15/05/2026
কয়েকদিন পরেই আমাদের প্রিয় হযরত শাহ জালাল উচ্চ বিদ্যালয় তার পথচলার ৫০ বছর পূর্ণ করবে। অর্ধশতকের এই দীর্ঘ যাত্রা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বয়সের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো শিক্ষার্থীর স্মৃতি, স্বপ্ন, হাসি-কান্না এবং অসংখ্য মানুষের নীরব ত্যাগ।
কিছুদিন আগে বলেছিলাম, এই বিশেষ সময়টাকে সামনে রেখে আমি আমার প্রিয় শিক্ষকদের নিয়ে লিখবো। কারণ একটি বিদ্যালয়কে শুধু তার ভবন, মাঠ কিংবা নাম দিয়ে মনে রাখা যায় না; কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের ছাড়া বিদ্যালয়ের স্মৃতিগুলো যেন অপূর্ণ থেকে যায়।
সেই ধারাবাহিকতায় আজ লিখছি শ্রদ্ধেয় এনায়েত উল্লা স্যারকে নিয়ে।
কিছু মানুষকে আমরা ছোটবেলায় পুরোপুরি বুঝতে পারি না। তখন আমরা শুধু তাঁদের দায়িত্ব দেখি, গাম্ভীর্য দেখি, দূর থেকে তাঁদের উপস্থিতি অনুভব করি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষকে নতুন করে বুঝতে শেখা যায়। বয়স বাড়ে, অভিজ্ঞতা বাড়ে, তখন হঠাৎ করেই মনে হয়—না, তিনি শুধু একজন প্রধান শিক্ষক ছিলেন না; তিনি নীরবে অনেক বড় কিছু ছিলেন।
স্কুলজীবনে তাঁকে আমরা প্রধান শিক্ষক হিসেবেই দেখতাম। তাঁর মধ্যে এক ধরনের ব্যক্তিত্ব ছিল, যা দূর থেকেও অনুভব করা যেত। খুব বেশি কথা বলতেন না, খুব বেশি নিজেকে প্রকাশও করতেন না। কিন্তু তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল এক ধরনের শৃঙ্খলা, গাম্ভীর্য এবং দায়িত্বের অনুভূতি।
ছোটবেলায় হয়তো সেই গাম্ভীর্যকে একটু ভয়ই লাগত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বুঝেছি, সব ভালোবাসা শব্দ দিয়ে প্রকাশ পায় না।
কিছু ভালোবাসা নীরব হয়।
কিছু যত্ন দূর থেকে দেওয়া হয়।
আর কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজের দায়িত্বের মাঝেই স্নেহ প্রকাশ করেন।
তিনি ছিলেন ঠিক তেমনই।
আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর স্নেহ পেয়েছি। তিনি আমাকে আদর করতেন। বিষয়টা হয়তো তখন খুব সাধারণ মনে হয়েছিল। কিন্তু আজ সময়ের দূরত্বে দাঁড়িয়ে মনে হয়—একজন প্রধান শিক্ষকের শত ব্যস্ততার মাঝেও কোনো শিক্ষার্থীর প্রতি আলাদা খেয়াল রাখা মোটেও ছোট বিষয় নয়।
হযরত শাহ জালাল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তাঁর পথচলা। এই বিষয়টা যতবার ভাবি, ততবার মনে হয়—তিনি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেননি; তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের বেড়ে ওঠার সাক্ষী ছিলেন।
প্রায় দেড় যুগ ধরে তিনি এই বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। একটি বিদ্যালয় শুধু ইট, দেয়াল আর শ্রেণিকক্ষ দিয়ে তৈরি হয় না; সেখানে মানুষের সময় জমা থাকে, ত্যাগ জমা থাকে, ভালোবাসা জমা থাকে। আমার বিশ্বাস, এই বিদ্যালয়ের কোথাও না কোথাও তাঁর সময়, শ্রম আর নীরব ভালোবাসার ছাপ রয়ে গেছে।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু তাঁর মাঝে কখনো কোনো কৃত্রিমতা দেখিনি। বরং ছিল সংযম, ব্যক্তিত্ব এবং গভীর দায়িত্ববোধ।
আজ তিনি অবসর জীবন পার করছেন।
কিন্তু কিছু মানুষকে অবসরপ্রাপ্ত মনে হয় না।
কারণ তাঁরা পদ থেকে বিদায় নেন, দায়িত্ব থেকে বিদায় নেন—মানুষের স্মৃতি থেকে নয়।
আজ স্কুলের কথা মনে পড়লে বহু মুখের ভিড়ে তাঁর মুখটাও ভেসে ওঠে। তখন মনে হয়, মানুষকে বুঝতে মাঝে মাঝে অনেক সময় লাগে।
আজ বিদ্যালয়ের অর্ধশতকের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে মনে হয়—বিদ্যালয় শুধু ভবন দিয়ে গড়ে ওঠে না; কিছু মানুষ নীরবে একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রাণ দিয়ে যান।
শ্রদ্ধেয় এনায়েত উল্লা স্যার আমার কাছে শুধু একজন প্রধান শিক্ষক নন।
তিনি একটি সময়ের নাম।
তিনি একটি ব্যক্তিত্ব।
তিনি স্মৃতির ভেতরে থাকা এক নীরব গাম্ভীর্য।
আর জীবনের কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের মূল্য মানুষ সময় পেরিয়ে আরও গভীরভাবে বুঝতে শেখে। ✍️
কয়েকদিন পরেই আমাদের প্রিয় হযরত শাহ জালাল উচ্চ বিদ্যালয় তার পথচলার ৫০ বছর পূর্ণ করবে। অর্ধশতকের এই দীর্ঘ যাত্রা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বয়সের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো শিক্ষার্থীর স্মৃতি, স্বপ্ন, হাসি-কান্না এবং অসংখ্য মানুষের নীরব ত্যাগ।
লিখা - প্রাক্তন শিক্ষার্থী ❤️
16/01/2026
05/11/2025
02/11/2025
30/09/2025
10/07/2025