আমাদের শিক্ষা ভাবনা

আমাদের শিক্ষা ভাবনা " Let there be light, Let there be education."
(2)

21/08/2026

শিক্ষাবিজ্ঞানের বিএড কোর্স: তত্ত্ব থেকে বাস্তব শ্রেণিকক্ষে পাঠদান
✍️ সৈয়দ মুস্তাফিজুর রহমান

ভূমিকা:
বিএড (Bachelor of Education) কোর্সের মূল উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষাতত্ত্ব সম্পর্কে প্রশিক্ষণার্থীদের জ্ঞান প্রদান করা নয়; বরং তাঁদের একজন দক্ষ, প্রতিফলনশীল, সৃজনশীল ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলা। একজন শিক্ষক কীভাবে পাঠ পরিকল্পনা করবেন, কীভাবে শিক্ষার্থীদের সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করবেন, কীভাবে প্রশ্ন করবেন, কীভাবে শিখন-অগ্রগতি মূল্যায়ন করবেন এবং কীভাবে শ্রেণিকক্ষের বৈচিত্র্যকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করবেন—এসব দক্ষতা বিএড প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই শিক্ষাবিজ্ঞানের বিএড কোর্সে পাঠদান হওয়া উচিত ‘শিক্ষককে শিক্ষাদান’ নয়, বরং ‘শিক্ষককে কার্যকরভাবে শেখাতে শেখানো’। এ ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক জ্ঞান ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন তৈরি করা জরুরি।

ভিডিওতে প্রদর্শিত প্রশিক্ষণ পরিবেশে দেখা যায়, প্রশিক্ষক শুধু বক্তব্য প্রদান করছেন না; বরং প্রশিক্ষণার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে উপস্থাপন, প্রশ্নোত্তর, অংশগ্রহণ, পর্যবেক্ষণ ও পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে একটি সক্রিয় শিক্ষণ পরিবেশ তৈরি করছেন। একজন প্রশিক্ষণার্থীকে সামনে এসে উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া এবং অন্যদের পর্যবেক্ষক ও অংশগ্রহণকারী হিসেবে যুক্ত করা বিএড প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক দিক নির্দেশ করে।

১. বিএড কোর্সে পাঠদানের প্রকৃতি:

বিএড কোর্সের পাঠদান সাধারণ কোনো বক্তৃতাভিত্তিক শ্রেণিকক্ষের মতো হওয়া উচিত নয়। কারণ এখানে প্রশিক্ষণার্থীদের অধিকাংশই ভবিষ্যৎ বা কর্মরত শিক্ষক। তাঁদের পূর্ব অভিজ্ঞতা, শ্রেণিকক্ষ-অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব চিন্তাকে পাঠদানের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়।

শিক্ষাবিজ্ঞানের পাঠদানে তাই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন—

জ্ঞান → দক্ষতা → প্রয়োগ

শিক্ষাবিজ্ঞানের কোনো তত্ত্ব সম্পর্কে জানা যথেষ্ট নয়। প্রশিক্ষণার্থীকে জানতে হবে—

* তত্ত্বটি কী;
* কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ;
* শ্রেণিকক্ষে এর প্রয়োগ কীভাবে হবে;
* কোন পরিস্থিতিতে কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা উপযোগী;
* প্রয়োগের পর শিক্ষার্থীর শিখন কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে।

এই কারণে বিএড শ্রেণিকক্ষ হওয়া উচিত theory-informed and practice-oriented।

২. প্রশিক্ষক থেকে Facilitator:
আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানে শিক্ষক বা প্রশিক্ষকের ভূমিকা পরিবর্তিত হয়েছে। তিনি আর কেবল জ্ঞান বিতরণকারী নন; তিনি একজন facilitator of learning।

ভিডিওতে প্রশিক্ষকের অবস্থান, অঙ্গভঙ্গি, প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং প্রশ্নের মাধ্যমে আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার প্রবণতা এই Facilitator-এর ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

একজন কার্যকর বিএড প্রশিক্ষক—

* প্রশ্ন করেন;
* প্রশিক্ষণার্থীদের কথা বলতে উৎসাহিত করেন;
* তাঁদের অভিজ্ঞতা জানতে চান;
* ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন;
* তাৎক্ষণিক ও গঠনমূলক Feedback দেন;
* বাস্তব শ্রেণিকক্ষের উদাহরণ ব্যবহার করেন;
* প্রশিক্ষণার্থীদের নিজেদের পাঠদান প্রদর্শনের সুযোগ দেন।

ফলে প্রশিক্ষক-কেন্দ্রিক শ্রেণিকক্ষ ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী/প্রশিক্ষণার্থী-কেন্দ্রিক শ্রেণিকক্ষে রূপান্তরিত হয়।

৩. Demonstration বা প্রদর্শনভিত্তিক পাঠদান:

বিএড কোর্সে শুধু ‘কীভাবে পাঠদান করতে হয়’ তা বলার চেয়ে বাস্তবে দেখিয়ে দেওয়া অনেক বেশি কার্যকর।

যেমন—প্রশিক্ষক যদি বলেন, “শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন করার সময় শিক্ষার্থীদের সক্রিয় রাখতে হবে”, তাহলে এর পাশাপাশি একটি কার্যকর প্রশ্ন করার নমুনা প্রদর্শন করা উচিত।

একইভাবে প্রশিক্ষণার্থীকে সামনে এসে একটি নির্দিষ্ট বিষয় উপস্থাপন করতে দিলে সে বাস্তব পাঠদানের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। অন্যান্য প্রশিক্ষণার্থী পর্যবেক্ষণ করে এবং পরে Feedback প্রদান করলে একটি microteaching cycle তৈরি হয়।

এর সাধারণ ধাপ হতে পারে—

পরিকল্পনা → উপস্থাপন → পর্যবেক্ষণ → Feedback → পুনঃপরিকল্পনা → পুনঃউপস্থাপন

এই প্রক্রিয়া একজন প্রশিক্ষণার্থীকে নিজের পাঠদানের শক্তি ও দুর্বলতা শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

৪. Microteaching-এর গুরুত্ব

বিএড প্রশিক্ষণে Microteaching অত্যন্ত কার্যকর একটি কৌশল। একটি পূর্ণাঙ্গ শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার পরিবর্তে প্রশিক্ষণার্থীকে নির্দিষ্ট একটি Teaching Skill অনুশীলনের সুযোগ দেওয়া হয়।

যেমন—

* প্রশ্ন করার দক্ষতা;
* ব্যাখ্যা করার দক্ষতা;
* উদ্দীপনা সৃষ্টির দক্ষতা;
* Blackboard/Whiteboard ব্যবহারের দক্ষতা;
* উদাহরণ প্রদানের দক্ষতা;
* Reinforcement বা উৎসাহ প্রদানের দক্ষতা;
* শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা;
* উপসংহার টানার দক্ষতা।

ভিডিওতে প্রশিক্ষণার্থীর সামনে এসে উপস্থাপন এবং প্রশিক্ষকের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা এই ধরনের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।

৫. প্রশ্ন করার দক্ষতা

একজন দক্ষ শিক্ষকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হলো সঠিক প্রশ্ন করতে পারা।

বিএড কোর্সে প্রশ্ন শুধু জ্ঞান যাচাইয়ের জন্য নয়; চিন্তা, বিশ্লেষণ, যুক্তি ও প্রতিফলন তৈরির জন্য ব্যবহার করা উচিত।

উদাহরণ হিসেবে—

স্মরণমূলক প্রশ্ন
“শিক্ষণ পদ্ধতি কী?”

