03/02/2024
জালালবাদ একাডেমির প্রাণ পুরুষ, আমাদের “ডিরেক্টর স্যার”
আব্দুল ওয়াহেদ খান!
_______________
সিলেটের সাংবাদিকতার অঙ্গনে একজন সাহসী ও স্বাধীনচেতা সাংবাদিক আবদুল ওয়াহেদ খান। অধুনালুপ্ত সিলেটের সাড়া জাগানো সর্ব প্রথম দৈনিক পত্রিকা দৈনিক জালালাবাদী ও সাপ্তাহিক সিলেট সমাচার এর তিনি ছিলেন স্বনামধন্য সম্পাদক, প্রকাশক ও স্বত্তাধিকারী। ভয়ভীতির উর্ধে থেকে সংবাদ পরিবেশনে সাহসিকতার জন্য তৎকালীন সুধীসমাজে ব্যাপকভাবে সমাদৃত ছিলেন আব্দুল ওয়াহেদ খান। তৎকালীন সুধী সমাজে তাঁর সম্পাদিত ও প্রকাশিত সিলেট সমাচার পত্রিকা ব্যাপক প্রশংসিত ছিল। সেই সময়ে তার পত্রিকা সিলেটের বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করতো।
তাঁর সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার মাধ্যমে। তিনি ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে দৈনিক ইত্তেফাক এর ঢাকা অফিসে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর পর্যন্ত কাজ করেন।
এছাড়া ইত্তেফাক কর্মচারীর ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারির দায়িত্বও পালন করেন।
১৯৭১ থেকে ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে দায়িতব পালন করেন।
পেশাগত প্রশিক্ষণের জন্য তিনি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার মাধ্যমে ব্রিটিশ মনো ইনস্টিটিউট ইস্ট পাকিস্তান সেন্টার থেকে ডিপ্লোমা ইন মনো অপারেশন কোর্স এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে জার্নালিজম সার্টিফিকেট কোর্স গ্রহণ করেন।
আব্দুল ওয়াহেদ খান সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ২৫ নং ওয়ার্ডের বারখলা গ্রামে ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর জন্রহণ করেন। শিক্ষক পিতা আব্দুল আজিজ খান ও মাতা মোছা: রাবেয়া খাতুনের তৃতীয় সন্তান তিনি।
সাংবাদিকতায় সফল এই ব্যক্তি সাংবাদিক প্রতিনিধি হিসেবে সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সঙ্গে ভারতের শান্তিনিকেতন এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, জাপান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, বৃটেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসেইন মো: এরশাদের সঙ্গে মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, ভূটান, নেপাল ভ্রমণ করেন।
তিনি একমাত্র সিলেটি সাংবাদিক যিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসেইন মো: এরশাদের সঙ্গে একাধিক রাষ্ট্রীয় সফরে প্রতিনিধি হিসাবে বিদেশ সফর করেন।
তিনি তৎকালী এরশাদ সরকারের মন্ত্রী হুময়ুন রশিদ চৌধুরীর সাথে ইংল্যান্ডে রাষ্ট্রিয় সফর করেন।
সাংবাদিক প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে (এসোসিয়েট প্রেস অব আমেরিকা কর্তৃক আয়োজিত) প্যাসিফিক রিজিওনাল জার্নালিস্ট কনফারেন্স (বান্দুং) ইন্দোনেশিয়ায়, ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের জাতিসংঘের ৪১ তম অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮৬ সালে আন্তর্জাতিক সমাজকল্যাণ পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত রিজিওনাল একচেন্জ প্রোগ্রামে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, হংকং