19/04/2026
আজ আমাদের প্রিয় প্রতিষ্ঠান মঈনুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক জনাব শেখ সিকন্দর আলী সাহেবের মৃত্যুবার্ষিকী। গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সাথে আমরা তাঁকে স্মরণ করছি।
তাঁর দূরদর্শী চিন্তা, অক্লান্ত পরিশ্রম ও শিক্ষার প্রতি অগাধ ভালোবাসার ফলেই এই প্রতিষ্ঠান আজ আলোকিত পথচলায় এগিয়ে চলেছে। তাঁর হাতে গড়া এই বিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়- এটি একটি আদর্শ, একটি স্বপ্নের প্রতিফলন।
আমরা তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করছি।
আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।
শেখ সিকন্দর আলী: শিক্ষা ও মানবতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র
সিলেটের শেখঘাটের গর্বিত সন্তান শেখ সিকন্দর আলী (জন্ম: ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দ – মৃত্যু: ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন এক আলোকিত চিন্তার দিশারী। তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। সমাজসেবা, শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চার অঙ্গনে তিনি রেখে গেছেন অমলিন স্বাক্ষর। তার মহৎ কর্ম ও দূরদর্শী চিন্তা আজও প্রজন্মকে পথ দেখাচ্ছে।
তবে তার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল শিক্ষা, বিশেষত নারী শিক্ষা প্রসারে। তিনি বিশ্বাস করতেন, “নারী সমাজকে অশিক্ষিত রেখে একটি সমাজ কিংবা সম্প্রদায়ের উন্নতি কখনো সম্ভব নয়।”
১৯৩৫ সালের এক অনন্য সাহসী উদ্যোগ আজও সিলেটের শিক্ষার ইতিহাসে দীপ্ত হয়ে আছে। তখনও সিলেট শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ছিল অবহেলিত, নারী শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি। এই ব্যথা গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল শেখঘাটের মহান সমাজসেবক মরহুম শেখ সিকন্দর আলীকে। তিনি বুঝেছিলেন- “একজন শিক্ষিত মা-ই পারে একটি আলোকিত প্রজন্ম গড়ে তুলতে।”
সেই উপলব্ধি থেকেই ১৯৩৫ সালে তিনি স্থাপন করেন একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়। শত প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি পিছিয়ে যাননি। বরং সাহসের সঙ্গে সমাজকে পথ দেখিয়েছেন।
নিজের জননীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থেকে বিদ্যালয়ের নামকরণ করেন “মঈনুন্নেছা প্রাথমিক বিদ্যালয়।” এ নাম শুধু একটি বিদ্যালয়ের নয়, এটি এক মাতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং নারী শিক্ষার আলোকবর্তিকা।
জনসাধারণের মধ্যে যখন শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়, তখন স্থানীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার মুখে, বিদ্যমান বিদ্যালয়টির মানোন্নয়নের প্রয়োজন অনুভূত হয় এবং একে মাধ্যমিক স্তরে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবে ১৯৬৭ সালে বিদ্যালয়টিকে একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এরপর এর শিক্ষা কার্যক্রম ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সালে এটি সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি লাভ করে। এই সময় থেকে এটি কেবল শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধিই নয়, বরং মানসম্মত শিক্ষা প্রদানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
তিনি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও ছিলেন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন, বিশাল হৃদয়ের অধিকারী এবং সত্যিকার অর্থে সমাজ হিতৈষী ব্যক্তিত্ব। ১৯৬৪ সালে তিনি পরলোকগমন করেন। কিন্তু তার দূরদর্শী উদ্যোগ আজও সিলেটের অসংখ্য পরিবারকে আলোকিত করছে। শেখ সিকন্দর আলী সাহেব সত্যিই ছিলেন প্রজন্মের পর প্রজন্মের প্রেরণার এক আলোকিত নক্ষত্র।
আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি এই মহান ব্যক্তিত্বকে। তাঁর আদর্শ ও কর্ম আমাদের পথ চলার প্রেরণা হয়ে থাকুক।