বোঝার প্রশ্ন:
“শিক্ষণ পদ্ধতি ও কৌশলের মধ্যে পার্থক্য কী?”

প্রয়োগমূলক প্রশ্ন:
“একটি বড় শ্রেণিতে আপনি কীভাবে সহযোগী শিক্ষণ ব্যবহার করবেন?”

বিশ্লেষণমূলক প্রশ্ন:
“কেন সব শিক্ষার্থীর জন্য একই শিক্ষণ পদ্ধতি কার্যকর নাও হতে পারে?”

এভাবে প্রশ্নের স্তর পরিবর্তন করলে প্রশিক্ষণার্থীদের Higher-Order Thinking Skills বিকশিত হয়।

৬. Feedback: প্রশিক্ষণের প্রাণ:
বিএড কোর্সে Feedback অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে Feedback যেন কেবল “ভালো হয়েছে” বা “ভুল হয়েছে”—এই দুই শব্দে সীমাবদ্ধ না থাকে।

কার্যকর Feedback হওয়া উচিত—

Specific + Constructive + Action-oriented

অর্থাৎ—

“আপনার উপস্থাপন ভালো হয়েছে” বলার পাশাপাশি বলা যেতে পারে—

“আপনার বিষয়বস্তুর ব্যাখ্যা পরিষ্কার ছিল। তবে প্রশ্ন করার সময় শ্রেণিকক্ষের পেছনের সারির প্রশিক্ষণার্থীদেরও সরাসরি সম্পৃক্ত করলে অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।”

এ ধরনের Feedback প্রশিক্ষণার্থীকে নিজের পরবর্তী পাঠদানে কী পরিবর্তন করতে হবে তা বুঝতে সাহায্য করে।

৭. Reflective Practice:
একজন দক্ষ শিক্ষক কখনো মনে করেন না যে তাঁর শেখানোর পদ্ধতি সবসময় নিখুঁত। বরং তিনি নিজের পাঠদান নিয়ে প্রশ্ন করেন—

* আমার পাঠের উদ্দেশ্য কি অর্জিত হয়েছে?
* প্রশিক্ষণার্থীরা কি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে?
* আমার প্রশ্নগুলো কি যথেষ্ট চিন্তাশীল ছিল?
* আমি কি সব প্রশিক্ষণার্থীকে সমান সুযোগ দিয়েছি?
* কোন অংশটি ভালো হয়েছে?
* কোথায় উন্নতি করা দরকার?

এই আত্মবিশ্লেষণই Reflective Practice

বিএড প্রশিক্ষণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে এই প্রতিফলনশীল মানসিকতা তৈরি করা।

৮. প্রশিক্ষণার্থী-কেন্দ্রিক শ্রেণিকক্ষ:
বিএড শ্রেণিকক্ষে প্রশিক্ষণার্থীদের কেবল নোট গ্রহণকারী হিসেবে রাখা হলে শিক্ষক-প্রশিক্ষণ তার প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারে না।

তাঁদের—

* আলোচনা করতে হবে;
* প্রশ্ন করতে হবে;
* উপস্থাপন করতে হবে;
* দলগত কাজ করতে হবে;
* সমস্যা সমাধান করতে হবে;
* Microteaching করতে হবে;
* Peer Feedback দিতে হবে;
* নিজের কাজ মূল্যায়ন করতে হবে।

অর্থাৎ প্রশিক্ষণার্থীর ভূমিকা হবে learner, practitioner এবং reflective professional—এই তিনটির সমন্বয়।

৯. বাস্তব শ্রেণিকক্ষের সঙ্গে সংযোগ:
শিক্ষাবিজ্ঞানের তত্ত্ব তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা বাস্তব শ্রেণিকক্ষের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করা যায়।

যেমন “শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষা” পড়ানোর সময় শুধু সংজ্ঞা না দিয়ে প্রশিক্ষণার্থীদের প্রশ্ন করা যেতে পারে—

> “আপনার শ্রেণিতে যদি ৬০ জন শিক্ষার্থী থাকে এবং তাদের শেখার সক্ষমতা ভিন্ন হয়, তাহলে কীভাবে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক পাঠদান করবেন?”

এ ধরনের বাস্তব সমস্যা প্রশিক্ষণার্থীদের তত্ত্বকে ব্যবহারিক পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করতে শেখায়।

১০. প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার:

বর্তমান সময়ে বিএড পাঠদানে ICT ও Digital Learning Tools-এর ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। PowerPoint, ভিডিও, ডিজিটাল বোর্ড, Google Forms, Kahoot, Quizizz, Learning Management System এবং অন্যান্য প্রযুক্তি প্রশিক্ষণকে আরও ইন্টার‌্যাক্টিভ করতে পারে।

তবে প্রযুক্তি ব্যবহারই লক্ষ্য নয়; শিখনকে কার্যকর করাই লক্ষ্য।

অর্থাৎ—Technology should serve pedagogy, not replace pedagogy.