ও ফিলিপাইন ভ্রমণ করেন। চিয়াংমাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ বিভাগ ও আন্তর্জাতিক সমাজ কল্যাণ পরিষদ ও ইউ এন ডিপির উদ্দ্যোগে ১৯৯৩ সালের জানুয়ারী থেকে ২৮শে মে পর্যন্ত হংকং মালয়েশিয়া, বৃটেন, কানাডা, আমেরিকা ও থাইল্যান্ড সফর করেন। এছাড়া সরকারী বেসরকারীভাবে অস্ট্রেলিয়া, সিংগাপুর, জাপান, কানাডা, খ্রীস, হল্যান্ড, জার্মানী, ইরাণ, আরব আমিরাত, কাতার, মরক্কো, সুইজারল্যান্ড, সৌদি আরব ভ্রমন করেন।
১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে গ্রেট ব্রিটেনস্থ বাংলাদেশ ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ত্যাওয়ার্ড কমিটি সাংবাদিক ও সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য তাকে নগদ অর্থ ও সম্মাননা প্রদান করে।
১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে কানাডার মন্ট্রিস্থ দৈনিক ক্রিসেন্ট পত্রিকার বোর্ড অব ডিরেক্টর কর্তৃক সাহসী সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য ক্রিসেন্ট এওয়ার্ড প্রদান করে।
১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকান বায়োগ্রাফিক্যাল ইনস্টিটিউট কর্তৃক ‘International Cultural Diploma of Honor’ হিসেবে মনোনীত এবং এই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রকাশিত Five Thousand Personalities of the World এর পঞ্চম এডিশনের অন্তর্ভুক্তকরণ করা হয়।
২০০৯ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকাভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে, ফিলিপাইনের ম্যানিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস্ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড মাস কম্যুনিকেশনস্ সোসাইটি কর্তৃক পরিচালিত ১৯৭০ থেকে ২০০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিন দশকে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৪৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সহ যে সব দেশে সামরিক শাসন জারী হয়েছিল, তৎকালীন সময়ে এসব দেশের প্রচার মাধ্যম ও পত্র পত্রিকার ভূমিকার উপর নিরবচ্ছিন্ন ও ব্যাপক জরিপ ও গবেষণা চালানো হয়। চুড়ান্ত পর্যায়ে নির্দলীয় ও স্বাধীন পত্রিকাগুলোর মধ্যে বাংলাদেশী সাপ্তাহিক সিলেট সমাচার পত্রিকা ও সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ খান বিশেষভাবে মূল্যায়িত ও প্রশংসতি হন।
যেসব প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করেছেন, চেয়ারম্যান সিলেট বিভাগীয় সমাজ কল্যাণ ফেডারেশন, চেয়ারম্যান জালালাবাদ একাডেমী সিলেট, সদস্য বাংলাদেশ ওভারসীজ সেন্টার ট্রাষ্ট, ফাউন্ডার মেম্বার ও ট্রাষ্টী সিলেট খাজাঞ্চীবাড়ী ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, সাধারণ সম্পাদক ১৯৮৮-১৯৯২ ও পেট্রন কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট স্পোর্টস এন্ড কালচার ট্রাষ্ট, ফাউন্ডার মেম্বার সিলেট প্রেস ক্লাব, সহসভাপতি বাংলাদেশ সংবাদপত্র পরিষদ, বাংলাদেশ কাউন্সিল অব এডিটরস, জাতীয় সমাজ কল্যাণ পরিষদ, সমাজ কল্যাণ নির্বাহী পরিষদ বাংলাদেশ সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়, সদস্য আন্তর্জাতিক সমাজ কল্যাণ কাউন্সিল, জেলা সমাজ কল্যাণ পরিষদ, সিলেট পৌর সমাজ সেবা প্রকল্প পরিষদ, বি.