Brilliant Tuition Media

Brilliant Tuition Media

Share

We provide Tutor

10/01/2024

শিশু-কিশোরদের অনলাইন আসক্তি ক্ষতিকর

শৈশবকাল হলো একটা মানুষের জীবনের প্রথম স্তর। আর এ শৈশব শব্দটি শুনলে মনের মধ্যে একটি ভালো লাগার অনুভূতি জেগে ওঠে। শিশুরা আমাদের খুব আদরের। অথচ শিশুদের জীবন ও ভবিষ্যৎ আজ হুমকির মুখে। ইন্টারনেটের আগ্রাসী ছোঁয়ায় আজ অনেক মানুষ বিপর্যস্ত। তবে এর ভয়াবহতার শিকার প্রধানত অল্প বয়সি শিশু ও কিশোররা।

বর্তমান যুগে তথ্যপ্রযুক্তির সংশ্লিষ্টতা ছাড়া জীবনে গতিময়তা আনা সম্ভব নয়। ইন্টারনেট ব্যবহারের যেমন ভালো দিক আছে, তেমনি তার খারাপ দিকও আছে। তবে এর নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে সজাগ থাকা খুবই জরুরি। ইন্টারনেট মানবসভ্যতার একটি বিস্ময়কর অবদান। বর্তমান প্রজন্ম অতিদ্রুত এই প্রযুক্তির প্রতি আসক্ত হচ্ছে। এক দুই যুগ আগেও শিশু-কিশোরদের খেলার সাথি ছিল পাড়া-প্রতিবেশীদের সন্তান, নানা ধরনের মাটির হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল।

হরেক রকমের খেলা খেলে পার করত নিজেদের সৌন্দর্যের শৈশব-কৈশোরকাল। বর্তমান সময়ে শিশুদের খেলার সাথি কার্টুন, মিনা রাজু, গোপাল বার্ট ইত্যাদি। শিশু কান্না করলে সান্ত¡না দেওয়ার সহজ পন্থা হলো বাবু তুমি কান্না করোনা, তুমি টিকটক গোপাল বার্ড, মিনা রাজু দেখো। শিশুর পড়ার বয়সে আত্মঘাতী অনলাইন জগতে আসক্ত করলে তার মেধা কাজ করবে কোন দিকে? তার পড়ার মেধা তো এই অনলাইনের মধ্যে ব্যয় করে। ফলে শিশু একটা সময় অনলাইনে আসক্ত হয়ে যায় আর পড়তে চায় না। পড়লেও পড়া মনে থাকে না।

তার মন-মানসিকতা সব সময় অনলাইনের দিকে আসক্ত থাকে। শিশুকাল হলো মানুষের জ্ঞান অর্জনের প্রথম ধাপ। এখান থেকে তার হাতেখড়ি শুরু হবে। তা না হলে তার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বলতা হারিয়ে যাবে। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আর অনলাইনে আসক্তি হয়ে শিশু-কিশোররা ভবিষ্যতে মেধাশূন্যে জাতির পথে অগ্রসর হচ্ছ। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ইন্টারনেটের মাধ্যমে অবাধ তথ্যসম্ভারে বিচরণের মধ্য দিয়ে নিজেদের চিন্তা, জ্ঞানের পরিধি ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে পারছে ঠিক।

তবে এর ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন না থাকায় নানা ধরনের বিপদে হাবুডুবু খেতে হচ্ছে। ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় হয়তো সে একটা ভালো পেজে আছে, তার মাঝেমধ্যে অনেক ধরনের অনেক বিজ্ঞাপন এবং অনেক খারাপ পেজগুলো আসে, যার কারণে তার বয়সের তাড়নায় নিজেদের ভালো-মন্দের জ্ঞান না হওয়ায় ওই সাইটগুলোতে সে বিচরণ করে। এমন খারাপ সাইটগুলোতে বিচরণ করতে করতে একটা সময় এই সাইটগুলোর প্রতি এবং অনলাইনের ওপর আসক্ত হয়ে পড়ে। তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশ শিশু-কিশোর ইন্টারনেটের মাধ্যমে নতুন নতুন পেজের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। যে বয়সে তাদের হাতে থাকার কথা সব সময় খাতা-কলম-বই কিন্তু সে বয়সে তাদের হাতে থাকে মোবাইল, লেপটপ অনলাইন জগতের উপকরণ।