প্রযুক্তি এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে যাতে প্রশিক্ষণার্থীর চিন্তা, অংশগ্রহণ, সহযোগিতা ও মূল্যায়নের সুযোগ বৃদ্ধি পায়।

১১. মূল্যায়ন হবে ধারাবাহিক:
বিএড কোর্সে শুধু চূড়ান্ত পরীক্ষার মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থীর দক্ষতা নির্ধারণ যথেষ্ট নয়। পাঠদান দক্ষতা বিকাশের জন্য Continuous Assessment প্রয়োজন।

মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে—

* Observation Schedule;
* Teaching Practice Assessment;
* Rubric;
* Portfolio;
* Peer Assessment;
* Self-Assessment;
* Presentation;
* Microteaching Performance;
* Reflective Journal।

এতে প্রশিক্ষণার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা, মনোভাব ও পেশাগত বিকাশ—সবগুলো দিক মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়।

১২. একজন আদর্শ বিএড প্রশিক্ষকের বৈশিষ্ট্য:

একজন কার্যকর শিক্ষক-প্রশিক্ষকের মধ্যে থাকা উচিত—

১. বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান
২. শিক্ষাবিজ্ঞানের জ্ঞান
৩. যোগাযোগ দক্ষতা
৪. প্রশ্ন করার দক্ষতা
৫. শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা দক্ষতা
৬. ICT দক্ষতা
৭. Feedback প্রদানের দক্ষতা
৮. পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন দক্ষতা
৯. Empathy ও পেশাগত সংবেদনশীলতা
১০. Reflective Practice-এর অভ্যাস।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রশিক্ষককে তাঁর নিজের আচরণ ও পাঠদানের মাধ্যমে সেই শিক্ষণ-দক্ষতার মডেল তৈরি করতে হবে, যা তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে দেখতে চান।

উপসংহার

বিএড কোর্সে শিক্ষাবিজ্ঞানের পাঠদান মূলত একজন প্রশিক্ষণার্থীকে কী পড়াতে হবে’ থেকে ‘কীভাবে কার্যকরভাবে শেখাতে হবে’—এই যাত্রায় নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া।

ভিডিওতে প্রদর্শিত প্রশিক্ষণ পরিবেশ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—শিক্ষক-প্রশিক্ষণ কেবল বক্তৃতা বা তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে কার্যকর হয় না; বরং প্রদর্শন, অংশগ্রহণ, প্রশ্নোত্তর, অনুশীলন, পর্যবেক্ষণ, Feedback এবং Reflective Practice-এর সমন্বিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন দক্ষ শিক্ষক তৈরি হয়।

তাই বাংলাদেশের বিএড প্রশিক্ষণে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি প্রশিক্ষণ-সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থী শুধু শিক্ষাবিজ্ঞানের তত্ত্ব জানবেন না; বরং সেই তত্ত্বকে বাস্তব শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করতে পারবেন।

কারণ একজন ভালো শিক্ষক কেবল ভালোভাবে বিষয় জানেন না—তিনি জানেন কীভাবে শিক্ষার্থীকে শেখার সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। আর একজন ভালো শিক্ষক-প্রশিক্ষক সেই দক্ষতাটি প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে তৈরি করে দেন।

শিক্ষক তৈরি করা মানে শুধু শিক্ষককে জ্ঞান দেওয়া নয়; বরং তাকে শেখানো—কীভাবে অন্যকে শেখার সুযোগ তৈরি করে দিতে হয়।”


fans

21/08/2026

শিক্ষাবিজ্ঞানের বিএড কোর্স: তত্ত্ব থেকে বাস্তব শ্রেণিকক্ষে পাঠদান
✍️ সৈয়দ মুস্তাফিজুর রহমান

ভূমিকা:
বিএড (Bachelor of Education) কোর্সের মূল উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষাতত্ত্ব সম্পর্কে প্রশিক্ষণার্থীদের জ্ঞান প্রদান করা নয়; বরং তাঁদের একজন দক্ষ, প্রতিফলনশীল, সৃজনশীল ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলা। একজন শিক্ষক কীভাবে পাঠ পরিকল্পনা করবেন, কীভাবে শিক্ষার্থীদের সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করবেন, কীভাবে প্রশ্ন করবেন, কীভাবে শিখন-অগ্রগতি মূল্যায়ন করবেন এবং কীভাবে শ্রেণিকক্ষের বৈচিত্র্যকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করবেন—এসব দক্ষতা বিএড প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই শিক্ষাবিজ্ঞানের বিএড কোর্সে পাঠদান হওয়া উচিত ‘শিক্ষককে শিক্ষাদান’ নয়, বরং ‘শিক্ষককে কার্যকরভাবে শেখাতে শেখানো’। এ ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক জ্ঞান ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন তৈরি করা জরুরি।

ভিডিওতে প্রদর্শিত প্রশিক্ষণ পরিবেশে দেখা যায়, প্রশিক্ষক শুধু বক্তব্য প্রদান করছেন না; বরং প্রশিক্ষণার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে উপস্থাপন, প্রশ্নোত্তর, অংশগ্রহণ, পর্যবেক্ষণ ও পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে একটি সক্রিয় শিক্ষণ পরিবেশ তৈরি করছেন। একজন প্রশিক্ষণার্থীকে সামনে এসে উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া এবং অন্যদের পর্যবেক্ষক ও অংশগ্রহণকারী হিসেবে যুক্ত করা বিএড প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক দিক নির্দেশ করে।

১. বিএড কোর্সে পাঠদানের প্রকৃতি:

বিএড কোর্সের পাঠদান সাধারণ কোনো বক্তৃতাভিত্তিক শ্রেণিকক্ষের মতো হওয়া উচিত নয়। কারণ এখানে প্রশিক্ষণার্থীদের অধিকাংশই ভবিষ্যৎ বা কর্মরত শিক্ষক। তাঁদের পূর্ব অভিজ্ঞতা, শ্রেণিকক্ষ-অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব চিন্তাকে পাঠদানের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়।

শিক্ষাবিজ্ঞানের পাঠদানে তাই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন—

জ্ঞান → দক্ষতা → প্রয়োগ

শিক্ষাবিজ্ঞানের কোনো তত্ত্ব সম্পর্কে জানা যথেষ্ট নয়। প্রশিক্ষণার্থীকে জানতে হবে—

* তত্ত্বটি কী;
* কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ;
* শ্রেণিকক্ষে এর প্রয়োগ কীভাবে হবে;
* কোন পরিস্থিতিতে কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা উপযোগী;
* প্রয়োগের পর শিক্ষার্থীর শিখন কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে।

এই কারণে বিএড শ্রেণিকক্ষ হওয়া উচিত theory-informed and practice-oriented।

২. প্রশিক্ষক থেকে Facilitator:
আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানে শিক্ষক বা প্রশিক্ষকের ভূমিকা পরিবর্তিত হয়েছে। তিনি আর কেবল জ্ঞান বিতরণকারী নন; তিনি একজন facilitator of learning।

ভিডিওতে প্রশিক্ষকের অবস্থান, অঙ্গভঙ্গি, প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং প্রশ্নের মাধ্যমে আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার প্রবণতা এই Facilitator-এর ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

একজন কার্যকর বিএড প্রশিক্ষক—

* প্রশ্ন করেন;
* প্রশিক্ষণার্থীদের কথা বলতে উৎসাহিত করেন;
* তাঁদের অভিজ্ঞতা জানতে চান;
* ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন;
* তাৎক্ষণিক ও গঠনমূলক Feedback দেন;
* বাস্তব শ্রেণিকক্ষের উদাহরণ ব্যবহার করেন;
* প্রশিক্ষণার্থীদের নিজেদের পাঠদান প্রদর্শনের সুযোগ দেন।

