18/07/2025
ইসরায়েল রাষ্ট্রটির আত্মপ্রকাশ থেকেই এর প্রকৃতি ছিল ঔপনিবেশিক, সহিংস ও উগ্র জাতিবাদে পূর্ণ। ১৯৪৮ সালে অস্তিত্বে আসার পর থেকে এ রাষ্ট্রটি মধ্যপ্রাচ্যে কখনোই একটি সহনশীল, ন্যায়ের পক্ষে অবস্থানকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। বরং যুগে যুগে তার কর্মকাণ্ডে উঠে এসেছে একটি আইনভ্রষ্ট, নীতিহীন, ঔদ্ধত্যপূর্ণ এবং রক্তপিপাসু সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের রূপরেখা। আজ সিরিয়া, ইরান, লেবানন, ইয়েমেন কিংবা ফিলিস্তিন—সবখানে একই নিষ্ঠুর ছায়া।
---
🔥 গাজা: ধ্বংসের সমার্থক হয়ে ওঠা এক ভূখণ্ড
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে প্রায় ৩৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি, যার মধ্যে অর্ধেকের বেশি নারী ও শিশু। জাতিসংঘ অনুমোদিত ত্রাণ কেন্দ্র, হাসপাতাল, রিফিউজি ক্যাম্প, স্কুল—কোনো কিছুকেই রক্ষা করা হয়নি। শিশুদের মাথা কেটে ভিডিও প্রকাশ করা, ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মৃতদেহে ব্যঙ্গাত্মক হাসি, নারী চিকিৎসকদের ধর্ষণ ও হত্যা—সবকিছুই একটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নৃশংস রূপ।
এই হত্যাযজ্ঞকে বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ বলে সমর্থন দিয়েছে, অথচ যে পরিমাণ বিস্ফোরক গাজায় ব্যবহৃত হয়েছে, তা হিরোশিমার পর দ্বিতীয় বৃহৎ গণধ্বংসের নজির।
---
✈️ সিরিয়া: সর্বশেষ হামলার ভয়াবহতা
২০২৫ সালের ১৬ ও ১৭ জুলাই, ইসরায়েল সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক এবং সুইডা প্রদেশে ভয়াবহ বিমান হামলা চালায়।
দামেস্কে ‘ডিফেন্স মিনিস্ট্রি’ ও প্রেসিডেন্ট ভবনের আশপাশে হামলায় নিহত হয় ৩ জন, আহত হয় ৩৪ জন।
একই সঙ্গে সুইডা ও দারআ প্রদেশে ৭টিরও বেশি হামলা চালানো হয়, বিশেষ করে আল-থালা বিমানঘাঁটিতে।
ইসরায়েল দাবি করে, তারা সিরিয়ার ‘ড্রুজ সংখ্যালঘুদের রক্ষায়’ এ হামলা চালিয়েছে। কিন্তু এটি সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের ঘোর লঙ্ঘন, যার বিরুদ্ধে রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক এবং আরব দেশগুলো কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছে।
এটি নতুন কিছু নয়। সিরিয়ায় ইসরায়েল নিয়মিতভাবে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে—কখনো ইরান ঘনিষ্ঠ মিলিশিয়াদের টার্গেট করে, কখনো প্রতিরক্ষা স্থাপনায়, আবার কখনো রাসায়নিক গবেষণাগারে।
---
🇱🇧 লেবানন: হিজবুল্লাহ ‘বহিরাগত’ নয়, প্রতিরোধের প্রতীক
লেবাননের দক্ষিণ সীমান্তে ইসরায়েল প্রায়ই হামলা চালায়, যুক্তি হিসেবে তুলে ধরে হিজবুল্লাহর অস্তিত্ব। অথচ হিজবুল্লাহ লেবাননের বৈধ রাজনৈতিক দল ও প্রতিরক্ষা শক্তি।
২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৫ সালেও দেখা যাচ্ছে—ইসরায়েল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কৃষিজমি, বাড়িঘর, এমনকি রেডক্রস ক্যাম্পেও হামলা করছে। সম্প্রতি সেখানে কয়েকটি গ্রামে অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ৮ জন শিশু।
---
🛰️ ইয়েমেন: প্রক্সি আগ্রাসনের ছায়া
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মাধ্যমে ইয়েমেনে হুথি বিরোধী অভিযানে ইসরায়েলও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।
২০২৪ সালে জানা যায়, ইয়েমেন উপকূলবর্তী পারিম দ্বীপ ও সোকোত্রা দ্বীপে গোপনে ইসরায়েল সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলেছে।
এটি মূলত ইরানপন্থী যোদ্ধাদের দমন এবং লোহিত সাগরের বাণিজ্যনিরাপত্তা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার একটি ছলচাতুরী।
---
🧠 ইরান: পারমাণবিক নয়, আদর্শই আসল সমস্যা
ইরানকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের ভয় মূলত পারমাণবিক অস্ত্রে নয়—বরং ইসলামী বিপ্লবের আদর্শে। ইরান ফিলিস্তিনের পক্ষে, ইহুদি আধিপত্যের বিরুদ্ধে এবং ইসরায়েলবিরোধী একমাত্র রাষ্ট্র যা সামরিকভাবে টিকে আছে।
২০২৫ সালেই ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্র ও ইসফাহান ফ্লাইট কমান্ডে সাইবার ও ড্রোন হামলা চালায় ইসরায়েল। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে এর কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত হয়নি।
---
🇺🇳 বিশ্ব নীরব, অপরাধীরা চুপ
ইসরায়েলের প্রতিটি হামলার পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থন। জাতিসংঘে প্রস্তাব উঠলেই মার্কিন ভেটো, ইউরোপের ভাসাভাসা বিবৃতি এবং মুসলিম বিশ্বের অন্তঃকলহ ইসরায়েলের জন্য রক্তপাত চালানোর সনদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাশিয়া, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক এবং ইরান একসঙ্গে প্রতিবাদ করলেও পশ্চিমা জোটের প্রভাব এতটাই দৃঢ় যে, কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি কেউই।
---
❝ উপসংহার: ইসরায়েল রাষ্ট্র নয়, এক আতঙ্ক
যে রাষ্ট্র শিশুদের মাথায় বোমা ফেলে, নারীদের ধর্ষণ করে, হাসপাতাল গুড়িয়ে দেয়, প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ডে ঘাঁটি বসায় এবং ধর্ম, জাতি ও প্রতিরোধ—সব কিছুকেই ভয় পায়—তাকে ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ বলা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতারণা।
আজ ইসরায়েল একটি রাষ্ট্র নয়, বরং এক আতঙ্কের নাম। বিশ্বের সবচেয়ে সহিংস, ঔদ্ধত্যপূর্ণ, নিষ্ঠুর ও রক্তপিপাসু আগ্রাসী শক্তি। এর নাম বদলানো দরকার—“Jewish State” নয়, Terror State of Israel।