শিশু-কিশোররা বিভিন্ন ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইমো, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এই অনলাইনে জগতে আসক্ত হয়ে কোনো সময় দিন গিয়ে রাত আসে, রাত গিয়ে দিন আসে খবর থাকে না। তাদের নিয়মিত খাবার খাওয়া হয় না। যার ফলে তারা নানা ধরনের পুষ্টিহীনতায় ভোগে। শরীর দুর্বল থাকে।

অনলাইনে আসক্ত শিশু-কিশোররা কারো সঙ্গে কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক করতে পারে না। কারো সঙ্গে ভালো করে কথা বলতে পারে না, মিশতে পারে না। তারা সব সময় একরোখা থাকে। শিশু-কিশোরদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার জ্ঞানচর্চা করা কিন্তু তারা অনলাইনে আসক্ত হয়ে বইয়ের কথা প্রায় ভুলতে বসেছে।

যেখানে শিশু-কিশোররা হবে জ্ঞানপিপাসু, জ্ঞান অন্বেষণের জন্য মুক্ত বিহঙ্গের মতো ছুটে বেড়াবে, নানা রঙের নানা জ্ঞানের বই পাঠ করে নিজের মস্তিষ্ককে করবে আরো উর্বর, নিজেকে করবেন আরো সমৃদ্ধ। সেখানে তারা মোবাইলের টাচ স্ক্রিন আর লেপটপের মনিটরে নিজেদের সীমাবদ্ধ করে ফেলছেন। সারা দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একটি বড় অংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে।

ইন্টারনেটে নিরাপত্তা নিয়ে শিশুরা কীভাবে, তাদের পরিস্থিতি কী- এসব জানতে ইউনিসেফ সারা দেশে এ জরিপ চালায়। ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি ১১ হাজার ৮২১ ছেলেমেয়ে জরিপে অংশ নেয়। ইউনিসেফ বাংলাদেশের ওই জরিপে বলা হয়- বাংলাদেশের ৮১ দশমিক ২ শতাংশ শিশু-কিশোর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিন সময় কাটায়। এদের ৯০ শতাংশই মুঠোফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করে।

একটি সমীক্ষা অনুযায়ী দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী ১০০ জনের মধ্যে কমপক্ষে ৬৪ জন প্রতিদিন গড়ে ৪ ঘণ্টা কোনো না কোনো ধরনের প্রযুক্তিগত পর্দার সামনে ব্যয় করেন। পরিসংখ্যান বলছে, প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ মানুষ আত্মহত্যা করে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে ইন্টারনেট গ্রাহক ১২ কোটি ৬১ লাখের বেশি। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত গ্রাহক বেড়েছে ২০ লাখ। শিশু-কিশোররা ইন্টারনেটের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা সাইবার অপরাধের মতো জঘন্য কাজে লিপ্ত হয়ে যায়।

বেসরকারি এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৬০ শতাংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে।

ছদ্মবেশে বখাটেপনা, ইভটিজিং করা ইত্যাদি থেকে শুরু করে সামাজিকমাধ্যমে অহরহই হচ্ছে হ্যাকিং ঘটছে ব্ল্যাকমেইলের মতো ঘটনাও। এর ফলে দেশে ক্রমেই বাড়ছে সাইবার অপরাধ। বেসরকারি জরিপে দেখা যায়, প্রতি ২০ সেকেন্ডে এ ধরনের একটি অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে ব্যক্তি থেকে শুরু করে পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। বাংলাদেশের ৪৯ শতাংশ স্কুলশিক্ষার্থীর একই ব্যক্তির দ্বারা উৎপীড়নের শিকার হওয়া অথবা অনলাইনে উত্ত্যক্তের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

ইন্টারনেটের মাধ্যমে মাদক, অস্ত্র, আত্মহত্যা ও নিজেকে ঘৃণা করা জাতীয় প্রচারণা বাড়লেও সাধারণ স্কুলশিক্ষার্থীরা এগুলোকে খুব একটা হুমকি মনে করে না। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ বলছে, দেশের ১৩ শতাংশ শিশু-কিশোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি বা উত্ত্যক্তের শিকার হয়েছে। আর একাধিকবার হয়রানির শিকার হয়েছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। হয়রানি বা উত্ত্যক্তের কারণে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে।