ফলে প্রশিক্ষক-কেন্দ্রিক শ্রেণিকক্ষ ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী/প্রশিক্ষণার্থী-কেন্দ্রিক শ্রেণিকক্ষে রূপান্তরিত হয়।

৩. Demonstration বা প্রদর্শনভিত্তিক পাঠদান:

বিএড কোর্সে শুধু ‘কীভাবে পাঠদান করতে হয়’ তা বলার চেয়ে বাস্তবে দেখিয়ে দেওয়া অনেক বেশি কার্যকর।

যেমন—প্রশিক্ষক যদি বলেন, “শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন করার সময় শিক্ষার্থীদের সক্রিয় রাখতে হবে”, তাহলে এর পাশাপাশি একটি কার্যকর প্রশ্ন করার নমুনা প্রদর্শন করা উচিত।

একইভাবে প্রশিক্ষণার্থীকে সামনে এসে একটি নির্দিষ্ট বিষয় উপস্থাপন করতে দিলে সে বাস্তব পাঠদানের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। অন্যান্য প্রশিক্ষণার্থী পর্যবেক্ষণ করে এবং পরে Feedback প্রদান করলে একটি microteaching cycle তৈরি হয়।

এর সাধারণ ধাপ হতে পারে—

পরিকল্পনা → উপস্থাপন → পর্যবেক্ষণ → Feedback → পুনঃপরিকল্পনা → পুনঃউপস্থাপন

এই প্রক্রিয়া একজন প্রশিক্ষণার্থীকে নিজের পাঠদানের শক্তি ও দুর্বলতা শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

৪. Microteaching-এর গুরুত্ব

বিএড প্রশিক্ষণে Microteaching অত্যন্ত কার্যকর একটি কৌশল। একটি পূর্ণাঙ্গ শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার পরিবর্তে প্রশিক্ষণার্থীকে নির্দিষ্ট একটি Teaching Skill অনুশীলনের সুযোগ দেওয়া হয়।

যেমন—

* প্রশ্ন করার দক্ষতা;
* ব্যাখ্যা করার দক্ষতা;
* উদ্দীপনা সৃষ্টির দক্ষতা;
* Blackboard/Whiteboard ব্যবহারের দক্ষতা;
* উদাহরণ প্রদানের দক্ষতা;
* Reinforcement বা উৎসাহ প্রদানের দক্ষতা;
* শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা;
* উপসংহার টানার দক্ষতা।

ভিডিওতে প্রশিক্ষণার্থীর সামনে এসে উপস্থাপন এবং প্রশিক্ষকের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা এই ধরনের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।

৫. প্রশ্ন করার দক্ষতা

একজন দক্ষ শিক্ষকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হলো সঠিক প্রশ্ন করতে পারা।

বিএড কোর্সে প্রশ্ন শুধু জ্ঞান যাচাইয়ের জন্য নয়; চিন্তা, বিশ্লেষণ, যুক্তি ও প্রতিফলন তৈরির জন্য ব্যবহার করা উচিত।

উদাহরণ হিসেবে—

স্মরণমূলক প্রশ্ন
“শিক্ষণ পদ্ধতি কী?”

বোঝার প্রশ্ন:
“শিক্ষণ পদ্ধতি ও কৌশলের মধ্যে পার্থক্য কী?”

প্রয়োগমূলক প্রশ্ন:
“একটি বড় শ্রেণিতে আপনি কীভাবে সহযোগী শিক্ষণ ব্যবহার করবেন?”

বিশ্লেষণমূলক প্রশ্ন:
“কেন সব শিক্ষার্থীর জন্য একই শিক্ষণ পদ্ধতি কার্যকর নাও হতে পারে?”

এভাবে প্রশ্নের স্তর পরিবর্তন করলে প্রশিক্ষণার্থীদের Higher-Order Thinking Skills বিকশিত হয়।

৬. Feedback: প্রশিক্ষণের প্রাণ:
বিএড কোর্সে Feedback অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে Feedback যেন কেবল “ভালো হয়েছে” বা “ভুল হয়েছে”—এই দুই শব্দে সীমাবদ্ধ না থাকে।

কার্যকর Feedback হওয়া উচিত—

Specific + Constructive + Action-oriented

অর্থাৎ—

“আপনার উপস্থাপন ভালো হয়েছে” বলার পাশাপাশি বলা যেতে পারে—

“আপনার বিষয়বস্তুর ব্যাখ্যা পরিষ্কার ছিল। তবে প্রশ্ন করার সময় শ্রেণিকক্ষের পেছনের সারির প্রশিক্ষণার্থীদেরও সরাসরি সম্পৃক্ত করলে অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।”

এ ধরনের Feedback প্রশিক্ষণার্থীকে নিজের পরবর্তী পাঠদানে কী পরিবর্তন করতে হবে তা বুঝতে সাহায্য করে।

৭. Reflective Practice:
একজন দক্ষ শিক্ষক কখনো মনে করেন না যে তাঁর শেখানোর পদ্ধতি সবসময় নিখুঁত। বরং তিনি নিজের পাঠদান নিয়ে প্রশ্ন করেন—

* আমার পাঠের উদ্দেশ্য কি অর্জিত হয়েছে?
* প্রশিক্ষণার্থীরা কি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে?
* আমার প্রশ্নগুলো কি যথেষ্ট চিন্তাশীল ছিল?
* আমি কি সব প্রশিক্ষণার্থীকে সমান সুযোগ দিয়েছি?
* কোন অংশটি ভালো হয়েছে?
* কোথায় উন্নতি করা দরকার?

এই আত্মবিশ্লেষণই Reflective Practice

বিএড প্রশিক্ষণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে এই প্রতিফলনশীল মানসিকতা তৈরি করা।

৮. প্রশিক্ষণার্থী-কেন্দ্রিক শ্রেণিকক্ষ:
বিএড শ্রেণিকক্ষে প্রশিক্ষণার্থীদের কেবল নোট গ্রহণকারী হিসেবে রাখা হলে শিক্ষক-প্রশিক্ষণ তার প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারে না।

তাঁদের—

* আলোচনা করতে হবে;
* প্রশ্ন করতে হবে;
* উপস্থাপন করতে হবে;
* দলগত কাজ করতে হবে;
* সমস্যা সমাধান করতে হবে;
* Microteaching করতে হবে;
* Peer Feedback দিতে হবে;
* নিজের কাজ মূল্যায়ন করতে হবে।

অর্থাৎ প্রশিক্ষণার্থীর ভূমিকা হবে learner, practitioner এবং reflective professional—এই তিনটির সমন্বয়।

৯. বাস্তব শ্রেণিকক্ষের সঙ্গে সংযোগ:
শিক্ষাবিজ্ঞানের তত্ত্ব তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা বাস্তব শ্রেণিকক্ষের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করা যায়।

যেমন “শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষা” পড়ানোর সময় শুধু সংজ্ঞা না দিয়ে প্রশিক্ষণার্থীদের প্রশ্ন করা যেতে পারে—

> “আপনার শ্রেণিতে যদি ৬০ জন শিক্ষার্থী থাকে এবং তাদের শেখার সক্ষমতা ভিন্ন হয়, তাহলে কীভাবে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক পাঠদান করবেন?”

