20/10/2025
ক্লাসরুমের জানালা দিয়ে নরম রোদ ঢুকছে। বোর্ডের পাশে পুরনো এক ঘড়ি টিকটিক করে সময় জানাচ্ছে—বেলা এগারোটা ছুঁই ছুঁই। ছাত্রছাত্রীরা একে একে চেয়ারে বসে, কেউ খাতা খুলছে, কেউ নোটবুকের ভেতর কিছু লিখছে। ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে গম্ভীর গলায় ভেসে এল —
“সবাই চুপ।”
শিক্ষক ঢুকেছেন। তাঁর মুখে সেই চিরচেনা কঠোর ভাব। চশমার কাঁচে রোদ পড়ে ঝলমল করছে।
ক্লাস মুহূর্তেই স্তব্ধ।
স্যার চারপাশে তাকালেন, তারপর থেমে গেলেন প্রথম সারির এক মেয়ের ওপর।
—এই যে নীল জামা, তোমার নাম কী?
মেয়েটি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে উঠল।
—রেশমি, স্যার।
স্যারের কণ্ঠে এবার অদ্ভুত রুক্ষতা।
—তুমি এখনই ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাও। ভবিষ্যতে যেন তোমার মুখ না দেখি আমি।
পুরো ক্লাস নিঃশব্দ। যেন হঠাৎ বাতাসও থেমে গেছে।
রেশমি হতভম্ব চোখে তাকিয়ে থাকে—
—স্যার, আমি তো কিছু করিনি…
স্যারের গলা আরও ভারী হয়ে ওঠে।
—আমি এক কথা দ্বিতীয়বার বলি না।
রেশমির চোখে পানি চলে আসে। কাঁপা হাতে ব্যাগটা গুছিয়ে নেয়, তারপর মাথা নিচু করে দরজার দিকে হাঁটে। দরজা খুলে বেরিয়ে যাওয়ার সময় একবার ঘুরে তাকায়—তার চোখে বিস্ময়, কষ্ট আর প্রশ্ন একসাথে জমে আছে।
দরজাটা ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।
স্যার কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর হঠাৎ বললেন,
—বল তো, আইন কেন তৈরি করা হয়?
কেউ উত্তর দিতে সাহস পায় না প্রথমে। তারপর একে একে কণ্ঠ ভেসে আসে।
—শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য, স্যার।
—অন্যায়ের শিকার না হওয়ার জন্য।
—ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার জন্য।
স্যার ধীরে মাথা নেড়ে বললেন,
—ঠিক বলেছ তোমরা।
তারপর তাঁর গলা একটু নরম হয়, যেন ভেতর থেকে কোনো ক্লান্তি বেরিয়ে আসে।
—তোমাদের কি মনে হয় না, আমি রেশমির সঙ্গে অন্যায় করেছি?
কেউ কোনো উত্তর দেয় না। বাতাসটাও যেন চুপ হয়ে গেছে।
স্যার নিজেরই প্রশ্নের উত্তর দিলেন,
—হ্যাঁ, আমি অন্যায় করেছি। কিন্তু তোমরা কেউ কিছু বললে না কেন? কারণ তোমরা ভেবেছ, এটা তো আমার সঙ্গে হয়নি। তাই না?
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তাঁর বুক থেকে।
—এই ভাবনাটাই আমাদের সমাজকে ধীরে ধীরে মেরে ফেলছে। আজ যাকে অন্যায় করতে দেখলে, আর কিছু বললে না, কাল তোমার সঙ্গেও যখন হবে—তখন তোমার পাশে কেউ থাকবে না। কারণ সবার মনেই থাকবে—“এটা তো আমার সঙ্গে হয়নি।”
স্যার একটু থামলেন। জানালা দিয়ে রোদের রেখা এসে তাঁর মুখে পড়েছে। তিনি ধীরে বললেন,
—আজ আমি তোমাদের একটা অদ্ভুত ক্লাস নিলাম। বই খুলতে হয়নি, বোর্ডে কিছু লিখতেও হয়নি। কিন্তু বিশ্বাস করো, আজকের ক্লাসটা হয়তো তোমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে।
পুরো ক্লাস নিশ্চুপ। কেউ চোখ তুলতে পারছে না।
টেবিলের ওপর রাখা চক ধীরে গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে, শব্দটা হঠাৎ করেই খুব স্পষ্ট শোনা গেল।
স্যার চুপচাপ ব্যাগটা তুললেন। দরজার কাছে এসে থেমে বললেন,
—সব সময় মনে রেখো, অন্যায়ের সামনে চুপ থাকা মানে, সেই অন্যায়ের অংশ হওয়া। চুপ থাকা মানেই সম্মতি দেওয়া।