21/02/2019
___ বিয়ের বাজার করতে ঢাকায় এসেছিল রফিক। নিজ গ্রামের পানুর সাথে প্রেম ছিল রফিকের্। বিয়ের কথাবার্তাও পাকা হয় দুজনের্। ২০ তারিখ বিয়ের বাজার করতে ঢাকায় আসার আগে রফিকের সাথে কি কথা হয়েছিল পানুর আমরা জানিনা
হয়ত এমনি কথা হয়েছিল
- আসি
- সাবধানে থেকো
বায়ান্নর ফেব্রুয়ারীর সেই আগুনঝরা দিনে রফিক বিয়ের বাজার করতে ঢাকায় পা দিয়েছিল। তখনো কি রফিক জানত নিয়তি তার থেকে মাতৃভাষার জন্য বুকের রক্ত মুক্তিপণ হিসেবে নিবে। ২১ তারিখ সন্ধ্যায়ই বাড়ি ফেরার কথা ছিল রফিকের্। তার প্রিয়তমা পানুর কাছে। সেই রফিক গেল ঢাকা মেডিকেলের সামনে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে মায়ের ভাষার দাবি আদায়ের মিছিলে। পুলিশের গুলিতে মাথার খুলি উড়ে গেল রফিকের্।
ঢাকা মেডিকেলের হোস্টেলের ১৭ নাম্বার রুমের পূর্বদিকে পরে রইল ভাষার জন্য প্রথম প্রাণ দেয়া শহীদ রফিকের লাশ। রফিকের লাশ কে ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া হলো এনাটমি হলের পিছনের বারান্দায়।রফিকের মাথার মগজ পরে ছিল। ড. মশাররফুর রহমান খান রফিকের মগজ হাতে করে নিয়ে যান। (সোর্স- জন্মযুদ্ধ ৭১)
সেই মগজের নিওরনে তখনো হয়ত জমা ছিল প্রিয়তমা পানুর সাথে কাটানো হাজারো স্মৃতি।
এদিকে ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন তখন আজকের প্রখ্যাত কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী সাহেব। তিনি রফিকের খুলি উড়ে যাওয়া লাশ দেখলেন। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে এলো দুটি লাইন
" আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি "
কবিতার আকারে সে গান লেখা শেষ হলো
প্রথমে গানটিতে সুর দিলেন সুরকার আবদুল লতিফ সাহেব। পরবর্তীতে দেশের সংগীত জগতের সম্রাট শহীদ আলতাফ মাহমুদ একদিন গাফফার চৌধুরী কে বললেন
- তোর গানটিকে আমি সুর দেব
আলতাফ মাহমুদের সুরের জাদুতে জন্ম নিল আমাদের একুশের গান। আরেক জিনিয়াস শহীদ জহির রায়হান সে গান শুনে সিদ্ধান্ত নিলেন তার জীবন থেকে নেয়া ছবিতে সে গান ব্যাবহার করবেন। দৃশ্যায়ন করা হলো সত্যিকারের প্রভাতফেরীর দৃশ্য। গাওয়া হলো গান। জন্ম নিল একুশের গান।
ক্র্যাক হেডেড আলতাফ মাহমুদ ৭১ এ যুদ্ধ শুরু হলে যোগ দিলেন যুদ্ধে। গেরিলা এ্যাটাকে নাকের পানি চোখের পানি এক করে দিলেন পাকিস্তানি জানোয়ারদের্। আলতাফ মাহমুদের সঙ্গী তখন শহীদ রুমি ,বদি ,জুয়েল ,আজাদ ,হাফিজ। একসাথে পাক সেনাদের মেরেছেন। মরণেও তারা একসাথেই রইলেন। সেই যে গেলেন আর ফিরে এলেন না। রুমি ,বদি ,আলতাফ মাহমুদেরা
বেঁচে থাকল তার গান ,একুশের গান
বেঁচে থাকল জীবন থেকে নেয়া ,হারিয়ে গেলেন জিনিয়াস জহির রায়হান।
আচ্ছা বাদ দেন আরেক গল্প বলি
তারও অনেক আগে কুমিল্লার আরেক ক্র্যাক হেডেড সন্তান ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তান পার্লামেন্টে দাড়িয়ে বাঘের বাচ্চার মত মাথা উচুঁ করে পাকিস্তানের হোমড়াচোমড়াদের শুনিয়ে দিলেন
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি
" Out of six crors and ninety lakhs people inhabiting this state, four crores and 40 lakhs of people speak Bengali language. So, sir, what should be the State language of the state? The state language of the state should be the language which is used by the majority of the people of the state, and for that, sir, I consider that Bengali language is a lingua franca of our state "
কলিজা লাগে এমন কথা বলতে। এমন সাহসিকতার দাম ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে প্রাণ দিয়ে চুকাতে হয়েছিল।
৭১ এর ২৮ শে মার্চ ধীরেনবাবু তার স্ত্রী সন্তানদের ডেকে বললেন , 'আমার অনুরোধ, তোমরা আমার মৃতদেহ বারান্দায় ফেলে রেখো যাতে সবাই আমার মৃতদেহ দেখে মনে সাহস পায়, বিদ্রোহ করবার জন্য।'
হত্যা করার আগে পাকিস্তানি জানোয়ারেরা ধীরেন বাবুর হাটুঁ গুড়িয়ে দিয়েছিল। হামাগুড়ি দিয়ে বাথরুমে যেতে হত এই সূর্যসন্তান কে।
এই হলো বাংলা ভাষার জন্ম নেয়ার গল্প
প্রিয় প্রজন্মের ছোট ভাই বোনেরা। আজকে আমাকে একটা কথা দিবা তোমরা।
তোমরা যখন বড় হয়ে দেশ বিদেশে যাইবা। তখন ওইসব দেশের মানুষ কে তোমরা বুক ফুলাইয়া
আমাদের শহিদ আলতাফ মাহমুদদের গল্প শুনাইবা। ধীরেন বাবুর সাহসের কথা শুনাইবা। শহিদ রফিক আর পানুর গল্প শুনাইবা।
তোমরা মাথা উচুঁ কইরা সারা দুনিয়াকে বইলা দিবা
দুনিয়াতে সব দেশের স্বাধীনতা দিবস আছে কিন্তু সব দেশের বিজয় দিবস নাই
সব দেশের শহীদ আছে কিন্তু কোন দেশের ত্রিশ লক্ষ শহীদ নাই,
সবদেশের ভাষা আছে ,কিন্তু বাংলা মায়ের মত ভাষার জন্য প্রাণ দেয়ার নজির নাই।
___ সংগৃহীত