এ ধরনের বাস্তব সমস্যা প্রশিক্ষণার্থীদের তত্ত্বকে ব্যবহারিক পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করতে শেখায়।

১০. প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার:

বর্তমান সময়ে বিএড পাঠদানে ICT ও Digital Learning Tools-এর ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। PowerPoint, ভিডিও, ডিজিটাল বোর্ড, Google Forms, Kahoot, Quizizz, Learning Management System এবং অন্যান্য প্রযুক্তি প্রশিক্ষণকে আরও ইন্টার‌্যাক্টিভ করতে পারে।

তবে প্রযুক্তি ব্যবহারই লক্ষ্য নয়; শিখনকে কার্যকর করাই লক্ষ্য।

অর্থাৎ—Technology should serve pedagogy, not replace pedagogy.

প্রযুক্তি এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে যাতে প্রশিক্ষণার্থীর চিন্তা, অংশগ্রহণ, সহযোগিতা ও মূল্যায়নের সুযোগ বৃদ্ধি পায়।

১১. মূল্যায়ন হবে ধারাবাহিক:
বিএড কোর্সে শুধু চূড়ান্ত পরীক্ষার মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থীর দক্ষতা নির্ধারণ যথেষ্ট নয়। পাঠদান দক্ষতা বিকাশের জন্য Continuous Assessment প্রয়োজন।

মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে—

* Observation Schedule;
* Teaching Practice Assessment;
* Rubric;
* Portfolio;
* Peer Assessment;
* Self-Assessment;
* Presentation;
* Microteaching Performance;
* Reflective Journal।

এতে প্রশিক্ষণার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা, মনোভাব ও পেশাগত বিকাশ—সবগুলো দিক মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়।

১২. একজন আদর্শ বিএড প্রশিক্ষকের বৈশিষ্ট্য:

একজন কার্যকর শিক্ষক-প্রশিক্ষকের মধ্যে থাকা উচিত—

১. বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান
২. শিক্ষাবিজ্ঞানের জ্ঞান
৩. যোগাযোগ দক্ষতা
৪. প্রশ্ন করার দক্ষতা
৫. শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা দক্ষতা
৬. ICT দক্ষতা
৭. Feedback প্রদানের দক্ষতা
৮. পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন দক্ষতা
৯. Empathy ও পেশাগত সংবেদনশীলতা
১০. Reflective Practice-এর অভ্যাস।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রশিক্ষককে তাঁর নিজের আচরণ ও পাঠদানের মাধ্যমে সেই শিক্ষণ-দক্ষতার মডেল তৈরি করতে হবে, যা তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে দেখতে চান।

উপসংহার

বিএড কোর্সে শিক্ষাবিজ্ঞানের পাঠদান মূলত একজন প্রশিক্ষণার্থীকে কী পড়াতে হবে’ থেকে ‘কীভাবে কার্যকরভাবে শেখাতে হবে’—এই যাত্রায় নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া।

ভিডিওতে প্রদর্শিত প্রশিক্ষণ পরিবেশ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—শিক্ষক-প্রশিক্ষণ কেবল বক্তৃতা বা তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে কার্যকর হয় না; বরং প্রদর্শন, অংশগ্রহণ, প্রশ্নোত্তর, অনুশীলন, পর্যবেক্ষণ, Feedback এবং Reflective Practice-এর সমন্বিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন দক্ষ শিক্ষক তৈরি হয়।

তাই বাংলাদেশের বিএড প্রশিক্ষণে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি প্রশিক্ষণ-সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থী শুধু শিক্ষাবিজ্ঞানের তত্ত্ব জানবেন না; বরং সেই তত্ত্বকে বাস্তব শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করতে পারবেন।

কারণ একজন ভালো শিক্ষক কেবল ভালোভাবে বিষয় জানেন না—তিনি জানেন কীভাবে শিক্ষার্থীকে শেখার সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। আর একজন ভালো শিক্ষক-প্রশিক্ষক সেই দক্ষতাটি প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে তৈরি করে দেন।

শিক্ষক তৈরি করা মানে শুধু শিক্ষককে জ্ঞান দেওয়া নয়; বরং তাকে শেখানো—কীভাবে অন্যকে শেখার সুযোগ তৈরি করে দিতে হয়।”

'কমপক্ষে ৮৬৪টি বৈজ্ঞানিক গবেষণা পর্যালোচনা করে গবেষকেরা শিশুদের ভালো ঘুমের যেসব উপকারের কথা বর্ণনা করেছেন, সেগুলো হলো—এক...
18/08/2026

'কমপক্ষে ৮৬৪টি বৈজ্ঞানিক গবেষণা পর্যালোচনা করে গবেষকেরা শিশুদের ভালো ঘুমের যেসব উপকারের কথা বর্ণনা করেছেন, সেগুলো হলো—
এক. মস্তিষ্কের বিকাশে সাহায্য করে—ঘুমের সময় শিশুর মস্তিষ্ক নতুন তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে এবং শেখার ক্ষমতা উন্নত হয়।
দুই. শারীরিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে—গভীর ঘুমের সময় গ্রোথ হরমোন বেশি নিঃসৃত হয়, যা শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং হাড় ও মাংসপেশির বিকাশে সহায়তা করে।
তিন. রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়—পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে।
চার. মেজাজ ও আচরণ ভালো রাখে—যথেষ্ট ঘুম না হলে শিশু খিটখিটে, অমনোযোগী বা অতিরিক্ত চঞ্চল হয়ে যেতে পারে।
পাঁচ. স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়ায়—ভালো ঘুম শেখা বিষয় মনে রাখতে এবং মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে।..অনেক দেশেই শিশুদের স্কুলে ঘুমিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। আমরা হয়তো এখনই তা চালু করতে পারব না। তবে বিষয়টি নিয়ে ভাবা যেতেই পারে।'- লিখেছেন গওহার নঈম ওয়ারা



Credit: Post

শিক্ষক নিয়োগ সংস্কার:  বিএড অনার্স শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার গুণগত শিক্ষার সূচনাসৈয়দ মুস্তাফিজুর রহমান সুশিক্ষা ও সুচিন...
04/08/2026