ইন্টারনেটের অপব্যবহার রোধ করতে হলে সতর্ক হতে হবে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে। নিরাপদ ইন্টারনেটের ব্যবহারবিধি পাঠ্যপুস্তকে সংযোজন করা প্রয়োজন। যেকোনো মূল্যে শিশু-কিশোরদের নিরাপদ শৈশব ও কৈশোর নিশ্চিত করতে হবে। তবেই আমরা নিশ্চিত তুলতে পারব তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন আসক্তি কমাতে অভিভাবকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে বকুনি দিয়ে কিংবা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কেড়ে নিয়ে এ অভ্যাস ঠেকানো যাবে না। বরং এতে বিপরীত হতে পারে।

স্মার্টফোন, ল্যাপটপ আসক্তদের এসব ডিভাইস ব্যবহারের সময়টি ধাপে ধাপে কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সবার আগে অভিভাবককে দেখতে হবে কেন তার সন্তান অনলাইনে বা অনলাইন গেমে সময় কাটানোতে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে? শুধু অনলাইন গেম খেলতে কিংবা অনলাইনে থাকতে নিষেধ করলেই হবে না, বিকল্প কোনো খেলাধুলার ব্যবস্থা করার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

তা ছাড়া সন্তানের সামনে অভিভাবকদের স্মার্টফোনে মগ্ন থাকা, খাবার টেবিলে স্মার্টফোন দেখার অভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হবে। না হলে আমরা আমাদের দেশের এই শিশু-কিশোর ভবিষ্যতের সোনালি সম্পদকে মেধাশূন্য জাতির পথে ঠেলে দেব।

ফলে ভবিষ্যৎ জাতির সঠিক কর্ণধার ও জ্ঞানী মানুষের অভাব অনুভব করবে। আর তারা একটা সময় পরিবার, সমাজ আর রাষ্ট্রের বোঝা হবে। তাই আমরা আমাদের সন্তানদের ওপর নজর রাখা একান্ত নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

