন্তু ছাত কোথাও
আর আস্ত নেই। সারা রাতের বৃষ্টি-বাদল
বাইরে ত পড়েনি, পড়েচে আমার গায়ের উপর।
খাট টেনে যেখানে নিয়ে যাই সেখানেই
পড়ে জল। পাছে ছাত ভেঙ্গে মাথায়
পড়ে পালিয়ে এলাম বাইরে, কিন্তু তাতেই
কি রক্ষে আছে মা, পঙ্গপালের মত ডাঁশ-
মশা ঝাঁকে ঝাঁকে সমস্ত রাত্রি যেন
ছুবলে খেয়েছে,—এধার থেকে ছুটে ওধার যাই,
আবার ওধার থেকে ছুটে এধারে আসি। গায়ের
অর্ধেক রক্ত বোধ করি আর নেই মা।
বহু প্রয়াস, বহু সাধ্য-সাধনায় ঘরে আনা বৃদ্ধ
গুরুদেবের অবস্থা দেখে নন্দরানীর দু’চোখ
অশ্রু-সজল হয়ে উঠল, বললেন, কিন্তু বাবা,
বাড়িটা যে তেতলা, আপনার ঘরের উপর আরও
যে দুটো ঘর আছে, বৃষ্টির জল তিন-তিনটে ছাত
ফুঁড়ে নামবে কি করে? কিন্তু বলতে বলতেই তাঁর
সহসা মনে হলো এ হয়ত ঐ শয়তান লালুর
কোনরকম শয়তানি বুদ্ধি।
ছুটে গিয়ে বিছানা হাতড়ে দেখেন
মাঝখানে চাদর
অনেকখানি ভিজে এবং মশারি বেয়ে ফোঁটা
ফোঁটা জল ঝরছে।
তাড়াতাড়ি নামিয়ে নিয়ে দেখতে পেলেন
ন্যাকড়ায় বাঁধা এক চাঙড় বরফ, সবটা গলেনি,
তখনও এক টুকরো বাকি আছে। পাগলের মত
ছুটে বাহিরে গিয়ে চাকরদের
যাকে সুমুখে পেলেন চেঁচিয়ে হুকুম দিলেন,—
হারামজাদা লেলো কোথায়? কাজকর্ম চুলোয়
যাক গে,
বজ্জাতটাকে যেখানে পাবি মারতে মারতে ধরে
আন্।
লালুর বাবা সেইমাত্র নীচে নামছিলেন,
স্ত্রীর কাণ্ড দেখে হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন,—
কি কাণ্ড করচ? হলো কি?
নন্দরানী কেঁদে ফেলে বললেন, হয় তোমার ঐ
লেলোকে বাড়ি থেকে তাড়াও, না হয় আজই
আমি গঙ্গায় ডুবে এ-মহাপাতকের প্রায়শ্চিত্ত
করব।
কি করলে সে?
বিনা দোষে গুরুদেবের
দশা কি করেছে চোখে দেখোগে। তখন সবাই
গেলেন ঘরে। নন্দরানী সব বললেন, সব
দেখালেন। স্বামীকে বললেন, এ
দস্যি ছেলেকে নিয়ে ঘর করব
কি করে তুমি বল?
গুরুদেব ব্যাপারটা সমস্ত বুঝলেন। নিজের
নির্বুদ্ধিতায় বৃদ্ধ
হাঃ হাঃ করে হেসে ফেললেন।
লালুর বাবা আর একদিকে মুখ
ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
চাকররা এসে বললে, লালুবাবু
কোঠি মে নহি হ্যায়। আর একজন
এসে জানালে সে মাসীমার
বাড়িতে বসে খাবার খাচ্ছে।
মাসীমা তাকে আসতে দিলেন না।
মাসিমা মানে নন্দর ছোট বোন। তার স্বামীও
উকিল, সে অন্য পাড়ায় থাকে।
এর পরে লালু দিন-পনেরো আর এ বাড়ির
ত্রিসীমানায় পা দিলে না।

Want your school to be the top-listed School/college in Tangail?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Website

Address


Singuria, Ghatail
Tangail