শিক্ষক নিয়োগ সংস্কার: বিএড অনার্স শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার গুণগত শিক্ষার সূচনা

সৈয়দ মুস্তাফিজুর রহমান

সুশিক্ষা ও সুচিন্তা সমাজ পরিবর্তনের প্রধানতম নিয়ামক। এই সুশিক্ষা ও সুচিন্তার কারিগর হলেন একজন শিক্ষক যিনি স্বীয় মেধা,পরিশ্রম ও মননশীলতার নির্জন স্বাক্ষর রাখেন শিক্ষার্থীর জীবন মানসপটে যাঁর সিংহভাগই অজানা থেকে যায় যেমন মসৃন থাকে না পড়া বইয়ের পৃষ্ঠা। আমাদের জাতি গঠনের যদি কোনো নিরব বিপ্লব ঘটে থাকে সেই বিপ্লবের পথ প্রদর্শক হলেন শিক্ষক আর বিপ্লবের সূতিকাগার হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষাবিজ্ঞান অনুসারে শিক্ষার নানা উপাদান রয়েছে যেমন বস্তুগত ও অবস্তুগত উপাদান, এর মধ্যে অন্যতম শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষাক্রম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এইসব উপাদানের যথাযথ গঠনশৈলী ব্যাতীত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা অসম্ভব, এই চারটা উপাদানই বেশ গুরুত্বপূর্ণ তবে বলা যায় সবকিছুর শেকড়ে আছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। এ লেখার মূল বিষয়বস্তু 'শিক্ষক নিয়োগ' পদ্ধতি নিয়ে। লেখার উপজীব্য বিষয়টা যেহেতু 'শিক্ষক নিয়োগ' সংক্রান্ত তাই প্রথমে কিছু কথা বলা নেয়া যাক শিক্ষক সর্ম্পকে। শিক্ষক বললেই আমাদের ভাবনার দোলাচলে আর বাস্তবতার নিরিখে ভেসে ওঠে একটি বিদ্যাপীঠের শ্রেণিকক্ষে টেবিল, চেয়ার, বোর্ড, শিক্ষার্থী, অনেকগুলো ডেস্ক বেঞ্চসহ শিক্ষার নানাবিধ প্রয়োজনীয় উপাদান নিয়ে যিনি একাগ্রচিত্তে কাজ করেন, রয়েছে তাঁর দারুণ মেরুদণ্ড স্বচ্ছ মুখচ্ছবি। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে ক্ষমতার কাছে শিক্ষকদের নতশির, মুখচিত্র ঘোলাটে কারণ মায়াজালের মিথ্যে পৃথিবী ভেদ করে দাঁড়িয়ে থাকা আয়না যে শুধু নামমাত্র একটা আয়না। ব্যক্তির মুখে কোন ময়লা নেই তবুও আয়নায় ধূলো আর বালিকনা জমে জমে জীবন শেষ কুড়ি কুড়ি বছরের পরে এই ধূসর মাটির ভুবনে। এই পৃথিবীর ধূলোময় আয়নায় হয় না নিজেকে দেখা, নিজেকে চেনা-জানা। ব্যক্তির নিজেকেই যখন দেখা যায় না তখন গোটা সমাজকে দেখা যাবে কি করে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। ব্যক্তির আত্ম পর্যালোচনাই সমাজের আত্ম পর্যালোচনার নামান্তর। আমাদের পূর্ব পুরুষগণ আদর করে ছেলে ভুলানো রীতিতে শিক্ষকদের পেশাকে সম্বোধন করছেন 'মহান পেশা' হিসেবে। ব্যাপারটা এমন হয়ে গিয়েছে শিক্ষকদের কোন শখ আহ্লাদ, নিত্য নৈমিত্তিক চাহিদা থাকতে নেই তথা তাঁদের পেট আর পিঠ থাকতে নেই। এদুটি থাকা যেন গুরুপাপ। 'শিক্ষা' প্রসঙ্গে বিস্তর, জ্ঞানগর্ভ কথাবার্তা অনেকেই বলে যাচ্ছেন তাঁদের কিন্তু শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি প্রসঙ্গে কেউ খুব একটা বলেন না বা বলতে চান না যেন এটিই 'ভাশুরের নাম' মুখে নিতেই যত নিষেধ আপত্তি বাধা বিপত্তি। বহিঃবিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কি কি বিষয় প্রাধান্য দেয় আর আমাদের দেশ কি উপায়ে শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছে। তথ্য উপাত্তের ফুলঝুরি, সুদ কষা ,দুধে পানি মেশালে কত লাভ এসব অংকের পাঠ, 'গরু গৃহপালিত পশু' এর ইংরেজি অনুবাদ ইত্যাদি শিক্ষক নিয়োগের কি সঠিক পদ্ধতি ? উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষা মডেলের দিকে দৃষ্টিপাত করে দেশীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে নতুন পদ্ধতির অবতারণা হোক।