10/01/2024

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর দায়িত্ব

কয়েকজন মিলিটারি জেনারেল আসলেন সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেলের অফিসে সাক্ষাৎ করতে- ম্যাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন আমাদের চেয়ে ঢের বেশি। যদি আমাদের বেতন কাঠামো তাদের সমান করতেন, আমাদের মর্যাদা একটু বাড়ত। এঙ্গেলা মার্কেল, ‘আপনারা কী আপনাদের শিক্ষকদের সমান হতে চান?’ সঙ্গে সঙ্গে জেনারেলরা মাথা নিচু করে সভা শেষ করে চলে গেলেন। প্রতি বছর ব্রিটিশ রানি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে একটি নির্দিষ্ট দিনে সাক্ষাৎ করেন। সেই সাক্ষাৎ দিবসে প্রথম ক্যাটাগরিতে প্রবেশ করেন শিক্ষক, তারপর অন্যান্য শ্রেণি-পেশা (যেমন- প্রধানমন্ত্রী, আমলা-আমত্য প্রভৃতি)। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালাম বলতেন, ‘শিক্ষক হচ্ছে আধুনিকতা ও উন্নয়নের রূপকার।’ ওকে, মানলাম, শিক্ষকতা হলো ক্রিম পেশা। কিন্তু কীভাবে? কি তার অন্তর্নিহিত মাহাত্ম্য। একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীর মগজ ও পদতলকে কতটা মসৃণ করতে পারল, তার ওপরই নির্ভর করে এর মাহাত্ম্য। যেমন- একজন ব্যাংকার চেক ইস্যু করেন, এটা তার রুটিন কাজ; প্রশাসক ফাইল ইস্যু করেন, যা কেবলই তার সরকারি কর্তৃক তৈরিকৃত কিছু দলিল। তাকে কিছু পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত কাজও করতে হয়, যা সমষ্টিগত প্রচেষ্টার একটি ফসল। কিন্তু একজন শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে, সেমিনারে, সম্মেলনে, প্রতিক্ষণে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে হয়। সৃষ্টি না করেও ক্লাস শেষ করা যায়, তবে সেটা কেবলই রুটি-রুজির চাকরিতে রূপান্তরিত হয়। এমন অবস্থা একজন শিক্ষককে মানসিকভাবে হত্যা করতে থাকে। তখন তার জন্য নেতিবাচক কোনো পন্থা অবলম্বন করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। শ্রেণিকক্ষ তখন একজন শিক্ষকের জন্য নিরানন্দ এবং বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে সৃষ্টিশীল, সৎ ও শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষকের জন্য শ্রেণিকক্ষ আনন্দ ভোগের উৎসে পরিণত হয়। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সব কাজ তখন ‘আনন্দ খেলা’র মতো গণ্য হয়। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীরা মনের অজান্তে পিচ্ছিল কাঁচা রাস্তা হতে পাকা রাস্তা ধরে চলতে শেখে, যা একসময় তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। শিক্ষকের সন্তানকে দেখাশোনার জন্য অনেক আত্মীয়-পরিজন থাকে। কিন্তু অনেক শিক্ষার্থী আছে, যাদের দেখাশোনা করার জন্য শিক্ষক ছাড়া আর কেউে নেই। স্বল্প শিক্ষিত (কিন্তু বিদ্যুৎসাহী) পিতা-মাতা মনে করেন, আমার ছেলেমেয়েকে ভালো শিক্ষকের কাছে পাঠিয়েছি, সে বড় মানুষ হয়েই আসবে। ওই শিক্ষার্থীদের মানুষ করার প্রায় সব দায়িত্ব তখন শিক্ষকের ওপর বর্তায়। শিক্ষক তখন শিক্ষার্থীর মুখ দেখামাত্রই তার সন্তানের দুঃখের কথা ভুলে যেতে পারে। এমতাবস্থায় প্রকৃতগতভাবে সন্তানের শিক্ষকরাও দয়াবান শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। শিক্ষকের সন্তান তখন ‘প্রকৃতির অদৃশ্য শক্তিতে’ বলীয়ান হয়ে ওঠে। এভাবে আমাদের সমাজকল্যাণকর জনপদে পরিণত হতে থাকে। দুর্বল ও পশ্চাৎপদ কোনো শিক্ষার্থীকে শুধু নাম ধরে ডাকার কারণেই সে আলোময় পথ খুঁজে পাওয়ার অনুপ্রেরণা পেতে পারে। অনেক সময় কোনো শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে যে, শিক্ষার্থীর ‘ভালো ভবিষ্যৎ’ গড়ার জন্যই এই শাস্তি। শাস্তির সংখ্যা ও পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে, যদি শিক্ষার্থীর পরিবারে আচরণ শিক্ষার যথাযথ চর্চা না থাকে। মা-বাবার আচরণও যদি দীর্ঘ সময় ধরে নেতিবাচকায় পরিপূর্ণ থাকে, তার সন্তানও শিক্ষালয়ে এসে ভালো আচরণ করতে সক্ষম হয় না। শিক্ষার্থীর মধ্যে যদি কোনোক্রমে অহংকার এসে যায়, তার আচরণও নেতিবাচক হতে বাধ্য। আদর ও শাস্তি অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর পড়ালেখার জন্য যতটা হবে, আচরণের পরিবর্তনের জন্য হবে তার দ্বিগুণ। অর্থাৎ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর আচরণগত পরিবর্তন করাই শিক্ষকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ‘সরি’ বলার মনোভাব তৈরি করতে পারলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে হৃদযোগ হতে পারে সহজে। আর শিক্ষার্থীরাও তখন সৎ হওয়ার অনুপ্রেরণা লাভ করে, কারণ তার শিক্ষক ভুল বা অন্যায়ের জন্য যদি সরি বলতে পারে, তখন তাদের নিকট এটা ভালো মানুষ হওয়ার টনিক হিসেবে কাজ করে। আমার স্যার যেহেতু ভালো মানুষ, অতএব শিক্ষার্থী মনে করে আমাকে ভালো হতে হবে।

‘সরি’ বলা শিক্ষকের যে কোনো পরামর্শ, উপদেশই তখন তারা মনের অজান্তে মানতে বাধ্য হয়। আলটিমেটলি ওই শিক্ষার্থীরা ১/২ বছরের শিক্ষা, দক্ষতা ও সততার পথে চলতে চলতে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। ‘ধন্যবাদ’ শ্রেণিকক্ষের জন্য আরো একটি টনিক শব্দ, যা কাজ করে বিদ্যুতের মতো। শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ধন্যবাদ’ শব্দটা বড় একটি পুরস্কার বা স্বীকৃতি, যা তাকে দ্বিগুণ শক্তিতে পড়ালেখা করতে, ভালো মানুষ হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে।