এ.ভি. এস সিলেট, সিলেট জেলা যুব উন্নয়ন বোর্ড, জেলা স্কাউট কমিটি, সদস্য কমনওয়েলথ জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশন, সদস্য জাতীয় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ পরিষদ । কো-চেয়ারম্যান বাংলাদেশ পোস্টাল ইনকোয়ারী কমিটি, রিসোর্স পার্সন অবজার্ভার এঞ্জামিন, বুয়েট , সদস্য সিলেট জেলা পরিষদ । চট্রগ্রাম বিভাগীয় উন্নয়ন বোর্ড, রেলওয়ে বোর্ড, সিলেট মেডিকেল কলেজ হসপিটাল এডভাইজারী কমিটি, ওর্গানাইজিং সেক্রেটারী ব্লাড ব্যাংক বোর্ড, প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য আদর্শ মহিলা কলেজ, নছিবা খাতুন গার্লস হাইস্কুল, দক্ষিণ সুরমা কলেজ, চেয়ারম্যান আম্বরখানা গার্লস হাইস্কুল যে সময় হাইস্কুলকে কলেজে উন্নীত করা হয়। সিলেট ডায়বাটিক সমিতি, জালালাবাদ অন্ধ কল্যাণ সমিতি, সেক্রেটারী বৃহত্তর সিলেট শিক্ষা পরিবেশ উন্নয়ন কমিটি, সিলেট আইন শৃঙ্খলা এডভাইজারী কমিটি, চেয়ারম্যান সিলেট শিল্পী কল্যাণ তহবিল, সেক্রেটারী সিলেট নাগরিক কমিটি, আজীবন সদস্য হার্ট ফাউন্ডেশন। সহ-সভাপতি চট্রগ্রাম বিভাগীয় সমাজ কল্যাণ ফেডারেশন, ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত রেডিও বাংলাদেশ সিলেট কেন্দ্রের নিয়মিত কথক।
এছাড়া ৭০ ও ৮০ এর দশকে সিলেটের চার মহকুমাকে জেলাতে উন্নীত করে বৃহত্তর সিলেটকে প্রশাসনিক বিভাগে উন্নীত করা ও সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে তার সম্পাদিত সিলেট সমাচার ও দৈনিক জালালাবাদীর অবদান এবং তার ব্যক্তিগত সাংগঠনিক প্রচেষ্টা, এগুলো বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া মৌলভীবাজারে টিবোর্ড, হবিগঞ্জ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও সুনামগঞ্জে হাওর ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের হেড অফিস ও কৃষি কলেজ স্থাপনে তৎকালীন তিন মহকুমায় মতবিনময় সভা করে ও সিলেট সমাচার ও দৈনিক জালালাবাদীর মাধ্যমে জনগণকে উদ্ভুদ্ধ করেন।
এই নির্বিক সাংবাদিক আজীবন নিতী নৈতিকতা ধরে রেখেছেন। জীবনে কোনদিন কোন অন্যায়ের কাছে নত হননি। দেশের কর্তা ব্যাক্তিদের সাথে উঠা বসা থাকলেও কখনও কোন ফায়দা হাছিল করেননি নিজের জন্য। বরং তাকে ভালোবেসে অনেক সুযোগ সুবিধা দিতে চেয়েছেন অনেকেই, সম্মানের সাথে তিনি তা ফিরিয়ে দিয়েছেন। খুব পরিপাটি থাকতেন সুদর্শন চেহারার এই মানুষ। গত দুই দশকেরও বেশি সময় হবে, নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছিলেন আব্দুল ওয়াহেদ খান। লেখা লেখি আর বই পড়েই সময় পার করে দিতেন। এ সময়ের অনেকেই আমরা আব্দুল ওয়াহেদ খানকে না চিনলেও ৭০ ও ৮০ -র দশকের সুধী সমাজ, রাজনৈতিক ব্যক্তি, সচেতন নাগরিক, শিক্ষিত মানুষেরা খুব ভালো করে জানে আব্দুল ওয়াহেদ খান এক আপোষহীন মানুষ, কবি দিলোয়ারের ভাষায় “ওয়াহেদ, যে লড়তে যানে।”
গত ১লা ফেব্রুয়ারি ১১:৫০ মিনিটের সময় সিলেট নগরির একটি ক্লিনিকে বার্ধক্য জনিত কারনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর, মরহুমের জানাজার নামাজ গত ২ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার বাদ জুমা হযরত শাহজালাল দরগাহ প্রাঙ্গনে আনুষ্ঠিত হয়, শাহজালাল দরগাহ কবরে তার দাফন সম্পন্ন হয়।