আমি ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ সিলেটের বিএড অনার্সের প্রথম ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ইতিমধ্যেই এম এড সম্পন্ন করে বর্তমানে ব্লু বার্ড হাই স্কুল এন্ড কলেজ ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএড প্রোগ্রামের কোর্স টিচার হিসেবে শিক্ষকতায় আছি। আমাদের দেশে যেভাবে শিক্ষায় বিএড ও বিএড অনার্স চলছে সেটার পুরো প্রক্রিয়াটা বদল করা চাই। বর্তমান বিশ্বে উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষায় বিএড অনার্স একটি আলোচিত এডুকেশনাল প্রোগ্রাম/কোর্স। আমাদের দেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত বি.এড অনার্স কারিকুলাম রিফরমেশন করা কেননা এখনও বি.এড অনার্স কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে করা হচ্ছে না। উন্নত বিশ্বে বিএড/ বিএড অনার্স তথা ডিগ্রি প্রদান করা হয় নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে যেমন Education in Literature, Education in Physics, Education in English ইত্যাদি।
আমাদের দেশে বি.এড অনার্সের ২য় বর্ষে একজন শিক্ষার্থী বিষয় নির্ধারণ করে ভাষাবিজ্ঞান (বাংলা, ইংরেজি, আইসিটি) / বিজ্ঞান (পদার্থবিজ্ঞান,গনিত ও আইসিটি) মানবিক (অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইসিটি) হতে তাঁর পছন্দের বিষয়/ক্ষেত্র । এই যে বাংলা, ইংরেজি,আইসিটি/পদার্থবিজ্ঞান,গণিত ও আইসিটি/ অর্থনীতি,রাষ্ট্রবিজ্ঞান ,আইসিটি বিষয়ের পড়ে শিক্ষাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের বিশেষ লাভ হচ্ছে না বরং এই ধরি মাছ না ছুই পানি মতোর হয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা। একটা উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বি.এড অনার্সের একটা সেমিস্টারের সিলেবাস সম্পন্ন করার সময় নির্ধারণ করেছে তিন থেকে ছয়মাস। এই যে তিন থেকে ছয়মাসে একজন শিক্ষার্থী কতটুকু শিখে এবং সেটি আদৌ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে কি? চাকরি বাজারে বিশেষ করে শিক্ষা ক্ষেত্রেই বি.এড অনার্সের মন্দা চোখের পড়ার মত। স্কুল কলেজে কোন শিক্ষাবিজ্ঞান বিষয় নামে কোনো অস্তিত্বই নেই। প্রতিষ্ঠান চায় বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক আর আমাদের বিষয়টা হচ্ছে শিক্ষাবিজ্ঞান যদিও বিএড অনার্সের শিক্ষার্থীদের পড়তে হচ্ছে বিভিন্ন বিষয় যেমন ভাষাবিজ্ঞান (বাংলা, ইংরেজি, আইসিটি) / বিজ্ঞান (পদার্থবিজ্ঞান,গনিত ও আইসিটি) মানবিক (অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইসিটি) আমার মনে হয় এই ক্ষেত্রে পরিবর্তন বাঞ্ছনীয় কেননা এভাবেই পড়ে ( শুধু শুধু ডিগ্রির বোঝা) আমাদের কি লাভ? আমাদের দ্বারা রাষ্ট্রের কি লাভ? তারুণ্যশক্তি বাদ দিয়ে কখনোই একটি জাতি তার স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে পারে না। বহিঃবিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো একাডেমিক পড়াশোনার সাথে সাথে জীবন দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা,দীক্ষা, মেধা মননশীলতার চর্চা করে আর আমরা আছি পড়ে সেই মান্ধ্যতার যুগে। উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে ফিনল্যান্ড, আমেরিকা, ইউকে, শ্রীলংকা, এমনকি পার্শ্ববর্তী ভারত কত এগিয়ে শিক্ষা ও কর্মে আর আমরা ক্রমশ যাচ্ছি পিছিয়ে। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় ভিসি নিয়োগ প্রাপ্ত হন আর চা চমুচা সিঙ্গারার বয়ান শোনান, মেধার পরিবর্তে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় সুপারিশে শিক্ষক নিয়োগই এমন অসুস্থ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নেই থাকা খাওয়ার সুস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নেই যথাযথ শিক্ষা উপকরণ ব্যবস্থার সুবর্ণ সুযোগ। এছাড়া গবেষণা খাতকে রাখা হয়েছে নামকাওয়াস্তে ফি সাবি লিল্লাহ। অপ্রতুল অর্থ বরাদ্দ পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করে তুলছে। আমাদের দেশের কথাই বলা যাক। আমাদের বি.এড অনার্সে মোট আটটি সেমিস্টার। বি. এড অনার্সের সবথেকে আনন্দময় সেমিস্টার হচ্ছে ৭ম সেমিস্টার, এই সময়েই আমাদের বিভিন্ন সরকারি/বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুই/তিনমাস টিচিং প্র্যাকটিস ক্লাস নিতে হয়। আমরা বিভিন্ন সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমাদের টিচিং প্র্যাকটিস করি আমাদের কোন কমতি থাকে না বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা নিজেদের উৎসর্গ করি শিক্ষার্থীদের জন্য, শিক্ষার জন্য। গোটা দেশে সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ আছে মোট ১৪টি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের IERসহ শিক্ষা বিষয়ক এডুকেশনাল প্রোগ্রাম আছে গুটিকয়েক। শিক্ষার এইসব শাখা থেকে প্রতিবছর অনেক শিক্ষার্থী তাদের কোর্স সম্পন্ন করে চাকরি অন্বেষণের দৌড়ে নাম লেখান। এখন একটা প্রশ্ন উত্থাপন করা যেতেই পারে- এই যে শিক্ষা বিষয়ক ডিগ্রি নেয়ার পর আমাদের চাকরি খুঁজতে হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে যে ক্ষেত্রের সাথে শিক্ষার বাস্তবিক প্রয়োগ নেই বললেই চলে। এতে কি আমাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষতির পাল্লা ভারী হচ্ছে না ? একজন সাধারণ মানুষ এটার উত্তর দিবে এমনটা যে ক্ষতি হচ্ছে। ক্ষতি সংঘটিতকালে তা অনুধাবন করা যায়না মানুষ টের পায় যখন দেবালয় পুড়ে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না আর! শিক্ষকতা কোন চাকরি নয় এটি একটি ব্রত তাই শিক্ষক নিয়োগ হোক সঠিক উপায়ে হোক। শিক্ষক নিয়োগ বিশেষ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পাবলিক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেয়া হোক কারণ রাষ্ট্রকে শিক্ষক নিয়োগ পরবর্তীতে নতুন করে শিক্ষক প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হচ্ছেনা। এতে সময় ও টাকা উভয়ের রক্ষা হল সেই সেইসাথে শিক্ষাক্ষেত্রের শেকড়ের থাকা শিক্ষার্থীরা হল গুণগত মান সম্পন্ন শিক্ষক যা 2030 সালের মধ্যেই SDG-4 তথা গুণগত শিক্ষা অর্জনে অন্যতম চাবিকাঠি। তরুণদের নিয়ে ভাবতে না পারলে দেশ পিছিয়ে যাবে হাজার বছর, তরুণরাও নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে অবস্থার আলোকে তবে পরিবর্তন হোক আমাদের শিক্ষায়, আমাদের কর্মযজ্ঞের অসুস্থ প্রতিযোগিতায়। অসুস্থ ব্যক্তি যেমন সুস্থ দেহ সুস্থ মনে কোন কাজ করতে পারেন না ঠিক তেমনি অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমাদের ভেতরকার মানুষের হৃদয়, সৃজনশীল চিন্তাকে তিলে তিলে মেরে দিচ্ছে হয়ত এই ব্যাপারটা আমার বুঝতে পারছি না বা বুঝেও না বুঝার ভান করছি। এই বুঝতে না পারা কিংবা বুঝেও না বুঝার ভান করাই একদিন জাতীয় বিরাট ক্ষতির কারণ হবে দেশের শিক্ষায়। সেইদিন যেন না আসে এই লাল সবুজের বাংলাদেশের ভিটে মাটিতে রোদ বৃষ্টি জোছনায় আলো আঁধারিতে জোনাকির আলোর মোহ মায়ায়।

কলমে:
সৈয়দ মুস্তাফিজুর রহমান
প্রশিক্ষক
বিএড কোর্স, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষক: প্রশিক্ষণই পেশাগত উৎকর্ষের চাবিকাঠি✍️ সৈয়দ মুস্তাফিজুর রহমান যেকোনো জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শ্রেণি...
29/07/2026

একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষক: প্রশিক্ষণই পেশাগত উৎকর্ষের চাবিকাঠি
✍️ সৈয়দ মুস্তাফিজুর রহমান

যেকোনো জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষে আর সেই শ্রেণিকক্ষের প্রাণ হলেন মহান শিক্ষক। শিক্ষাবিজ্ঞানের (Pedagogy) আধুনিক তত্ত্ব অনুযায়ী শিক্ষকতা শুধু একটি চাকরী নয়, নয় নিছক জ্ঞান বিলানো বরং একে বলা যায় একটি নিরন্তর পরিবর্তনশীল কাঠামোবদ্ধ সুবিন্যস্ত প্রক্রিয়া। আজকের জগত দ্রুত পরিবর্তনশীল। বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির জয়জয়কার। প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ও শিক্ষার্থীর মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। শিক্ষা বিজ্ঞানের মূল দর্শন হচ্ছে শিক্ষাদানকে একটি বৈজ্ঞানিক ও শৈল্পিক রূপ প্রদান করা। পশ্চিমা বিশ্বের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদগণ প্রশিক্ষণের গুরুত্বকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। জন ডিউই (John Dewey) এর মতে, "শিক্ষা কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি প্রক্রিয়া।" এই প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে হলে শিক্ষকদের প্রতিনিয়ত নতুন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত হতে হবে। পাউলো ফ্রেইরি (Paulo Freire) তিনি প্রথাগত ‘ব্যাংকিং মডেল’ শিক্ষার পরিবর্তে সংলাপধর্মী শিক্ষার কথা বলেছেন। শিক্ষকদের এই সংলাপ ও সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষ হতে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। জঁ পিয়াজে (Jean Piaget) শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের স্তর অনুযায়ী পাঠদান নিশ্চিত করতে একজন শিক্ষককে অবশ্যই শিশুর মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণে ঋদ্ধ হতে হবে। এশীয় অঞ্চলে শিক্ষককে কেবল তথ্য প্রদানকারী হিসেবে নয়, বরং ‘গুরু’ বা ‘পথপ্রদর্শক’ হিসেবে দেখা হয়। এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে (যেমন- চীন, ভারত, বাংলাদেশ) শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। এত বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর মনোযোগ ধরে রাখা এবং বৈচিত্র্যময় শিখন চাহিদা মেটানোর জন্য বিশেষায়িত 'Pedagogical Skills' এর জ্ঞানের প্রয়োজন আছে। পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে শিক্ষকদের নিরন্তর ছাত্র থাকার ওপর জোর দেওয়া হয়। জাপানের 'Lesson Study' বা সিঙ্গাপুরের বাধ্যতামূলক ১০০ ঘণ্টার বার্ষিক প্রশিক্ষণ মডেল আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। রবীন্দ্রনাথের মতে, "এক শিখা যেমন অন্য শিখাকে জ্বালায়, তেমনি শিক্ষকের জ্ঞানতৃষ্ণা শিক্ষার্থীর মধ্যে সঞ্চারিত হতে হবে।" এই জ্ঞানতৃষ্ণা সজীব রাখার জন্য প্রশিক্ষণ আবশ্যক। বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ২০২৩ সাল থেকে প্রবর্তিত নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম শিক্ষকদের চিরাচরিত ভূমিকাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। 'সহায়তাকারী' (Facilitator) হিসেবে শিক্ষক নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষকের ভূমিকা কেবল গৎবাঁধা লেকচার দেওয়া নয়, বরং শিক্ষার্থীকে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিখতে,বুঝতে সহায়তা করা। এই রূপান্তরের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। ২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শিক্ষকদের ডিজিটাল টুলস, মাল্টিমিডিয়া এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম (যেমন: মুক্তপাঠ) ব্যবহারে দক্ষ হতে হচ্ছে। প্রযুক্তি ও এআই-এর সমন্বয়ে পাঠদান এখন সময়ের দাবি। প্রথাগত পরীক্ষার বদলে এখন 'পারদর্শিতার নির্দেশক' (PI) এর মাধ্যমে ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হচ্ছে। 'নৈপুণ্য' অ্যাপের মতো আধুনিক টুলস পরিচালনা এবং গুণগত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে নিবিড় প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।শিক্ষকদের দক্ষতা কেবল বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বহুমুখী:

১। মানসিক স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিং: শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ নিরসনে শিক্ষকের সহমর্মী হওয়া জরুরি।
২। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা: বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রান্তিক শিশুদের মূলধারায় যুক্ত করার দক্ষতা।
৩। কর্মসহায়ক গবেষণা (Action Research): শ্রেণিকক্ষের বাস্তব সমস্যা সমাধানে শিক্ষকদের নিজস্ব গবেষণা।
৪। পেশাদারিত্ব ও নেতৃত্ব: নৈতিকতা, সময়ানুবর্তিতা এবং দলীয় কাজের মাধ্যমে নেতৃত্ব প্রদান।

উন্নত প্রশিক্ষণের পথে কিছু বাধা বিদ্যমান, যেমন—বিপুল সংখ্যক শিক্ষকের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, পরিকাঠামোগত অভাব এবং পরিবর্তনের প্রতি রক্ষণশীল মানসিকতা। তবে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ, ইন-হাউস ট্রেনিং এবং পিয়ার লার্নিংয়ের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেবল একটি পেশাগত বাধ্যবাধকতা নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের দক্ষতা এবং প্রাচ্যের মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষকরা যদি নিজেদের প্রতিনিয়ত গড়ে তোলেন, তবেই ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ এবং ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন সফল হবে। একজন প্রশিক্ষিত শিক্ষকই পারেন একটি শ্রেণিকক্ষকে প্রাণবন্ত গবেষণাগারে পরিণত করতে এবং শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করতে। কথায় আছে একজন শিক্ষক ভালো তো দেশ ভালো আর দেশ ভালো তো আমি, আপনি ভালো, আমরা সবাই ভালো। একজন শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়ন হলো একটি দীর্ঘস্থায়ী যাত্রা। আজ যে শিক্ষক শিখতে থামবেন, কাল তিনি শেখানোর আগ্রহ ও অধিকার হারাবেন। তাই নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান চর্চায় আত্মনিয়োগ করাই হোক আধুনিক শিক্ষকের মহান ব্রত।

কলমে:

সৈয়দ মুস্তাফিজুর রহমান
প্রশিক্ষক বিএড কোর্স
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠাতা, Teachers' Excellence Academy,Sylhet.

Address

Sylhet
3100

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when আমাদের শিক্ষা ভাবনা posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The School

Send a message to আমাদের শিক্ষা ভাবনা:

Shortcuts

Share

Category