একজন শিক্ষার্থী যখন ভালো শিক্ষকের নিকট হতে ধন্যবাদ, গুড অথবা গ্রেট শব্দগুলো অর্জন করে, তখন নিশ্চিতভাবে সে তার ক্লাসমেটদের নিকট ‘হিরো বা হিরোইন’ বনে যায়। তার এই ‘হিরোইজম’ ধরে রাখার জন্য সে নিয়মিত পড়ালেখা, পরিশ্রম করতে থাকে। অন্যরাও স্যারের স্বীকৃতি পেতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। ‘ধন্যবাদ বা কমপ্লিমেন্ট’ অর্জন প্রতিযোগিতা শ্রেণিকক্ষে রীতিমতো কনফারেন্স রুমে পরিণত করে। ফলে তা জ্ঞান বা দর্শন আদান-প্রদানের মন্দিরে পরিণত হয়। কিন্তু আমাদের শ্রেণিকক্ষে ‘সরি বা ধন্যবাদ’ চর্চার আকাল লক্ষ্য করা যায়। আমাদের শিক্ষকরা হয়তো বা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিতর্ক, আলোচনা-পর্যালোচনা, প্রশ্নোত্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ততটা ইন্টাররেক্টিভ হতে পারেন না। ফলে ‘সরি বা ধন্যবাদ’ বলার সঠিক ক্ষেত্র তৈরি হয় না। শিক্ষকদের গতানুগতিক ও গৎবাধা বক্তব্য প্রদান করার ফলে কোথায় ‘সরি বা ধন্যবাদ’ বলতে হবে, তা শিক্ষক হাতড়িয়ে পায় না। সুতরাং ‘সরি বা ধন্যবাদ’ বলার জন্য প্রশ্নোত্তর বা বির্তক সৃষ্টি করতে হবে। প্রশ্নোত্তর পর্বে আসবে ‘ধন্যবাদ’ এবং বিতর্কে আসবে ‘সরি’ বলার পরিবেশ।

‘সরি বা ধন্যবাদ’ প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষকের উচ্চ ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে, যা শিক্ষার্থীর মাঝে শিক্ষক একজন অনুসরণীয় মডেলে পরিণত হবে। কিছু পরিবার হতে আগত শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যতিক্রম কিছু পন্থা অবলম্বন করা শিক্ষকের বিশেষ দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিছু কিছু পরিবারের ছেলেমেয়েদের কৌশলে স্বীকৃতি, প্রশংসা বা বিশেষ নজর দিলে তারা খুবই আশান্বিত হবে। হীনমন্যতা ভুলে গিয়ে তারা নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করবে। এমন পন্থা তাদের জন্য সফলতার শিখর হতে পারে। তার অন্তরে ক্ষুধা, বঞ্চনা, লাঞ্চনা কারণে বড় হওয়ার যে কষ্টের আগুন তার ভেতরে জ্বলছে, সেটা নিমিষেই তার মন থেকে দূরীভূত হয়ে যায়। এখন শিক্ষকতা পেশাটাকে যেহেতু সবাই সহজ মনে করে এবং জবাবদিহিতার যেহেতু সংকট রয়েছে, তখন বুঝতে হবে, জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হচ্ছে সাচিবিক ডেস্কে অথবা মগজহীন প্রভাবশালী মানুষের টেবিলে। সুতরাং, শুধু পরীক্ষা কক্ষভিত্তিক শিক্ষা নয়, ডেস্কভিত্তিক সিদ্ধান্তে জাতি গঠন নয়, শ্রেণিকক্ষ ও আদর্শ পরিবারভিত্তিক শিক্ষা ও সমাজ গড়ে উঠুক, এটাই আমাদের কামনা। একজন ভালো শিক্ষকের মুখ হতে যদি কোনো স্বীকৃতি, প্রশংসাসূচক শব্দ শুনে, তখন সে মনে করে তার মধ্যে কিছু আছে, সে পারবে। সে জীবনকে তখন নতুনভাবে গড়ে তোলার সংগ্রামে নেমে পড়ে। বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী ওই ধরনের পরিবার হতে আসছে। দেশের লিডিং পজিশনগুলোও পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তারই দখল করছে। হ্যাঁ, ওই সন্তানগুলো কাউকে না কাউকে আইডল মানে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাবে শিক্ষকই তার সেই আইডল। শিক্ষার্থীর হৃদয়ে দোলা দিয়ে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষকে দেশ গড়ার একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে পারে। অবশ্য দেশগড়ার যে দুটি সংগঠন মৌলিক অবস্থানে আছে, তা হলো পরিবার ও শ্রেণিকক্ষ।

