25/12/2025
আদর্শ ছেলে
– কুসুম কুমারী দাশ
আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?
মুখে হাসি বুকে বল, তেজে ভরা মন
‘মানুষ হইতে হবে’ – এই যার পণ৷
বিপদ আসিলে কাছে হও আগুয়ান
নাই কি শরীরে তব রক্ত, মাংস, প্রাণ?
হাত পা সবারই আছে, মিছে কেন ভয়?
চেতনা রয়েছে যার, সে কি পড়ে রয়?
সে ছেলে কে চায় বল, কথায় কথায়
আসে যার চোখেজল, মাথা ঘুরে যায়?
মনে প্রাণে খাট সবে, শক্তি কর দান,
তোমরা ‘মানুষ’ হলে দেশের কল্যাণ৷
প্রাইমারিতে সবাই পড়েছি এ কবিতা। যা একটি চতুর্দশপদী কবিতা। কুসুম কুমারী দাশ কে ছিলেন জানেন নিশ্চয়ই, কবি জীবনানন্দ দাশের মা।
জন্ম ১৮৭৫ সালে বরিশালের গৈলায়,মৃত্যু ১৯৪৮ সালে কলকাতায়। পড়াশোনা প্রবেশিকা অর্থাৎ এখনকার এসএসসি পর্যন্ত।
▪️ আদর্শ ছেলে বাংলা সাহিত্যে এক কালজয়ী কবিতা। তাঁর এমন আরো কিছু সমাজমনস্ক ও নীতিবোধে পরিপূর্ণ ছড়া-কবিতা রয়েছে। তবে আমরা বেশিরভাগ এই একটি কবিতাই জানি।
তিনি শুধু একজন কবি নন, ছিলেন এক সাহসী ও প্রগতিশীল নারী, যিনি পুত্র জীবনানন্দ দাশের মননে সাহিত্য ও প্রকৃতিপ্রীতির বীজ বপন করেছিলেন।
কবি জীবনানন্দ দাশ মায়ের সম্পর্কে লিখেছেন-
"সাহিত্য পড়ায় ও আলোচনায় মাকে বিশেষ অংশ নিতে দেখেছি। দেশি বিদেশি কোনো কোনো কবি ও ঔপন্যাসিকের কোথায় কি ভাল,কি বিশেষ তাঁরা দিয়ে গেছেন- এ সবের প্রায় প্রথম পাঠ তাঁর কাছ থেকে নিয়েছি। তাঁর স্বাভাবিক কবিমনকে তিনি শিক্ষিত ও স্বতন্ত্র করে তোলবার অবসর পেয়েছিলেন। কিন্তু বেশি কিছু লিখবার সুযোগ পেলেন না।.... তখনকার দিনের সেই অসচ্ছল সংসারের একজন স্ত্রীলোকের পক্ষে শেষ পর্যন্ত সম্ভব হল না।"
"আদর্শ ছেলে" কবিতার পাশাপাশি লেখা এই কবিতাটি যেন খানিকটা হতাশায় ভরা। পড়লে মনে হয় বর্তমানের প্রেক্ষাপটে লেখা। অথচ কবিতাটি ১০০ বছর আগের।
মনুষ্যত্ব
- কুসুম কুমারী দাশ
একদিন লিখেছিনু আদর্শ যে হবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।
আজ লিখিতেছি বড় দুঃখ লয়ে প্রাণে
তোমরা মানুষ হবে কাহার কল্যাণে?
মানুষ গড়িয়া ওঠে কোন্ উপাদানে;
বাঙালি বোঝেনি তাহা এখনো জীবনে--
পুঁথি হাতে পাঠ শেখা--দু-চারটে পাশ
আজিকার দিনে তাহে মিলে না আশ্বাস,
চাই শৌর্য, চাই বীর্য, তেজে ভরা মন
মানুষ হইতে হবে হবে এই পণ--
বিপদ আসিলে কাছে হবে আগুয়ান
দুই খানি বাহু বিশ্বে সবারি সমান--
দাতার যে দান তাহা সকলেই পায়
কেউ ছোট কেউ বড় কেন হয়ে যায়!
কেন তবে পদতলে পড়ি বারবার?
মনুষ্যত্ব জাগাইলে পাইব উদ্ধার--।
যত অপমান, যত লাঞ্ছনা পীড়ন
একতার বলে সব হইবে দমন!
তেজীয়ান, বলীয়ান সেই ছেলে চাই
সোনার বাংলা আজি হারায়েছে তাই।
আবার গড়িতে হবে বীর শিশুদল,
বাংলার রূপ যাহে হবে সমুজ্জ্বল।
যারা পড়তে ভালোবাসেন তাদের জন্য কবির আরো একটি কবিতা দিলাম।
সাধন পথে
-- কুসুম কুমারী দাশ
এক বিন্দু অমৃতের লাগি
কি আকুল পিপাসিত হিয়া,
এক বিন্দু শান্তির লাগিয়া
কর্মক্লান্ত দুটি বাহু দিয়া---
কাজ শুধু করে যায়
অন্তরেতে দুরন্ত সাধনা,
তুমি তার দীর্ঘ পথে
হবে সাথী একান্ত ভাবনা।
সে জানে এ আরাধনা
কবে তার হইবে সফল;
তব বাণী যেই দিন তারি
ভাষা হয়ে ঘুচাবে সকল
অন্তরের অহঙ্কার,
স্তুতি, নিন্দা, ভয়
সেদিন লভিবে শান্তি,
সংগ্রামে বিজয়।
তোমার স্বরূপে তার রূপ হবে লীন!
সেই তার সাধনার পরম সুদিন।