প্রস্তুতিবিহীন ও নোট খাতাবিহীন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ, শিক্ষকের জন্য যেমন অস্বস্তিকর শিক্ষার্থীদের যেমন তেমন বিরক্তিকর। গতানুগতিক স্টাইলে মূর্তির মতো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে শিক্ষকের ডেলিভারি শিক্ষার্থীর বিরক্তিসৃষ্টি ব্যতিরেকে অন্য কিছু দেয় না। প্রতিক্ষণে দমকা হাওয়া সৃষ্টি করে ধানক্ষেতের দোলা সৃষ্টি করায় শিক্ষকের কাজ। এতে শিক্ষার্থীর মগজে একটি ঝড় বয়ে যাবে, যা তাকে চিন্তাশীল ও সৃষ্টিশীল করে তুলবে। নিকট পরিবেশ হতে উদাহরণ দিয়ে শিক্ষক প্রতিটি টার্ম, আইডিয়া ও কনসেপ্ট ব্যাখ্যা করলে শিক্ষার্থী তা সহজে বুঝতে সক্ষম হয়। অবশ্য একজন শিক্ষককে ওই প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে দিয়ে যাওয়ার জন্য তাকে চিন্তা, স্টাডি ও প্ল্যান করে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলে ভালো হয়। আর শিক্ষক যদি এগুলো না করেন এবং সর্বদা ব্যস্ততার মধ্যে সময় কাটান তখন তার ইনোভেশন দক্ষতাগুলো মরে যেতে থাকে। শিক্ষক যখন একজন মডেলের মতো অভিনয়, আনন্দ ও রস দিতে সক্ষম হয়, শিক্ষার্থী তখন শ্রেণিকক্ষে আনন্দ পায় ও শিক্ষা গ্রহণে অধিকতর মনোযোগী হয়। এমতাবস্থায় সে বড় হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হতে থাকে। শিক্ষার্থী প্রশ্ন করলে ধন্যবাদ, যেকোনো উত্তর দিলে ‘হ্যাঁ’ সূচক ফিডব্যাক দিলে শিক্ষার্থী আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। মোদ্দাকথা, শ্রেণিকক্ষ প্রাণোবন্ত করে তোলার জন্য যা করা দরকার, সবকিছু প্রাকৃতিক উপায়ে করা উচিত। শিক্ষকের কৃত্রিমতা, কপটতা ও নিয়মানুবর্তিতার অভাব, শিক্ষার্থীদের মনে নেতিবাচক দাগ কেটে যায়। তাই ভারো শিক্ষক হওয়ার আগে ভালো মানুষ হওয়া দরকার। শিক্ষার্থীর শিক্ষক আর্দশ মানুষ না হলে, শিক্ষকের শিক্ষাদান শত চেষ্টায়ও ফলপ্রসূ হয় না। এখন শিক্ষকতা পেশাটাকে যেহেতু সবাই সহজ মনে করে এবং জবাবদিহিতার যেহেতু সংকট রয়েছে, তখন বুঝতে হবে জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হচ্ছে সাচিবিক ডেস্কে অথবা মগজহীন প্রভাবশালী মানুষের টেবিলে। সুতরাং, শুধু পরীক্ষা কক্ষভিত্তিক শিক্ষা নয়, ডেস্কভিত্তিক সিদ্ধান্তে জাতিগঠন নয়, শ্রেণিকক্ষ ও আদর্শ পরিবারভিত্তিক শিক্ষা ও সমাজ গড়ে উঠুক, এটাই আমাদের কামনা।

ড. কেএম আতিকুর রহমান, সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, গাছবাড়িয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম
প্রিন্ট সংস্করণ
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

10/01/2024

একজন ভালো শিক্ষক হওয়ার জন্য কী কী গুণ থাকা প্রয়োজন?

দুঃখজনক হলেও সত্য আজকাল কেউই শিক্ষক হতে চায় না। সব জায়গায় চেষ্টা করে কোথাও চান্স না পেলে তখনই শিক্ষক হয়। অথচ একটা সময় ছিল ভালো ছাত্ররা সর্বাগ্রে শিক্ষক হতে চাইতো। আমি নিজেই এমন শিক্ষক পেয়েছি যিনি এইচএসসি তে ৩য় বোর্ড স্ট্যান্ড করে শিক্ষক হওয়ার জন্যই পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়েে পড়াশোনা করে শিক্ষক হয়ে ছিলেন। আমার দেখা মতে একজন আদর্শ শিক্ষক। কিন্তু এখন সময় বদলে গেছে, সবাই অর্থ আর ক্ষমতার পেশা পছন্দ করে। শিক্ষাকতার মতো সম্মানিত পেশায় কেউ আর আগের মতো পছন্দ করে না। আমরা শিক্ষকরাই এর জন্য দায়ী , আর আর্থসামাজিক অবস্থারও অনেক পরিবর্তন হয়েছে।

যাইহোক শিক্ষক হতে হলে অবশ্যই নিজেকে নিজে তৈরি করতে হবে। আমার মতে একজন ভালো শিক্ষক হতে হলে,

১. প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে। নিজের বিষয়ের বাইরেও অনেক কিছু আছে যা একজন শিক্ষককে জানতে হবে। মনে রাখতে হবে, একজন শিক্ষকের জ্ঞানচর্চা কখনও থেমে থাকবে না।

২. মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ের উপর জ্ঞান থাকতে হবে। উপস্থিত বুদ্ধি থাকতে হবে।

৩. কখনো রেগে যাওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করা যাবে না।

৪. আমার চেয়েও আরেক শিক্ষক অথবা আমার ছাত্রও বেশি জানতে পারে। অন্য শিক্ষকের কোন দোষ ত্রুটি আলোচনা করা যাবে না।

৫. পাঠদানের পূর্বে অবশ্যই প্রস্তুতি নিয়ে শ্রেনীকক্ষে যেতে হবে।

৬. শিক্ষার্থীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে।

৭. শিক্ষার্থীরা মনোযোগীী কি-না তা খেয়াল করতে হবে। তাদেরকে পাঠের মধ্যে মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করতে হবে।

৮. একটানা না পড়িয়ে মাঝে মধ্যে শিক্ষা মূলক কিছু গল্প করতে হবে।

৯. কিছু রসাত্মক গল্পও করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা হাসিখুশিতে থাকে।

১০. একজায়গায় না দাড়িয়ে, সারা ক্লাসের মধ্যে ঘুরে ঘুরে ক্লাস নিতে হবে।

১১. সবার দিকে পর্যায়ক্রমে তাকাতে হবে। এবং সবাইকে কমবেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

১২. ক্লাসের পড়া ক্লাসেই শেষ করার চেষ্টা করতে হবে। পড়া কম হোক সমস্যা নেই, কিন্তু সবাই যেন সেটা সহজেই বোঝে সেটা খেয়াল করতে হবে।

১৩. মাঝে মধ্যে কুইজের ( পরীক্ষার) ব্যবস্থা করতে হবে। সম্ভব হলে পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে। ( হোকনা যতই ক্ষুদ্র)।

১৪. শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপদল করে বিভক্ত করে প্রতিযোগীতার ব্যবস্থা করলে আরও ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে।

১৫. হাসি খুশি ও সর্বদা প্রফুল্য মনে থাকতে হবে।

১৬. কথা স্পষ্ট করে বলতে হবে।

১৭. নিজের জীবনের সফলতার গল্প করতে হবে, এতে শিক্ষার্থীদের মনে অনুপ্রেরণা আসবে।

১৮. সবসময় ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে আলোচনা করতে হবে, নেতিবাচক বিষয় আনা যাবে না।

১৯. শিক্ষার্থীদের মনে সবসময় সাহস যোগাতে হবে।

২০. শিক্ষার্থীদেরকে সবসময় সন্তানের ন্যায় ভাবতে হবে।

আশাকরি যথেষ্ট বলা হয়েছে। তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে কলিগরা কিন্তু সবসময়ই ভালো শিক্ষককে খাটো করার চেষ্টা করবে এবং হেডস্যার বা অধ্যক্ষের কাছে ছোট করার চেষ্টা করবে। তাই সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

10/01/2024

সকল শ্রেণীর জন্য বাসায় শিক্ষক দিচ্ছি
+8801740103101

Want your school to be the top-listed School/college in Sylhet?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Website

Address


Sylhet
Sylhet
3100